somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গল্পঃ নাবিলা কাহিনী ৫ - অভিশপ্ত ভালোবাসা (১ম পর্ব)

০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৩:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



(এক)
কিছুক্ষণ ধরেই খুব অস্বস্তি লাগছিল। পড়া রেখে হাতের বইটা বেঞ্চের উপর রাখতেই মনে হলো কে যেন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ঝট করে পিছনে ফিরে তাকালাম। জামিল সাথে সাথেই মাথা নীচু করে ফেললো। লজ্জা পেয়েছে। জামিল বেশি কিছুদিন ধরেই আমার পিছনে পিছনে ঘুরছে। এই নিদারুণ ঘটনা আমি টের পেয়েছি প্রায় একমাস হলো। একদিন কলেজে বেশ আগেই চলে এসেছিলাম। কলেজের করিডোর দিয়ে আস্তে আস্তে যখন হাঁটছিলাম, তখনই চোখে পরলো বাউন্ডারি দেয়ালে, কয়েকটা গাছের গায়ে কে যেন চক দিয়ে লিখে রেখেছে সুজাতা+জামিল, জামিল+সুজাতা। বেশ লজ্জা লজ্জা লাগছিল দেখে। ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাস সবেমাত্র শুরু হয়েছে। ক্লাসের সবার সাথে সেভাবে আমার পরিচয়ও হয়নি। তবে জামিল নামের যে একটা ছেলে আমাদের ক্লাসে পড়ে সেটা এক বান্ধবীর মুখে শুনেছিলাম। সারাজীবন গার্লস স্কুলে পড়ে আসা একটা মেয়ের পক্ষে হুট করে সব ছেলেদের সাথে পরিচিত হওয়া কিংবা আড্ডা দেয়া এত সহজ নয়। ক্লাসের অনেক মেয়েকেই দেখি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই দিব্যি ছেলেদের সাথে মানিয়ে নিয়েছে, হইচই করছে, গল্প করছে। এইগুলি মনে হয় আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি এমনতেই অনেক চাপা স্বভাবে মেয়ে। দশটা কিল পরলেও একটা কথার খই ফুটে বের হয় না এই অবস্থা আমার! ছেলেদের সাথে যেয়ে যেচে আমি কথা বলবো এটা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার।

গত সপ্তাহে কলেজে ক্লাস চলাকালীন সময়ে বাথরুম থেকে ফিরে দেখি আমার ব্যাগের চেইন সামান্য খোলা। মেয়েদের ব্যাগে অনেক কিছু থাকে যা সবার দেখা ঠিক না। ব্যাগের চেইন এইজন্য মেয়েরা কখনই খোলা রাখে না। ভয় হচ্ছিল কিছু চুরি হয়ে গেল নাকি? তাড়াতাড়ি ব্যাগের চেইন খুলে ভিতরে তাকিয়ে দেখি সব ঠিক আছে। কিন্তু ভিতরের কিছু কাগজপত্রের সাথে আরেকটা অতিরিক্ত যে কাগজ ছিল সেটা খেয়ালও করিনি। বাসায় যেয়ে দেখি ভিতরে একটা প্রেমপত্র, আসলে ঠিক প্রেমপত্র না, একটা প্রেমের কবিতা লিখে শেষে আই লাভ ইউ সুজাতা লিখে দিয়েছে। হুট করেই কেমন জানি লাগলো আমার। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার দিকে তাকাতেই দেখলাম লজ্জায় আমার দুই গণ্ডদেশই রক্তিমাভ হয়ে উঠেছে। হাত দিয়ে ঘষে ঘষে সেই লজ্জার লালরং মুছার আপ্রাণ চেষ্টা করলাম। লাভ হলো না। কবিতাটা আবার পড়লাম। কবিতা গল্প উপন্যাস পড়ার পাঠক পোকা আমি। সাহিত্য আমার খুব প্রিয় বিষয়। যেকোন একটা বই পেলেই হয়, সাথে সাথেই আমি সেটাতে ডুবে যাই। কবিতার বইও অনেক পড়েছি। এই কবিতাটা যে একদম কাঁচা হাতের লেখা বুঝতে দেরি হলো না। তবুও কেন জানি খুব ভালোই লাগলো। কেউ যে আমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছে সেটাই অনেক বড় ব্যাপার। একদম নীচে সেই নব্য কবির নাম আর রোল নাম্বার লেখা। বোকা ছেলে। প্রেমপত্রে কেউ রোল নাম্বার লেখে নাকি? আমি যেন ওকে চিনতে পারি সেইজন্য মনে হয় লিখেছে। ক্লাসে নিয়ে বান্ধবীদের দেখালে এই ছেলের খবর আছে! ইচ্ছেমতো পঁচিয়ে ছেড়ে দেবে। মাথায় সহসাই দুষ্টামি বুদ্ধি এলে সেটা আবার ব্যাগেই রেখে দিলাম। কালকে ক্লাসে যেয়ে কোন ছেলেটা জামিল বের করতেই হবে।

পরেরদিন ক্লাসে প্রথম পিরিয়ডে রোল নাম্বার ডাকতেই আমি হুট করেই কার স্বপ্নের নায়িকা হয়ে গেলাম সেটা দেখতে পেলাম। আমি জামিলের দিকে ভালো করে তাকাতেই দেখি ছেলেটা লজ্জায় জড়সড় হয়ে মাথা নীচু করে বসে রইলো। সেই থেকে শুরু। সব ক্লাসেই আমার কিছুটা পিছনেই বসে জামিল আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। প্রথম প্রথম খুব অস্বস্তি লাগলেও কেন যেন আমি জামিল’কে কিছুই বলি না। ক্লাসে একটা প্রেমিক প্রবর আছে, থাক না? অসুবিধা কি? ছেলে তো আমাকে কোন ডিস্টার্ব করছে না। ক্লাসে সব বান্ধবীদেরই একটা দুইটা করে আছে। অন্তত হীনমন্যতায় তো আর আমাকে ভুকতে হব না, সেটাই বা কম কিসের? বরং মাঝে মাঝে জামিলের চোখে আমার জন্য বিমুগ্ধ যে দৃষ্টি দেখতে পাই সেটা ভালোই তো লাগে। আগে কলেজে আসার সময় এতো সাজুগুজু করে আসতাম না, কোনরকমে কাপড় পাল্টেই ঝেড়ে দৌড় দিতাম। এখন কলেজে আসার সময় খুব সাঁজতে ইচ্ছে করে। মাঝে মাঝে দারুণ করে সেঁজে আসি। সেই দিনগুলিতে জামিলের যে অবস্থা হয়! ওর চোখের পলকও মনে হয় পরে না। কয়েকদিন আগে আম্মুর কাছ থেকে একটা টাঙ্গাইলের সূতি শাড়ি নিয়ে সেটা পরে এসেছিলাম। ক্লাসে ঢুকেই দেখি আমি যেই বেঞ্চে বসি জামিল তার ঠিক পিছনের বেঞ্চেই বসে আছে। আমাকে দেখেই বিশাল এক কাতল মাছের মতো হা করে ফেললো। সেই হা আর কিছুতেই বন্ধ হয় না। চোখের মনি প্রায় ঠিকরে বের হয়ে যায় অবস্থা!

জামিলের এই অবস্থা দেখে আমার মাথায় মহাদুষ্টামি বুদ্ধি এসে চাপলো। ইচ্ছে করেই পিঠ খোলা রেখে ওর ঠিক সামনেই যেয়ে বসলাম। নির্ঘাত আজকেই একটা প্রেমের কবিতা পাবো ওর কাছ থেকে। এখনই মনে হয় লেখা শুরু করে দেবে। ক্লাস শুরু হয়ে গেল কিছুক্ষণ পরেই। স্যার যেই উল্টোদিকে দিকে ফিরে ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা শুরু করে, বজ্জাতটা সাথে সাথেই এগিয়ে এসে আমার কানের কাছে গান গাওয়া শুরু করে দেয়। সেদিন সব ক্লাসেই এই একই কাজ করলো জামিল। ‘পরে না চোখের পলক, কী তোমার রূপের ঝলক, আমি জ্ঞান হারাবো, মরেই যাবো, বাঁচাতে পারবে না কেউ…’
গানের এইলাইনগুলি শুনে আমি হাসতে হাসতে শেষ। মুখে হাত চেপে ধরেও হাসি আমি কিছুতেই থামাতে পারি না, হাসির দমকে দুইচোখেই প্রায় পানি চলে আসার উপক্রম!

মনের ভিতরে মহাশংকা নিয়েই মাঝে মাঝে পিছনে ফিরে তাকাচ্ছিলাম আমি। জ্ঞান হারিয়ে সত্যই যদি জামিল পরে যায় তখন কেলেঙ্কারি কাণ্ড হয়ে যাবে। এই কলেজে আর বেশ কিছুদিন আসাই যাবে না!


(দুই)
ক্লাসের সব বিষয়ের মধ্যে কেন যেন ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাসগুলির প্রতি আমার আকর্ষণ বেশি। কলেজে সদ্য যোগ দেয়া কামরুল হাসান স্যার’কে আমার খুব ভালো লাগে। ইংরেজি সাহিত্যের ক্লাস যে কত মধুর হতে পারে কামরুল স্যার সেটা হাতেনাতেই প্রমাণ করে দিলেন। দ্য ওল্ড ম্যান এ্যান্ড দ্যা সি, মাদার ইন ম্যানভাইল, গিফট অব দ্য মেজাই গল্পগুলোর প্রেমে গভীরভাবে আমি ডুবে গেলাম। এই ডুবন্ত অবস্থাতেই নিজের অজান্তেই কামরুল স্যার কখন যেন আমার মনের ভিতরে বাসা বানাতে শুরু করে দিলো!
কামরুল স্যার বয়সে তরুণ, অবিবাহিত। ক্লাসেও খুব স্মার্টলী আসেন। কন্ঠস্বরও দারুণ, ভরাট গলা। আমি পুরো ক্লাসেই গালে হাত দিয়ে মুগ্ধ হয়ে শুধু স্যারের কথা শুনি আর শুনি। নিজের যে কত বড় সর্বনাশ ইতিমধ্যেই হয়ে গেছে সেটা ঠিকই টের পেলাম একদিন। স্যার ক্লাসের মাঝখানে আমাকে দাঁড় করিয়ে একটা প্রশ্ন করলেন। খুব সহজ প্রশ্ন। আমি উত্তরটা জানি, শুধু আমি কেন ক্লাসের সবাই জানে। কিন্তু কিছুতেই স্যার’কে মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছিলাম না। মুখ খুললেই কেমন যেন কথা জড়িয়ে যাচ্ছে। সারা ক্লাসে হাসির হুল্লোড় বয়ে যাচ্ছে। মাথা ঘুরিয়ে দেখি জামিল রীতিমতো হতম্ভব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। চরম বিব্রতকর অবস্থা। স্যার আমাকে বসতে বলে এরপর থেকে ক্লাসে মনোযোগ দিয়ে পড়া শুনতে বললেন।

রাগে সারা গা জ্বলতে লাগলো আমার। আমার চেয়ে বেশি মনোযোগ দিয়ে স্যারের ক্লাস কেউ করে নাকি? আজকে ক্লাসে ঢুকার পর থেকে কামরুল স্যার এখন পর্যন্ত যা যা বলেছে সব আমি ঠা ঠা মুখস্ত বলে দিতে পারবো। না, কামরুল স্যারের সামনে মনে হয় বলতে পারবো না। বাকি সবার সামনে পারবো। মেজাজ এত খারাপ হয়ে গেল যে বাকি ক্লাসে আর কোনভাবেই মনোযোগ দিতে পারলাম না। ঠিক একই ঘটনা পরের সপ্তাহেও আবার ঘটলো। এবার আর ছাড় পেলাম না।

ক্লাসের ভিতরেই সবাই আমাকে কামরুল স্যার’কে নিয়ে রীতিমতো পঁচানো শুরু করে দিলো। সবাই মিলে এত পঁচালেও আমার কেন যেন খুব একটা খারাপ লাগতো না। আমি কাউকে কিছুই বলতাম না। চুপ করে শুধুই শুনে যেতাম। তবে বেচারা জামিলে অবস্থা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমার চেয়ে ওকেই বেশি পঁচাতো সবাই। আগ বাড়িয়ে সবাই’কে ঐ বলে বেড়িয়েছিল আমি নাকি ওর প্রেমিকা! এখন ঠেলা সামলা অবস্থা! কামরুল স্যারের ক্লাস করাই জামিল বাদ দিয়ে দিল।

জামিল ছাড়াও আর বেশ কয়েকজন আমাকে প্রেমপত্র দিয়েছিল। আমি কাউকেই কিছু বলিনি। চাপা স্বভাবের মেয়ে দেখে সহজে কেউ বিরক্তও করতো না। তবে মাঝে মাঝে সুযোগ পেলেই আমার কানের কাছে এসে এরা ঘ্যানর ঘ্যানর করতো। আমি কোন উত্তর দিতাম না। এরা জানতো আমি কথা কম বলি। শুধু জামিলের সাথে টুকটাক কথা হতো।

প্রায় রাতেই আমি জামিল আর কামরুল স্যারের বিষয় নিয়ে চিন্তা করি। কেন যেন সহপাঠী ছেলে বন্ধুরা অনেকেই আমার বাহ্যিক রূপের প্রেমে পরলেও তাদের দূর্বল ব্যক্তিত্ব আমার মনে রেখাপাত করতে পারলো না। নিজের অজান্তেই আমি এদের ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেলাম। তুষার, রাজু, কবির আমাকে বেশ কয়েকবার চিঠি লিখলেও ওদের কাউকেই আমার যোগ্য বলে মনে হলো না। আমার সহপাঠীরা আমার অল্প একটু ভালোবাসা পাওয়ার আশায় কলেজের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন কিছু লিখে নিয়মিত মুখরোচক আলোচনার জন্ম দিলেও আমি এদের নিয়ে কোন আগ্রহই পেলাম না। আমি ততোদিনে মনে মনে কামরুল হাসান স্যার’কে আমার মনের ভিতরে স্বপ্নের নায়কের জায়গায় বসিয়ে নিয়েছি। স্যারের মনোমুগ্ধকর ক্লাসের প্রেমে পড়ে গেলাম আমি। স্যারের প্রতি দুর্বলতা দিন দিন বাড়তে থাকলে স্যারও ঠিক ঠিক একদিন টের পেয়ে গেলেন।

পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়ে যাবার আগেই কামরুল হাসান স্যার আমাদের কলেজের প্রিন্সিপ্যাল আজাদ মল্লিক স্যার’কে নিয়ে আমাদের বাসায় এসে একদিন হাজির। আমাকে সামনে বসিয়েই আমার আব্বু আম্মুকে আমার বিষয়ে অনেক উৎসাহ দিলেন। আমি যে খুব ভালো একজন ছাত্রী এবং সুযোগ পেলে আমি কলেজের মান সম্মান অনেক উঁচু পর্যায়ে নিয়ে যাবো সেটাই বুঝালেন। এরপর প্রিন্সিপ্যাল স্যার এবং কামরুল স্যার আমাকে ডেকে নিয়ে আলাদা করে কথা বলতে বসলেন। কামরুল স্যার মনে হয় প্রায় সবকিছু আগেই প্রিন্সিপ্যাল স্যার’কে বলে নিয়ে এসেছিলেন। দুইজনই খুব সুন্দর করে আমাকে যা বুঝানোর বুঝিয়ে দিলেন, কামরুল স্যার বেশ কঠোর ভাষায় আমাকে সংযত হয়ে আচরণ করতে এবং মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করতে বললেন। লজ্জা আমার মাথা কাটা যাচ্ছিল। আব্বু আম্মু নিশ্চয় পাশের রুম থেকে সব কিছু শুনছিলেন। প্রিন্সিপ্যাল আজাদ স্যার আমাকে উনাদের সামনের ওয়াদা করালেন যে আমি এখন থেকে শুধুমাত্র লেখাপড়ায় মনোযোগ দেবো।

উনারা চলে যাবার পর দৌড়ে আমি নিজের রুমে চলে আসলাম। বাসায় কাউকেই মুখ দেখানোর মতো অবস্থা নেই এখন। তবে আব্বু আম্মু আমাকে কিছুই বললেন না। রাতেরবেলা ঘুমানো আগে অল্পবয়সী মেয়েলী আবেগে অনেকক্ষণ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে জামা পুরো ভিজিয়ে ফেললাম। কোন শিক্ষকের ক্লাসের প্রেমে পড়া এবং সেই শিক্ষকের প্রেমে পড়ার মাঝে আকাশ পাতাল পার্থক্যটা আমাকে আজকে দুইজন স্যার খুব সুন্দর বুঝিয়ে দিয়ে গেছেন। শিক্ষকদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা সহসাই হাজারগুণ বেড়ে গেলো। কিছুক্ষণ পরে কান্না থামলে নিজেই নিজেকে সান্তনা দিলাম। আমাকে অনেক শক্তপোক্ত হতে হবে। লেখাপড়া করে মানুষের মত মানুষ হতে হবে। আব্বু, আম্মু, স্যারদের মুখ উজ্জ্বল করতে হবে।

আগের চেয়েও বেশি আগ্রহ নিয়ে আমি লেখাপড়ায় ঝাপিয়ে পরলাম। ধীরে ধীরে ক্লাসের সব বন্ধু বান্ধবীদের কাছ থেকে দূর থেকে আর দূরে সরে যেতে লাগলাম। দেমাগী, স্বার্থপর, অহংকারী ইত্যাদি নানাবিধ তকমা আমার কপালে জুটে গেল। ক্লাসে কেউ আর ভালো করে আমার সাথে কথাও বলে না। ছোটবেলা থেকেই অন্তর্মুখী মেয়ে ছিলাম আমি, এখন যেন আরো বেশি নিজের ভিতরে শামুকের মতো গুটিয়ে গেলাম আমি।

কলেজের দুইটা বছর দেখতে দেখতে কেটে গেল। আমিও আমার পরিশ্রম এবং সাধনার ফল হাতেনাতেই পেয়ে গেলাম। মফস্বলের একটা সাধারণ কলেজ থেকে আমি আর্টস নিয়ে স্টার মার্কসহ পাশ করে বের হলাম।


খুব মনোযোগ দিয়ে এতক্ষণ সুজাতার কাহিনী শুনছিল নাবিলা। সুজাতার কথা শেষ হতেই জিজ্ঞেস করলো-
-সুজাতা, কলেজ থেকে পাশ করে বের হয়ে যাবার আগে জামিল কি তোমার সাথে ওর এফিয়্যার নিয়ে আর কোন কথাই বলেনি?
-না ম্যাডাম। আসলে ও কিছুটা অন্যরকম ছেলে। কামরুল স্যারের সাথে আমার এই ঘটনার পর জামিল খুব শকড হয়ে গিয়েছিল। কামরুল স্যারের ক্লাস ও কোনভাবেই করবে না। এই নিয়ে প্রিন্সিপ্যাল স্যার একদিন ওকে ডেকে নিয়ে খুব করে বকা দিতেই জামিল আমাদের কলেজ ছেড়ে একবারে চলে যায়।
-জামিলের সাথে কি তোমার আর কখনই কথা হয়নি?
-না ম্যাডাম। ফার্স্ট ইয়ারে থাকতেই একদিন আমার কাছে মোবাইল নাম্বার চেয়েছিল। আব্বু আমাকে কোন মোবাইল কিনে দেন নি। তাই ওকে কোন নাম্বার দিতে পারিনি। এজন্য পরে আর যোগাযোগ হয়নি।
-জামিল কেমন আছে সেটা কখন জানতেও ইচ্ছে করে না তোমার?
-ও ভালো আছে। অনেক ভালো আছে।
-তোমার সাথে তো কথাই হয় না। তুমি জানলে কিভাবে যে ও ভালো আছে? সুজাতা আমার কাছে কোন কিছু গোপন করার চেষ্টা করবে না। তুমি কিভাবে জানলে? দেখা হয়েছিল জামিলের সাথে?

সুজাতা বেশ অস্বস্তি নিয়েই ওর সামনে বেশ বসা পরিপাটি করে শাড়ি পরা মহিলা সাইকোলজিস্ট নাবিলা হকের দিকে তাকালো। এই দুঃসহ স্মৃতিটা সুজাতা গোপন করতে চেয়েছিল। জীবনের কিছু কিছু স্মৃতি যত দ্রুত ভুলে যাওয়া যায় ততই ভালো। সুজাতা কিছুতেই সেই স্মৃতি আবার ওর মনে ফিরিয়ে আনতে চাইছে না। মাথা নীচু করে ও সোফায় বসে রইলো।

নাবিলা ওর হাতে ধরা সুজাতার ফাইলে আজকের কিছু তথ্য লিখে রাখলো। সুজাতার এটাই প্রথম সেশন, এইজন্য এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। রোগী আসলেই অসুস্থ, নাকি সেটার ভান করছে সেটা একটা সেশনেই ধরে ফেলা যায়।
-জামিল তোমাকে সব মিলিয়ে মোট কয়টা প্রেমপত্র লিখেছিল? কয়টা কবিতা লিখেছিল?
-ম্যাডাম, আমার এই অসুস্থতার সাথে জামিলের সাথে কোন সর্ম্পক নেই।
-সুজাতা, জামিল কি তোমাকে কখনও চুমু খেয়েছিল? কখনও শারীরিক সর্ম্পক হয়েছিল তোমাদের দুইজনের?
-না ম্যাডাম।
সুজাতার মুখের এক্সপ্রেশন খুব কম। কোন কিছু ওকে স্পর্শ করলো, নাকি করলো না সেটা ওর চেহারা দেখে বুঝাই যায় না। নাবিলা ওর হাতঘড়ির দিকে তাকালো। প্রায় একঘন্টা পার হয়ে গেছে সুজাতার সেশনের। নাবিলা সুজাতার ফাইলে আজকের মতো লেখা বন্ধ করলো।
-সুজাতা, তুমি যদি আমার সাথে সেশন কন্টিনিউ করতে চাও তাহলে আমাকে সবকিছু খুলে বলতে হবে। কোন কিছুই গোপন করা যাবে না। আজকে শুধুমাত্র প্রথমদিন দেখেই আমি এই রুলস ভায়োলেট করলাম। আর তোমার আজকের সেশন এখানেই শেষ।

বেশ বড় করে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো সুজাতা। দ্রুত হাতেই ভেনিটি ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যেতে চাইছে ও।
-সুজাতা?
-জী ম্যাডাম?
-নেক্সট সেশনে আমি কিন্তু জামিলের আদ্যপান্ত সবকিছু শুনতে চাইবো। পরেরদিন কোন এক্সকিউজ হবে না। ক্লিয়ার?
-জী ম্যাডাম, ক্লিয়ার।

সুজাতা রুম থেকে বের হয়ে যেতেই নাবিলা দ্রুত হাতে সুজাতার ফাইলে আরো নতুন কিছু তথ্য লিখতে শুরু করলো।

(তিন)
মানুষের স্বপ্ন তার জীবনের চেয়েও অনেক বড় হয়। কলেজে খুব ভালো রেজাল্ট হবার কারণে বাসা থেকেই আমাকে ঢাকায় পাঠানো হলো। কলেজের চারজন বান্ধবী একসাথেই ফার্মগেটের একটা ছাত্রীনিবাসে এসে উঠলাম। বড় একটা রুম। দুইটা খাট। এক খাটে দুইজন করে ঘুমাই। শেলী, লিপি, কাজল আর আমি। আমি আর কাজল এক খাটে এবং শেলী আর লিপি এক খাটে। আমি ছাড়া বাকি তিনজনই সাইন্সের স্টুডেন্ট। একসাথে কোচিংয়ে যাই আবার একসাথেই ফিরে আসি।

কলেজে এদের সাথে খুব একটা খাতির না থাকলেও খুব তাড়াতাড়ি আমরা একে অপরের আত্মার আত্মীয় হয়ে উঠলাম। বিকেলবেলা একসাথেই আমরা সংসদ ভবনের সামনের খোলা জায়গায়, চন্দ্রিমা উদ্যানের ভিতরে, ক্রিসেন্ট লেকের শান বাঁধানো পাড়ে হাতে হাত ধরে ঘুরে বেড়াতাম। অস্তমিত সূর্যের গোধূলি লগনে আলো আঁধারীর মাঝে যুগলবন্দী প্রেমিক প্রেমিকাদের দেখলেই আমরা শিহরিত হয়ে উঠতাম। নিজেদের নিঃসঙ্গতা কাটিয়ে উঠার জন্য আমরা আরো বেশি বেশি করে একসাথে থাকা, ঘুরাফেরা করতাম। প্রেম করার ইচ্ছে আমাদের সবারই ছিল। কিন্তু আমরা ঠিক করেছিলাম ভার্সিটি উঠেই একবারে জীবনসঙ্গী বাছাই করে নেবো।


এতটুকু বলেই সুজাতা হঠাৎ চুপ হয়ে কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে বসে থাকলো। নাবিলা সুজাতার ফাইলের একদম প্রথমে দেয়া তথ্যগুলি আবার বের করে দেখলোঃ
*নাম – সাদিয়া আফরিন। ডাক নাম - সুজাতা।
*বয়স - ২০ বছর।
*বৈবাহিক অবস্থা - অবিবাহিতা।
*পেশা - ছাত্রী, প্রথম বর্ষ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
*বর্তমান ঠিকানা – শামসুন নাহার হল, ঢাকা।
*অন্যান্য – কোন ভাইবোন নেই। বাবা ব্যবসা করেন, মা গৃহিণী।
*সমস্যা – ফাঁকা। (তার মানে পেশেন্ট নিজের মুখেই সমস্যার কথা বলতে চাচ্ছে)

নাবিলা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সুজাতার দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা গভীর অন্তর্মূখী স্বভাবের। খুব ভেবে চিন্তে প্রতিটা কথা বলে। মানুষের মন এমনিতেই খুবই বিচিত্র, আর তারচেয়েও বিচিত্র সব সমস্যা এরা নিজেরাই সৃষ্টি করে বেড়ায়।
-সুজাতা, তুমি কি আমার কাছে স্বেচ্ছায় এসেছ? না কেউ তোমাকে আমার কাছে আসতে বলেছে?
-নিজের ইচ্ছায় এসেছি।
-তোমার কেন মনে হলো আমার কাছে তোমাকে আসতেই হবে?
-আমি আসলে বিরাট একটা মানসিক সঙ্কটে ভুগছি।
-তোমার এই সমস্যাটা কতদিন ধরে হচ্ছে?
-প্রায় নয়মাস থেকে। মানে আমি টের পেয়েছি যেদিন থেকে।

প্রায় তিন মিনিট পরে যখন সুজাতা আবার কথা শুরু করলো, তখন কথা বলার টোনটা একেবারেই বদলে গেল। মৃদুস্বরে এবার যা যা বললো, সেটা শোনার জন্য নাবিলা মোটেও প্রস্তুত ছিল না.....

কাজল আর আমি কোচিংয়ের সময়ে ছাত্রীনিবাসে একই বিছানায় ঘুমাতাম। কাজল আমার চেয়ে অনেক সুন্দরী এবং আকর্ষনীয়া। তখন শীতকাল ছিল। রাতে আমরা একই কম্বলের নীচে ঘুমাতাম। কলেজে থাকতেই জুয়েল ভাইয়ার সাথে কাজলের এ্যাফিয়ার ছিল। কিন্তু ঢাকায় আসার আগে সেটা ভেঙ্গে যায়। রাতে ঘুমের ঘোরে কাজল প্রায়ই আমাকে জড়িয়ে ধরে ওর প্রেমিক মনে করে আমাকে ইচ্ছেমতো চুমু খেত, জড়াজড়ি করতো। কাজল ঘুমের ঘোরে এইসব করলেও আমি তো জেগে থাকতাম আর ভিতরে ভিতরে শিহরণে কাঁপতাম কিন্তু কিছুই প্রকাশ করতে পারতাম না। কাজলের আবেগের স্পর্শগুলির সময়ে আমি চন্দ্রাহতের মতো হয়ে যেতাম। মুহুর্তের মধ্যে আমার পুরো পৃথিবী নিঃস্তব্ধ হয়ে যেত। কী এক অসহ্য অচেনা অনুভুতি এসে আমার সমস্ত যুক্তিতর্ককে ছাপিয়ে পুরোপুরি আছন্ন করে ফেলতো! আস্তে আস্তে আমার মনের ভিতরে এক নিষিদ্ধ ভালোলাগা কাজ করতে শুরু করলো। কাজলের সুগঠিত স্তন, নিতম্ব, উরু, কমলার কোয়ার মত জোড়া ঠোঁট সবকিছু আমার বুকের ভিতরে অজানা আবেগের ক্রমাগত আস্ফালন করতো। কারণে অকারণে আমি কাজল’কে জড়িয়ে ধরতাম, ধরতেও খুব ভালো লাগতো। ওকে জড়িয়ে ধরার মধ্যে আমি অদ্ভুত অনুভূতি টের পেতে শুরু করলাম যা দুইজন নারীর ক্ষেত্রে একেবারেই অস্বাভাবিক ঘটনা।

নাবিলা সুজাতা'কে থামতে বললো। মেয়েটা জড়তা কাটিয়ে খোলামেলাভাবে কথা বলতে শুরু করেছে সেটা খুব ভালো লক্ষন। কিন্তু সুজাতা এখন খুব জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে, এইভাবে একে কথা বলতে দেয়া ঠিক হবে না।
-সুজাতা, এই বিষয়টা নিয়ে আমরা কিছুক্ষণ পরে আলাপ করবো। আমাকে তোমার শৈশবের কোন মধুর একটা স্মৃতির কথা বলো। যেটার কথা তোমার প্রায়ই মনে পড়ে।

সুজাতাও যেন যেন বিশাল একটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। তীব্র অস্বস্তির নিঃশ্বাসটা বড় হয়ে বের হয়ে যেতেই বুক থেকে যেন পাষানসম পাথরটাও ঝট করে নেমে গেল। নাবিলার কথামতো সুজাতা ছোটবেলায় ওর বাবার সাথে নৌকায় করে নদীর বুকে ঘুরে বেড়ানোর একটা চমৎকার স্মৃতির বলতে শুরু করলো। সুজাতা চোখ মুখ এখন সেই মধুর স্মৃতি মনে পড়ে যাওয়ায় ঝকমক করছে। উত্তেজনার স্নায়বিক চাপ কাটিয়ে শান্ত আর স্বাভাবিক অবস্থায় দ্রুতই ফিরে আসছে সুজাতা। হাসিমুখে নাবিলা সুজাতার সেই কাহিনী শুনতে লাগলো।

কাজল খুব ঘুমাতে পছন্দ করতো। আমি ইচ্ছে করেই ওকে জাগাতাম না। জড়িয়ে ধরে ওর অজান্তেই ওর সুশোভিত শরীরের ঘ্রাণ নিতাম। কাজলকে সুযোগ পেলেই গভীর রাতে আমি জড়িয়ে ধরতে শুরু করলাম। আমার মধ্যে নতুন এক পরিবর্তন শুরু হলো। সাজুগুজু আমার আগে খুব ভালো লাগলেও এখন আর ভালো লাগে না। ভয়াবহ বিষন্নতা আমাকে কূঁড়ে কুঁড়ে খেতে শুরু করলো। আমার রুমমেটদের গোপন পোশাকগুলো আমার খুব প্রিয় হয়ে উঠতে লাগলো। ওদের জামা, অর্ন্তবাসে আমি কামনার গন্ধ পাই। ওরা রুমে না থাকলে সেগুলো নিয়ে ভিন্ন এক আকর্ষণ কাজ করে। ওরা যখন আমার সামনে কাপড় পাল্টায়, ইচ্ছে করেই ওদেরকে জড়িয়ে ধরি, আদর করি, চুমু খেতে থাকি। ওদের কাউকেই কিছু টের পেতে দেই না। মেয়েদের মতোই আমি ওদের সামনে আচরণ করি। কোচিং চলাকালে অনেক ছেলে ইশারা ইঙ্গিতে আমার কাছে আসতে চাইলেও আমি কেন যেন কোন আগ্রহই পাইনি। চোখের সামনেই আমার সোনালী ভবিষ্যতের হাতছানি। আমাকে নিজের লালিত স্বপ্ন, আমার প্রিয় শিক্ষকদের আকাংখা, বাবা মা’র আশাগুলি পূরণ করতেই হবে। খুব খাটাখাটনি করেছিলাম আমরা সবাই। ফলাফল হাতেনাতেই পেলাম। ঢাকা ভার্সিটিতে আমরা চারজনই চান্স পেয়ে গেলাম। শুরু হয়ে গেল আমাদের নতুন এক জীবন।

ভার্সিটিতে ক্লাস শুরু হতেই আমার সামনে এক নতুন পৃথিবী চলে আসলো। নিজের এই অবৈধ গোপন ইচ্ছে আমি ধামাচাপা দেবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগলাম। ঠিক করে ফেললাম আমি খুব দ্রুতই প্রেম করে ফেলবো। একটা ছেলের সাথে গভীর সর্ম্পক তৈরি হলেই হয়তো এইসব নোংরা ইচ্ছেগুলি কেটে যাবে। ক্লাসের ছেলেদের সাথে ভালোভাবে মিশতে শুরু করলাম, নিয়মিত আড্ডা দিতাম। ক্লাসমেট রায়হানের সাথেই আমার প্রথম গভীর বন্ধুত্ব হলো। রায়হান আমাকে প্রচুর সময় দিতে শুরু করলো। একসাথে লাইব্রেরি ওয়ার্ক করা, এ্যাসাইনমেন্ট করা, সময় পেলেই রিকশায় ঘুরতে যাওয়া, মাঝে মাঝেই বাইরে হোটেলগুলিতে খেতে যাওয়া। তিনমাস এভাবেই চললো। রায়হান রিকশায় বসার সময়, পার্কে হাঁটার সময় ইচ্ছেমতো আমার হাত ধরতে লাগলো। কোথাও প্রেমিক যুগলদের অন্তরঙ্গ দৃশ্য দেখলেই ও আমার ঘনিষ্ট হতে চেষ্টা করতো। রিকশায় উঠে হুট তুলে দিয়েই চুমু খেতে চেষ্টা করতো, জোর করে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে রাখতো। রায়হান আমার মনের সাথে শরীর’কেও ভালোবাসতে শুরু করলো। বান্ধবীরা তাদের প্রেমিকের সাথে অন্তরঙ্গ সময় কাটিয়ে হলে ফিরে গভীর রাত পর্যন্ত সেইসব গল্প করে অজানা পূলকে ভাসতে দেখে আমারও এতে খুব আগ্রহ হলো।

কয়েকদিন পরেই কাজলের ফুপাতো বড় বোনের বিয়ে। কাজল, রায়হান, আমি লঞ্চ করে বরিশালে যাওয়ার সুযোগ পেলাম। রায়হানের খুব কাছে আসার এই সুযোগ আমি কোনভাবেই হাতছাড়া করতে চাইলাম না। দক্ষিণের লঞ্চভ্রমণ সম্পর্কে আমার আসলে কোন ধারণাই ছিল না। লঞ্চে জীবনে প্রথমবার উঠলাম। দোতলা সুসজ্জিত সব কেবিন। কেবিনের সামনে ছোট্ট বারান্দা। সেই বারান্দায় সামনা সামনি বসে রাতের আকাশ দেখার জন্য খুব সুন্দর ব্যবস্থা আছে। লঞ্চে উঠেই আমি রায়হান’কে নিয়ে পুরো লঞ্চ ঘুরে দেখতে লাগলাম। দক্ষিণবঙ্গের মেয়ে বলে নদী, লঞ্চ, রাতের জোছনা দেখতে দেখতে কাজলের চোখ পঁচে গেছে। ও কেবিনে বসে গল্পের বই পড়ছে আর আমি রায়হান’কে নিয়ে বাইরে ঘুরছি। ইচ্ছে করেই রায়হানের গা ঘেঁষে আমি দাঁড়ালাম, সুযোগ দিলাম পেছন থেকে জড়িয়ে ধরার। রায়হানও এই সুযোগ হাতছাড়া করলো না। বিকেলে পেরিয়ে রাত নেমে এলো। রাতের খাবার খেয়ে কিছুক্ষণ তিনজন কেবিনে বসে লুডু খেললাম। কাজল আবার বই পড়তে শুরু করলে আমি আর রায়হান বাইরে এসে বসলাম। বারান্দায় মুখোমুখী চেয়ারে বসে কেবিনের যাত্রীরা আয়েশ করে চাঁদনী রাতের সৌন্দর্য্য উপভোগ করতে লাগলো। অথৈ পদ্মার বুক থেকে ভেসে হিমেল বাতাসের আবেশে প্রেমিকা কিংবা বউ’রা ঢংয়ে আল্লাদে ঢলে ঢলে পরছে পুরুষ সঙ্গীদের গায়ে। কেউ কেউ আবার লঞ্চের কোনায় যেয়ে টাইটানিকের রোজ আর ডিক্যাপ্রিও সাজছে। চাঁদের আলোতে চিকচিক করছে নদীর পানি। হালকা করে ঢেউ আছড়ে পড়ছে লঞ্চের ডেকে। পাশে বসা রায়হান পা দিয়ে আমার পা স্পর্শ করে, হাতে হাত ধরে রাখলো। আমি কিছুই বললাম না। আমিও চাই আজকের রাতটা ও আমার আরো কাছে আসুক। আমাদের চোখের সামনেই কপোত কপোতীরা বেশিরভাগই গভীর ভালোবাসায় হারিয়ে যাবার পথে।

আমিও কী মনে করে উঠে দাঁড়াই। রায়হানও আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমার খোলা লম্বা চুলগুলো ওর চোখে মুখে বুকে আছড়ে পরছে। রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে একটু নীচে ঝুঁকে আমি পদ্মার গভীর পানির ভিতর চাঁদের তীব্র আলোর ঝলকানি উপভোগ করতে থাকি। ইলিশ ধরার সাড়ি সাড়ি নৌকাগুলো আমাদের পাশ ঘেঁষে চলে যায়। রায়হানও আমার পিছনে এসে কখন যে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে টেরই পাইনি। ও আমার ঘাড়ে, কানে আলতো করে আদর করতে থাকে। আমিও ঘুরে ওর বুকের সাথে একদম মিশে যাই। বেশ কিছুক্ষণ ওকে জড়িয়ে ধরে থাকি। সুতীব্র পুরুষত্বের তাড়নায় রায়হান প্রায় জোর করেই আমাকে টেনে কেবিনে নিয়ে ঢুকালো। কেবিনের দরজা ভালো করে লাগিয়ে দিয়েই রায়হান আমার গোলাপী ঠোঁটে আদর করতে শুরু করে। আমি জানি ও এটা খুবই পছন্দ করে। ও আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বিছানায় শোয়লো। ওর ঠোঁটের স্পর্শের সাথে কাজলের ঠোঁটের আমার অভিজ্ঞতার সাথে কোন মিল খুঁজে পেলাম না। কাজল যে গভীর আবেগে আমাকে জড়িয়ে ধরতো সেটার সাথে রায়হানের কোন মিলই নেই। কাজল আমাকে জড়িয়ে ধরে যেভাবে আদর করতো তার সাথে রায়হানের চকিত আদরের কোন মিল আমি খুঁজে পেলাম না। ক্রমাগত এই অমিলগুলি আমার ভিতরে ছটফট করতে লাগলো। রায়হান'কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শেষবার ওর প্রতি আমার নারীসুলভ অনুভূতি মাপার আপ্রাণ চেষ্টা করি। নাহ, নিজের ভেতর নারীত্বের কোন কাঁপন, কোন তাড়না, একবিন্দু কামনাও অনুভব করলাম না। যেই অনুভূতি আমি কাজলকে জড়িয়ে ধরলে, ওর পাশে বসলে, এমন কি ওর পাশে শুতে গেলে হয় তার প্রায় কোন কিছুই আমি অনুভব করলাম না। সুতীব্র হাঁসফাঁসে যেন আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগলো। আমি কোনরকমে বিছানা থেকে নেমে একদৌড়ে কেবিনের দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়ালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই হালকা বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলে ঠান্ডা বাতাস সহ্য করতে না পেরে সবাই কেবিনে ঢুকে পরছে। আমি কাজলের কেবিনে ঢুকে ওর পাশে যেয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পরলাম। আমি যথেষ্ঠ সুন্দরী একটা মেয়ে। আমার ফিগারও তো খারাপ না।
তবে কেন আমার রায়হানের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে না?
কেন আমার মধ্যে রায়হানের জন্য কোনরকমের যৌন অনুভূতি আসছেই না?
আমার বুকের ভিতরে হৃদয়টা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে গেল, চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পরলো।
কেন আমার সাথে এমন হচ্ছে?
কেন?
কেন?
কেন?


আরোও পর্ব আসছে...............


সবাইকে ধন্যবাদ ও শুভ কামনা রইল।
সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত @ নীল আকাশ, সেপ্টেমবর ২০২০


উৎসর্গঃ আমার খুব প্রিয় বন্ধু, উপন্যাসিক, গল্পকার এবং কথা সাহিত্যিক @এ কে আজাদ'কে। যার প্রতিটা লেখাই আমি মুগ্ধতার সাথে পড়ি। ইচ্ছে করে প্রথাগত নিয়মের বাইরে যেয়ে ঠিক ওর মতন করে লিখতে!
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ বিকাল ৪:৩১
১৬টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতাঃ যেভাবে একুশে ফেব্রুয়ারি এলো

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ সকাল ৯:২৯


বসন্তের সিগ্ধ রোদ ঝলমলে,
কৃষ্ণচূড়া, পলাশ ও শিমুল ফোটার দিন।
সময়টা মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসায় আপ্লূত হবার লগন।
বসন্তের আগমনে দখিনা মলয়ের মতো ভেসে চলার দিন এদিক ওদিক পানে।
মায়া মায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

সাদা পায়রারা চলে যায়

লিখেছেন পদ্ম পুকুর, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ সকাল ১১:০৬


লেখার সাথে যুক্ত হবো, এরকম কোন স্বপ্ন-চিন্তা ছিলোনা কোনওদিন। না আমার-না আমার বাবা-মায়ের। তবে আকারে ইঙ্গিতে আব্বার সুপ্ত একটা ইচ্ছের কথা জানা গিয়েছিলো- তাঁর ছেলে বক্তব্য দেবে আর মাঠভরা মানুষ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ ও আমার কিছু অভিজ্ঞতা!

লিখেছেন রেজা ঘটক, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ দুপুর ১২:১৬

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ পাড়ি দিলেন অনন্তলোকে। খালেদ সাহেবের সাথে আমার একটামাত্র স্মৃতি আছে। যদিও সেটি খুব সুবিধার নয়। ১৯৯৯ সালের শেষের দিকে বা ২০০০ সালের... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ মিথিলা কাহিনী ৩ - তালাক-আল-রাজী (প্রথম পর্ব)

লিখেছেন নীল আকাশ, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ দুপুর ২:২৫



ক্লাস ফাইভের ম্যাথের ক্লাস নিচ্ছিল মিথিলা, হঠাৎ স্কুলের পিওন এসে দরজায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে চাইলো।
পড়া থামিয়ে পিওনকে ভিতরে ডাকলো মিথিলাঃ
-কী ব্যাপার? কোন সমস্যা হয়েছে?
-রিমনকে এইমাত্র খুঁজে পাওয়া গেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

করোনাকে আর ভয় পাচ্ছি না, লক্ষন খারাপ না'তো?

লিখেছেন চাঁদগাজী, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২১ রাত ১০:০২



গত বছর জুলাই মাস থেকে করোনাকে আর ভয় পাচ্ছি না, ইহা ভালো কি খারাপ, ব্লগার নুরু সাহেব থেকে জানার দরকার আছে, মনে হয়। আমরা ৭ জন বাংগালী মোটামুটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×