পিরোজপুর জেলা পরিষদ কর্তৃক প্রকাশিত ‘পিরোজপুর জেলার ইতিহাস’গ্রন্থে
১৯৭১ সালে স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় মাওলানা সাঈদীর নাম নেই। বরং ওই
গ্রন্থে পিরোজপুরের কৃতী সন্তানের তালিকায় তার নাম ও সংক্ষিপ্ত ইতিহাস
রয়েছে। একই বইয়ে সাঈদীর পাশাপাশি শের-ই- বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক,
আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, দৈনিক ইত্তেফাকের
প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, কবি আহসান হাবিব ও শহিদ
নূর হোসেনসহ ওই অঞ্চলের বহু গুণী ব্যক্তিদের জীবনী রয়েছে।
মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে ওই গ্রন্থে সেসব কয়েকটি
ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এসব ঘটনায় সঙ্গে মাওলানা সাঈদীর জড়িত
ছিলেন এরকম কোনো তথ্য সেখানে উল্লেখ নেই। এছাড়া এ গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধ
নিয়ে লেখা কয়েকটি ঘটনার সঙ্গে ট্রাইবু্যুনালে দেয়া রাষ্ট্রপক্ষের
সাক্ষীদের কোনো কোনো সাক্ষীর জবানবন্দির সঙ্গে যথেষ্ট গড়মিল রয়েছে। ২০০৭
সালে প্রকাশিত গ্রন্থটির প্রণয়ন কমিটিতে জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহীসহ
২১ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি রয়েছেন। মাওলানা সাঈদীর পক্ষে এ গ্রন্থটি
আসামিপক্ষের সাক্ষী আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রথম ট্রাইব্যুনালে প্রদর্শন
করেছেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক
অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির আল্লামা দেলাওয়ার
হোসাইন সাঈদীর বিচার প্রায় শেষ পর্যায়ে। মামলায় সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ
শেষে এখন যুক্তিতর্ক উপস্থাপন চলছে। আগামী মাসের মধ্যেই রায় ঘোষণা হতে
পারে বলে মনে করছেন মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন
সাঈদীর বিরুদ্ধে তত্কালীন পিরোজপুর মহকুমা এবং সদর উপজেলার পাড়েরহাট
ইউনিয়নসহ আশপাশের বিভিন্ন গ্রামে গণহত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও
ধর্মান্তরিতসহ নানা মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনে রাষ্ট্রপক্ষ। এসব
ঘটনায় রাষ্ট্রপক্ষে ২৮ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দেন এবং
তদন্তকর্মকর্তার কাছে দেয়া ১৬ জন সাক্ষীর জবানবন্দি সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ
করে ট্রাইব্যুনাল। অন্যদিকে আসামিপক্ষে ১৭ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে এসে
সাক্ষ্য দেন। এর মধ্যে একজন রয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের মানিত সাক্ষী।
জানা যায়, ২০০৭ সালে ‘পিরোজপুর জেলার ইতিহাস’ নামে একটি গ্রন্থ প্রকাশ
করে পিরোজপুর জেলা পরিষদ। ওই গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটিতে উল্লেখযোগ্য
ব্যক্তিরা হলেন, সভাপতি পিরোজপুরে বিভিন্ন সময়ে কর্মরত জেলা পরিষদের ৪
প্রধান নির্বাহী, সদস্য সচিব পিরোজপুরে বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম
মোস্তফা এবং প্রধান সমন্বয়কারী ও সদস্য পিরোজপুরে কর্মরত দৈনিক
ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার মো. মনিরুজ্জামান নাসিমসহ ২১ জন বিশিষ্ট
ব্যক্তি। ওই গ্রন্থে মোট পঞ্চদশ অধ্যায়ে রয়েছে পিরোজপুর জেলা পরিচিতি,
পিরোজপুর নামকরণ, ভৌগোলিক পরিচয়, জেলার ভূগঠন, জেলা মহকুমা সৃষ্টির
প্রেক্ষাপট, মহকুমা থেকে জেলা, পিরোজপুরের আদিপর্ব, প্রাচীনকাল: ঐতিহাসিক
পরিচয়, অতীতকালে পিরোজপুর, মোঘল আমলে পিরোজপুর, রায়েরকাঠির জমিদার:
রাজধানী স্থাপন, সেলিমাবাদ পরগনার অন্যান্য জমিদাররা, জাতীয় আন্দোলন ও
পিরোজপুর, ফরায়েজি আন্দোলন, ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ, বঙ্গভঙ্গ
আন্দোলন, পিরোজপুর জেলার রাজনৈতিক ইতিহাস, অভিবক্ত ভারতপর্ব, পাকিস্তান
আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের নির্বাচন, পিরোজপুরের ভাষা আন্দোলন, আইয়ুব খানের
শাসনবিরোধী আন্দোলন ও ছয়দফা আন্দোলন, ’৭০ এর নির্বাচন, মহান মুক্তিযুদ্ধ
ও স্বাধীনতা অর্জন, মুক্তিযোদ্ধাদের তত্পরতা, মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে
তত্পরতা পিরোজপুরের রাজনীতি (১৯৭২ থেকে ২০০২ সাল), জেলার সামাজিক, ধর্মীয়
ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইত্যাদি।
৪৯৮ পৃষ্ঠায় লেখা গ্রন্থটিতে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে তত্পরতা যারা
চালিয়েছিলেন তা বশিদভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা
হচ্ছেন, মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতা সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ মো. আফজাল,
আবদুস ছাত্তার মিয়া মোক্তার, সরদার সুলতান মাহমুদ, আবদুল আজিজ মল্লিক,
আশরাফ আলী শিকদার (চেয়ারম্যান), আজিজুল হক মোক্তার, ডা. মোজাফফর হোসেন,
দেলোয়ার হোসেন মল্লিক, সৈয়দ সালেহ আহম্মদ, জিন্নাত আলী মোক্তার, মানিক
খন্দকার, আতাহার চাপরাশি, সেকান্দার কমান্ডার (পাগলা সেকা), নুরু
কমান্ডার, হারুনুর রশিদ, দানেশ মোল্লা, সেকান্দার শিকদার, মোসলেম মাওলানা
ও আমির আলীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে মাওলানা সাঈদীর নাম নেই।
ওই গ্রন্থটির ৪২৫ নম্বর পৃষ্ঠায় বিশিষ্টি ব্যক্তিদের তালিকায় ছবিসহ
মাওলানা সাঈদীর সংক্ষিপ্ত জীবনী রয়েছে। সেখানে লেখা আছে মাওলানা দেলাওয়ার
হোসাইন সাঈদী পিরোজপুর জেলার জিয়ানগর উপজেলার সাউথখালী গ্রামে ১৯৪২ সালে
জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম মাওলানা ইউসুফ সাঈদী। সাঈদী তাদের
পূর্ব-পুরুষের উপাধি, বংশপরম্পরায় এ পদবী তাদের নামের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
বাবার প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি পরে শর্ষিণা আলিয়া
মাদরাসা ও খুলনা আলিয়া মাদরাসায় শিক্ষা লাভ করেন। ১৯৬২ সালে তিনি মাদরাসা
শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেন। ধর্ম, দর্শন, বিজ্ঞান, রাজনীতি
ইত্যাদি বিষয়ে তিনি বিস্তর অনুসন্ধানী ও বিশ্লেষণধর্মী লেখাপড়া করেছেন।
তিনি দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইসলামী চিন্তাবিদ ও সুবক্তা হিসেবে
পরিচিত। তিনি ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনে পিরোজপুর সদর,
নাজিরপুর-জিয়ানগর থেকে পরপর দুবার এমপি নির্বাচিত হন। এরই মধ্যে তিনি
দেশ-বিদেশ থেকে কয়েকটি পদক অর্জন করেছেন। তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টির
অধিক।
ওই জীবনীর তালিকায় মাওলানা সাঈদীর পাশাপাশি শের-ই-বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল
হক, আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, দৈনিক
ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, কবি আহসান
হাবিব ও শহীদ নূর হোসেনসহ ওই অঞ্চলের বহু গুণী ব্যক্তিদের জীবনী রয়েছে।
মাওলানা সাঈদীর আইনজীবী মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘পিরোজপুর জেলার ইতিহাস’
গ্রন্থে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। মাওলানা সাঈদী,
মানবতাবিরোধী অপরাধ কর্মকাণ্ডে বা স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন না তা ওই
গ্রন্থই বড় উদাহরণ। কারণ ওই গ্রন্থটি সর্বমহলে প্রশংশিত হয়েছে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


