
জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা কথাসাহিত্যে সংলাপপ্রধান নতুন শৈলীর জনক। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী লেখক। সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় তার প্রতিভা দেখিয়েছেন আপন মনে। তিনি একাধারে ছিলেন ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং গীতিকার। সেজন্যই তাকে বলা হয় আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ। হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দীর্ঘকাল কর্মরত ছিলেন। লেখালেখি এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের স্বার্থে একপর্যায়ে অধ্যাপনা ছেড়ে দেন। তার বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। তার গল্প-উপন্যাসের জনপ্রিয়তা তুলনারহিত। তার সৃষ্ট হিমু ও মিসির আলি চরিত্রগুলো বাংলাদেশের যুবকশ্রেণিকে গভীরভাবে উদ্বেলিত করেছে। তার নির্মিত চলচ্চিত্রগুলো পেয়েছে অসামান্য দর্শকপ্রিয়তা। তার টেলিভিশন নাটকগুলো ছিল সর্বাধিক জনপ্রিয়। সংখ্যায় বেশি না হলেও তার রচিত গানও সবিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে।ক্যান্সারে ভুগে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই তার মৃত্যু হয়। এরপর গাজীপুরের নুহাশ পল্লীতে তাকে সমাহিত করা হয়। চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- হুমায়ূন আহমেদের বেলায় কথাটি পরিপূর্ণ। আজ এই লেখকের ৬৯তম জন্মবার্ষিকী। নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের জন্মদিনে ফুলেল শুভেচ্ছা।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর প্রামে জন্মপ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। তার ডাক নাম ছিল কাজল। বাবার রাখা তার প্রথম নাম শামসুর রহমান। পরে তিনিই ছেলের নাম বদলে রাখেন হুমায়ূন আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন এবং প্রথম শ্রেণীতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি মুহসীন হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন এবং ৫৬৪ নম্বর কক্ষে তাঁর ছাত্রজীবন অতিবাহিত করেন। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে পলিমার রসায়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় প্রথম বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী তোমাদের জন্য ভালোবাসা। ১৯৭৪ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেন।১৯৭২ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস নন্দিত নরক দিয়েই বাংলা কথাসাহিত্যে পালাবদলের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। এর পর শঙ্খনীল কারাগার, লীলাবতী, জোছনা ও জননীর গল্প, মধ্যাহ্ন, বাদশাহ নামদারসহ দু’শোর বেশি উপন্যাস রচনা করেছেন হুমায়ূন আহমেদ। তার উপন্যাসের চরিত্র হিমু, মিসির আলী, শুভ্র বইয়ের পাতা থেকে টেলিভিশনের পর্দা কিংবা সেলুলয়েডে তরুণ-তরুণীদের আপনজন হয়ে ওঠে। ১৯৮০ সালে নাটক রচনা শুরু করেন হুমায়ূন আহমেদ। তার লেখা নাটক এই সব দিনরাত্রির জনপ্রিয়তার পর তিনি তৈরি করেন বহুব্রীহি, অয়োময়, কোথাও কেউ নেই, নক্ষত্রের রাত, উড়ে যায় বকপক্ষীসহ বহু নাটক। সিনেমা পরিচালক হিসেবেও তার ছিলো প্রচুর সুনাম। ১৯৯৪ সালে মুক্তি পায় তার প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমনি’। এই সিনেমার জন্য তিনি ১৯৯৪ সালে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন। একই বছর তিনি একুশে পদক অর্জন করেন। এরপর তিনিও নির্মাণ করেন ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘চন্দ্রকথা’, ‘শ্যামল ছায়া’ এবং আমার আছে জলসহ বহু চলচ্চিত্র। তার নির্মিত শেষ চলচ্চিত্র ঘেটুপুত্র কমলা’।
ভিষণ গান ভালো বাসতেন হুমায়ূন আহমেদ। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন নাটকে, সিনেমায় তার নিজের লেখা গান ব্যবহার করেছেন, এর মধ্যে "যদি মন কাঁদে তবে চলে এসো" অন্যতম। এইগানটি নিয়ে একটি মজার ঘটনা রয়েছেঃ নিউইয়র্কে একবার এই গানটি গেয়েছিলেন তার স্ত্রী শাওন। সেখানে কয়েকজন শ্রোতা বললেন এই রবীন্দ্র সঙ্গীততে আগে শুনিনি এটাতো চমৎকার!!
ব্যক্তিগত জীবনে হুমায়ূন আহমেদের দুইবার বিবাহরে পিড়িতে বসেন। তাঁর প্রথম স্ত্রীর নাম গুলতেকিন আহমেদ। তাদের বিয়ে হয় ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে। এই দম্পতির তিন মেয়ে এবং দুই ছেলে। তিন মেয়ের নাম বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ এবং ছেলের নাম নুহাশ আহমেদ। ২০০৫ সালে তিনি শাওনকে বিয়ে করেন। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার অন্ত্রে ক্যানসার ধরা পড়ে। এরপর চিকিৎসাধীন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১২ সালের ১৯ জুলাই কোটি বাঙালিকে কাঁদিয়ে মৃত্যুবরণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। ২৪ জুলাই তাকে নুহাশ পল্লীর লিচুতলায় দাফন করা হয়। আধুনিক বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের পথিকৃৎ এবং নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে সমাদৃত এই ব্যক্তিত্বের ৬৯তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।
সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই নভেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৪:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


