somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ৮৪তম জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা

২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আজ জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ৮৩তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলা সাহিত্যাকাশে একটি উজ্জ্বল দিন। এদিন বিক্রমপুরে কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন এবং কুড়িগ্রামে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক জন্মগ্রহণ করেন। দেশের দু-প্রান্তে জন্মগ্রহণ করেও এই দুই সাহিত্য তারকা বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে গেছেন এক অন্য মাত্রায়। ২০১৬ সালে জীবন থেকে ছুটি নিয়েছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ হক। তাদের সাহিত্যকর্ম বাংলা সাহিত্যভাণ্ডারের অমূল্য সম্পদরূপে দীপ্তি ছড়িয়ে চলেছে। দু-জনের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দেড়শতাধিক, অর্জিত পুরস্কারের সংখ্যা অর্ধশত পেরিয়েছে। মধ্যবিত্ত জীবনের নানা অনুষঙ্গ স্থান পেয়েছে তাদের সাহিত্যকর্মে। রাবেয়া খাতুনের রচনায় ফুটে উঠেছে বিকাশমান নাগরিক আধুনিকতা এবং জীবনসংগ্রামের চিত্র। রাবেয়া খাতুন কথাসাহিত্যিক হিসেবে পরিচিত হলেও এক সময় তিনি শিক্ষকতা করেছেন। সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন দীর্ঘদিন। প্রায় এক হাজার ছোটগল্পের পাশাপাশি পঞ্চাশটির বেশি উপন্যাস রচনা করেছেন এই মহিয়সী কথাসাহিত্যিক। তাঁর প্রকাশিত পুস্তকের সংখ্যা একশ'রও বেশি। এর মধ্যে রয়েছে উপন্যাস, গবেষণাধর্মী রচনা, ছোটগল্প, ধর্মীয় কাহিনী, ভ্রমণ কাহিনী, কিশোর উপন্যাস, স্মৃতিকথা ইত্যাদি। ইত্তেফাক, সিনেমা পত্রিকা ছাড়াও তার নিজস্ব সম্পাদনায় পঞ্চাশ দশকে বের হতো অঙ্গনা' নামের একটি মহিলা মাসিক পত্রিকা। রেডিও, টিভিতে প্রচারিত হয়েছে অসংখ্য নাটক, জীবন্তিকা ও সিরিজ নাটক। তার গল্পে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে কয়েকটি। রাবেয়া খাতুন উপন্যাস লিখেছেন পঞ্চাশটিরও বেশি, এ-যাবৎ চার খণ্ডে সংকলিত ছোটগল্পের সংখ্যা চার'শরও বেশি। ছোটদের জন্য লেখা গল্প-উপন্যাসও রয়েছে। রাবেয়া খাতুন বাংলাদেশের ভ্রমণসাহিত্যের প্রধানতম লেখকও। জরা তাঁকে জড় করতে পারেনি। ভ্রমণের ক্লেশ তাঁর কাছে প্রত্যক্ষাভিজ্ঞতার আনন্দ! তবে বর্তমানে অসুস্থতা কারণে দীর্ঘদিনের লেখার অভ্যাস আর কলমের প্রতি ভালবাসায় ছেদ পড়েছে। দুঃখ করে বলেন, ”লিখতে বসলে আর কোনদিকে আমার মন থাকতো না“। কিন্তু সেই মানুষটির এখন আর লিখতে ভালো লাগছে না।স্বনামধন্য এই কথাসাহিত্যিকের ৮৪তম জন্মবার্ষিকী আর ৮৫তম জন্মদিন। কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।


রাবেয়া খাতুন ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর তৎকালীন ঢাকা জেলার বিক্রমপুরে মামার বাড়ি পাউসার গ্রামেন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর উপজেলায় অবস্থিত ষোলঘর গ্রামে৷ তাঁর বাবা মৌলভী মোহাম্মদ মুল্লুক চাঁদ এবং মা হামিদা খাতুন। তিনি ১৯৪৮ সালে আরমানিটোলা বিদ্যালয় থেকে প্রবেশিকা (বর্তমানে মাধ্যমিক) পাস করেন। রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে হওয়ায় বিদ্যালয়ের গন্ডির পর তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬৩ সালে প্রথম উপন্যাস' মধুমতি প্রকাশের মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যে নিজস্ব অবস্থানের জানান দেন। সমকালীন বাংলা সাহিত্য এবং এই সময়ের বাঙালি লেখকদের আলোকিত ও আলোচিত এবং গত শতকের পঞ্চাশের দশকে যে লেখকদের সক্রিয়তা বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের ভিত্তি গড়ে দিয়েছে, কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুন তাঁদের অন্যতম। গল্প ও উপন্যাস ছাড়াও তিনি ভ্রমণকাহিনী, কিশোর উপন্যাস এবং স্মৃতিকথাও লিখেছেন। রাবেয়া খাতুন রচিত ভ্রমণকাহিনী বাংলা সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গল্প ও উপন্যাস রচনায় রয়েছে বিশেষ খ্যাতি ও পাণ্ডিত্য। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- সাহেব বাজার, রাজারবাগ শালিমারবাগ, মন এক শ্বেত কপোতী, ফেরারী সূর্য, নীল নিশীথ, বায়ান্ন গলির একগলি, পাখি সব করে রব, নয়না লেকে রূপবান দুপুর, মিড সামারে, এই ভরা বাদর মাহ ভাদর, হিরণ দাহ, মুক্তিযুদ্ধের উপন্যাস সমগ্র, এই বিরল কাল, হোটেল গ্রীন বাটন, চাঁদের ফোটা, বাগানের নাম মালনিছড়া, বসন্ত ভিলা, ছায়া রমণী, সৌন্দর্য সংবাদ, হৃদয়ের কাছের বিষয়, ঘাতক রাত্রি, মালিনীর দুপুর, রঙিন কাচের জানালা, মেঘের পর মেঘ, যা কিছু অপ্রত্যাশিত, দূরে বৃষ্টি, রমনা পার্কের পাঁচবন্ধু, শুধু তোমার জন্য, কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি, প্রথম বধ্যভূমি, কমলিকা, শঙ্খ সকাল প্রকৃতি, যা হয়না, আকাশে এখনো অনেক রাত, জাগতিক, স্বপ্নে সংক্রামিত, ও কে ছিল, মহাপ্রলয়ের পর, শহরের শেষ বাড়ি, নষ্ট জ্যোস্নার আলো, এই দাহ এবং রাইমা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি।


কর্মজীবনে অনেক মানুষের সান্নিধ্যে এসেছেন এই গুণী লেখক। উদ্বুদ্ধ হয়েছেন যাঁদের দ্বারা স্মৃতিমূলক রচনার মধ্য দিয়ে তাঁদের ব্যক্তিত্ব ও বৈচিত্র্যময় ব্যক্তিতাকে পাঠকের কাছে হাজির করেছেন। কর্মজীবনে লেখালেখির পাশাপাশি শিক্ষকতা করেছেন রাবেয়া খাতুন। সাংবাদিকতাও করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলা একাডেমীর কাউন্সিল মেম্বার। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের গঠনতন্ত্র পরিচালনা পরিষদের সদস্য, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জুরীবোর্ডের বিচারক, শিশু একাডেমীর কাউন্সিল মেম্বার ও টেলিভিশনের নতুন কুড়র বিচারক। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জাতীয় বিতর্কের জুরীবোর্ডের বিচারক ও সভানেত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। যুক্ত আছেন বাংলা একাডেমী, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ, ঢাকা লেডিজ ক্লাব, বিজনেস ও প্রফেশনাল উইমেন্স ক্লাব, বাংলাদেশ লেখক শিবির, বাংলাদেশ কথা শিল্পী সংসদ ও মহিলা সমিতির সঙ্গে।সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাবেয়া খাতুন ১৯৯৩ সালে একুশে পদক এবং ২০১৭ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারের পাশাপাশি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার, বাংলাদেশ লেখিকা সংঘ পুরস্কার, নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদক, জসিমউদ্দিন পুরস্কার, শেরে বাংলা স্বর্ণপদক, ঋষিজ সাহিত্য পদক, অতীশ দীপঙ্কর পুরস্কার, অনন্যা সাহিত্য পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন পুরস্কার, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার অর্জন করেন।ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৫২ সালের ২৩ জুলাই সম্পাদক ও চিত্র পরিচালক এটিএম ফজলুল হকের সাথে রাবেয়া খাতুনের বিয়ে হয়। তাদের চার সন্তানের মধ্যেে ইম্প্রেস টেলিফিল্ম-চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, রন্ধন বিশেষজ্ঞ কেকা ফেরদৌসী, স্থপতি ফরহাদুর রেজা প্রবাল ও ফারহানা কাকলী। লেখালেখির পাশাপাশি রাবেয়া খাতুন দীর্ঘদিন যাবৎ শিল্প, সাহিত্য, চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে জড়িত থেকেছেন। বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সামগ্রিক অগ্রযাত্রায় রাবেয়া খাতুনের অবদান তাৎপর্যপূর্ণ। তার সাহিত্য সৃষ্টিতে বহুমাত্রিকতা, ’৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, মানুষের মনের অন্তঃচেতনার জাগরণ, নির্লিপ্ততা, শিল্পের জন্য শিল্প, মানুষের জন্য শিল্প, সাহিত্যের বস্তুতান্ত্রিকতা, নারী জাগরণ, সমাজের ব্রত্য অন্তজ আবমান বাংলা জীবনের ছবির সঙ্গে রাবেয়া খাতুনের নৈসর্গ চেতনা মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তার সৃষ্টিকর্মে। সাহিত্যকর্ম বিবেচনায় তিনি একদিকে গ্রামভিত্তিক মধ্যবিত্ত সমাজের রূপান্তরের রূপকার এবং অন্যদিকে নাগরিক মধ্যবিত্তের বিকাশ ও বিবর্তনের দ্রষ্টা। সর্বক্ষেত্রেই রয়েছে তাঁর নিজস্ব জীবনবোধ ও অন্তর্দৃষ্টিমূলক প্রতিভার সমন্বয়। রাবেয়া খাতুন তার নিজস্ব সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে অমর ও চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। আজ কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের ৮৪তম জন্মবার্ষিকী আজ। কথাসাহিত্যিক রাবেয়া খাতুনের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ সন্ধ্যা ৬:০১
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমি টুপ করে চলে আসবো

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:১৯


আমি হাসিনা। আমি আমার স্বামী ওয়াজেদ মিয়াকে কোনদিন স্বামীর মর্যাদা দেইনি। সে জ্ঞানী হলেও আমি সবসময় তাকে বাসার কাজের লোকের চেয়ে বেশি কিছু মনে করিনি। আমি সবসময় মৃণাল কান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮




রুবার সাথে আমার বিয়েটা ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ের মতোই হয়েছে । একদম সাধারন কোনরকম অনুষ্ঠান নাই । সেইদিন অফিসে অনেক কাজ ছিলো । চোখে তারা ফারা দেখছিলাম । বসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রথম .........।

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


আন্ডারগ্রাউন্ড শোতে এটাই আমার প্রথম ড্রামস বাজানোর একটা মুহূর্ত।

কিছু গল্প আসলে পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।কিছু গল্প হঠাৎ করে একটা মুহূর্ত থেকে জন্ম নেয় আর তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমুদ্রের নীল খাম

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২


এই শহরে থাকি প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর ধরে। তিন প্রেমিকার মায়া ছেড়ে যাওয়া যায় না এমন এক অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। যার এক হাতে নদী, অন্য হাতে সমুদ্র, আর কপালে জায়গা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী দুঃশাসনের পতন অনিবার্য ছিল, জুলাই তো স্রেফ উছিলা মাত্র!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮



জুলাই নিয়ে অনেক বিতর্ক, সমালোচনা আছে। কিন্তু, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জুলাই গণঅভ্যূত্থান না হলে আমরা দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেতাম না। জুলাই ঘিরে যত বিতর্ক, সমালোচনাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×