
ভারতীয় গজল গায়ক, সুরস্রষ্টা, সংগীত পরিচালক সমাজকর্মী ও শিল্পোদ্যোগী জগজিৎ সিং। তিনি "গজল-সম্রাট" নামে পরিচিত। গজল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের একটি জটিল ধারা। সিং গজলের সঙ্গে "গীত" ধারার মিশ্রণ ঘটিয়ে এই ধারাটিকে সরল করে তোলেন। এরই ফলে গজল পুনরায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তার স্ত্রী চিত্রা সিংও একজন বিশিষ্ট ভারতীয় গজল গায়িকা। ১৯৭০ ও ১৯৮০-এর দশকে জগজিৎ এবং চিত্রা সিং ভারতীয় সংগীত জগতে প্রায় একই সঙ্গে খ্যাতনামা হয়ে ওঠেন। তাদের দুজনকে আধুনিক গজল সংগীতের পথপ্রদর্শক মনে করা হয়। ভারতের ফিল্মি গানের ধারার বাইরে থেকেও তারা ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী। অর্থ (১৯৮২) ও সাথ সাথ ছবিতে ব্যবহৃত তাদের গাওয়া গজলেগজল গায়ক, সুরস্রষ্টা, সংগীত পরিচালকর সংকলন এইচএমভি থেকে প্রকাশিত হয়; এটি ছিল তাদের সর্বাধিক বিক্রীত অ্যালবাম। লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তিনি প্রকাশ করেন সাজদা (১৯৯১) অ্যালবামটি। তিনি পাঞ্জাবি, হিন্দি, উর্দু, বাংলা, গুজরাটি, সিন্ধি ও নেপালি ভাষাতেও গান গেয়েছিলেন। ২০০৩ সালে সংগীত ও সংস্কৃতি জগতে অবদানের জন্য তাকে ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান পদ্মভূষণ দিয়ে সম্মানিত করা হয়। আজ "গজল-সম্রাট" জগজিৎ সিং এর ৭৯তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৪১ সালের আজকের দিনে তিনি ভারতের শ্রীগঙ্গানগরের বিকানের রাজ্যে জন্মগ্রহণ করেন। কিংবদন্তি গজল গায়ক, সুরস্রষ্টা, সংগীত পরিচালক জগজিৎ সিং এর জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

১৯৪১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি রাজস্থানের শ্রীগঙ্গানগরের এক পরিবারে জন্ম নেন জগজিৎ সিং। তার প্রকৃত নাম জগপ্রীত সিং।সঙ্গীতের পরিবারেই জন্ম নেন তিনি। তাই উত্তরাধিকার সূত্রে তাঁর রক্তেও বইছিল গান। গানের হাতেখড়ি নিজের বাবার থেকেই তাঁর। এরপর ১৯৬৫ ন্সালে তিনি চলে আসেন মুম্বই। সেখানে এসে ১৯৬৭ এ তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় গজল গায়িকা চিত্রার। সেই চিত্রার সঙ্গেই দু’বছর পর সুর ও বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন জগজিৎ সিং। এরপর একসুঙ্গে গানের জগতে চলা শুরু করেন দু’জনে। একসঙ্গে বহু গানও গান তাঁরা। এরপর এক সন্তান হয় দুজনের। কিন্তু ১৯৯০ সালে একট গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান জগজিৎ-চিত্রার একমাত্র পুত্র। ছেলের বয়স হয়েছিল ১৮ বছর। ছেলের মৃত্যুশোক সামলাতে না পেরে নিজেকে গানের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। কিন্তু গান থামাননি জগজিৎ। বরং তাঁর গানে বাড়তে থাকে আরও আবেগ। এরপর তাঁর প্রথম অ্যালবামটিও ব্যাপক হিট করে। গজলের দুনিয়ায় রীতমত এক নয়া মোড় আনেন তিনি। ছবিতে তিনি যখন গজল গাইতে শুরু করেন, তখন সাধারণ মানুষ, যারা গজল খুব একটা শুনতেন না তারাও গজল শোনা শুরু করে দেন। প্রায় পাঁচ-দশকব্যাপী সংগীতজীবনে তিনি ৮০টি অ্যালবাম প্রকাশ করেন। তার নয়ি দিশা (১৯৯৯) ও সমবেদনা (২০০২) ছিল ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তথা বিশিষ্ট হিন্দি কবি অটলবিহারী বাজপেয়ীর লেখা গানের সংকলন।

জগজিৎ ও চিত্রা সিং প্রথম ভারতীয় সুরস্রষ্টা যিনি ডিজিটাল মাল্টি-ট্র্যাক রেকর্ডিং পদ্ধতিতে গান রেকর্ড করেন। এই পদ্ধতিতে রেকর্ড করা তাদের প্রথম অ্যালবামটি ছিল বিয়ন্ড টাইম (১৯৮৭)। রবিশঙ্কর ও অন্যান্য সংগীতশিল্পী ও সাহিত্যিকদের সঙ্গে তিনি ভারতীয় শিল্প ও সংস্কৃতির রাজনীতিকরণের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন। শাস্ত্রীয় ও লোকশিল্পীদের তিনি নানাভাবে সাহায্য করতেন। মুম্বইয়ের সেন্ট মেরি স্কুলের লাইব্রেরি নির্মাণ, বম্বে হসপিটাল গঠন এবং ক্রাই, সেভ দ্য চিলড্রেন ও আলমা প্রভৃতি সংগঠনের কাজকর্মেও তিনি প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেন। প্রায় ১৫০টি গজল গানের অ্যালবাম বানিয়েছেন তিনি। ছবিতে গান গাইলেও তিনি ‘প্লেব্যাক’ সিংগার নয়, গজল গায়ক হিসেবেই মানুষের মধ্যে খ্যাতি পান। বয়সজনিত কারণে জগজিৎ সিং প্রায়ই হৃদরোগের চিকিৎসা নিতেন। এছাড়াও উচ্চ রক্তচাপেরও সমস্যা ছিল তার। মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত গুরুতর সমস্যায় তাকে ভারতের মুম্বাইয়ের লীলাবতী হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল। সেপ্টেম্বর মাসে স্ট্রোকে আক্রান্ত হবার পর এক মাস ধরে মুম্বাইয়ের হাসপাতালে কোমায় ছিলেন শিল্পী জগজিৎ সিং। ২০১১ সালে গজল সম্রাটের সুর চিরকালের মত থেমে যায়। ১০ অক্টোবর, ২০১১ইং, সোমবার, সকাল ৮ টা ১০ মিনিটে ঐ মুম্বাইয়ের লীলাবতী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭০ বছর বয়সে মারা যান এই গজল শিল্পী। আজ "গজল-সম্রাট" জগজিৎ সিং এর ৭৯তম জন্মবার্ষিকী। কিংবদন্তি গজল গায়ক, সুরস্রষ্টা, সংগীত পরিচালক জগজিৎ সিং এর জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
ফেসবুক লিংক
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।







