
চাঁদে অবতরণকারী প্রথম মানুষ হিসাবে পৃথিবীর ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন মার্কিন নভোচারী ও বৈমানিক নিল আর্মস্ট্রং। ১৯৬১ সালে মহাকাশচারী ইউরি গ্যাগারিনের শূন্যে ভ্রমণের মধ্য দিয়ে যে দ্বার উন্মোচন হয়েছিল মানব ইতিহাসে তার নয় বছর পর ১৯৬৯ সালের ২০ জুলাই চন্দ্রবিজয়ের মাধ্যমে সে ইতিহাসকে প্রাণবন্ত করে তুলেন নিল আর্মস্ট্রং। আর এ বিজয় বিশ্ববাসীকে জানান দিয়েছে নতুন গ্রহে বসবাসের চিন্তা। যেখানে নতুন করে কোন সভ্যতা হয়তো গড়ে উঠবে। নিল আর্মস্ট্রং নিজেও বিশ্বাস করতেন একদিন আসবে যখন মানুষ এ গ্রহেই পড়ে থাকবে না। কারণ সময় হয়েছে নতুন ঠিকানার সন্ধানে। নিল আর্মস্ট্রংয়ের ওই যাত্রা ভবিষ্যতকে আরও মধুর স্বপ্ন বিভোর করেছে। যে স্বপ্ন বাস্তবায়নে পৃথিবীব্যাপী মানুষ মহাকাশ নিয়ে উদ্বুদ্ধ হয়েছে গবেষণায় চিন্তায়। সম্প্রতি মঙ্গলে পাঠানো রোবট যে ইমেজ পাঠাচ্ছে সেটি সে সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়েছে। আর এতোসব সম্ভাবনা কেবল একটি পদক্ষেপের কারণেই মানুষ আজ সফলভাবে করতে পারছে সেটি হলো আর্মস্ট্রংয়ের চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ, বিচরণ। আজ এই বৈমানিক ও নভেচারীর ৮৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৩০ সালের আজকের দিনে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর ওয়াপাকোনেটায় জন্মগ্রহন করেন। চন্দ্রবিজয়ী নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং এর জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা।

নিল আর্মস্ট্রং ১৯৩০ সালের ০৫ আগস্ট মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর ওয়াপাকোনেটায় জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা স্টেফান কনিগ আর্মস্ট্রং ও মাতা ভায়োলা লুইসা। তিন ভাইয়ের মাঝে নিল আর্মস্ট্রং ছিলেন সবার বড়। পিতা ছিলেন হিসাব নিরীক্ষক। পিতার চাকরির সুবাদে নিল আর্মস্ট্রংয়ের কিশোর বয়স কাটে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২০টি শহরে। মাত্র দুবছর বয়সেই পিতার সঙ্গে যান ক্লিভল্যান্ড বিমান দৌঁড় দেখার জন্য। ১৯৩৬ সালের ২০ জুলাই মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি প্রথম বিমানভ্রমণের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। আর মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিমান চালনার সনদ নেন আর্মস্ট্রং। লুম হাইস্কুল পেরিয়ে ১৯৪৭ সালে আর্মস্ট্রং ভর্তি হন পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যারোস্পেস প্রকৌশল জানার জন্য। পরবর্তীতে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকায় অবস্থায় তৃতীয় বর্ষে বিশেষ বৃত্তিতে যোগ দেন মার্কিন নৌবাহিনীতে। ১৯৫২ সালে কোরীয় যুদ্ধে নৌবাহিনীর যুদ্ধবিমান ফ্লাই করে বাহবা পেয়েছিলেন তিনি। ওই বছরই যুদ্ধ শেষে দেশে ফেরেন আর্মস্ট্রং এবং ১৯৫৫ সালে লুইস ফ্লাইট প্রোপালশন ল্যাবরেটরিতে যোগদেন এবং অ্যারোনোটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ব্যাচেলর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে ড্রাইডেন ফ্লাইট রিসার্চ সেন্টারের পরীক্ষামূলক বিমান চালক হিসাবে যোগ দেন। ১৯৫৮ সালে মার্কিন বিমানবাহিনীর ‘ম্যান ইন স্পেস সুনেস্ট’ প্রকল্পে আমন্ত্রণ পান তিনি। এরপরপরই ১৯৬২ সালে তিনি নাসা অ্যাস্ট্রোনাট কর্পসে যোগ দেন। বিভিন্ন পরীক্ষামূলক বিমান নিয়ে তিনি ৯০০ এর ও অধিক বার উড্ডয়ন করেন। ১৯৬২ সালের ২০ এপ্রিল এক্স-ফিফটিন রকেটে প্রথমবারের মতো ভূমি থেকে প্রায় দুলাখ ফুট উঁচুতে উড্ডয়ন করার রেকর্ড গড়েন আর্মস্ট্রং। এর পর ১৯৬৬ সালের ১৬ মার্চ জেমিনি ৮ নভোযান দিয়ে প্রথমবার মহাকাশে আরোহণ করেন আর্মস্ট্রং। এর মাধ্যমে আর্মস্ট্রংয়ের মহাকাশ অভিযান আরও আশা জাগিয়ে তুলে।

আর্মস্ট্রং এর পরবর্তী ও শেষ অভিযান হয় এপোলো ১১ নভোযানের অভিযান নেতা হিসাবে। ১৯৬৯ সালের ১৯ জুলাই চাঁদের কক্ষে প্রবেশ করে অ্যাপোলো ১১ এবং ২০ জুলাই তারিখের গ্রীনউইচ মান সময় অপরাহ্ন ১২:৩৬ মিনিটে ৩৮ বছর বয়সী নিল আর্মস্ট্রং সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসেন চাঁদের পৃষ্ঠে। চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করে তিনি একটি মার্কিন পতাকা স্থাপন করেন। এ বিরল ঘটনার মধ্য দিয়ে পৃথিবীর ইতিহাসে চাঁদে পা রাখা প্রথম নভোচারী হয়ে ওঠেন তিনি। একটি তথ্যে জানা যায় সেদিন সারা বিশ্বের ৫০ কোটিরও বেশি মানুষ টেলিভিশনে সে দৃশ্য দেখে বলে । আর ভারতীয় উপমহাদেশে তখন বিবিসির খবরে কোটি মানুষের কান। প্রথম মানুষ হিসাবে চাঁদে পা রাখার সময় নিল আর্মস্ট্রং মন্তব্য করেনঃ This is a small step for (a) man, but a giant leap for mankind, অর্থাৎ, এটি একজন মানুষের জন্য ক্ষুদ্র একটি পদক্ষেপ, কিন্তু মানবজাতির জন্য এক বিশাল অগ্রযাত্রা। তাঁরা চাঁদে ২.৫ ঘণ্টা সময় কাটান এবং ২১ জুলাই ফেরত আসেন আর্মস্ট্রংসহ নভোচারী ওই দল। অ্যাপোলো ১১ এর পরে আর্মস্ট্রং আর মহাকাশ অভিযানে যান নাই। তিনি ১৯৭৯ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি অফ সিনসিনাটির ঊড্ডয়ন প্রকৌশলের অধ্যাপক হিসাবে কাজ করেন।

চন্দ্র বিজয়ের বছরেই ঢাকায় আসেন চন্দ্র বিজয়ীরা। ১৯৬৯ সালের ২৭ অক্টোবর বিকেলে ঢাকা এয়ারপোর্টের (বর্তমান তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দর) অবতরণ করে চন্দ্র বিজয়ীদের বহনকারী বিমান। ভারতের মুম্বাই থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনিক রাজধানী ঢাকাস্থ তেজগাঁও এয়ারপোর্টের টার্মিনাল বিল্ডিংয়ের পশ্চিম দিকে ছিল ভিআইপি লাউঞ্জ এসে পৌঁছায় তারা। সেখানেই সামান্য সময় অবস্থান করেন তারা। নভোচারীদের সঙ্গে ছিলেন তাঁদের স্ত্রী। বিমানবন্দরে ঢাকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের কর্মকর্তারা আর এক ঝাঁক সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষ উপস্থিতি ছিল। তুমুল করতালি ও মুহুর্মুহু আনন্দ ধ্বনির মধ্যে তাদের মোটর শোভাযাত্রা করে নিয়ে যাওয়া হয় হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। ২০১১ সালের নভেম্বরে চন্দ্র বিজয়ী নিল আর্মস্ট্রং আরো তিন নভোচারীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক কংগ্রেসনাল গোল্ড মেডেল অর্জন করেন।

একজন নভোচারী হিসেবে আর্মস্ট্রং সব সময়ই নিভৃতে থাকতে পছন্দ করতেন। নিভৃত এ নভোচারী ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন খুবই আশাবাদী এক মানুষ। তিনি মহাকাশ অভিযানের বিষয়ে সব সময়ই উত্সাহ দিয়েছেন এবং মহাকাশ মিশন সমর্থন করে গেছেন। নিল আর্মস্ট্রং ২৬ বছর বয়সে বিয়ে করেছিলেন গার্হস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের ছাত্রী জেনেট এলিজাবেথ শ্যারনকে। বিয়ের পর নবদম্পতি ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাস করতে শুরু করেন। আর্মস্ট্রং-জেনেটের সংসারে এসেছিল দুই ছেলে এরিক, মার্ক ও এক মেয়ে ক্যারেন। ১৯৬২ সালে মস্তিষ্কের টিউমারজনিত অসুস্থতায় ক্যারেনের মৃত্যু ঘটলে খুব কষ্ট পেয়েছিলেন নিল। আর্মস্ট্রং-শ্যারনের সংসার অনেক দিনই টিকেছিল, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ১৯৯৪ সালে এসে তাঁরা আলাদা হয়ে যান। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৯ সালের দিকে ক্যারোল নাইট নামের এক বিধবাকে বিয়ে করেন আর্মস্ট্রং। শেষ পর্যন্ত ক্যারোল নাইটের সঙ্গেই ছিলেন তিনি।

বাইপাস সার্জারির কিছুদিন পর ২০১২ সালের ২৫ আগষ্ট মৃত্যুবরন করেন চন্দ্র বিজয়ী নিল আর্মস্ট্রং। আর্মস্ট্রং-এর পরিবার সূত্রে জানা যায় এ মাসের প্রথম দিকে তার হৃদযন্ত্রে বাইপাস সার্জারী হয়েছিল। এরপর যে জটিলতা দেখা দেয় তাতেই আর্মস্ট্রং-এর মৃত্যু হয় বলে তার পরিবার জানিয়েছে। ২০১২ সালের ৩১ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইওর সিনসিনাটিতে তাঁর বাড়িতে একান্ত পারিবারিকভাবে আর্মস্ট্রংয়ের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়েছে। চন্দ্রবিজয়ী নিল আর্মস্ট্রং সাগর ভালোবাসতেন। তার ইচ্ছা ছিল, সাগরে সমাহিত করা হবে তাঁর মরদেহ। সে ইচ্ছা অনুযায়ী সাগরেই সমাহিত করা হবে তাঁর মরদেহ। আর্মস্ট্রংয়ের পারিবারিক মুখপাত্র রিক মিলার এ তথ্য জানিয়েছিলেন। তবে সাগরের কোথায় তাঁকে সমাহিত করা হবে, এ ব্যাপারে বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে না। নিল আর্মস্ট্রংয়ের পরিবার থেকে বিষয়টি গোপন রাখতে বলা হয়েছে। আর্মস্ট্রংয়ের দেহভস্ম, নাকি পুরো দেহ সাগরে সমাহিত করা হবে, নৌবাহিনী এ ব্যাপারেও মুখ খোলেনি। শোনা যায়, মৃত্যুর পূর্বে নিল আর্মস্ট্রং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। যা মার্কিন সরকার মিডিয়াতে প্রকাশের ব্যাপারে কঠোর গোপনীয়তা বজায় রেখেছিল তাঁর জীবনের শেষ দিন অবধি।

নিল আর্মস্ট্রং আমাদের ছেড়ে চলে গেলেও, তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন আমাদের কাছে। মহাকালের স্রোতে কখনওই হারিয়ে যাবেন না তিনি ও তার কৃতিত্ব। মার্কিন নভোচারী ও বৈমানিক নিল আর্মস্ট্রং এর আজ ৮৫তম জন্মবার্ষিকী। চন্দ্রবিজয়ী নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং এর জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

