
খিলজি বংসের ২য় শক্তিশালী শাসক আলা-উদ্দিন-খিলজি। তিনি দিল্লিতে বসে ভারতীয় উপমহাদেশে খিলজি শাসন পরিচালনা করেছেন।একাধারে তিনি ছিলেন একজন দক্ষ প্রশাসক, চৌকস জেনারেল আর দুর্ধর্ষ যোদ্ধা। মৌর্য সম্রাট অশোকের পর তাকেই একমাত্র সম্রাট হিসেবে বিবেচিত করা হয়, যিনি গোটা হিন্দুস্তানকে এক সুতোয় গাঁথতে পেরেছিলেন। আলাউদ্দিন খিলজি ছোটবেলা থেকেই একজন দুর্ধর্ষ যোদ্ধা ছিলেন। তরবারি ও অশ্ব, দুটো চালানোর ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমান দক্ষ। তিনি এত বেশি পরিমাণ শহর আর নগর জয় করেছিলেন যে, তাকে সিকান্দার সানি বা দ্বিতীয় আলেক্সান্ডার উপাধিও দেয়া হয়েছিলো। হিন্দুস্তানের ইতিহাসে বিজেতাদের তালিকা করতে গেলে নিঃসন্দেহে তাঁর নাম উপরের দিকেই থাকবে। একজন অপ্রতিদ্বন্দ্বী বিজেতা হিসেবে তিনি ১২৯৬ সালে ইলখানী রাজ্যের শিয়া শাসক গাজান মাহমুদকে পরাজিত করে সিন্ধ দখল করেন। ১২৯৯ সালে চাগতাই খান দুয়া খানকে পরাজিত করে পাঞ্জাব নিজের দখলে নেন। ১৩০১ সালে রণথম্বোর, ১৩০৩ সালে চিতোর, ১৩০৫ সালে মান্দু সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির পদানত হয়। রাজা রায় রামচন্দ্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মালিক কাফুর। তবে পরবর্তীতে রাজা রায়চন্দ্রকে “রায় রায়হান” খেতাব দিয়ে পুনরায় তাকে রাজ্য চালনার অনুমতি দেয়া হয়েছিলো। একই সাথে গুজরাটও তাকে দেয়া হয়েছিলো। ১৩০৯ সালে রাজা রায় রামচন্দ্রের সহায়তায় মালিক কাফুরের নেতৃত্বে বারাঙ্গল জয় করা হয়। হিন্দুস্তান শাসনে তাঁর সফলতা এতই বেশি যে, যদি তাকে দিল্লি সালতানাতের শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে অভিহিত করা হয়, তবে তা মোটেই বেশি বলা হবে না। প্রায় ২০ বছর হিন্দুস্তান শাসনের পর ১৩১৬ সালের আজকের দিনে তিনি ভারতের দিল্লীতে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিলো ৫০ বছর। আজ তাঁর ৭০৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ইতিহাসের নায়ক সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ১২৬৬ সালের ৪ জানুয়ারী ভারতের বীরভূমে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম শিহাবুদ্দিন খিলজি। শিহাবুদ্দিন খিলজি সম্পর্কের দিক দিয়ে জালালুদ্দিন খিলজির বড় ভাই। এদিক দিয়ে সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি সুলতান জালালুদ্দিন খিলজির ভ্রাতুষ্পুত্র। আবার সুলতান জালালুদ্দিন খিলজি তাঁর সাথে নিজ মেয়ের বিয়েও দেন। অর্থাৎ এই দিক বিবেচনায় হিসাব করলে, সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ছিলেন একই সাথে সুলতান জালালুদ্দিন এর ভ্রাতুষ্পুত্র এবং জামাতা। ১২৯০ সালে সুলতান জালালুদ্দিন খিলজি তাকে আমীর-ই-তুযুক পদে নিয়োগ দেন। এর এক বছর পরই অর্থাৎ ১২৯১ সালে তিনি সুলতান গিয়াসুদ্দিন বলবনের এক ভ্রাতুষ্পুত্রের বিদ্রোহ দমন করে সফলতা লাভ করলে জালালুদ্দিন খিলজি তাকে “আলা-উদ-দ্বীন” উপাধি দান করেন। এরপরই তিনি কারার গভর্নরের দায়িত্ব পান। আলাউদ্দিন খলজি খুব উচ্চাকাঙক্ষী ছিলেন । গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের মতো তিনিও বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখতেন । কিন্তু কাজি আলা-উল-মূলকের পরামর্শে তিনি এই অসম্ভব পরিকল্পনা ত্যাগ করে সারা ভারত জুড়ে এক বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপনের নীতি গ্রহণ করেছিলেন । বিশ্বজয়ের পরিকল্পনা ত্যাগ করলেও তিনি তার মুদ্রায় নিজেকে ‘দ্বিতীয় আলেকজান্ডার’ হিসাবে উল্লেখ করতেন । ভারতে সাম্রাজ্য স্থাপনের পাশাপাশি তিনি উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে মোঙ্গল আক্রমণের হাত থেকেও ভারতকে রক্ষা করেন । প্রথমে তিনি ভারতের গুজরাটের রাজা কর্ণদেব, রণ-থম্ভোরের রাজপুত নেতা হামির দেব , মেবারের রাজা রতন সিং ও মালবের অধিপতি মহ্লক দেবকে পরাজিত করেন । এরপর তিনি মালিক কাফুরের নেতৃত্বে দক্ষিণ ভারতে অভিযান প্রেরণ করেন । কাফুর দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র, বরঙ্গলের কাকতীয়রাজ প্রতাপ রুদ্র, দোরসমুদ্রের হোয়্সলরাজ তৃতীয় বল্লালকে পরাজিত করবার পর ভাতৃবিরোধের সুযোগ নিয়ে পান্ড্য রাজ্য অধিকার করেন । এরপর তিনি নাকি রামেশ্বর পর্যন্ত অগ্রসর হন । আলাউদ্দিন খলজি অবশ্য দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলি সরাসরি সাম্রাজ্যভুক্ত না করে সেখানকার রাজাদের মৌখিক আনুগত্য ও করদানের প্রতিশ্রুতি নিয়েই করদ রাজ্যে (কর ডাকে স্বীকৃত) পরিণত করেন । বিজেতা হিসাবে আলাউদ্দিন খলজি ছিলেন দিল্লির সুলতানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ । স্যার উলসলে হেগের মতে, তার রাজত্বের সঙ্গে সঙ্গেই সুলতানি সাম্রাজ্যবাদের সুত্রপাত হয় । তার আমলেই প্রথম দক্ষিণ ভারতে সুলতানি সেনাবাহিনীর অনুপ্রবেশ ঘটে । বিজেতা হিসাবে অনেকে তাকে আকবরের সঙ্গে তুলনা করেন। আলাউদ্দিনের দৃঢ়ত ও তার অসম সাহসিকতাপূর্ণ যুদ্ধকৌশলের কারনে তিনি ইতিহাস বিখ্যাত হয়ে আছেন।

হিন্দুস্তানের প্রতি সুলতান আলাউদ্দীন খিলজির আরেকটি বৃহৎ অবদান হচ্ছে, দাক্ষিণাত্যকে হিন্দুস্তানের মূল ভূ-খন্ডের সাথে একত্রিত করা। হিন্দুস্তানের মূল ভূ-খন্ড থেকে দাক্ষিণাত্য সবসময়েই আলাদা ছিলো। তবে, গৌড় শাসনামলে দাক্ষিণাত্যের শেষ সীমানা কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত গৌড় শাসন পৌঁছুতে পেরেছিলো। এরপর আর কোনো শাসকই দাক্ষিণাত্য শাসন করতে পারেন নি। কিন্তু সুলতান আলাউদ্দীন খিলজি ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি দাক্ষিণাত্য বিজয় করতে পেরেছিলেন। তবে দাক্ষিণাত্যকে সরাসরি নিজ শাসনে না নিয়ে আগের রাজাদেরই নিজের অধীনে নিয়োগ দেন। ‘তারিক-ই-আলাই’-এর বর্ণনানুযায়ী, এসব রাজারা সুলতান আলাউদ্দীন খিলজিকে নিয়মিত জিজিয়া আর খাজনা আদায় করে নিজ নিজ সিংহাসন অধিকারে রাখার সুযোগ পেয়েছিলেন। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী নিজে বিদ্যান না হলেও বিদ্যোৎসাহী ও বিদ্যানুরাগী ছিলেন। শিক্ষা ও শিক্ষিত ব্যক্তিদের তিনি ভালবাসতেন। সিংহাসনে আরোহনের পর তিনি ফারসী ভাষা শিক্ষা গ্রহণ করেন। অল্প সময়ের ভিতরে তিনি ফারসী ভাষায় পারদর্শী হয়ে উঠেন। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্পের পৃষ্টপোষক হিসেবে আলাউদ্দিন খিলজী ভারতীয় ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন। মুসলিম ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ কবি ভারতীয় তোঁতা পাখি বলে খ্যাত কবি আমির খসরু ছিলেন আলাউদ্দিন খিলজীর রাজ দরবারের সবচেয়ে খ্যাতিমান কবি। যুদ্ধ বিজেতা এবং প্রসাশক হিসাবে আলাউদ্দিন খলজি সুলতানি আমলে অসাধারণ সাফল্যের পরিচয় দেন । অর্থনৈতিক সংস্কারের দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায় যে আলাউদ্দিন ছিলেন মধ্যযুগের ভারতের প্রথম মুসলিম শাসক, যিনি
(১) জমি জরিপ করিয়েছিলেন ,
(২) জায়গির দান বা ভূমিদান প্রথার অবলুপ্তি ঘটিয়েছিলেন ।
(৩) রাজস্ব ও কর ধার্য করেছিলেন
(৪) বাজারদর নিয়ন্ত্রণ নীতি প্রবর্তন করেছিলেন ।
(৫) মসজিদ মাদ্রাসা,লঙ্গরখানা স্থাপন করেন
ভারতীয় সাম্রজ্যের নক্ষত্র আলাউদ্দিন খিলজি ১৩১৬ সালের ৪ জানুয়ারী মৃত্যুবরণ করেন। আজ দার ৭০৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। ইতিহাসের নায়ক সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০২০ রাত ৯:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



