somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী, কিংবদন্তি শিল্পী শেফালী ঘোষের ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি

৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ দুপুর ২:৫৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তি শিল্পী শেফালী ঘোষ। শেফালী ঘোষ, আঞ্চলিক গানের সম্রাজ্ঞী হিসেবেই যার পরিচিতি। মূলত বৃহত্তর চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের শিল্পী হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম কণ্ঠসৈনিক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে গান গেয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সাহায্য সংগ্রহ করেন এই কিংবদন্তী। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান নিয়ে শুরু থেকেই একশ্রেণির মানুষের নাক ছিটকানো স্বভাব ছিল। শিক্ষিত সমাজের একটি অংশও আঞ্চলিক গানকে তাদের গান মনে করতেন না, তারা ভাবতেন এসব 'হাইল্যা-জাইল্যা'দের গান। আবার কিছু শিল্পীর আঞ্চলিক গানে অশ্নীলতার থাকায় অনেকে এই গান পছন্দ করতেন না। এত সব বৈরিতা জয় করেই কিন্তু চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গান গণমানুষের মন-জয় করেছে। চট্টগ্রামের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্ব দরবারে স্থান করে নিয়েছে। আর এর পেছনে সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব অবশ্যই শেফালী ঘোষের। বোয়ালখালীর কানুনগোপাড়ার গ্রাম্য কিশোরী শেফালী গানের ফুল হয়ে ফুটেছিলেন নিজের প্রতিভায়, সীমাহীন পরিশ্রমের মাধ্যমে। তিনি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরেছেন যা উপমহাদেশের সংগীতকে সমৃদ্ধ করেছে।প্রায় পাঁচ দশকের সংগীত জীবনে তিনি প্রায় সহস্রাধিক গান গেয়েছেন। শেফালী ঘোষের গাওয়া গান নিয়ে দুই শতাধিকের বেশি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। তার গাওয়া বিখ্যাত গানের মধ্যে রয়েছে এম এন আখতার রচিত এবং সুরারোপিত "যদি সুন্দর একখান মুখ পাইতাম", আহমেদুল হক সিদ্দিকী রচিত ও সুরে "ও রে সাম্পানওয়ালা", মলয় ঘোষ দস্তিদার রচিত ও সুরে "ছোট ছোট ঢেউ তুলি" প্রভৃতি। তিনি ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সাংস্কৃতিক ভূমিকা রেখেছেন। সঙ্গীতের পাশাপাশি যাত্রা এবং মঞ্চনাটকেও তার নিয়মিত অংশগ্রহণ ছিল। তিনি বেশ কয়েকটি বাংলা চলচ্চিত্রের গানেও প্লেব্যাক শিল্পী হিসেবে কণ্ঠ দিয়েছেন। শেফালী ঘোষ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের প্রায় ২০টিরও বেশি দেশে সঙ্গীত পরিবেশন করেছেন। ২০০৬ সালের আজকের দিনে শেফালী ঘোষ মারা যান। তাঁকে হারিয়ে চট্টগ্রামবাসীর কেটে গেল ১৩টি বছর। আজ তার ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। কিংবদন্তি শিল্পী শেফালী ঘোষের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।


শেফালী ঘোষ ১৯৪১ সালে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার কানুনগোপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই তার শৈশব কাটে। পাঁচ ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। তার পিতার নাম কৃষ্ণ গোপাল ঘোষ এবং মাতার নাম আশালতা ঘোষ। শেফালী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন শেষে ভর্তি হন স্থানীয় মুক্তাকেশী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। পরিবারের অনুপ্রেরণায় বিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সময়ে তার গান গাওয়ার এবং শেখার সূত্রপাত ঘটে। তার গানের প্রথম ওস্তাদ ছিলেন তেজেন সেন। পরবর্তীতে অধ্যক্ষ ওস্তাদ শিবশঙ্কর মিত্র, জগদানন্দ বড়ুয়া, নীরদ বড়ুয়া, মিহির নদী, গোপালকৃষ্ণ চৌধুরীসহ বিভিন্ন সংগীতজ্ঞের কাছে তিনি শিক্ষাগ্রহণ করেন। শিল্পীজীবনের সূচনালগ্নে প্রথমে রবীন্দ্র সঙ্গীত, নজরুল সঙ্গীত এবং আধুনিক গান শিখতে শুরু করলেও এক পর্যায়ে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেন তিনি। কিন্তু পরবর্তী সময়ে চট্টগ্রামের লোকসঙ্গীত- অর্থাৎ আঞ্চলিক গান, পল্লিগীতি, মাইজভান্ডারী গান, পীর মুর্শিদের শানে রচিত গান গাওয়ার দিকে আগ্রহী হয়ে উঠেন। শেফালীর সঙ্গীত জীবনের উত্তরণ গ্রাম থেকেই কিন্তু খুব অল্প সময়েই শেফালীর সৌরভ শহরেও ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৬৩ সালে শেফালীর ২২ বছর বয়সে চট্রগ্রাম বেতারের তৎকালীন আঞ্চলিক পরিচালক শেফালী ঘোষ এবং আঞ্চলিক গানের সম্রাট শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবকে আঞ্চলিক ভাষায় গান গাইতে প্রস্তাব জানালেন। এতে দুইজনই রাজি হলেন এবং তাদের সেই দ্বৈত কণ্ঠের গান ইথারে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। ১৯৭০ সালে তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হলে শেফালী ঘোষ শিল্পী হিসেবেই অংশ নেন। তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের নিয়মিত শিল্পী হিসেবে গান গেয়ে মুক্তিযুদ্ধের জন্য সাহায্য সংগ্রহ করেন। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর যখন উপদ্রুত উপকূল মৃত্যু-উপত্যকায় পরিণত হয়। তখন শেফালী গেয়ে উঠলেন তাঁর বিখ্যাত গান—ভাঙা গাছর নয়া টেইল/পাতা মেলি দেহার খেইল/পঙ্খি আবার উড়ের ফিরের/ চুপতে প্রেমের হথা হঅর। ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এসে আবার জীবনের হাল ধরার এমন প্রেরণাদায়ী গান গেয়েছিলেন বলেই জীবনমুখী শিল্পী শেফালী ঘোষ বেঁচে আছেন জীবনের কোলাহলে। শেফালী ঘোষ বেশির ভাগ গান গেয়েছেন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়। কিন্তু তাঁর সেই গানের সুর ছড়িয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে, দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। আজও কোনো গানের আসরে শত শত দর্শক-শ্রোতা মাতোয়ারা হয়ে শোনেন তাঁর গান।


(শেফালী ঘোষ ও তার একমাত্র সন্তান শিল্পী সুকণ্ঠ দত্ত ছোটন)
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯ বছর বয়সে শেফালী ঘোষ গান শেখার জন্য চট্টগ্রাম শহরে আসেন। সেখানে তার পরিচয় ঘটে সংগীতানুরাগী ননী গোপাল দত্তর সঙ্গে। শেফালী ঘোষের কিংবদন্তি শিল্পী হওয়ার পেছনে যার বড় অবদান তিনি হলেন সঙ্গীতজ্ঞ ননী গোপাল। পরে তার সঙ্গে শেফালীর বিয়ে হয়। শেফালী ঘোষের একমাত্র সন্তান শিল্পী সুকণ্ঠ দত্ত ছোটন এ বছর ১ জুলাই ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে চট্টগ্রামের রয়েল হাসপাতালে মারা গেছেন। আঞ্চলিক গানের এই মহান শিল্পী শেফালী ঘোষ অনেক দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করেছেন। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে বহুদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন ভারতের অ্যাপোলা হাসপাতালে। ২০০৬ সালের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর বিকাল পৌনে ৬ টায় শেফালী ঘোষ মারা যান। শেফালী ঘোষ চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ঝরা বকুল, তাকে নিয়ে যুগ যুগ ধরে মানুষ গানের মালা গাঁথবে, গণমানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকবেন গানের ফুল শেফালী। শিল্পী হিসেবে শ্রেষ্ঠ যে পুরস্কারটি তিনি পেয়েছেন তা হচ্ছে, অগুনতি মানুষের ভালোবাসা। অবশ্য ২০০৬ সালে মৃত্যুর এক বছর পর রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছিলেন একুশে পদক।বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, কাতার, ওমান, কুয়েত, ভারত, মিয়ানমার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পৃথিবীর প্রায় ২০টিরও অধিক দেশে শেফালী ঘোষ গান গেয়ে চট্টগ্রাম তথা সারাদেশের সংস্কৃতিকে তুলে ধরেছিলেন। শেফালী ঘোষ জীবদ্দশায় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিক পদক-১৯৯০, বাংলা একাডেমি আজীবন সম্মাননা পদক-২০০২ ও শিল্পকলা একাডেমী পদক-২০০৩ লাভ করেন। মৃত্যুর পর তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে একুশে পদক-২০০৬-এ ভূষিত করা হয়। আজ তার ১৩তম মৃত্যুবার্ষিকী। শেফালী ঘোষ আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন বহুকাল। যত দিন এই বাংলা থাকবে, বাংলার মাটি থাকবে, তত দিন তার সুর মূর্ছনা বাঙালিকে অনুপ্রেরণা জোগাবে, আন্দোলিত করবে। শিল্পী শেফালী ঘোষের কীর্তি আমাদের নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই সংরক্ষণ করতে হবে। বাংলা আঞ্চলিক গানের কিংবদন্তি শিল্পী শেফালী ঘোষের মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ দুপুর ২:৫৭
৭টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আমি টুপ করে চলে আসবো

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:১৯


আমি হাসিনা। আমি আমার স্বামী ওয়াজেদ মিয়াকে কোনদিন স্বামীর মর্যাদা দেইনি। সে জ্ঞানী হলেও আমি সবসময় তাকে বাসার কাজের লোকের চেয়ে বেশি কিছু মনে করিনি। আমি সবসময় মৃণাল কান্তি... ...বাকিটুকু পড়ুন

রুবা

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:২৮




রুবার সাথে আমার বিয়েটা ওঠ ছেড়ি তোর বিয়ের মতোই হয়েছে । একদম সাধারন কোনরকম অনুষ্ঠান নাই । সেইদিন অফিসে অনেক কাজ ছিলো । চোখে তারা ফারা দেখছিলাম । বসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রথম .........।

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৪


আন্ডারগ্রাউন্ড শোতে এটাই আমার প্রথম ড্রামস বাজানোর একটা মুহূর্ত।

কিছু গল্প আসলে পরিকল্পনা করে শুরু হয় না।কিছু গল্প হঠাৎ করে একটা মুহূর্ত থেকে জন্ম নেয় আর তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমুদ্রের নীল খাম

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২


এই শহরে থাকি প্রায় সাতাশ-আটাশ বছর ধরে। তিন প্রেমিকার মায়া ছেড়ে যাওয়া যায় না এমন এক অদ্ভুত সুন্দর এই শহর। যার এক হাতে নদী, অন্য হাতে সমুদ্র, আর কপালে জায়গা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আওয়ামী দুঃশাসনের পতন অনিবার্য ছিল, জুলাই তো স্রেফ উছিলা মাত্র!

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০১ লা জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮



জুলাই নিয়ে অনেক বিতর্ক, সমালোচনা আছে। কিন্তু, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে জুলাই গণঅভ্যূত্থান না হলে আমরা দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসন থেকে মুক্তি পেতাম না। জুলাই ঘিরে যত বিতর্ক, সমালোচনাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

×