
সারাবিশ্বে ধুমপানজনিত কারণে দিন দিন বাড়ছে ক্ষতির সংখ্যা। অর্থ, স্বাস্থ থেকে শুরু করে তামাকজাত এই পণ্যে ঝুঁকি নানামাত্রিক। প্রতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলার ক্ষতি হয় তামাকজাত পণ্যের ব্যবহারে। যার পুরোটাই ক্ষতি! প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৮০ লাখ কোটি টাকার বেশি। আর বিশ্বের যে ১৩টি দেশে সবচেয়ে বেশি সিগারেট-বিড়ি, জর্দা, গুল ও সাদাপাতার মতো ক্ষতিকর তামাক পণ্য উৎপাদিত হয় তার মধ্যে বাংলাদেশ হচ্ছে শীর্ষস্থানীয়। সে হিসাবে ধূমপানসহ তামাক জাতীয় পণ্যের পেছনে বিশ্বে মোট ব্যয়ের এক শতাংশও যদি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ধরা হয়, তাহলে বাংলাদেশে বছরে ব্যয় হয় প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা। স্বাস্থ্যসেবায় অতিরিক্ত ব্যয় এবং উৎপাদনশীলতা নষ্ট হওয়ার কারণে এই ক্ষতি হয় বলে জানানো হয়েছে গবেষণায়। সম্প্রতি প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তামাক থেকে যে পরিমাণ কর আহরিত হয় ধুমপানের এই ক্ষতি তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তামাকজাত পণ্যের কর থেকে আয় ছিল ২৬৯ বিলিয়ন বা ২৬ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ব সংস্থার এক যৌথ গবেষণার পর এমনটাই জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমানে ধুমপানের কারণে অকাল মৃত্যুতে পড়েছেন ৬০ লাখ মানুষ। বর্তমানে ধূমপানে যত লোকের মৃত্যু হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে তা এক তৃতীয়াংশ বাড়বে। অর্থাৎ ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ৮০ লাখে পৌঁছাবে। এই মৃত্যুর ৮০ শতাংশই ঘটে নিম্ন এবং মধ্য আয়ের দেশগুলোতে। কারণ বিশ্বের ৮০% ধূমপায়ীরই বাস এসব দেশে। আর বিশ্বব্যাপী ধূমপায়ীর সংখ্যাও বাড়ছে বলে জানা যায় ওই গবেষণা থেকে। বাংলাদেশও যার একটি অংশ। বিশ্বের বহু দেশে, বিশেষ করে উন্নত দেশগুলোতে যখন স্বাস্থ্য ঝুঁকির কারণে ধূমপায়ীর সংখ্যা ক্রমাগত কমছে, সেখানে বাংলাদেশে তা বাড়ছে কারন ধূমপান নিরুৎসাহিত করার ব্যাপারে সরকারগুলোর উদাসীনতা ফলশ্রুতিতে প্রতি বছর বাংলাদেশের ধূমপায়ীরা সিগারেট-বিড়ির আগুনে পুড়িয়ে ফেলছেন মূল্যবান ৮০ হাজার কোটি টাকা। এটা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৪ শতাংশ। যার পুরোটাই অপচয়। ধূমপানের পেছনে পোড়ানো এই বিপুল পরিমাণ অর্থ রক্ষা করা গেলে প্রতি বছর দেশে অন্তত তিনটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব হতো।

ধূমপানের খরচ জোগাতে ব্যক্তির আয়ের উল্লেখযোগ্য একটা অংশ অপচয় হয়। বায়োমেডিক সেন্টার (বিএমসি) প্রকাশিত গবেষণা তথ্য মতে, দেশে স্বল্প আয়ের ৬০ বছরের কম বয়সী ধূমপায়ী পরিবারপ্রধানরা পারিবারিক খরচের মধ্যে শিক্ষায় ৮ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যসেবায় ৫.৫ শতাংশ কম ব্যয় করেন। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য মতে, আয়ের দিক থেকে ধূমপায়ীদের সংখ্যাগরিষ্ঠই অসচ্ছল। ফলে ধূমপায়ীর পরিবারের সদস্যরা পরিমিত পুষ্টির জোগান ও শিক্ষা খাতে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের ভারসাম্য রাখতে পারছেন না। এটা সুস্থ, টেকসই ও মেধাভিত্তিক জাতি গঠনের পথে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এদিকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনের অংশ হিসাবে অনুষ্ঠিত টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক (এসডিজি) শীর্ষ সম্মেলনে বিশ্বনেতারা ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের জন্য ১৭টি লক্ষ্য অর্জনে ১৬৯টি প্রতিশ্রুতি পূরণের অঙ্গীকারবদ্ধ হন। বাংলাদেশও তামাককে এসডিজি অর্জনে বড় বাধা হিসাবে দেখছে। তাই সরকার আগামী ২০৪০ সালের মধ্যে তামাকের ব্যবহার সম্পূর্ণ নির্মূল করতে পরিকল্পনা নিয়েছে। ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে গৃহীত ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফটিসি) স্বাক্ষর করেছে। সে অনুযায়ী সরকার ২০০৫ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন তৈরি এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন ধারায় সংশোধনী এনে সংশোধিত তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৩ পাস করেছে। যার ওপর ২০১৫ সালে বিধিমালাও তৈরি করা হয়। সে আলোকে স্বাস্থ্য উন্নয়ন সারচার্জের অর্থ ব্যবহারের জন্য গ্রহণ করা হয় জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচিও। কিন্তু তামাকের ব্যবহার এবং সে সংশ্লিষ্ট মৃত্যু ঠেকাতে সরকারগুলো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না বলে অভিযোগ করা হয় গবেষণা প্রতিবেদনে। হুট করে তামাক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে বড় কোনো অর্থনৈতিক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে এই আশঙ্কায় সরকারগুলো তামাকবিরোধী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন না। কিন্তু সরকারগুলোর এই আশঙ্কা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা। বিজ্ঞানীদের দাবি এখনই তামাকবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণের সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
ফেসবুক লিংক
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






