somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নূর মোহাম্মদ নূরু
নূর মোহাম্মদ নূরু (পেশাঃ সংবাদ কর্মী), জন্ম ২৯ সেপ্টেম্বর প্রাচ্যের ভেনিস খ্যাত বরিশালের উজিরপুর উপজেলাধীন সাপলা ফুলের স্বর্গ সাতলা গ্রামে

বাঙালি কবি, লেখক ও ঔপন্যাসিক মৈত্রেয়ী দেবীর ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

০৪ ঠা মার্চ, ২০১৯ রাত ৮:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


বাঙালি সাহিত্যিক এবং সমাজসেবী মৈত্রেয়ী দেবী। ১৬ বছর বয়সে প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘উদারতা’-র ভূমিকা লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। মৈত্রেয়ী দেবীকে পাঠক সমাজে এক অনন্য স্থান এনে দেয় ১৯৭৬ সালে প্রকাশিত তার এই আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস। লেখিকার গভীর জীবনবোধ আর নিপুন দক্ষতায় ব্যক্তিগত প্রেমের কাহিনী, উপন্যাসে উপস্থাপিত হয়ে, তা হয়ে উঠেছে সর্বজনীন। তাই ‘ন হন্যতে’ বাংলা ভাষায় বহুল পঠিত স্মৃতিচারণমূলক এক অসামান্য উপন্যাস। ১৯৭৬ সালে এই বইটির জন্য তিনি সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। বলা হয়ে থাকে যে, ‘ন হন্যতে’ একাডেমিক পুরস্কারপ্রাপ্ত একালের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস। বইটি ইংরেজি ভাষায় ‘ইট ডাজ নট ডাই’ নামে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়। এছাড়াও ভারতের বিভিন্ন ভাষায় বইটি অনুবাদ করা হয়েছে। ১৯৭৭ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান ‘পদ্মশ্রী’ উপাধিতে ভূষিত হন। সাহিত্য ছাড়াও সমাজসেবায় অনন্য অবদান রেখেছেন। মংপুতে রবীন্দ্রনাথ মৈত্রেয়ী দেবীর আমন্ত্রণে ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে চারবার গিয়েছিলেন। মংপুর সে দিনগুলোকে নিয়ে ১৯৪৩ সালে মৈত্রেয়ী দেবী বই লেখেন ‘মংপুতে রবীন্দ্রনাথ’। অসাধারণ জনপ্রিয়তার কারণে বইটি ইংরেজিতে অনুদিত হয় ‘টেগোর বাই ফায়ারসাইড’ নামে। রবীন্দ্র বিষয়ক তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ: স্বর্গের কাছাকাছি, বিশ্বসভায় রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে, কবি সার্বভৌম, রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ দি ম্যান বিহাউন্ড হিজ পেয়েট্রি প্রভৃতি। ১৯৬১-তে রবীন্দ্র শতবর্ষে বক্তৃতা দেয়ার জন্য আমন্ত্রিত হয়ে তিনি সোভিয়েত রাশিয়া, হাঙ্গেরি, বুলগেরিয়া ও গণতান্ত্রিক জার্মানিতে গিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি ভারতের সর্বোচ্চ সম্মাননা পদ্মশ্রী পুরস্কারে ভূষিত হন। বাঙা্লি কবি, লেখক ও ঔপন্যাসিক মৈত্রেয়ী দেবীর ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ১৯৯০ সালের আজকের দিনে তিনি ভারতের কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন। বাঙালি সাহিত্যিক এবং সমাজসেবী মৈত্রেয়ী দেবীর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।


মৈত্রেয়ী ১৯১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর তার বাবার কর্মস্থল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমান বাংলাদেশ) চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম সুরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও মায়ের নাম হিমানী মাধুরী রায়। তার বাবা ছিলেন একজন দার্শনিক ও প্রাবন্ধিক। যদিও তার শৈশব কাটে বরিশালে, পিতার আদিনিবাস বরিশালের আগৈলঝারা গ্রামে। পরে পিতার কর্মক্ষেত্রের সুবাদে কৈশোরেই সপরিবারে চলে আসেন কলকাতার ভবানীপুরে। একদিকে পিতার আদর্শ আর অন্যদিকে তৎকালীন কলকাতার 'এলিট' সম্প্রদায়ের সাহচর্য, মৈত্রেয়ী দেবীর মননে আনে দার্শনিকতার ছাপ। ১৯৩৬ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগমায়া দেবী কলেজ থেকে দর্শনে স্নাতক ডিগ্রী লাভ করেন। তার সাহিত্যজীবন শুরু ষোল বছর বয়সে। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ উদিত ১৯৩০ সালে প্রকাশিত হয়। এই বইয়ের ভূমিকা লিখেছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ চিত্তছায়া। ১৯৪২ সালে রবীন্দ্রনাথের মংপুতে কাঠানো দিনগুলোর স্মৃতি ও তার সাথে আলাপচারিতা নিয়ে লিখেন স্মৃতিকথা মংপুতে রবীন্দ্রনাথ। বইটি টেগোর বাই ফায়ারসাইড নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়। রবীন্দ্র বিষয়ক তার অন্যান্য বইগুলো হল স্বর্গের কাছাকাছি, কবি সার্বভৌম, রবীন্দ্রনাথ গৃহে ও বিশ্বে, রবীন্দ্রনাথ : দি ম্যান বিহাইন্ড হিজ পোয়েট্রি। তাঁর আত্মজীবনীমূলক উপন্যাস ন হন্যতে পাঠক মহলে তাকে খ্যাতির শীর্ষে নিয়ে আসে। ১৯৬১ সালে রবীন্দ্র শতবার্ষিকীতে আমন্ত্রিত হয়ে তিনি বুলগেরিয়া, হাংগেরী ও সোভিয়েত ইউনিয়ন যান৷ সোভিয়েট ইউনিয়ন তাঁকে রবীন্দ্র শতবার্ষিকী পদকে ভূষিত করে। মৈত্রেয়ী দেবী সোভিয়েট ইউনিয়ন, ইউরোপ ও আমেরিকাতে রবীন্দ্রনাথের ওপরে ও শান্তির সমস্যা বিষয়ক বহু ভাষণ দেন। তিনি ১৯৬৪ সালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলাকালীন 'কাউন্সিল ফর প্রমোশন অব কমিউনাল হারমনি' সংস্থা স্থাপন করেন। তিনি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। এই সময়ে তিনি কলকাতা থেকে ২৪ মাইল দূরে বাদু নামক গ্রামে একটি ৯ বিঘা জমি জুড়ে কৃষি, মীন পালন, মৌ পালন, গো পালন, হাঁস কুকুর পালনের খামার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এ'ছাড়াও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শরনার্থী শিবিরের অনাথ শিশুদের জন্য তিনি ‘খেলাঘর’ স্থাপন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ সংস্থার কাজ কর্ম দেখাশুনা করেছেন। ১৯৭৫ সালে ভারতীয় লেখিকা সংঘ "ন হন্যতে" ( ইংরেজি, It Does Not Die: A Romance) উপন্যাসের জন্য তাঁকে সম্মানসূচক পদক দেয়। 'ন হন্যতে' মানে 'যাকে বিনাশ করা যায় না'। এই বইতে তিনি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি, জীবন বোধ, ইংরেজ শাসনামলে ভারতের সমাজ ব্যবস্থা এবং জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন। এই বইটির জন্য তিনি ১৯৭৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন। বইটি ইংরেজি ভাষায় ইট ডাজ নট ডাই নামে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়।


ব্যক্তিগত জীবনে মৈত্রেয়ী দেবী ১৯৩৪ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে কলকাতার ড. মনমোহন সেনের সাথে বিয়ে বন্ধনে আব্দ্ধ হন। দুটি সন্তানের জনক জননী হন এই দম্পতি। কাজের সূত্রে হিমালয় ঘেঁষা দার্জিলিং এর মংপুতে থাকতেন এই দম্পতি। মংপুতে সিনকোনা চাষের গবেষণায় ড. মনমোহন সেনের বিশেষ অবদান ছিল। রবীন্দ্রনাথের ভাবশিষ্য আর স্নেহে লালিত মৈত্রেয়ী দেবী কবিগুরুকে আমন্ত্রণ জানান মংপুতে বেড়িয়ে যাবার জন্য। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে মৈত্রেয়ী দেবীর আমন্ত্রণে চারবার অবকাশ যাপনের জন্য মংপুতে গিয়েছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সাহিত্যরচনা ছাড়াও সমাজসেবামূলক কাজে নিবেদিত ছিলেন মৈত্রেয়ী দেবী। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬৪ সালে তিনি ‘কাউন্সিল ফর প্রমোশন অব কমিউনাল হারমনি’ সংস্থা স্থাপন করেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের সমর্থনে তিনি অক্লান্তভাবে কাজ করে গেছেন। মুক্তিযুদ্ধে শরনার্থী শিবিরের অনাথ শিশুদের জন্য তিনি ‘খেলাঘর’ স্থাপন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এ সংস্থার কাজ কর্ম দেখাশুনা করেছেন।১৯৯০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র মৈত্রেয়ী দেবী। আজ তার ২৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। বাঙালি সাহিত্যিক এবং সমাজসেবী মৈত্রেয়ী দেবীর মৃত্যুবার্ষিকীতে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা মার্চ, ২০১৯ রাত ৮:১১
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৭১-কখনোই ৫০/৫৫বছরের পুরোনো কোনো ঘটনা নয় ।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ৭:০১




৭১-হলো আমাদের বাংলাদেশের বাঙালি জাতির প্রতিদিনের এগিয়ে চলার অনুপ্রেরণা । ৭১ আমাদের অস্তিত্ব,একাত্তর আমাদের আত্মপরিচয়ের ইতিহাস । একাত্তর যদি মলিন বা বিলীন হয়,তখন আমি আর আমি,আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুভ সকাল। আসসালামু আলাইকুম।

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ সকাল ১০:৩৪



ভোর থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে!
অবশ্য বর্ষাকাল চলছে, বৃষ্টি তো হবেই। ছাতা ছাড়াই বাসা থেকে বের হলাম। ছাতা নেই। ভেঙে গেছে। এক বছর হয়ে গেলো। কিনবো কিনবো করে আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ভুল, অনুতাপ ও ভালোবাসা

লিখেছেন সামিয়া, ১০ ই জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮


আজকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরবা? আমি রান্নাঘর থেকে মাথা বের করে আনিসকে বললাম। সে জুতোর ফিতা বাঁধতে বাঁধতেই ছোট্ট করে উত্তর দিল,
- চেষ্টা করব। আমি হেসে বললাম,
- তোমার এই চেষ্টা... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার ফেরার ঘোষণা, পরিকল্পনা কোথায়?

লিখেছেন মাথা পাগলা, ১১ ই জুলাই, ২০২৬ রাত ১২:১৯



শেখ হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণা দিচ্ছেন, সময় পার হয়ে গেলে আবার নতুন ডেট দিচ্ছেন। তিনি কি আসলেই ফিরবেন? নাকি নিজের দলকেই কনফিউজ করে রাখছেন? অথবা শুধু জাশির ঘুম হারাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রামের বন্যায় আক্রান্তদের জন্য আমরা কি কিছু করতে পারি?

লিখেছেন সৈয়দ তাজুল ইসলাম, ১১ ই জুলাই, ২০২৬ ভোর ৪:০৭


সম্মানিত ব্লগার,
বাংলাদেশের সবরকমের দুর্যোগ মোকাবেলায় আমাদের ব্লগারদের বিশেষ অবদান রয়েছে। দুর্যোগে আক্রান্তদের সহযোগিতায় আমাদের সামু ব্লগারেরা সবসময়ই এগিয়ে এসেছেন। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আমি অনুরোধ করছি না। আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×