
সিরীয় শরণার্থী শিশু আয়লান কুর্দির করুণ মৃত্যুতে চোখে পানি আসেনি এমন মানুষ পৃথিবীতে বিরল। পুঁজিবাদের সর্বশেষ তোলপাড় করা বলি তুরস্কের তিন বছরের শিশু আয়লান কুর্দি। যে শিশুটি আসলে নিজের প্রাণ দানের মাধ্যমে আক্ষরিক অর্থেই মানবতাকে ভাসিয়ে দিয়েছে সাগরতীরে। অথবা মানবীয় বোধকেই ডুবিয়ে দিয়েছে অতল সাগরের গহবরে। আমরা কি বেঁচে আছি? বরং আমরা সবাই আজ আয়লানের মতোই মৃতবৎ! ২০১৫ সালের সেই ঘটনায় সাগরপাড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা ছোট্ট আয়লানের মরদেহটি দেখে হৃদয় কেঁদেছিল সবার। ছবিটির আলোকচিত্রী তুর্কি সাংবাদিক নিলুফার দেমির বলেন, ‘যখন বুঝতে পারলাম ছেলেটাকে বাঁচানোর কোনো উপায়ই নেই—মনে হলো, ওর ছবি তুলি...বেদনাদায়ক ঘটনাটা দেখুক সবাই। আশা করি, এই ছবি যে ধাক্কা দিয়েছে, তা চলমান সংকট সমাধানে সহায়ক হবে।’ নিষ্ঠুর পৃথিবীর অমানবতার শিকার শিশু আয়নাল তার সমস্ত অভিযোগ দায়ের করার জন্য ঠাই নিয়েছে সৃষ্টিকর্তার শাহী দরবারে। স্রষ্টা আয়লানের অভিজোগ আমলে নিয়ে কঠোর শাস্তি প্রদান কেছেন অপরাধীদের। তুরস্কের বোদরুম সৈকতে ছোট্ট একটি মরদেহ পড়েছিল। ছবিটি মুহূর্তেই সারা বিশ্বের ছড়িয়ে পড়ে। ভূমধ্যসাগরের তীরে পাওয়া সিরিয়ার তিন বছরের শিশু আয়লান কুর্দির লাশের ছবি কাঁপিয়ে দিয়েছিল সারাবিশ্ব। ঘটনাটি ২০১৫ সালের। ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে তুরস্ক থেকে গ্রীসে যাওয়ার সময় নৌকাডুবিতে মারা গিয়েছিল শিশু আয়লানসহ পুরো পরিবার। ওই ঘটনায় আয়লানের সঙ্গে মা-ভাইসহ মারা যান আরও ১২ জন। আয়লানদের মৃত্যুতে তুরস্ক ও সিরিয়ার একাধিক পাচারকারী চক্র জড়িত বলে তদন্তে প্রকাশ হয়। দক্ষিণাঞ্চলীয় আদানা প্রদেশ থেকে সেসব পাচারকারী চক্রের তিন সদস্যকে গ্রেফতার করে তুর্কি নিরাপত্তাবাহিনী। এবছর ১৩ মার্চ আয়লানদের হত্যার অভিযোগে ওই তিন আসামিকে ১২৫ বছর করে কারাদণ্ড দেন বদ্রাম হাই ক্রিমিনাল কোর্টের বিচারক।

মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কুর্দি সম্প্রদায়ের মানুষেরা অন্যায়-অবিচার ও উপেক্ষার শিকার। এর মধ্যে সিরিয়ার সরকার বহু বছর ধরেই তাদের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করছে। ২০১১ সালে সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত সে দেশের কুর্দিরা রাজধানী দামেস্কেই থাকত। একপর্যায়ে তারা উত্তরাঞ্চলীয় শহর কোবানির কাছাকাছি মাখারজি এলাকায় গিয়ে বসবাস শুরু করে। সিরিয়ার কোবানে শহরে পরিবারের সঙ্গে থাকত আয়লান। কিন্তু গত বছরের শেষ দিকে কোবানিতে কুর্দি বাহিনী ও ইসলামিক স্টেট (আইএস) জঙ্গিদের লড়াই শুরু হলে স্থানীয় বহু পরিবার তুরস্কে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানকার কর্তৃপক্ষ কুর্দি শরণার্থীদের সাময়িক আশ্রয় দেয়। তবে স্থায়ী আশ্রয়ের খোঁজে কুর্দিরা ইউরোপসহ পশ্চিমা বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করছে। গৃহযুদ্ধকবলিত সিরিয়া থেকে এই কুর্দি পরিবারটি আশ্রয় নিয়েছিল তুরস্কে। সেখানে আইএস জঙ্গিদের তাণ্ডব থেকে বাঁচতে আয়লানের পরিবার কানাডায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে। সেখানে তাঁর বোন টিমা কেশবিন্যাসের কাজ করেন। কিন্তু কানাডা কর্তৃপক্ষ তাদের আবেদন নাকচ করে দেয়। এরপর তারা পাচারকারীদের সাহায্যে সাগর পাড়ি দিয়ে তুরস্ক থেকে গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করে। তুরস্ক থেকে নৌকায় চেপে গ্রিস যাওয়ার চেষ্টা করার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয় আবদুল্লাহর পরিবার। নৌকা ডুবে গেলে তাঁর হাত ফসকেই সাগরের ঢেউয়ে তলিয়ে যায় দুই ছেলে—তিন বছর বয়সী আয়লান আর পাঁচ বছর বয়সী গালিব। ভূমধ্যসাগর কেড়ে নিয়েছে ওদের মা রেহানাকেও। তবে সৌভাগ্যক্রমে ওই দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যান আয়লানের বাবা আবদুল্লাহ কুর্দি। এ ঘটনায় নৌকার ১৬ আরোহীর মধ্যে ১২ জনই মারা যান। আয়লানের মরদেহ তুরস্কের বোদরুম সৈকতে পড়ে থাকতে দেখা যায়। পরে আয়লান কুর্দিকে তার নিজ শহর কোবানিতে সমাহিত করা হয়। যেসব পশ্চিমা বিশ্ব মোড়লরা নানা বাহানা ও ছলচাতুরীর আশ্রয়ে সিরিয়া বা তুরষ্কে স্রেফ নিজেদের ফায়দার দুগ্ধ থেকে ননি তুলবার মানসে দিনের পর দিন গৃহযুদ্ধের আগুনে ঘি ঢেলে যায় সেই কথিত ইউরোপীয় মোড়লদের মানাবাধিকার নীতি বা শরণার্থী নীতিকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে আয়লানের অতি অসহনীয় নীল মরদেহটি। এই মর্মন্তুদ ঘটনায় পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্রের ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে কেবলমাত্র এখনও বিপ্লবী মানুষ যারা, সেই তাদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। আয়লান কুর্দির মৃতদেহের ছবি সংবাদ মাধ্যমে আলোড়ন তোলে এবং সিরীয় শরণার্থী সংকটের প্রতি বিশ্বের নজর ফেরায়। মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে সিরিয়া থেকে, স্রোতের মত ঢোকা অভিবাসীদের নিয়ে কি করা হবে, কিভাবে পরিস্তিতি সামাল দেয়া যাবে -- তা নিয়ে চরম মতভেদ তৈরি হয়েছে ইউরোপে। তখন এই সব বাদানুবাদ ছাপিয়ে আয়লান কুর্দির মৃতদেহের ছবি বিশ্বজুড়ে গভীর আবেগের জন্ম দিয়েছে। বড় ধরনের ঝাঁকুনি খায় অভিবাসী-সংকট নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত ইউরোপ। ঘুম ভাঙে বিশ্ববাসীরও। সাম্প্রতিক শরণার্থী সমস্যা নিয়ে ইউরোপের যে নেতারা এত দিন নির্লিপ্ত ছিলেন, তাঁরাও এখন মানবিক উদ্যোগের পথে এগোনোর কথা বলছেন। অন্তত দুই লাখ অভিবাসীকে গ্রহণ করতে ইউরোপকে অনুরোধ করেছে জাতিসংঘ।

ঘটনার প্রায় পাঁচ বছর পর এবছর ১৩ মার্চ ওই মর্মান্তিক ঘটনায় দোষীদের কারাদণ্ড দিয়েছেন তুরস্কের একটি আদালত। আয়লান ও তার পরিবারের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছে তিন পাচারকারীকে। তাদের প্রত্যেককে ১২৫ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু। জার্মানির একটি উদ্ধারকারী জাহাজের নামকরণ করা হয়েছে আয়লানের নামে। তার বাবা আবদুল্লাহ কুর্দি এখন যোগ দিতে চান সেই জাহাজে। যেটি ভূমধ্যসাগরে অভিবাসনপ্রত্যাশীদের উদ্ধারকারী জার্মান স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা সি-আই-এর কাজে সহযোগিতা করে। আবদুল্লাহ কুর্দি এখন ইরাকের এরবিলে থাকেন। সেখানে একটি শরণার্থী ক্যাম্পে শিশুদের সাহায্য করেন তিনি। আব্দুল্লাহ কুর্দি জানান, তিনি আবার বিয়ে করেছেন এবং বাবা হতে চলেছেন৷ ‘‘আমার সন্তানের জন্মের পরপরই আমি সেই জাহাজে গিয়ে অভিবাসীদের উদ্ধারকাজে যোগ দেবো,'' তিনি বলেন‘‘আমি তাদের সেই সাহায্যটুকু করতে চাই, যা আমি পাইনি৷'' আল্লাহর সেরা জীব মানুষের যারা ক্ষতি সাধন করে তারা মানবতার শত্রু। আয়লানের পাচারকারী শুধু নয় যারা দেশে দেশে যুদ্ধের নীলনকশা বানায়, অস্ত্রে শান দেয়, মানুষের ওপর অসহায়ত্ব চাপিয়ে দেয়; সেইসব সাম্রাজ্যবাদী যারা আয়লানের মতো নিষ্কলুষ, অপাপবিদ্ধ ও অবুঝ শিশুদের শরণার্থী হতে বাধ্য করে তাদের সমস্ত অভিযোগ আমলে নিয়ে সৃষ্টিকর্তা কঠিন শাস্তি প্রদান করেছেন। বিশ্বে আজ ত্রাহি ত্রাহি রব। বিধাতার এমন শাস্তি থেকে রক্ষাপেতে আমাদের আত্মশুদ্ধি হতে হবে। কায়মনবাক্যে স্রষ্টার কছে প্রার্থনা করতে হবে আয়লানরা তাদের অভিযোগ তুলে নেয়। আল্লাহ আমাদের অপরাধ ক্ষমা করুন। আমিন
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুন, ২০২০ বিকাল ৪:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


