somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

মুদ্রাতত্ত্ববিদ ও প্রত্নলিপিবিশারদ ও ঢাকা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীর ৭২তম মৃত্যুবিার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ রাত ১০:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাঙালি প্রত্নতত্ত্ববিদ, প্রত্নলিপিবিশারদ, শিকড়-সন্ধানী গবেষক এবং ঢাকা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা নলিনীকান্ত ভট্টশালী। তিনি ছিলেন একাধারে নিবেদিতপ্রাণ জাদুঘরবিশারদ, মূর্তিতাত্ত্বিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, ইতিহাসবিদ, মুদ্রাতাত্ত্বিক, প্রাচীন হস্তলিপিবিশারদ, পুঁথি সংগ্রাহক, সাহিত্যিক, সর্বোপরি দেশপ্রেমিক বাঙালি গবেষক। পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন যারা শুধু দেশ ও জাতির জন্য কাজ করেন। জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করেন জাতির মঙ্গলের জন্য। তাদের দলের একজন হলেন ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী। ড. নলিনীকান্ত জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করে গড়ে তোলেন ঢাকা জাদুঘর। ঢাকা জাদুঘরই আজ বাংলাদেশের জাতীয় জাদুঘর। পেশাদার প্রত্নতাত্ত্বিক না হয়েও তিনি জানতেন দেশের প্রাচীন ইতিহাসের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ছাড়া বিকল্প নেই। প্রত্নবস্তু সংগ্রহে তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবাদতুল্য। তাম্রশাসনের খণ্ডিত অংশ উদ্ধারের জন্য তিনি নিজে একনাগাড়ে চার দিন পুকুরপাড়ে বসে ছিলেন। বাংলাদেশের শিকড়-সন্ধানী মাঠপর্যায় গবেষক নলিনীকান্ত ভট্টশালী ইতিহাসের স্বর্ণভূমি বিক্রমপুরের সন্তান। আমাদের দেশের ঐতিহাসিকেরা সাধারণত লেখেন, বিক্রমপুরের কীর্তি কীর্তিনাশা পদ্মা ধ্বংস করেছে। আসল ঘটনা হলো, তাঁরা বিক্রমপুর ভ্রমণ না করেই এ জাতীয় মন্তব্য করেন। বিক্রমপুর অঞ্চল থেকে বিভিন্ন সময় মূর্তি, ভাস্কর্য, তাম্রশাসন, ইট বা ইটের দেয়াল পাওয়া গেছে। দূরদর্শী গবেষক ভট্টশালী জোর দিয়ে বলতেন, বিক্রমপুরের রামপাল অঞ্চলই ছিল বাংলার প্রাচীন রাজধানী। বাংলাদেশের ইতিহাস বিনির্মাণের অপার সম্ভাবনাময় বিক্রমপুরে ভট্টশালীর জরিপ, খনন ও ব্যাখ্যা শত বছর পরও সত্য বলে প্রমাণিত হচ্ছে। ভট্টশালী-নির্দেশিত রামপাল-বজ্রযোগিনী-নাটেশ্বর এলাকায় ২০১০ সাল থেকে আমাদের প্রত্নতাত্ত্বিক খননে প্রাচীন রাজধানীর বৌদ্ধবিহার, স্তূপ, মন্দির, রাস্তা প্রভৃতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। ১৯২৯ সালে প্রকাশিত উয়ারী-বটেশ্বরের ছাপাঙ্কিত রৌপ্য মুদ্রা নিয়ে ভট্টশালীর লেখা উয়ারী-বটেশ্বর নিয়ে আমাদের সাম্প্রতিক গবেষণার অনেক জটিল রহস্য উন্মোচনে অসাধারণ সাহায্য করছে। কিংবদন্তিতুল্য দেশপ্রেমিক এই গবেষক ১৯৪৭ সালের আজকের দিনে ঢাকা জাদুঘরের কম্পাউন্ডে মৃত্যুবরণ করেন। আজ তার ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী। মুদ্রাতত্ত্ববিদ ও প্রত্নলিপিবিশারদ ও ঢাকা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মৃত্যুবিার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।


নলিনীকান্ত ভট্টশালী ১৮৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গিবাড়ি উপজেলার নয়ানন্ধ গ্রামের নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস একই জেলার পাইকপাড়া গ্রামে। বাবার নাম রোহিনীকান্ত ভট্টশালী আর মা শরৎকামিনী। তার বাবা পেশায় ছিলেন পোস্টমাস্টার। নলিনীকান্ত ভট্টশালী কাকা অক্ষয় চন্দ্রের যত্নে লালিত-পালিত হন। তার প্রাথমিক শিক্ষা পাইকপাড়া পাঠশালায়। এনট্রান্স পাস করেন ১৯০৫ সালে সোনারগাঁও হাই স্কুল থেকে। পাঁচ টাকা বৃত্তিসহ রৌপ্যপদকও পেয়েছিলেন নলিনীকান্ত ভালো ফলাফলের জন্য। ঢাকা কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে উচ্চতর শিক্ষাগ্রহণ করেন। তিনি ১৯১২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে এমএ পাস করেন। ১৯২২ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সিফিত পুরস্কার প্রদান করে। নলিনীকান্ত ভট্টশালী ১৯৩৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় হতে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি সুলতানী আমলের বহু মুদ্রার আরবি হতে বাংলায় অনুবাদ করেন। তাঁর গবেষণামূলক অন্যতম বই হলো- ‘কয়েনস অ্যান্ড ক্রোনোলজি অব দ্য আর্লি ইন্ডিপেন্ডেন্ট সুলতানস অব বেঙ্গল’। গ্রন্থটি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘গ্রিফিত’ পুরস্কার লাভ করে। তার আরেকটি বিখ্যাত গ্রন্থ ‘আইকোনোগ্রাফি অব বুদ্ধিস্ট অ্যান্ড ব্রাহমিনিক্যাল স্কালপচার ইন দ্য ঢাকা মিউজিয়াম’। এই গ্রন্থটির জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করেন। ১৯১৩ সালে পশ্চিমবঙ্গের বালুঘাট হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। এর আগে অবশ্য তিনি ১৯১১ সালে ছাত্রাবস্থায় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ভারেলস্না গ্রামে প্রাপ্ত নটরাজ মূর্তির ছাপ বা লেখার পাঠোদ্ধারের মদ্য দিয়ে ইতিহাস গবেষণা ও চর্চা শুরু করেন। ১৯১২ সালে ড. নালিনীকান্ত নরসিংদীর বেলাব গ্রামে প্রাপ্ত বিক্রমপুরের ভোজ বর্মদেবের একটি তাম্রশাসনের পাঠোদ্ধার করেন। নলিনীকান্ত আরবি শিলালিপির পাঠোদ্ধারের জন্য ১৯১৮ সালে আরবি ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি বহু সুলতানী আমলের মুদ্রার আরবি হতে বাংলায় অনুবাদ করেন। তার গবেষণামূলক বইগুলো হলো “কয়েনস এন্ড ক্রোনোলজি অব দি আর্লি ইন্ডেপেন্ডেন্ট সুলতানস অব বেঙ্গল”।


বাংলাদেশের প্রাচীন ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য জাদুঘর নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তারই উদ্যোগে ১৯১২ সালে ঢাকা জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রথম সম্মেলন হয়। তার অক্লান্ত পরিশ্রমে ১৯১৩ সালে ঢাকা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা হয়। জুলাই মাসের ৭ তারিখ ঢাকা জাদুঘর আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। ঢাকা জাদুঘরের অবৈতনিক সম্পাদক হিসেবে কাজ করছিলেন এইচ ই স্টেপলটন। তিনি এ দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে তৎকালীন বাংলার গভর্নর লর্ড কারমাইকেল ১৯১৪ সালের জুলাই মাসে মাসিক ১০০/- টাকা বেতনে ঢাকা জাদুঘরের দায়িত্ব গ্রহণ করতে আহ্বান জানান ড. নলিনীকান্তকে। তিনি এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঢাকা জাদুঘরকে নিজের মতো করে সাজাতে থাকেন। জাদুঘরটিকে একটি শক্ত ভিত্তি দেওয়ার জন্য, সমৃদ্ধ করবার জন্য নিজের সমস্ত জীবন উৎসর্গ করেছেন। ঢাকায় জাদুঘর প্রতিষ্ঠার পর জীবনের ৩৩ বছর কেটেছে ওই প্রতিষ্ঠানে। গবেষনার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক বছর সাহিত্য এবং ইতিহাস পড়িয়েছিলেন তিনি। যতদিন বেঁচেছিলেন বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব, মুদ্রাতত্ত্ব এবং শিল্পসাহিত্য বিষয়ে অক্লান্তভাবে লিখে গেছেন। ঢাকা জাদুঘর বৌদ্ধ ও হিন্দুমূর্তি, পূর্ববাংলার স্বাধীন সুলতানী শাসক ও তাদের মুদ্রা- এগুলো নলিনীকান্তের ইংরেজিতে লিখিত বই। এছাড়া তিনি অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করেছেন যার মধ্যে- বীর সিংহ, হাসি ও অশ্রু, গোপি চাঁদ সন্ন্যাস, প্রবেশিকা ভারত ইতিকথা, প্রাথমিক ইংল্যান্ডের ইতিহাস এবং মূর্খ শতক অন্যতম। ইতিহাসের এ মানুষটি তথ্যের জন্য ঘুরে বেড়িয়েছেন মুন্সীগঞ্জ, কোটালীপাড়া, কুমিল্লা, সোনারগাঁও, বরেন্দ্র, খুলনা, যশোর, দিনাজপুর, মালদহসহ বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল।


কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে নলিনীকান্তের খুব ভালো সম্পর্ক ছিল। ভালো সম্পর্ক ছিল ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ও কবি জসিম উদ্দিনের সাথেও। পরিশ্রমী ও মেধাবী সংগঠক ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালী ১৯৪৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারী ঢাকা জাদুঘরের কম্পাউন্ডের বানীকুটিরে মারা যান। আজ তার ৭২তম মৃত্যুবার্ষিকী। মুদ্রাতত্ত্ববিদ ও প্রত্নলিপিবিশারদ ও ঢাকা জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মৃত্যুবিার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ রাত ১০:০৭
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

জলরেখার নীচে

লিখেছেন তাহমিদ রহমান, ১১ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১১:৫১

পৃথিবী প্রতিদিন একটি নতুন উচ্চতা আবিষ্কার করে।
কোনো জানালায় আলো জ্বলে,
কোথাও কাচের গায়ে সাঁটা হয় আরেকটি সাফল্যের বিকেল।
সিঁড়িগুলো মানুষের পদচিহ্নে মসৃণ হতে থাকে।

আমি দূর থেকে দেখি—
যেন আমার চোখই কেবল যাত্রা করে,
শরীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময়

লিখেছেন শাহেদ শাহরিয়ার জয়, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:৩৩

আহ সময়,
তুমি শেখাও,আমি শিখি না।
তুমি পড়াও,আমি পড়ি না,
তুমি দেখাও, আমি দেখি না।
বলেছিলে- একদিন বুঝবো,
সবকিছু হারিয়ে খুঁজবো!


তুমি ভুল!

চেয়ে দেখো-
আমি আজো বুঝি না,
আজো হা-হুতাশ নিয়ে কিছু খুঁজি না!

বি:দ্র: অনেকদিন পর!কেউ আছে আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

রসায়ন পরীক্ষায় রসটাই আসল :D

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ৩:০৩

রসায়ন পরীক্ষায় রসটাই আসল। না দেখলে মিস!! =p~


সালোকসংশ্লেষণ B-)

...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার ডিসেম্বরে ফেরার ঘোষণা আলোচনায় থাকারই কৌশল মাত্র

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:০৮

চব্বিশের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া সাবেক স্বৈরশাসক ও বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনার আগামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

জন্মান্তরের ক্ষুধা

লিখেছেন ইসিয়াক, ১২ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:০৮




ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, সেই সাথে গুমোট আকাশ। মেঘাচ্ছন্ন  আবহ । একটানা টুপটাপ আওয়াজ ছাড়া চারদিক সুনসান।বৃষ্টি তার ক্লান্তি কাটাতে  যেই একটু থমকে দাঁড়িয়েছে অমনি বুনো শালিকেরা নেমে এলো খাবারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×