


আমরা সকলেই কমবেশি সোনার হরিণের কথা শুনেছি, কিন্তু কখনও দেখা হয়নি। যদি সত্যিকার কেউ কখনও সোনার হরিণ দেখে থাকেন তাহলে সেটি সুচিকিৎসা পাওয়ার মতই ব্যতিক্রম। চিকিৎসা জগতের তিনটি শব্দ হচ্ছে অপচিকিৎসা, চিকিৎসা ও সুচিকিৎসা। মূলত সুচিকিৎসা শব্দটি এসেছে অপচিকিৎসার কারনেই। যদি বাংলাদেশে সত্যিকার চিকিৎসা হতো তাহলে সুচিকিৎসা শব্দটি আমাদের শুনতে হতোনা। আমাদের দেশের কোটিপতি ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তিবর্গ অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান। তার মানে তারা জানেন যে আসলে বাংলাদেশে সুচিকিৎসা নেই। এখন অবশ্য অনেক সাধারন মানুষও বাংলাদেশের চিকিৎসার উপর থেকে আস্থা হারিয়ে পার্শ্ববর্তি দেশ ভারতসহ বিদেশ যাচ্ছেন চিকিৎসার জন্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো কেনো এরা সবাই চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাচ্ছেন? প্রশ্নটির উত্তরটি অত্যন্ত সহজ, আর তা হলো বাংলাদেশে সুচিকিৎসা পাওয়া যায়না বলে এরা বিদেশ যাচ্ছেন। এবার প্রশ্ন হলো বাংলাদেশে কেনো সুচিকিৎসা পাওয়া যায়না? বাংলাদেশের প্রত্যেক উপজেলায় সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। জেলা ও বিভাগীয় শহরে রয়েছে একাধীক সরকারি হাসপাতাল। জাতীয় পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সহ অসংখ্য সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য চিকিৎসক,নার্স, উন্নত ল্যাব, পরীক্ষাগার ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদি। এছাড়া সারা বাংলাদেশে ব্যঙ্গের ছাতার মত রয়েছে অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ইত্যাদি। তাহলে বাংলাদেশের মানুষ সুচিকিৎসা থেকে কেনো বঞ্চিত হচ্ছে?
আসুন একটু দেখা যাক যে আমরা কেনো সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। বাংলাদেশে যে প্রতিনিয়ত অনেক রোগী অপচিকিৎসার শিকার হচ্ছে এটি পত্র-পত্রিকা ও টেলিভিশন খুললেই পাওয়া যায়। কিন্তু সুচিকিৎসার খবর পাওয়া ঐ সোনার হরিণের মতই কঠিন। যদি প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রীগনের হস্তক্ষেপে চিকিৎসা করানো হয় তাহলে অনেকেই সুচিকিৎসা পায়, এর অনেক উদাহরন বাংলাদেশে আছে। তাহলে বুঝতেই পারা যায় যে সাধারন মানুষ কেনো সুচিকিৎসা পাচ্ছেনা। সাধারন মানুষের সুচিকিৎসা না পাওয়ার প্রধান কারন হলো গাফিলতি, দুর্নীতি, প্রাইভেট ভাবে রোগী দেখার প্রবনতা, অসচ্ছ প্রেসক্রিপশন,রোগীদের যথেষ্ট সময় না দেওয়া,রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীলতার অভাব, অতিরিক্ত ও অসচ্ছ টেস্ট এবং সরকারের যথাযথ মনিটরিং ও জবাবদিহিতার অভাবসহ বিবিধ। যদিও কিছু ডাক্তার আছে যারা অনেকটাই ভালো। কিন্তু অধিকাংশ ডাক্তারের মধ্যে রয়েছে গাফিলতি,দুর্নীতি ইত্যাদি। যার কারনে রোগীরা সুচিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
একজন রোগী যখন সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারের নিকট যায় তখন অনেক ডাক্তার তাকে প্রথমেই জিজ্ঞেস করে যে তার কোনো রেফারেন্স আছে কিনা? একবার ভাবুন চিকিৎসা করাতে হলেও রেফারেন্সের দরকার হয়! যার রেফারেন্স থাকে তার চিকিৎসা সেই রেফারেন্স অনুযায়ী হয়,আর যায় রেফারেন্স নেই তাকে অনেক সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার বসতে পর্যন্তও বলেনা। ডাক্তার রোগীকে সময় দিতেই চায়না। তড়িঘরি করে রোগীর সমস্যা ভালো মতো না শুনে প্রেসক্রিপশন করে দেয়। অথচ রোগীর কিন্তু অনেক কিছু বলার থাকে। এরপর সরকারি হাসপাতালে যেহেতু ওষুধপাতি দেওয়া হয়, সেহেতু রোগীকে দু,একটি ওষুধ দিয়ে বলে অন্য ওষুধগুলোর সাপ্লাই নাই আপনি বাহির থেকে কিনে নিন। কিন্তু একজন অসহায় গরীব ব্যক্তি এতোগুলো টাকার ওষুধ কিভাবে কিনবে?
এরপর অধিকাংশ ডাক্তার রোগীর সাথে ভালো ব্যবহার করেন না। অথচ ডাক্তারের ভালো ব্যবহারই হতে পারে রোগীর সুস্থ হওয়ার অন্যতম হাতীয়ার। তারা চিন্তা করে এই রোগী দেখলে সে যত বেতন পাবে, না দেখলেও ঠিক সেই একই বেতন পাবে। তাহলে রোগীকে সময় দেওয়ার তার কি দরকার? ডাক্তার তড়িঘরি করে রোগী দেখেন এই কারনে যে সে তার প্রাইভেট চেম্বারে গিয়ে পাঁচশো থেকে শুরু করে একহাজার, দেড়হাজার টাকা ফিস নিয়ে রোগী দেখবেন। এতগুলো টাকা ধনী ব্যক্তিরা ফিস দিয়ে চিকিৎসা নিতে পারে। কিন্তু গরীব লোকেরা এতো টাকা কোথায় পাবে? এরপর আবার হাসপাতালে গরীব রোগীদের কেবিন পাওয়া সরকারি চাকরি বা সোনার হরিণের চেয়েও কঠিন ব্যাপার। অনেক গরীব রোগীর ঠাই হয় হাসপাতালের বারান্দায়। এরপর করাতে হয় বহু টেস্ট। ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে থেকে টেস্ট করাতে হয়। এতে রোগী আরো অসুস্থ হয়ে পরে। টেস্টের রিপোর্ট পেতে সাধারনত এক সপ্তাহ লেগে যায়। আবারো কখনও সে রিপোর্ট থাকে অসচ্ছ ও ভুল।
আমাদের দেশের অধিকাংশ ডাক্তারের হাতের লেখা খুব খারাপ। যা অনেক উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তি ও বুঝতে পারে না। অথচ এই অস্বচ্ছ প্রেসক্রিপশনের কারনে প্রতিবছর আমাদের দেশে অনেক লোক ভুল ওষুধ সেবন করে মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। তাই সরকারের উচিত প্রেসক্রিপশন কম্পিউটারে টাইপ করে দেওয়া বাধ্যতামূলক করা। এবং অবশ্যই প্রত্যকটি ওষুধের নামের পাশাপাশি ওষুধের গ্রুপের নাম ও কোম্পানির নাম ও উল্লেখ করা। এটি ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানসহ সুচিকিৎসার অন্যতম একটি হাতীয়ার হবে। তাছাড়া নিম্মমানের কোম্পানি গুলোর ব্যবসা ও ডাক্তারের স্বেচ্ছাচারিতাও অনেকাংশে দূর হবে। কিন্তু সরকার কি এমন ব্যবস্থা করবে?
একথা আর নতুন করে বলতে হয়না যে সরকারি হাসপাতালের চেয়ে বেসরকারি হাসপাতালে বর্তমানে ভালো চিকিৎসা পাওয়া যায়। যাদের একটু টাকা পয়সা আছে তারা কখনও সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যায়না। কারন তারা জানে যে সরকারি হাসপাতালের এমন হালছাল। অতি দুঃখজনক হলেও সত্য, যে সরকারি হাসপাতালে যে ডাক্তার রোগীর সাথে বাজে আচরন করেছে ও পর্যাপ্ত সময় দেয়নি সেই একই ডাক্তার বেসরকারি হাসপাতালে সেই একই রোগীর সাথে ফেরেস্তার মত আচরন করবে এবং পর্যাপ্ত সময় দিবে। কিন্তু বেসরকারি এইসব হাসপাতালের সমস্যা হচ্ছে এখানে প্রচুর টেস্ট দেওয়া হয়। টেস্ট না লাগলেও ডাক্তার অসংখ্য টেস্ট দিয়ে থাকে। কেননা এটা ঐ বেসরকারি হাসপাতালের বড় ধরনের একটা ব্যবসা, এবং ঐ সব টেস্ট থেকে ডাক্তার ভাগ পেয়ে থাকে। তাছাড়া প্রত্যেক ডাক্তারই ঔষধ কোম্পানির গ্যাঁড়াকলে আটকা। তাদের নিকট থেকে ডাক্তার ঘুষ নেয় বলেই প্রেসক্রিপশনে সেইসব নিম্নমানের কোম্পানির ওষুধ লিখে থাকে। তাহলে সুচিকিৎসা আর পাওয়া গেলো কই??
এছাড়া ভূয়া সনদধারী ডাক্তার, নার্স অদক্ষ স্টাফ ইত্যাদি সুচিকিৎসার পথে অন্যতম দায়ী। তাছাড়া রয়েছে যথাযথ জবাবদিহিতা ও সরকারের যথেষ্ট মনিটরিং এর অভাব। তাহলে বাংলাদেশে সুচিকিৎসা পাওয়া সোনার হরিণের মত কঠিন কিনা? অনেক রোগী আছেন অপচিকিৎসার শিকার হয়ে চিকিৎসা জগতকে ঘৃনা করা শুরু করে। তাই সরকারের উচিত স্বাস্থ্য নীতিমালায় পরিবর্তন এনে জবাবদিহি নিশ্চিত করে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। সোনার হরিনের মতো কঠিন নয়, বরং সুচিকিৎসা পৌছে যাক বাংলাদেশের সকল গরীব ও অসহায় মানুষের দ্বারে,দ্বারে-সেটাই প্রত্যাশা করি।।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০১৭ দুপুর ১২:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


