
মাওলানা মামুনুল হক নামের হেফাজত ইসলামের এক নেতা তার ফেসবুক ওয়ালে দীর্ঘ একটি পোস্ট লিখেছেন। তার এই পোস্টটি এক অদ্ভুত রসাত্মক ট্র্যাজেডি।
লেখাটি পড়লে মনে হয়, তিনি যেন কোনো এক সুমহান সত্যের জন্য ক্রুসেডে নেমেছিলেন, আর মাঝপথে ‘৫০১’ নম্বর কক্ষে এসে তাসের ঘরের মতো সব গুলিয়ে ফেলেছেন! তৎকালীন সরকারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ও ব্যক্তির গোপনীয়তা (প্রাইভেসি) লঙ্ঘনের রূপ যেমন সত্য, তেমনি এই লেখার ছত্রে ছত্রে লুকিয়ে থাকা হাহাকার, স্ববিরোধী যুক্তি আর ধারালো প্রতারণাও সমান সত্য।
১. ‘ডিজিটাল জালিয়াতি’ বনাম ‘পারিবারিক ঐতিহ্য’
রিসোর্টের খাতায় নাম লিখলেন প্রথমার (আমিনা তাইয়্যেবা), সাথে থাকা নারীর আইডি কার্ডে নাম অন্য (শাহিদা ইসলাম), আর মুখে দাবি করলেন তিনি আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী (জান্নাত আরা ঝর্ণা)! একেই বোধহয় বলে ‘এক টিকিটে তিন সিনেমা’। রসিকতা বাদ দিলেও, দেশের প্রচলিত দণ্ডবিধি (Penal Code)অনুযায়ী অন্যের নাম ব্যবহার করে পরিচয় গোপন করা বা জালিয়াতি করা স্পষ্ট অপরাধ। তিনি অবলীলায় বললেন, "আমরা দুজন কথা বলেই প্রথমার নাম বলেছিলাম।" বাহ! স্বামী-স্ত্রী মিলে পরামর্শ করে জালিয়াতি করলে বুঝি তা অপরাধ থেকে পুণ্যিতে রূপান্তরিত হয়?
২. আইন যখন ‘জটিলতা’, বাল্যবিয়ে তখন ‘সহজ সমাধান’!
তিনি অত্যন্ত খোলামনে স্বীকার করেছেন, প্রথম স্ত্রী রাষ্ট্রীয় আইনে ‘অপ্রাপ্তবয়স্ক’ (অর্থাৎ শিশু) থাকায় তিনি কাবিন করেননি। আবার দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রেও ‘আইনি জটিলতা’ এড়াতে সরকারি রেজিস্ট্রেশনের ধার ধারেননি। দেশের মুসলিম পারিবারিক অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী প্রথম স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া এবং রেজিস্ট্রেশন ছাড়া বিয়ে করা আইনত দণ্ডনীয়। একজন শীর্ষনেতা যখন দেশের আইনকে "জটিলতা" বলে বুড়ো আঙুল দেখান, তখন সাধারণ নাগরিকের আইন মানার দায় কোথায় থাকে? আইনের চোখে যা অপরাধ, হুজুরের চোখে তা কেবলই ‘কৌশল’!
শর্তযুক্ত বিয়ে: ইসলাম নাকি ‘সুবিধাবাদ’?
মামুনুল সাহেব শর্ত দিলেন—ইসলাম স্ত্রীদের যে সমান অধিকার দিয়েছে, তিনি তা দিতে পারবেন না! আর অসহায় নারীটি নাকি ‘স্বেচ্ছায়’ তা মেনে নিয়েছেন। বাহ রে ইনসাফ! যে ইসলামের মূল স্তম্ভই হলো বহুবিবাহের ক্ষেত্রে স্ত্রীদের মধ্যে নিখুঁত সমতা ও ইনসাফ কায়েম করা, সেখানে নিজের অক্ষমতা জেনেও কেবল ‘ভোগের ছাড়পত্র’ পেতে অধিকার ত্যাগের এমন চুক্তি কোন ইসলাম সম্মত? একে ‘মুতাহ বিয়ে’ বা চুক্তিভিত্তিক বিয়ে না বলে ‘সুবিধাবাদী সুবিধাজনক বিয়ে’ বলাই শ্রেয়।
৪. পবিত্র ইতিহাসের অপব্যবহার ও চরম ধৃষ্টতা
সবচেয়ে চমত্কার ও ধৃষ্টতাপূর্ণ রসিকতাটি তিনি করেছেন নিজেকে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর পবিত্র চরিত্রের সাথে তুলনা করে! হযরত আয়েশা (রা.)-এর ওপর অপবাদ দেওয়া মুনাফিকদের বিরুদ্ধে স্বয়ং আল্লাহ কুরআনের আয়াত নাজিল করে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেছিলেন। আর এখানে মামুনুল সাহেব নিজেই স্বীকার করছেন তিনি প্রথম স্ত্রীর কাছে মিথ্যা বলেছেন, রিসোর্টের খাতায় জালিয়াতি করেছেন, দেশের আইন ভেঙেছেন। নিজের এই সব জগাখিচুড়ি আর নৈতিক স্খলনকে আড়াল করতে ইসলামের পবিত্রতম ইতিহাসের ঢাল ব্যবহার করা চরম ধৃষ্টতা ছাড়া আর কী হতে পারে?
৫. ‘৫০১’ কি বিজয়ের প্রতীক, নাকি ব্যর্থতার দলিল?
তত্কালীন সরকার ও তার গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (ডিজিএফআই, এনএসআই) একজন নাগরিকের ঘরের দরজা ভেঙে লাইভ করা, ব্যক্তিগত কল রেকর্ড ফাঁস করার যে অন্যায় কার্যক্রম চালিয়েছিল, তা ছিল স্বাধীন দেশের সংবিধানের ৪৩ অনুচ্ছেদের (গোপনীয়তার অধিকার) চরম লঙ্ঘন। রাষ্ট্রের সেই ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নোংরা ও নিন্দনীয়।
কিন্তু রাষ্ট্র অন্যায় করেছে বলেই কি আপনার নিজের করা বেআইনি কাজ, জালিয়াতি এবং প্রথম স্ত্রীর সাথে করা প্রতারণা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যায়? চোরকে ধরতে গিয়ে পুলিশ যদি আইন ভাঙে, তার মানে এই নয় যে চোরটি সাধু পুরুষে রূপান্তরিত হয়ে গেল!
‘৫০১’ নম্বর কক্ষের ঘটনাটি তৎকালীন সরকারের একটি চরম নোংরা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত স্ক্রিপ্ট ছিল—তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু মামুনুল হক যেভাবে আজ সেই ‘৫০১’-কে তার "বিজেয়ের প্রতীক" বা "সেলিব্রেশনের ট্রফি" বানাতে চাচ্ছেন, তা দেখে হাসব না কাঁদব, তা ভাবার বিষয়।
রাষ্ট্রের করা অন্যায় কে পুঁজি করে নিজের আইনভঙ্গ, জালিয়াতি, বাল্যবিয়ে এবং প্রতারণাকে কোনোভাবেই জাস্টিফাই করা যায় না। তার এই দীর্ঘ বয়ান কোনো সত্যের জয়গান নয়, বরং ধর্মীয় আবেগের সস্তা ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইলিং ব্যবহার করে নিজের নৈতিক ও আইনি দেউলিয়াত্ব ঢাকার এক ব্যর্থ ও চতুর কসরত মাত্র!
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:২৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

