
বাংলাদেশের প্রথম প্রজন্মের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা আবদুর রাজ্জাক। দেশে এ যাবৎকালে শ্রেষ্ঠ শিল্পী হিসেবে যারা নিজেদের অবস্থান প্রোথিত করেছেন তাদের অন্যতম হলেন আবদুর রাজ্জাক। তিনিই ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ছাত্র যিনি চারুকলায় মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। তাঁর আগে যেমন এদেশে কেউ চারুকলায় সর্বোচ্চ ডিগ্রি গ্রহণ করেননি, ঠিক তেমনি পরবর্তী বহু বছর পর্যন্ত কেউ এ ব্যাপারে উৎসাহিতও হননি। অবশ্য একথা ঠিক পাকিস্তান আমলে সে সুযোগ ছিল একেবারেই সীমিত। বাংলাদেশ হবার পর অনেকের সামনে প্রচুর সুযোগ আসে তখন শিল্পীরা অনেকেই স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের দিকে আগ্রহী হন। পরে অনেকে চারুকলায় পিএইচডি ডিগ্রিও নিয়েছেন। আবদুর রাজ্জাকের কাজের একটি বড় অংশ রয়েছে ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে। এর বেড়ে ওঠা তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন তিল তিল করে। চল্লিশ ও পঞ্চাশ দশকের ঢাকার প্রতিবেশ ও পারিপার্শ্বিক চিত্র ছিল তাঁর ছবির এক বিশেষ অনুষঙ্গ। তার নেতৃত্বেই চারুকলা ইনস্টিটিউটে ভাস্কর্য বিভাগ চালু হয়। তাঁর আঁকা উল্লেখযোগ্য শিল্পকর্ম হল 'টেকনাফ', 'সুন্দরবন-১', 'রিভার-১'। চারুকলায় অবদানের জন্য তিনি ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান একুশে পদকে ভূষিত হন। আজ এই খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীর ত্রয়োদশ মৃত্যুবার্ষিকী। প্রজন্মের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

বহুমাত্রিক চিত্র শিল্পী আবদুর রাজ্জাক ১৯৩২ সালে (জন্ম তারিখ অজ্ঞাত) বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার ভেদরগঞ্জ থানার দিগর মহিশখালি নামের এক প্রত্যন্ত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম সাদর আলী আমিন এবং মায়ের নাম রিজিয়া বেগম। চার ভাই, দু'বোনের মধ্যে আব্দুর রাজ্জাক সবার ছোট। গ্রামের প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক স্কুলেই আব্দুর রাজ্জাক পড়াশোনা শুরু করেন। এরপর তিনি ফরিদপুর হাই স্কুলে এসে ভর্তি হন । ১৯৪৭ সালে যখন ভারত-বিভাগ হয় তখন ফরিদপুর হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৪৯ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে দ্বিতীয় বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেন। এরপর তিনি ভর্তি হন আর্ট ইনস্টিটিটে। ১৯৫৪ সালে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর কিছুদিন তিনি ঢাকার সরকারি গবেষণা সংস্থা ম্যালেরিয়া ইনস্টিটিউটে আর্টিস্ট ও মিউজিয়াম কিউরেটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর প্রতিযোগিতামূলক ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে ১৯৫৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া স্টেট ইউনিভার্সিটিতে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়তে যান এবং ১৯৫৭ সালে মাস্টার অব ফাইন আর্টস ডিগ্রি (এমএফএ) লাভ করেন। এজন্য আবদুর রাজ্জাককে কোর্স ও ষ্টুডিও'র কাজের পাশাপাশি একটি থিসিসও লিখতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পড়াশুনা শেষ করে আবদুর রাজ্জাক ১৯৫৮ সালে ঢাকার সরকারি আর্ট ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ছাত্রদের আন্দোলনের মুখে 'গভর্ণমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস' ইস্ট পাকিস্তান কলেজ অব আর্টস এন্ড ক্রাফটসে রূপান্তরিত হয় এবং তখন থেকে বিএফএ স্নাতক ডিগ্রির পাঠক্রম শুরু হয়। ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদিন ১৯৬৩ সালে রাজ্জাককে ভাস্কর্য বিভাগের দায়িত্ব দেন। প্রিন্ট-মেকিং, পেইন্টিং ও ড্রয়িংয়ে তিনি পারদর্শী ছিলেন। কিন্তু নতুন এ দায়িত্ব পেয়ে অবাক হলেও তিনি একে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন এবং ভাস্কর্য বিভাগ গড়ে তোলেন। কাজটি খুব সহজ ছিল না। কিন্তু তিনি সাফল্যের অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। তাঁর হাতেই গড়ে উঠেছে এদেশের আধুনিক ভাস্কর্য চর্চার একগুচ্ছ প্রতিভাবান তরুণ শিল্পী- আনোয়ার জাহান, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, শামীম শিকদার, হামিদুজ্জামান খান, এনামুল হক এনাম প্রমুখ। স্বাধীনতার পর থেকে এই মাধ্যমটির বিকাশ ঘটে এবং এটি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি আসে। ১৯৮৩ সালে তিনি কলেজ অব আর্টস এন্ড ক্রাফটসের অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেন। তাঁর সময়েই এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ভূক্ত হয় এবং একটি ইনস্টিটিউটে রূপান্তরিত হয়। ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত তিনি ইনস্টিটিউটের ভারপ্রাপ্ত পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৩ সালে ৬০ বছর বয়সে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন নিয়মে অবসর নিয়ে দু'বছরের জন্য পুনঃনিয়োগ গ্রহণ করেন। এরপর দুই বছর এবং পরে আরো এক বছর তিনি অধ্যাপনা করেন। আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য অনুষদে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে ড্রয়িং ও ডিজাইন শেখাতেন।

শিল্পীজীবনে আবদুর রাজ্জাক বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করেছেন এবং প্রতিটি মাধ্যমেই প্রতিভার চূড়ান্ত স্বাক্ষর রেখেছেন। বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করা প্রসঙ্গে শিল্পী নিজেই বলেছেন, ‘একমাত্র এভাবেই শিল্পী পরিপূর্ণতা পান। ত্রিমাত্রিক ভাস্কর্য-শিল্পের অনুশীলন ছাড়া বস্তুর আকারগত পদ্ধতি বা ফর্ম-সম্পর্কে ধারণা পরিষ্কার হয় না। তেমনি পেইন্টিং করা ছাড়া রঙের প্রকৃতিও বোঝা শক্ত। অন্যদিকে ড্রয়িং বুঝতে সাহয্য করে রেখার সাবলীলতা। পেইন্টিংয়ের চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে হলেও ভাস্কর্যের ফর্মগুণ এবং ড্রয়িংয়ের রেখার গুণ প্রয়োজন।’ এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বহু মাধ্যমে কাজ করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৬২ সালের দিকে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের ভ্রাতুস্পুত্রী মুস্তারী বেগমের সাথে রাজ্জাক বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে। ১৯৮৯ সালের মে মাসে এক দুর্ঘনায় তাঁর ছোট ছেলে প্রতিভাবান তরুণ শিল্পী আরিফ আহমেদ তনু মারা যান। তাঁর বড় ছেলে একটি খ্যাতিমান ঔষধ প্রস্তুতকারক কোম্পানির পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। সুদীর্ঘ শিল্পীজীবনে আবদুর রাজ্জাক ঢাকা আর্ট গ্রুপ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ ভাস্কর সমিতি, বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ প্রভৃতি শিল্পকলা সম্পৃক্ত বিভিন্ন সংগঠনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি দেশ-বিদেশে অসংখ্য চিত্রপ্রদর্শনীর নির্বাচক মণ্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিল্পকলায় গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য আবদুর রাজ্জাক ১৯৮৯ সালে একুশে পদক এবং একই বছর বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা লাভ করেন। ২০০৫ সালের ২৩ অক্টোবর যশোহরে একটি কর্মশালা পরিচালনা কালে মৃত্যুবরণ করেন শিল্পী আবদুর রাজ্জাক । মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৭৩ বছর। আবদুর রাজ্জাক পৃথিবী ছেড়ে গেলেওে মৃত্যুর এতদিন পরেও তিনি বিস্মৃত হননি। কারণ প্রকৃত শিল্পীদের কখনও মৃত্যু হয় না। তারা তাদের রেখে যাওয়া সৃজনশীলতার মধ্য দিয়ে, চিত্রকর্মের মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকেন আজীবন। আজ এই খ্যাতিমান চিত্রশিল্পীর ত্রয়োদশ মৃত্যুবার্ষিকী। প্রজন্মের খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী ও ভাস্কর আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে অক্টোবর, ২০১৮ বিকাল ৪:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


