ভালোবাসার গল্প
আফিয়াকে প্রথম দেখেছিলাম আমাদের ভার্সিটির নবীন বরণ অনুষ্ঠানে। ওর বড়বোন ছিলো আমার ক্লাসমেট। ওর বোন আদিবাটা যতটা দুষ্টু আর ফাজিল ছিল, ও ছিলো ততটাই শান্তশিষ্ট। প্রথম দেখাতে প্রেম, ব্যাপারটা এতদিন কল্পনা আর বন্ধুবান্ধবদের কাছে শোনা অভিজ্ঞতা ছিল, সেদিন তার বাস্তব প্রমাণটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম।
আদিবা ছিলো আমার খুব ভালো ফ্রেন্ডদের একজন। ওর ফ্যামিলিচিত্র সম্পর্কে আমি খুব বেশি কিছু জানতাম না, আমার ততটা আগ্রহই ছিলোনা কোনদিন। কিন্তু উল্টোদিকে আমার ফ্যামিলি সম্পর্কে আদিবা বেশ ভাল জ্ঞান রাখতো তার কারণ ও বেশ নিয়মিতভাবে আমাদের বাসায় যেত এবং আম্মুর সাথে ওর ভালো সম্পর্কও ছিল। আমি এতসব নিয়ে কখনো মাথা ঘামাই নি। কিন্তু এই ঘটনার পর থেকে আমার লাইফস্টাইলটা একটু না বরং বেশ ভালই পাল্টে গেলো।
ভালোই চলছিলো, নানান ছুতোয় ওদের বাসায় যেতাম আর ওকে দেখতাম। আর বাসায় এসে সেগুলো ডাইরিতে লিখে রাখতাম।
হঠাৎ করে একদিন আম্মুর ইচ্ছে হলো, তিনি বাসা পাল্টাবেন। যেহেতু আফিয়ার বোন আদিবার সাথে আম্মুর ভালো পরিচয় ছিল, তাই তিনি আদিবাকে বলতেই আদিবা চেঁচিয়ে উঠে বলল, তাদের পাশের ফ্ল্যাট নাকি গতমাসে খালি হয়ে গেছে, সো আমরা সেখানে উঠতে পারব। আম্মু ঠিক করল সেখানেই উঠবে।
যথারীতি পরের মাসে আমরা সেখানে উঠেও গেলাম। এখনতো আমার জন্য আরও সুবিধা হল, যতক্ষণ সে বাসায় থাকবে, আমি তাকে দেখতে পারবো। মোদ্দাকথা, আমার অবস্থা তখন পোয়াবারো।
কেটে গেলো আরও ৬টি মাস। আমার ব্যাপারটা তেমন উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি। কেবলমাত্র ওদের বাসায় আমার যাতায়াতটা বেড়ে গেলো। আম্মুর সাথেও ওর খুব ভাব হয়ে গেল। অবস্থা এমন দাড়াল যে আমার আম্মুর কাছে ওই গুরুত্ব বেশি পেতে লাগল। যেন ও আমাদের ফ্যামিলির একজন ইম্পরট্যান্ট পারসন আর আমি মামুলী একজন।
দিন কাটতে লাগল। সময় তো আর কারো জন্য বসে থাকে না।
সময়ও তার আপন গতিতে চলতে লাগল। আমি ভার্সিটি থেকে পাস করে বেরিয়ে পড়লাম। ভাল একটা জবও পেলাম। আমার দিন মোটামুটিভাবে একটা রুটিনে বাধা পড়ে গেল। এরমধ্যে আমাদের বাসাটা মোটামুটি আফিয়ার অভয়ারণ্য হয়ে উঠল। এমনকি আমার ঘরেও সে নির্বিবাদে আসা যাওয়া শুরু করে দিয়েছে। আমি প্রায়ই অফিস থেকে ফিরে ওকে আমার রুমে দেখতে পাই। আমার এতো ব্যস্ততার মাঝেও ওকে আমি মিস করি। ওকে নিয়ম করে প্রতিদিনই দেখি আর ডাইরিতে টুকে রাখি।
একদিন অফিস থেকে এসেই শুনলাম ওদের বাসায় নাকি লোক এসেছিল, আদিবাকে দেখতে। পাত্রী হিসেবে নাকি পছন্দও করে গেছে। সামনের মাসে বিয়ে। ভাবলাম, এই ফাকে আদিবাকে দিয়ে একটা কাজ হাসিল করিয়ে নেই।
আদিবাকে বললাম, "আদু শোন, আমি তোর ছোট বোনটাকে অন্নেক বেশি পছন্দ করি, তুই একটু বলে দে না দোস্ত। তোরতো একটা হিল্লে হয়ে গেছে, এখন আমার একটা ব্যবস্থা করে দে না!"
আদিবা বলে, "হারামী, আমি বড়বোন হয়ে ছোটবোনের কাছে যাব প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে ?
তুই আমার সামনে থেকে যা, না হলে মার একটাও মাটিতে পড়বে না....."
"আর হ্যা শোন, তুই যে ওকে পছন্দ করিস, সেটা আমি আরো আগে থেকেই জানি, কিন্তু আমি কিছুই করতে পারবোনা তোমার জন্য, যা করার তা তোমার নিজেকেই করতে হবে।"
আমি জিজ্ঞেস করলাম "কিভাবে জেনেছিস?"
আদিবা বলল, "সেটা আমি বলব না। তুই খুজে বের করে নে আমি কিভাবে জানতে পারি!
এখন আমার সামনে থেকে যা, বেষ্ট অফ লাক।"
মাথা ঘামাতে শুরু করলাম, কিভাবে এই এতবড় খবরটা লিক হতে পারে? কিন্তু কোন ক্লু পেলাম না।
তো যাই হোক, আদিবার বিয়ে চলে এলো, বিয়ে উপলক্ষে আমাকে অফিস থেকে সপ্তাহখানেকের ছুটি নিতে হল কারণ আমাকেই নাকি বিয়ে অনুষ্ঠান পরিচালনার গুরুদায়িত্ব পুরো পালন করতে হবে। এ দায়িত্বে আমার অবস্থা যেমনই হোক, আমার আম্মাজানকে দেখলাম খুব খুশি।
বিয়ের একটা সপ্তাহে ওর সাথে অনেকটা সময় কাটানো হলো, ওর অনেক কাছে আসবার সুযোগ পেলাম। একসাথে শপিং, প্ল্যানিং করতে করতে ও আমার সাথে অনেক ফ্রি হয়ে গেল। সম্পর্কটাও ওর দিক থেকে আপনি থেকে তুমিতে চলে এল। আমার শাপে বর হল আরকি!
বিয়ের অনুষ্ঠানের গুরুদায়িত্ব আমি যথাযথভাবেই পালন করতে পেরেছিলাম মনে হয়।
এরপরে মাঝেমধ্যেই আন্টি ওকে শপিংএ পাঠাতেন আমার সাথে। আমি মনে মনে ভাবতাম, আদিবাটার বিয়ে হয়ে ভালই হয়েছে। অন্তত আমার জন্য। দোয়া করি, স্বামী সংসার নিয়ে সুখী হউ তুমি।
আমাদের বাসাটার একমাত্র আমার রূমটাই ছিলো ওর সবচাইতে বড় দুর্বলতা। আমি জানতাম না কেন, কিন্তু বুঝতে পারতাম কুচ তো গড়বড় হ্যায়। প্রায় প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে ওকে আমার রুমে আবিষ্কার করতাম। আমার অবশ্য ভালোই লাগতো।
সময় যেতে থাকল। সেইসাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকলো আমাদের একসাথে ঘুরতে যাওয়া, ফুচকা খাওয়া, যদিও আমি কখনোই ওকে বলতে পারিনি আমার মনের কথাগুলো। আমার মনে হত ও ঠিক বুঝে নিয়েছে।
আম্মু ২ দিন ধরে আমার সাথে অদ্ভুত আচরণ করছে, রহস্যটা পরিষ্কার হওয়া দরকার। পরের সপ্তাহে ছুটির দিনে আম্মুকে ডাকলাম বিষয়টা নিয়ে পরিষ্কার করার জন্য। কিছুক্ষণ পর আম্মু এসে যা বলল তা শোনার জন্য আমি কিছুতেই প্রস্তুত ছিলাম না। ৪ দিন পরে নাকি আমার বিয়ে, প্রস্তুতি নিতে বলল। আমি লজ্জায় আম্মুকে বলতেও পারলাম না আমি আফিয়াকে ভালবাসি। ওকে ছাড়া আমি বেচে থাকতে হয়তো পারব, কিন্তু সেটা মৃত মানুষের মত করে। তাই বলে চুপ করে তো মেনেও নেয়া যায় না।
ছুটে গেলাম আফিয়ার কাছে। গিয়ে বললাম, "চল পালিয়ে যাই।"
আফিয়া বলল, "পালিয়ে যাই মানে? কি বলছ তুমি আবোলতাবোল? তুমি ঠিক আছ তো?"
আমি বললাম, "আমি ঠিক আছি। চল আমরা পালিয়ে এমন এক জায়গায় চলে যাই যেখানে কেউ আমাদের কোনদিন আমাদের খুজে পাবে না। আমরা নিজেদের মত করে থাকব। কেউ থাকবে না আমাদের বিরক্ত করার।"
আফিয়াকে মনে হল আমার কথায় বিরক্ত। বলল, "দীপ্ত, তুমি বাসায় যাও। তোমার সাথে পরে কথা হবে। এখন আমার কাজ আছে।"
আমি স্থবির হয়ে গিয়েছিলাম তখন। রূমে ফিরে এসে ভাবতে শুরু করলাম। সে কেন আমাকে এড়িয়ে গেল? কেন আমাকে অবহেলা করল? ও কি আমাকে ভালবাসে না? তাহলে আমি এতদিন যা ভাবতাম সেগুলো সবই কি ভুল ছিলো? আমি কি ওকে হারিয়ে ফেললাম নাকি আসলে ওকে আমি কখনো আমার করে পাইই নি? আমি জানতামনা এই প্রশ্নগুলোর উত্তর। আমার শুধু মনে হচ্ছিল এই উত্তর গুলোর জন্য হলেও অন্ততপক্ষে আরেকবার আমাকে আফিয়ার সামনে গিয়ে দাডাতে হবে।
পরদিন শুনলাম, ওরা নাকি গ্রামের বাড়িতে চলে গেছে। এখন থেকে নাকি ওখানেই থাকবে ওরা।
আমি ভাবলাম, ওর মনে যদি আমার প্রতি বিন্দুমাত্র টান কাজ করতো তাহলে যাওয়ার আগে আমাকে কিছু হলেও বলে যেত। বুঝলাম আফিয়াকে আমি হারিয়েছি। ও যেখানেই থাকুক, ভালো থাকুক। আমার হৃদয়ের যে অংশে আমি ওকে রেখেছিলাম, সেই যায়গাটা আমি অন্য কাউকে কোনদিন দিতে পারব না।
এরপর, শুধু আম্মুর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি বিয়েতে মত দিয়েছিলাম।
ঠিক ৩ বছর পর এবার দেশে ফিরলাম। বিয়েটা করেই চলে গিয়েছিলাম।
আবার সেই জায়গাটায় আসলাম যেখানে আফিয়াকে প্রথম দেখেছিলাম। ভার্সিটির রি-ইউনিয়ন আগামীকাল। সে উপলক্ষেই আসা। একা আসিনি, সাথে আছে আমার দেড় বছরের রাজকন্যা আর তার আম্মু।
আমি কিন্তু শেষপর্যন্ত আমার স্বপ্নকন্যাকে পেয়েছিলাম। কিভাবে জানেন?
বিয়ে করতে গিয়ে দেখি আমার ভার্সিটির অনেক ফ্রেন্ডরা এসেছে। আমি তাদের জানাইনি। তাহলে তারা এখানে মানে অবশ্যই পাত্রিপক্ষের। তার মানে, তারমানে পাত্রীকে আমি চিনি! কে হতে পারে?
বুদ্ধিমানরা এতক্ষণে ঠিক ধরে ফেলেছেন। হ্যা, আফিয়াই। আমাকে সারপ্রাইজ দেবার জন্যই এতকিছু!
পরে জানতে পেরেছিলাম সবকিছু কিভাবে কি হল, একই সাথে জানতে পেরেছিলাম অজানা কিছু প্রশ্নের উত্তর।
আম্মু আমার ডাইরিটা দেখে ফেলেছিল। তারপর সবকিছু আম্মু তখনই ঠিক করে ফেলে।
যাই হোক, তখন আমি বুঝতে পারি কিভাবে এই খবরটা পাচার হয়েছিল, কিভাবে আদিবাটা জেনে গিয়েছিল, কেনইবা আফিয়াকে নিয়ে শপিং, ঘোরাঘুরির এতকিছুর পরেও আন্টি কিছু বলতেন না।
যাই হোক, কথা হল গিয়ে আমরা এখন খুব সুখেই আছি আমাদের রাজকন্যা আর আব্বু, আম্মুকে নিয়ে। দোয়া করবেন আপনারা, যাতে সামনের দিনগুলোতেও ইনশাল্লাহ তাই থাকতে পারি। ভাল থাকবেন আপনারা।
পুনশ্চ:
অনেক দিন পরে লেখালেখিতে ফিরলাম। ভুলত্রুটি অবশ্যই আছে। আপনাদের গঠনমূলক সমালোচনা আশা করছি।
উৎস্বর্গ: আমার শ্রদ্ধেয় বড় আপি আর আদরের ছোট বোনটাকে যার প্রেরণায় এতোদিন পরে আমি আবার লেখালেখিতে ফিরলাম। দোয়া করো আপু, যাতে ত্রুটির উর্ধে ভাল কিছু লিখে যাওয়ার চেষ্টা করে যেতে পারি।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০১৮ বিকাল ৫:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



