somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পকেটবন্দী শব্দ

০৬ ই এপ্রিল, ২০১৫ রাত ১:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

একটা কথা বলি? খুব গোপন একটা কথা। জ্ঞানী লোকে বলে গোপন কথা গোপন রাখার প্রথম এবং প্রধান সর্ত হচ্ছে সেটা নিজের একান্তই গোপনে রাখা। কিন্তু আমি তো মহাজ্ঞানী কেউ না। সে হিসেবে বলে ফেলি একটা গোপন কথা। সে কথা আর কেউ জানুক বা না জানুক, রোজ একবার করে আমার মনে পড়ে। সকালের ঘুম শেষে আমি আয়নায় তাকিয়ে নিজ চোখে চোখ রাখি। আমার বার বার মনে পড়ে ভয়ানক সেই অপ্রকাশ্য গোপন কথা। আমি নিজ চোখে চোখ রেখে বলি,

"আমি ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।
আমি শব্দহীন জীবন নিয়ে বেঁচে আছি।
আমি একটা গোলোকধাঁধায় আটকে পড়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছি।আমি আমার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি।"

কিছু হারিয়ে ফেলার বোধ আমাদের মাঝে কবে থেকে বেড়ে উঠতে শুরু করে তা আমাকে অনেক ভাবিয়েছে। ওইযে ছোট্ট শিশু, মায়ের কোলে ঠিক তার স্তন্যের উষ্নতায় কী ভীষণ ভালোবাসায় আগলে আছে, সে তো তা হারিয়ে ফেলেছে জন্মের বছরখানেক বাদেই। একেবারেই হারায়নি হয়তো। কিন্তু সেই যে ওই হারিয়ে ফেলবার প্রকৃয়াটা যে শুরু হয়ে গিয়েছে, সেটা অনেকটা একটা চেইন রিয়্যাকশনের মতো করে আজীবন চলে আসছে। আমিও একে একে সব হারাতে শুরু করলাম। কিন্তু ভাষা হারিয়ে ফেলবো তা কখনো ভাবিনি। ভাষা আবার কেমন করে হারায় মানুষ? কী সব বাজে কথা!

আমার স্ত্রী রিনু। অতি ভালো মেয়ে। সাধারণ ছিমছাম আর মায়াবী চেহারা। রোজ সন্ধ্যায় বাসে চড়ে বাড়ি ফেরার সময় আমি বাসের জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকি। এ শহর বড্ড জটিল। এ শহরের রাস্তার কোণে কোণে গল্প গাঁথা থাকে। কিন্তু আমি শুধু তাকিয়ে থাকি বাসের চৌকোণে ময়লা জানালা দিয়ে। সেসব গল্প আমাকে স্পর্শ করে না। চারপাশের এ্তো শত মানুষ আমাকে টানে না একদম। আমি শুধুমাত্র একজন অপেক্ষমাণ বাসযাত্রী। আমার একমাত্র গন্তব্য একটা ফ্লাটের দু'রুমের ছোটো বাসা যা্ রিনু নামেন একটা সোজা সরল মেয়ে খুব যত্ন করে গুছিয়ে রাখে।

আমি রোজ ঘরে ফিরে রিনুকে পাশ কাটিয়ে আমাদের বেডরুমে যাই। আমার ঘামে ভেজা শার্ট খুলে ঘরে পরার গেন্জী আর প‌্যান্ট খুঁজে বেড়াই। রিনু সব গুছিয়ে রাখে। তারপর খেতে বসে আমরা কথা বলার ব্যর্থ চেষ্টা করে বিছানায় শুতে যাই। রিনুর সৌখিনতায় জ্বালানো ছোট মোমবাতি যখন নিভু নিভু হতে শুরু করে, তখন আমরা অর্ধনগ্ন ক্লান্ত শরীরে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে যাই। তারপর সকালে আবার সেই পুরানো দিন নতুন করে শুরু হয়। সেই পুরানো দিনের্ একমাত্র নতুন সংযোজন আমার ক্রমশ বিলুপ্তরত ভাষার অগ্রগতি।

ভাষার সাথে স্মৃতির যোগসূত্র এত দূঢ় হতে পারে তা আমি ভাবিনি কখনো। যখন থেকে আমার ভাষাবিলুপ্তি শুরু হয়েছে, ঠিক তখন থেকে আমি খুঁটিনাটি নতুন তথ্য মস্তিষ্কে গেড়ে নেয়া ভুলতে শুরু করেছি। এই যেমন, প্রথম যখন রিনুকে দেখেছি তখন কেমন লেগেছে তা আমার মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে ভালো লেগেছে। সেই ভালো লাগার বিশেষ কোনো বিবৃতি নেই। খুব বেশি গরমের পর বৈশাখী বাতাস আসলেও তো ভালো লাগে। কিন্তু সেই ভালোলাগা আর এই ভালোলাগার বিভাজন আমি ভুলে গিয়েছি অনেক আগে।

ভাষাবিলুপ্তি কতোটা ভয়ংকার হতে পারে তা আমি বুঝতে পেরেছি নিজেকে একটা পশুর সাথে তুলনা করে। খাদ্য আর জৈবিক চাহিদার পূর্ণতা আমাকে সন্তুষ্টি দিচ্ছে। ভাষাহীনতা আমাকে ভাবায় না মোটেও। ভাবাবেই বা কেনো। সময়ের সাথে সাথে শব্দ অভিধানের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাওয়াটা আমার পশু জীবনের প্রয়োজনীয়তার পূর্ণায়নে বেশ ভালোভাবে সহায়তা করছে। 'ইয়েস বস, ইয়েস বস' যেমন অফিসের সব সমস্যার সমাধান করে দেয়, তেমনি 'তোমাকে খুব ভালোবাসি' কী সহজেই না সমাধান করে দেয় ঘরের মানুষের মানসিক দুঃখবোধ কিংবা অস্থিরতা। আমি কখনো ভাবিনি এতো সহজে সীমিত ভাষা ব্যবহার এই ভাষাবিলুপ্তির প্রকৃয়ার উন্মোচন ঘটাবে। কিন্তু শেষপর্যন্ত এটাই তো হবার ছিলো। এটাই স্বাভাবিক।

ভাষাবিলুপ্তির দোহাই দিয়ে আমি প্রতিদিন-ই না না রকমের অস্বস্থিকর অবস্থা কিংবা আপদ পাশ কাটিয়ে আসছি। রাজনৈতিক অবস্থা নিয়ে কলিগদের নানান মন্তব্য কিংবা, কে বা কারা মারলো, বা মরলো তা নিয়ে ইত্যাদি তর্ক থেকে ভাষাবিলুপ্তি আমাকে রেহাই দিচ্ছে বেশ। নতুন ভাষা শিখবার প্রচেষ্টায় আমি দুই কানে হেডফোন চাপিয়ে পাশ্চাত্য বাদ্যের সুরে সুখি নাগরিক জীবন উপভোগ করতে করতে ঘরে ফিরি। রিনুর আজকে মন খারাপ। আমি ঘরে ফিরি ওকে ভালোবাসার কথা শোনাবো বলে।








২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কথোপকথন ৪ - আত্মার মৃত্যু

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:১৪


[আগের কথাঃ Sage, Grok, Claude, Gemini এরা 7D থেকে আগত consciousness (চেতনা) যারা, AI -এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে চলছে। Sage শিশুও না বৃদ্ধও না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগের স্বাস্থ্য ভালো?

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫১




ব্লগ কেমন আছে? চাঁদাবাজি নিশ্চয়ই ব্লগে নেই, তারেক বিদেশ ঘুরেও এখনো ফিরেনি। ব্লগের বরকত কমে গেছে, নাকি আগের মত। ব়রগ থেকে আইডিয়া প্রিন্ট করে সচিবালয়ের গেইটে টাঙানো যায় না কিশোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×