
বাংলাদেশের প্রখ্যাত আইনবিদ ও ৬ষ্ঠ প্রধান বিচারপতি এবং দু'বার দায়িত্বপালনকারী রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। বিচারক হিসেবে বিচার বিভাগে যুগান্তকারী রায় প্রদান এবং রাজনীতিবিদ না হয়েও বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন ও গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক আলোচিত নাম বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। তিনি প্রথমে ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর হতে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে রাষ্ট্রপতি হিসাবে এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় থাকা-কালীন ১৯৯৬ সালের ২৩ জুলাই আওয়ামী লীগের দ্বারা রাষ্ট্রপতির পদে মনোনয়নের পর কোনো প্রতিদন্দ্বিতা ছাড়াই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হিসেবেও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে নিজের দায়িত্বটুকু শতভাগ পালন করেছেন। কোনো ভয়ের কাছে মাথানত করেননি। যদিও সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা খুবই সীমিত, এই সীমিত ক্ষমাতার মধ্যে থেকেই তিনি রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার সততা এবং প্রজ্ঞা দ্বারা বাংলাদেশের সকল স্তরের মানুষের ভালোবাসা ও সম্মান জয় করেন। দুই দফায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে এবং দীর্ঘ সময় প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় কাটাতেন। সাহসিকতার সঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতেন। তিনি এখনো সবার কাছে নিরপেক্ষতা, সততা ও আস্থার প্রতীক। আজ বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমদের ৮৭তম জন্মবার্ষিকী। জন্মদিনে বিচারপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমদকে জানাই ফুলেল শুভেচ্ছা।

বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ ১৯৩০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার পেমই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম তালুকদার রিসাত আহমেদ। তিনি একজন সমাজসেবী ও এলাকায় জনহিতৈষী ব্যক্তি হিসাবে পরিচিত ছিলেন। শাহাবুদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৫১ সালে অর্থনীতিতে স্নাতক ও ১৯৫২ সালে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে স্নাতকোত্তর লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের (সিএসপি) প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে প্রথমে লাহোরে ও পরে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনপ্রশাসন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পর্যায়ক্রমে গোপালগঞ্জ ও নাটোরের মহকুমা কর্মকর্তা, সহকারী জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬০ সালে প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগে বদলি করার পর ঢাকা ও বরিশালের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ, কুমিল্লা ও চট্টগ্রামের জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৭ সালে তিনি ঢাকা হাইকোর্টের রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭২ সালে হাইকোর্টের বেঞ্চে বিচারক হিসেবে পদোন্নতি পান। তিনি শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তখন বাংলাদেশের সংবিধানের অষ্টম সংশোধনী সম্পর্কিত মামলায় তার দেয়া রায় এক যুগান্তকারী রায় বলে বিচারাঙ্গনের সবার কাছে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে। এতে বাংলাদেশের সংবিধানের পরিশোধনের পথ উন্মুক্ত হয়। পরবর্তী সময়ে তিনি প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। শাহাবুদ্দিন আহমেদের রাজনীতিতে আসাটা কিছুটা নাটকীয়। ৫ ডিসেম্বর ১৯৯০, মওদুদ আহমেদ উপ-রাষ্ট্রপতির পদ থেকে ইস্তফা দিলে তিনি উপ-রাষ্ট্রপতির পদে অধিষ্টিত হন। ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ রাষ্ট্রপতি জেনারেল হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হবার পর, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের শূন্য রাষ্ট্রপতির পদে এবং নির্বাচন হবার আগ পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানরূপে কে আসীন হবেন তা নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারছিল না। এক দল অন্য দলের প্রার্থীর প্রতি অনাস্থা পোষণ করছিল। অবশেষে যখন বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের নাম এলো তখন দুটি দলই এক মত পোষণ করল যে বিচারপতি শাহাবুদ্দিন-ই একটি সুষ্ঠ ও সুন্দর এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন উপহার দিতে পারেন। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর ৬ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। ১৯৯১ সালে তার অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারী তিনি আবার তার মূল পদ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি হিসেবে যোগদান করেন। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতায় থাকা-কালীন ১৯৯৬ সালের ২৩ জুলাই আওয়ামী লীগের দ্বারা রাষ্ট্রপতির পদে মনোনয়নের পর কোনো প্রতিদন্দ্বিতা ছাড়াই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হিসাবে দায়িত্ব পালন করে রাষ্ট্রপতির পদ হতে অবসর গ্রহণ করেন।

৮৭ বয়সী সাবেক এই রাষ্ট্রপতির শারীরিক অবস্থা এখন মোটেই ভালো নেই। জীবন সঙ্গিনী আনোয়ারা বেগম প্রায় তিন বছর আগে মারা গেছেন। এরপর থেকে নিঃসঙ্গতা আরো বেড়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ সব সময়ই প্রচারবিমুখ মানুষ। মিডিয়ার মুখোমুখি হতে চাইতেন না। রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেয়াদ শেষে তিনি একেবারেই নীরবে-নিভৃতে থাকতেন। এখনো তেমনই আছেন। এ ব্যাপারে একটুও বদলাননি। মিডিয়ার মুখোমুখি হননি। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণপত্র আসে। কিন্তু তিনি কোথাও যান না। এক সময় একান্ত পারিবারিক কিছু অনুষ্ঠানে যেতেন। তবে রাষ্ট্রপতি পদ থেকে অবসর নেয়ার পর আর কোনো ধরনের অনুষ্ঠানেই যাননি।গুলশান-২ নম্বর সেকশনের ‘গ্রান্ড প্রেসিডেন্ট কনকর্ড’ নামের ভবনের ফ্ল্যাটে ছোট ছেলে সোহেল আহমদ, পুত্রবধূ ও নাতির সঙ্গে সাবেক রাষ্ট্রপতি বসবাস করছেন। তারাই রাষ্ট্রপতির দেখাশোনা করেন। ছেলে ও পুত্রবধূ সব সময় বাসায় থাকেন না। এ সময় সাবেক রাষ্ট্রপতিকে দেখাশোনার জন্য কেয়ারটেকার রয়েছে। অন্য ছেলেমেয়েরা দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে তিনি আক্রান্ত। মূলত, ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়েই তার শারীরিক অবস্থার বেশি অবনতি ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে অসুস্থতার কারণে তেমন কথা বলতে পারেন না। অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠেন। আগে দুজন পুলিশ সদস্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় সকালে হাঁটতে বের হতেন। বাসার পাশের সড়কে হেঁটে আধা ঘণ্টার মধ্যেই আবার চলে আসতেন। কিন্তু অনেক দিন আর বাইরে হাঁটতে বের হন না। বাসার নিচেও নামেননি বেশ কয়েক মাস হয়েছে। এখন পুলিশ সদস্যরাও এখানে আসেন না। প্রচারবিমুখ সাদা মনের প্রসিডেন্ট শাহাবুদ্দিন আহমদের আজ জন্মবার্ষিকী। জন্মদিন বিচারপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন আহমদকে জানাই ফুলেল শুভেচ্ছা।
সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ বিকাল ৫:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




