
২০০ বছরের মধ্যে দেশে সবচেয়ে বড় বন্যা হওয়ার পূর্বাভাস দিয়েছে দ্য ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম-রেঞ্জ ওয়েদার ফোরকাস্ট (ইসিএমডব্লিউএফ)। প্রতিষ্ঠানটি চলতি মাসের আগামী ১০ দিনের বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে এমন তথ্য তুলে ধরেছে। ইসিএমডব্লিউএফ তথ্য অনুযায়ী, আগামী কয়েক সপ্তাহে বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যা হতে পারে।
সম্প্রতি দেশের পূর্ব ও উত্তর অঞ্চলের কয়েকটি জেলায় নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া শ্রাবণের শেষে কয়েকদিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। দেশের উত্তরাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। এরই মধ্যে দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম ও ঠাকুরগাঁওয়ে বন্যায় ১৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ দুই জেলায় সবকটি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৯ লাখ মানুষ। আশঙ্কা করা হচ্ছে আকস্মিক বন্যার কবলে পড়তে যাচ্ছে দেশ। কারণ আগস্টে বন্যা হলে তা যেমন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তেমনি এ বন্যার ব্যাপকতাও বাড়ে। বিশেষত মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টি, সেই সঙ্গে উজান থেকে আসা ঢলে মাত্র এক দিনে ৯০ পয়েন্টের মধ্যে ৮১টিতে পানি বেড়ে গেছে; এর মধ্যে ১৭টি পয়েন্টে পানি উঠে গেছে বিপৎসীমার ওপরে। বন্যা পর্যবেক্ষণ বিশেষজ্ঞরা তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বলছেন, আরো তিন দিন পানি বাড়তে পারে। আগস্টে দেখা দেয়া বন্যা সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে বলেও তাঁরা জানান। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের একজন পরিচালক বলেছেন, ‘একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে সমুদ্র ও নদনদী পানিতে ভরে থাকায় এবার সমস্যা দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেদিকে নজর রেখেই আমরা প্রস্তুতি নিয়েছি।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক দিনেই একসঙ্গে বেশ কিছু নদনদীর পানি বেড়ে যাওয়ার ঘটনা খুব স্বাভাবিক নয়। আরো তিন দিন এভাবে বিভিন্ন নদনদীর পানি যদি বাড়তে থাকে, বিপৎসীমার ওপরে উঠবে আরো কিছু এলাকার পানি। এখন মাঝারি থেকে ভারি বৃষ্টিপাত চলছে। বৃষ্টি কমে গেলেও ওই পানি কমে স্বাভাবিক পর্যায়ে আসতে লেগে যাবে দীর্ঘ সময়। অন্যদিকে গত জুন থেকে এ পর্যন্ত তিন দফায় সিলেট অঞ্চলে বন্যা হওয়ায় সেখানে দীর্ঘমেয়াদি বন্যার প্রভাব আরো বেড়ে যাচ্ছে।
বন্যা বিশেষজ্ঞরা এবারে বন্যা পরিস্থিতি খুবই গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করার পরামর্শ দিয়েছেন। কারণ এর আগে শুরু হওয়া আকস্মিক বন্যা এখনো যমুনা-সুরমাবেষ্টিত আছে, যা ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও মেঘনার দিকে ধাবিত হতে পারে বলে জোর আশঙ্কা রয়েছে। আর সাধারণত ওই নদনদী তিনটির মধ্যে যেকোনো দুটির পানি একসঙ্গে মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেলে সারা দেশেই বন্যার প্রভাব পড়ে যায়। মেঘনার চাঁদপুর মোহনায় পানি বেড়ে গেলেও দেশের মধ্যাঞ্চল বা রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের অঞ্চল বন্যায় আক্রান্ত হয়। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা এখনই বন্যা নিয়ে আতঙ্কিত না হয়ে বরং সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রিয়াজ আহম্মেদ বলেন, ‘সকাল থেকে বন্যা পরিস্থিতি দেখে আমি ইতিমধ্যেই কবলিত এলাকার জেলা প্রশাসনকে সার্বিক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। দুর্গতদের উদ্ধার করা, প্রয়োজনমতো আশ্রয়কেন্দ্র খোলা, বিশেষ সাহায্যের পাশাপাশি সারা দেশের জেলা প্রশাসকদের কাছে তাত্ক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য আগাম থাকা চাল ও টাকা থেকে সাহায্য দেয়া এবং মেডিক্যাল টিম প্রস্তুত করতেও বলা হয়েছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে দেশে সাধারণত জুন-জুলাই মাসে এমন ধরনের বন্যার প্রবণতা দেখা গেছে। এবার ওই সময়ে সিলেট অঞ্চলে বন্যা থাকলেও অন্য এলাকায় এর প্রভাব ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই রবিবার থেকে যে পরিস্থিতি শুরু হয়েছে তা অনেকটাই আকস্মিক। আগস্টের প্রায় মাঝামাঝি সময়ে এসে এমন বন্যা দেখা দেয়া উদ্বেগজনক।
বন্যা বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ বন্যা পূর্বাভাস এবং সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সেলিম ভূইয়া বলেন, ‘এখন যা পরিস্থিতি দেখছি তাতে বলা যায়, দেশ বন্যার মধ্যে পড়ে গেছে। আরো দুই-তিন দিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করার পর নিশ্চিত করে বলা যাবে এ বন্যা কতটা ব্যাপক হবে। যদি বৃষ্টি ও পানিপ্রবাহ একইভাবে বাড়তে থাকে তবে বিপদ বয়ে আনতে পারে। আর যদি পরিস্থিতির উন্নতি হয় তবে ব্যাপকতা কম হবে। আর বড় আকারের বন্যা হলে তা দেশের বেশির ভাগ এলাকার জন্য ব্যাপক ক্ষতি বয়ে আনবে।’
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি স্টাডিজের শিক্ষক গওহার নঈম ওয়ারা জানান, বর্তমানে টানা বৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে ২১ আগস্ট অমাবস্যা। অপর দিকে আসামে বড় ধরনের বন্যা হচ্ছে। এই পানি নেমে আসতে তিন-চার দিন সময় লাগবে। আবার আমাদের ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মা অববাহিকায় পানি বাড়ছে। পদ্মার পানি এখনো বিপদসীমা অতিক্রম না করলেও পানি যেভাবে বাড়ছে, তাতে ১৯ তারিখের মধ্যে এ সীমা অতিক্রম করতে পারে। দুই নদীর পানি একসঙ্গে বাড়ছে।
আবহাওয়াবিদরা মনে করছেন, ১৯৮৮, ১৯৯৮ ও ২০০৭ সালের বন্যার আগে মৌসুমী বায়ুর গতিপ্রকৃতির সঙ্গে এবারের মৌসুমী বায়ুর গতিপ্রকৃতির মিল রয়েছে। ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, আমাদের দেশে প্রতি ৭ থেকে ১০ বছর পর পর বড় আকারের বন্যা দেখা দেয়। বন্যার এই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালের পর এবার এবার বড় ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিগত প্রায় মাস খানেক ধরে দেশে বৃষ্টিপাতের হার বেড়েছে। সক্রিয় মৌসুমী বায়ু দেশের উত্তর দিকে অগ্রসর হওয়ায় উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাতের হার বেড়েছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বন্যা যে ভয়াবহ রূপ লাভ করবে, তাতে সন্দেহ নেই।
সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০১৭ রাত ৮:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




