somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও প্রধান সংগীত পরিচালক সমর দাসের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৩:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাংলা গানের অমর সুরস্রষ্টা, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুরসৈনিক ও উপমহাদেশের খ্যাতিমান সঙ্গীত পরিচালক সমর দাস। কালের ডামাডোলে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধের রক্তের দাগ মুছে গেছে, কিন্তু আজও তাঁর স্বাধীনতার গান আমাদের স্মৃতিতে সমুজ্জ্বল ও জাজ্বল্যমান। এখনো রক্তে নাড়া দেয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান প্রাণপুরুষ ছিলেন সমর দাস। ওই সময় অনেক গানে তিনি সুর করেন।তাঁর সৃষ্ট সুরে বহু গান জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং সেসব গান গেয়ে অনেক শিল্পী সঙ্গীত জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। তার সুর করা গান যুদ্ধকালীন মুক্তিবাহিনী ও সাধারণ মানুষকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করত। মুক্তিযুদ্ধে তার সুর করা ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’, ‘নোঙ্গর তোলো তোলো’, ‘চিরদিন আছে মিশে’ এবং ‘ভেবো না গো মা তোমার ছেলেরা’ গানগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা জুগিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে সুরবিন্যাস করে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা’ মূল গানটি বিবিসি লন্ডন থেকে সামরিক ব্রাশব্র্যান্ডে রেকর্ড করার দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ২০০১ সালের আজকের দিনে মৃত্যুৃবরণ করেন সমর দাস। আজ তাঁর ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। বিখ্যাত বাংলাদেশী যন্ত্রশিল্পী, সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক সমর দাসের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

১৯২৯ সালের ১০ ডিসেম্বর পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজারে নবদ্বীপ বসাক লেনে এক সঙ্গীতশিল্পী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সমর দাস। তার পিতা পিতা জিতেন্দ্রনাথ দাস এবং মাতা কমলিনী দাস। পারিবারিকভাবে সঙ্গীতের আবহে বেড়ে ওঠেন সমর দাস। তিনি প্রথমে প্রথমে পিতার কাছে বেহালা বাদন শেখেন পরে নর্থ ফিল্ড নামক এক মিশনারীর কাছে শেখেন পিয়ানো, গিটার এবং বাঁশি। সেই সঙ্গে অন্যান্য যন্ত্রসঙ্গীতেও তিনি দক্ষতা অর্জন করেন। অল্প বয়সেই গিটার ও পিয়ানো বাজানোর জন্য তার চারদিকে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৪৫ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি তৎকালীন অল ইন্ডিয়া রেডিও’র ঢাকা কেন্দ্রে বংশীবাদক হিসেবে সংগীত জীবনের সূচনা করেন এবং কালকাতা বেতারসহ কলকাতা এইচ.এম.ভি গ্রামোফোন কোম্পানিতেও যন্ত্রসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে কাজ করেন। এ গ্রামোফোন কোম্পানিতে তিনি কমল দাসগুপ্ত, অনুপম ঘটক, কালিপদ বসু প্রমুখ সুরকার ও সঙ্গীত শিল্পীর সান্নিধ্য লাভ করেন। এ প্রখ্যাত শিল্পীদের সান্নিধ্য সমর দাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।

১৯৪৭ সালে দেশভাগের পরে ঢাকা কেন্দ্রিক নাগরিক সঙ্গীত ঐতিহ্য গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার সমরদাসের অবদানকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৫৩ সালে ঢাকা বেতারে এবং ১৯৬১ সালে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান ঢাকা কেন্দ্রে রেডিওর নিজস্ব শিল্পী হিসেবে যোগদান করেন তিনি। ১৯৬৬ সালে তিনি কিছুকাল করাচীতে পিআইএ সাংস্কৃতিক দলের সঙ্গীত বিভাগের প্রধান ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে উঠলে তিনি সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে এর সঙ্গে যুক্ত হন। এখানে তিনি মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত কাজ করেন। রেডিও-টেলিভিশন এবং চলচ্চিত্রের জন্য তিনি অসংখ্য বাংলা গানের সংগীত পরিচালনা করেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি মুজিবনগর খেকে পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক ও প্রধান পরিচালক ছিলেন। এ সময় বহু গানে তিনি সুর দেন। তার সুর করা গান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মুক্তিবাহিনী ও দেশবাসীকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে প্রধান সঙ্গীত সংগঠক ও সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা ছিল সমর দাসের সঙ্গীতে বহুমুখী পারদর্শিতা অর্জনের এক উজ্জ্বল ভূমিকা। এছাড়ও শিল্পকলা একাডেমীসহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সমর দাস। শিল্পীদলের সদস্য ও দলনেতা হিসেবে তিনি নানা দেশে ভ্রমণ করেন।

সঙ্গীত পরিচালনায় সমর দাসের কৃতিত্বের কথা স্মরণীয় তেমনি বাংলা ছায়াছবির সংগীত পরিচালক হিসেবেও সমর দাসের নাম স্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি মুখ ও মুখোশ, লটারী, মাটির পাহাড়, আসিয়া, গৌরী, ধীরে বহে মেঘনা, রাজা এলো শহরে প্রভৃতি ছবির সঙ্গীত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। নদীর সন্তান, নবারুণ, বীরাঙ্গনা সখিনা, সোনার সবুজ গাঁয়ে ছবির নৃত্যনাট্যের সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন তিনি। লাহোরে অনুষ্ঠিত আফ্রোএশিয় সঙ্গীত সম্মেলনে (১৯৬৪) উপস্থাপিত সোনার সবুজ গাঁয়ে নৃত্যনাট্যের প্রযোজনা ও সঙ্গীত পরিচালনা এবং লন্ডনে অনুষ্ঠিত কমনওয়েলথ উৎসবে (১৯৬৬) সানস অব রিভার নৃত্যনাট্য পরিবেশিত হয় সমর দাসের পরিচালনায়। সমর দাসের মধ্যে মানবিক গুণেরও পরিচয় পাওয়া যায়। ১৯৭০ সালে বঙ্গোপসাগরের ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস হলে দুর্গত মানুষকে সহায়তা করার জন্য পল্টন ময়দানে কাঁদো বাঙালি কাঁদো নামে একটি সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সমর দাস ছিলেন এর প্রধান উদ্যোক্তা।

১৯৭২ সালে কলকাতার এইচ.এম.ভি কোম্পানি বাংলাদেশের ‘হূদয় হতে’ নামে একটি লংপ্লে রেকর্ড প্রকাশ করে যাতে রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের ২৬টি গান। সমর দাস ছিলেন এ রেকর্ডের সঙ্গীত পরিচালক। তিনি ১৯৭২ সালে বিবিসিতে গিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের অক্রেস্ট্রেশন রেকর্ড করে আনেন। নবগঠিত বাংলাদেশ বেতারের সিগনেচার টিউন বা সূচনা সঙ্গীত সমর দাসের কম্পোজ করা। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’ নামে দুটি এল.পি ডিস্ক প্রকাশ করার উদ্যোগ নিলে একজন সংগঠক ও সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে সমর দাস সেটাকে সফল করে তোলেন। ১৯৯৩ সালে ঢাকায় সাফ গেমসের সূচনা ও সমাপনী সঙ্গীত তিনি রচনা করেন। সংগীতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি একুশে পদক এবং ১৯৯৭ সালে স্বাধীনতা পদকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত হন।

২০০১ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর ঢাকায় পরলোক গমন করেন সমর দাস। মৃত্যুর পরে তাঁকে ঢাকার ওয়ারীস্থ খৃষ্টান গোরস্খানে সমাহিত করা হয়। সংঙ্গীত জীবনের সংগ্রামের দীর্ঘপথ পরিক্রমায় তিনি সৃষ্টি করেছেন অজস্র গান। যতোদিন বাঙালি থাকবে, যতোদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততোদিন স্বাধীনতার গান বেঁচে থাকবে আর পূর্ব দিগন্তে সূর্য ওঠার মতোই সমর দাসও যুগ যুগ ধরে আমাদের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। মুক্তিযোদ্ধা-শব্দসৈনিক সুরকার ও সঙ্গীত পরিচালক সমর দাসের ১৬তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৩:৫৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ঠেলায় নাম বাবাজি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৯


সময়টা সরকারের জন্য মোটেও ভালো যাচ্ছে না। একদিকে গ্যাস আর বিদ্যুতের সংকটে মানুষ প্রতিদিন কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের একের পর এক সিদ্ধান্ত নেটিজেনদের বাধার মুখে পড়ছে। ফলে সরকার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার মত তারেক জিয়াও কি ভারতে ইলিশ পাচার করছে?

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২৬



চলছে ইলিশের ভরা মৌসুম কিন্তু বাজারে কোন ইলিশ নেই.... ইলিশ নেই বললে ভুল হবে ইলিশ আছে কিন্তু উহা সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আওয়ামীলীগ আমলের ১৭ টি বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

~~~সংশয়~~~

লিখেছেন জটিল ভাই, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৩

♦أَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشِّيْطَانِ الرَّجِيْمِ (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ্'র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)
♦بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ (পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্'র নামে)
♦ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ (আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)


(ছবি নেট হতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুপ্ত ও সুপ্ত কি আওয়ামী লীগকে লুপ্ত করতে পারবে?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:৫২



গুপ্ত ও সুপ্ত আওয়ামী লীগকে লুপ্ত করতে না পারলে তারাই আবার ফিরতে পারলে গুপ্ত ও সুপ্তকে লুপ্ত করার কার্যক্রম গ্রহণ করবে। কারণ অতীতে গুপ্ত ও সুপ্তকে লুপ্ত না... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে “উপজাতি” নাকি “আদিবাসী”? আন্তর্জাতিক আইন ও ইতিহাসের নির্ভেজাল সত্য!​

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৭


সূচনা ও প্রেক্ষাপট:
লেখক পার্বত্য চট্টগ্রামে ২০০১ সালে তিনি যখন সেখানে দায়িত্ব পালন করেন, তখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে 'উপজাতীয়' (Tribal) হিসেবে ডাকা হতো। কিন্তু ২০১৫-১৬ সালের দিকে সেখানে পুনরায় পোস্টিং পাওয়ার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×