পড়ুন বৃটেনের দিনলিপি (১ম পর্ব)।
১০ সেপ্টেম্বর,২০১২। নিউক্যাসল, যুক্তরাজ্য।
ইস্ট কোস্ট লাইনের ট্রেনে লন্ডন থেকে নিউক্যাসল এসে নামলাম।৪৮৫ কিমি রাস্তা, রেল যোগাযোগ বেশ উন্নত, তাই যাত্রাপথের ক্লান্তি নেই।স্টেশন থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি নিলাম। এখানে পোস্ট কোডই সব ঠিকানার চূড়ান্ত, ড্রাইভারকে পোস্ট কোড বলতেই ট্যাক্সীতে সোজা বাসার সামনে নিয়ে এলো।
নিউক্যাসল উত্তর পূর্ব ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড়ো শহর, টাইন এন্ড ওয়্যার কাউন্টির রাজধানী। কাছাকাছি শহরের মধ্যে আছে ডারহাম, ইয়র্ক। স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবার্গ থেকে এর দূরত্ব ২০০ কিমি। শহরটি খুব পুরনো , এর প্রতিষ্ঠা রোমানদের হাতে খ্রীস্টিয় ২য় শতকে। রোমান সম্রাট হেড্রিয়ান এখানে একটি দূর্গ অর্থাৎ Castle নির্মান করেছিলেন, সে থেকে এর নাম নিউক্যাসল। সম্রাট হেড্রিয়ানের সময়ে তৈরী শহর রক্ষা দেয়াল 'হেড্রিয়ান ওয়াল' এর অস্তিত্ব এখনো দেখা যায়, যেটি একটি অন্যতম ট্যুরিস্ট আকর্ষণ ও বটে।
টাইন ব্রীজ ও ওয়াকওয়ে
রাতের আলোয় উজ্বল মিলেনিয়াম ব্রীজ
বৃটেনে লন্ডন যদি মহানগরী হয়ে থাকে, অন্য শহরগুলোকে ছোটখাট নগর বললেই মানাবে ভালো। দেশটার লল্ডন নির্ভরতা যে এতো বেশী, সেটি নিউক্যাসলে এসে লক্ষ করলাম। প্রধানত: মেট্রো থাকলেও তা সীমিত আকারের। রাত্রীকালীন কোন বাস সার্ভিস নেই, জরুরী প্রয়োজনে ট্যাক্সীই ভরসা, যদিও স্থানীয় প্রত্যেকেরই নিজস্ব গাড়ি আছে। লন্ডনের মতো এতো বাহারী পার্ক/উদ্যানের বিলাসীতা নেই। শহরের মূল আকর্ষণ সিটি সেন্টার যেটাকে মনুমেন্ট সিটি সেন্টার ও বলা হয়ে থাকে। তবে টাইন নদীর পাড় ঘেঁষে দুর্দান্ত একটি ওয়াকওয়ে আছে। টাইন নদীর পাড়টিও টেমসের মতো অনেক আকর্ষনীয়। নদীর উপরে আছে ৭টা সেতু। এদের মধ্যে সবচেয়ে পুরনোটির নাম হাই লেভেল ব্রীজ, প্রতিষ্ঠা ১৮৪৯ সালে(১৬০ বছর বয়স! ভাবা যায়!!)।এটি একটি রেলসেতু। আর সবচেয়ে আকর্ষণীয় দুটো সেতুর নাম টাইন ব্রীজ আর মিলেনিয়াম ব্রীজ। মিলেনিয়াম ব্রীজ নির্মাণ করা হয়েছে ২০০১ সালে মূলত পথচারীদের জন্য। আর ১৯২৮ সালে নির্মিত টাইন ব্রীজকে নিউক্যাসলের আইকন ও বলে থাকেন অনেকে।ওয়াকওয়ের পাশে দাড়িয়ে ৭টা সেতু সমেত একটি ছবি তোলেননি, নিউক্যাসলে এমন কোন টুরিস্ট বলতে গেলে নেই।
মনুমেন্ট সিটি সেন্টার, নিউক্যাসল, ইংল্যান্ড
নিউক্যাসল শহরকেন্দ্রের চাইতে এ শহরের বাইরের আকর্ষণও খুব কম নয়। নর্থশীল্ড, সাউথশীল্ড, হুইটলি বে এ উপশহরগুলো টাইন এন্ড ওয়্যারের অংশ হলেও নিউক্যাসল থেকে কিছুটা দূরে নর্থ সীর পাশে এর অবস্থান। টাইন নদীর মোহনার উত্তর প্রান্তে নর্থশীল্ড, দক্ষিণে সাউথশীল্ড। এ দুটো শহরের মাঝে যাতায়াতের জন্য ফেরী রয়েছে, রয়েছে যাত্রাপথের মনোমুগ্ধকর রোমাঞ্চ।
হুইটলী বের সুনীল সৈকত- নর্থসী
সাউথ শীল্ডে যাবার পথে সাগরের ভগ্ন উপকূলরেখার তীর ঘেঁষে নর্থ সী যখন প্রথম দেখলাম, খুবই রোমাঞ্চিত হয়েছিলাম। সমুদ্র আমার বরাবরই ভালো লাগে। কক্সবাজারের কল্লোলিত উষ্ণ ঊর্মিমালার সৈকতে আছড়ে পড়ার সুমধুর তান আমাকে সবসময় আনমনা করে দেয়। তাই মুগ্ধ হয়েছিলাম।কিন্তু ভাবিনি , আমার কক্সবাজারের নোনা জল আর নর্থ সীর নীলাভ জল এক নয়। সমুদ্রের কাছে যতই এগিয়ে গেলাম, তার শীতলতর জলের রূপদৃষ্টে ততই ভীত হলাম। সমুদ্র সৈকতে দাঁড়াতে হলো ঠান্ডা জল - হাওয়ার প্রচন্ড কাঁপুনি নিয়ে। নয়নসমুখে অসাধারণ নীল সমুদ্র, কিন্তু তাকে আপন করে, আবগাহনে সিক্ত করার সুযোগ একেবারেই নেই। দেখলাম ভগ্ন প্রস্তরময় সৈকতে মাছ ধরছে দুচারজন স্থানীয় বাসিন্দা। এই বরফের মতো ঠান্ডা জলে যে মাছ থাকতে পারে, তা এদের দেখেই বুঝতে পেলাম।
টাইনমাউথ ক্যাসল ও প্রায়রী
টাইনমাউথ লাইটহাউজ
নর্থশীল্ডে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান হচ্ছে টাইনমাউথ ক্যাসল এন্ড প্রায়রি। নর্থসীর সৈকতে পাহাড়ের ওপর স্থাপিত অসাধারণ এই ক্যাসলটি পর্যটকদের খুব কাঙ্খিত একটি স্থান। বলা হয়ে থাকে খ্রিস্টিয় ৭ম শতকে মূল ক্যাসল আর প্রায়রি স্থাপন করা হয়েছিল। প্রায়রি হচ্ছে খ্রীস্টানদের একধরনের পাঠ্যশালা। ক্যাসলে একটি জাদুঘর করা হয়েছে, আর এর পাশ ঘেঁষে পাহাড় থেকে সমুদ্র পর্যন্ত সেমে গেছে সিঁড়ি আর ওয়াকওয়ে। টাইনমাউথে এই ক্যাসলের গা ঘেষেই রয়েছে একসময়কার নিউক্যাসল বন্দর আর বাতিঘর। বন্দরটি বর্তমানে পরিত্যাক্ত হয়েছে। কিন্তু বাতিঘরটি সত্যিই দেখার মতো। নদীর দুপাড় থেকে শত-সহস্র টন পাথর ফেলে নদীমুখ সংকুচিত করে ১৯৩০ সালে এই বাঁধ আর বাতিঘর নির্মাণ করা হয়। এখানে এখন সেইলিং প্রশিক্ষণ হয়। নীল সমুদ্রের মাঝে টাইন নদীর মোহনা, বাতিঘর, টাইন ক্যাসল সব মিলিয়ে বলা চলে এটি মনোমুগ্ধকর একটি স্থান।
হলি আইল্যন্ড অব লিনডিসফার্ণ
জোয়ারের সময় হলি আইল্যান্ড কজওয়ে: বিপদাপন্ন পর্যটক
ইউনিভার্সিটি থেকে একদিন হলি আইল্যান্ডে যাওয়া হলো। আয়োজক স্টুডেন্ট ইউনিয়ন। নিউক্যাসেল থেকে ১০০ কিমি উত্তরে, নর্থ সীর মধ্যিখানে এর অবস্থান। অনেকটা আমাদের সেন্ট মার্টিন- ছেড়া দ্বীপের মতো।জোয়ারের সময় মূল ভূখন্ড থেকে পৃথক হয়ে যায়। সড়কটাকে বলা হয় হলি আইল্যান্ড কজওয়ে। জোয়ার ভাটার সময়সূচী না মেনে কজওয়েতে চলতে গেলে গাড়িসুদ্ধ পানিতে ডোবার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং সাবধান! বৃটেনে খ্রীস্টিয় ধর্মের সবচেয়ে পুরনো হাতে লেখা ল্যাটিন গসপেল এই হলি আইল্যান্ডেই পা্ওয়া যায়। এর মূল কপিটা এখন লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। হলি আইল্যন্ডের প্রাকৃতিক দৃশ্য অত্যন্ত মনোরম। নীল সমুদ্রের মাঝে এক টুকরো ছোট দ্বীপ, দ্বীপের মধ্যিখানে পা্হাড়ের উপর লিন্ডিসফার্ণ ক্যাসল, সৈকতে গাংচিলের ওড়াওড়ি। গোধূলীর পড়ন্ত আলোয় নীলাভ সৈকতের তীরে নোনা জলের স্পর্শে বসে আছি কিছুক্ষণ, মূল পৃথিবীর বন্ধন মুক্ত হয়ে--- অসাধারণ এক অনুভূতি।
ডারহাম ক্যাসল
ক্যাসলের ভেতরের দৃশ্য
নিউক্যাসল থেকে ঘন্টাখানেকের দূরত্বে ডারহাম। মূলত একটি বিশ্ববিদ্যালয় শহর। ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতি বিশ্বজোড়া।১৮৩২ সালে এর প্রতিষ্ঠা, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। তবে ডারহাম শহরের মূল আকর্ষণ ডারহাম ক্যাসল এবং ক্যাথেড্রাল। ক্যাসলটি নরম্যানদের হাতে একাদশ শতকে প্রতিষ্ঠা হয়। এটি বর্তমানে ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি কলেজ। আর ক্যাথেড্রালের প্রতিষ্ঠা ১০৯৩ সালে, বর্তমানে এটি ডারহামের অ্যাংলিকান বিশপের কার্যালয়। ক্যাসল এবং ক্যাথিড্রাল ইউনেসকো ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজের আওতাভুক্ত।ক্যাথিড্রালটি মনোমুগ্ধকর একটি স্থাপনা। বিশেষ করে দুপাশে সারি সারি আসন পাতা মধ্যযুগীয় রোমাঞ্চকর ক্যাথেড্রালে যখন প্রার্থণা সংগীতের সূচনা হয়, তখন অম্লান বদনে শুধু শুনতেই ইচ্ছে করে।
ইংল্যান্ডে আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছে গাড়ির দাম দেখে। এতো সস্তায় বিশ্বের বড়ো বড়ো ব্রান্ডের গাড়ি বিকোতে দেখে খুব আফসোস হয়! যদি দুটো গাড়ি দেশে নিয়ে যেতে পারতাম। রাস্তায় সবচেয়ে বেশী দেখলাম আমেরিকান ফোর্ড। ফিয়াট,বিএমডব্লিউ, পূজো, ভক্সওয়াগন,রেনল্ট, ভলভো,অডি, শেভ্রলেট, মার্সিডিস সব ব্র্যান্ড ই রাস্তায় দেখা যায়, তুলনায় এশীয় টয়োটা, হোন্ডা, দাইয়ুর সংখ্যা বেশ কম। বাসার সামনে ৫০০ পাউন্ডে (মাত্র ষাট হাজার টাকা!) একদিন পুরনো (বাংলাদেশের শো রুম মানের কাছাকাছি) একটি গাড়ি বিক্রির বিজ্ঞাপন দেখে খুব কিনতে ইচ্ছে হলো, কিন্তু চালানোর লাইসেন্স নেই যে!
বৃটেনের আবহাওয়ার বিবরণ লিখতে বসে ভাবছি, কি লিখব! যদি সাতদিনের বিবরণ লিখতে বসি, তাহলে তা দাঁড়াবে এরকম: চারদিন মেঘলা, মাঝে সাঝে বৃষ্টি, দুদিন অল্প স্বল্প মেঘের ফাঁকে রোদের ঝিলিক আর ২ দিন ঝকমকে রোদের উল্লসিত দিন। সকালে ফাকা আকাশ দেখে ঘর থেকে বেরুলাম, ২ ঘন্টা পর আকাশ কালো করে বৃষ্টি। ঘন্টা দুয়েক পরে আবার রোদেলা আকাশ। বৃষ্টির ধরণটাও বড়ো রোমান্টিক। সবচেয়ে ভারী বৃষ্টিও আমাদের দেশের হালকা বৃষ্টির চেয়ে হালকা, অধিকাংশ সময় এতোই হালকা যে ভ্রম হয়, একি কুয়াশা না বৃষ্টি। যেদিন প্রথম তুষারপাত হলো, বুঝতেই পারিনি হচ্ছেটা কী! তুলোর মতো ওড়াওড়ি করে ব্যস্ত করে তুলেছে চারপাশ। এ দৃশ্যটা যে কী রোমান্টিক, বলে বোঝানো যাবে না।এ সব কারণে এদেশের পোশাকের রূপও ভিন্ন। নারী, পুরুষ সবার গায়ে মাথাঢাকা ফ্যাশনেবল জ্যাকেট, শীতও কমবে, বৃষ্টিতেও ছাতার প্রয়োজন নেই, তুষারেও সমস্যা নেই।মাথা ঢেকে রাখলেই হলো।
মানুষজন অবশ্য প্রচন্ড ফ্যাশন সচেতন। ছেলে মেয়ে, বুড়ো বুড়ি সবাই যেন কোন হলিউডি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য সর্বদা প্রস্তুত! কাউকে এক মূহুর্তের জন্য সাধারণ চেহারায় দেখার জো নেই। তবে ফ্যাশন সচেতন হলেও এখানে ফ্যাশনেবল জিনিসপত্তর যে খুব দামী তা নয়।সব ধরনের গ্রাহকের জন্যই সব মূল্যের সামগ্রী রয়েছে। এখনকার অর্থনৈতিক সমস্যার জন্য অবশ্য দামী দামী দোকানে ভীড় কম। ২০ পাউন্ডে জুতো যেমন পাওয়া যাবে, তেমনি হাজার পাউন্ডের জুতোরও অভাব নেই। বাংলাদেশ থেকে পুরনো ডিজাইনের শীতবস্ত্র কিনে অবশ্য লাভ হয়নি, পরার উপায় নেই, বড্ড সেকেলে।৩০ পাউন্ডে যে এদেশে স্যুট পাওয়া যায় তা আগে জানলে কী হাজার পনেরো টাকায় বাংলাদেশ থেকে স্যুট বানিয়ে আনি!
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে নভেম্বর, ২০১২ রাত ১১:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


