
কবিশেখর কালিদাস রায় রবীন্দ্রযুগের বিশিষ্ট রবীন্দ্রানুসারী কবি, প্রাবন্ধিক ও পাঠ্যপুস্তক রচয়িতা।
ইঁদুর বলে বয়স হলে আমি-ই হব হাতি,
দূর্বা বলে বংশ হব আমি তো তার নাতি।
রুই কাতলা যা হোক হব কয় পুঁঠি মাছ হেঁকে,
গুগলি বলে শঙ্খ হব/হুগলী গাঙেই থেকে'’
ছড়ার রচয়িতা কবি, শিক্ষাবিদ ও সাহিত্য-সমালোচক কালিদাস রায়। প্রগাঢ় পল্লীপ্রীতির সঙ্গে রোমান্টিক রসকল্পনা এবং কবিতার সহজ, সরল ও অনাড়ম্বর ভাষার ব্যবহারে তার কাব্যগুলো পাঠকদের কাছে আজও হৃদয়গ্রাহী করে রেখেছে। আখ্যানমূলক কবিতা রচনাতেও সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন রবীন্দ্র ভাবধারার এ কবি। কালিদাস রবীন্দ্র-ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়ে কাব্যচর্চা শুরু করেন। গ্রামবাংলার রূপকল্প অঙ্কনের প্রতি আগ্রহ, বৈষ্ণবপ্রাণতা ও সামান্য তত্ত্বপ্রিয়তা ছিল তার কবিতাগুলির বৈশিষ্ট্য। রোমান্টিকতা, প্রেম, পল্লিজীবন, সমাজ, ঐতিহ্যপ্রীতি এবং বৈষ্ণবভাব তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়। তাঁর মোট কাব্যগ্রন্থ ১৯টি; কালিদাস রায় রচিত কাব্যগন্থগুলি : কুন্দ (১৯০৮), কিশলয় (১৯১১), পর্ণপুট (প্রথম ভাগ ১৯১৪, ২য় ভাগ ১৯২১), ব্রজবেণু (১৯১৫), বল্লব (১৯১৫), ঋতুমঙ্গল (১৯১৬), ক্ষুদকুঁড়া (১৯২২), রসকদম্ব (১৯২৩), লাজাঞ্জলি (১৯২৪), হৈমন্তী (১৯২৪), চিত্তচিতা (১৯২৫), আহরণী (সঙ্কলন ১৯৩২), বৈকালী (১৯৪০), ব্রজবাঁশরী (১৯৪৫), আহরণ (সঙ্কলন ১৯৫০), গাথাঞ্জলি (১৯৫৭), সìধ্যামণি (১৯৫৮), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৬৪) এবং পূর্ণাহুতি (১৯৬৮)। তাঁর ‘ছাত্রধারা’ কবিতা সুপরিচিত বহু প্রজন্মের কাছে। কালিদাস রায়ের রচিত প্রবন্ধ পুস্তকের মধ্যে প্রাচীন বঙ্গ-সাহিত্য, বঙ্গ-সাহিত্য পরিচয়, শরৎ সাহিত্য, সাহিত্য প্রসঙ্গ (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড) ও পদাবলী সাহিত্য বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তার রচিত চণক সংহিতা, রঙ্গচিত্র ও চালচিত্র গ্রন্থ রম্যসাহিত্য হিসেবে উল্লেখযোগ্য। তিনি কালিদাসের শকুন্তলা, কুমারসম্ভব এবং মেঘদূতের অনুবাদ করেন। প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্য পরিচয়, প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্য, পদাবলী সাহিত্য, শরৎ-সাহিত্য ও সাহিত্য প্রসঙ্গ তাঁর সমালোচনা গ্রন্থ। তাঁর রচিত শিশুতোষ গল্পকাহিনীও আছে। ‘বেতালভট্ট’ ছদ্মনামে রচিত তাঁর রম্যরচনাগুলি পাঠকসমাজে খুবই সমাদৃত হয়েছে। তিনি‘রসচক্র’ নামে একটি সাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠা করেন। সেকেন্ডারি বোর্ডের বাংলা সিলেবাস কমিটির চেয়ারম্যান এবং প্রধান পরীক্ষক পদেও ছিলেন। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রংপুর সাহিত্য পরিষদের ‘কবিশেখর’ উপাধতে ভূষিত হন। দীর্ঘদেহী, ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত কালিদাসবাবু ছাত্রদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিলেন তাঁর সাদাসিধে স্বভাব এবং পাণ্ডিত্যের কারণে। আজ কবিশেখর কালিদাস রায়ের ১৩১তম জন্মবার্ষিকী। ১৮৮৯ সালের আজকের দিনে তিনি ভারতের বর্ধমানে জন্মগ্রহণ করেন। রবীন্দ্রানুসারী কবি, সমালোচক কালিদাস রায়ের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।

কালিদাস রায় ১৮৮৯ সালের ২২ জুন পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার কড়ুই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তবে কবি খুব একটা তার জন্মভিটেতে আসেন নি। থাকতেন কলিকাতার চারু এভিন্যুতে। সেখানেই বৈঠক বসতো সেকালের বিখ্যাত সব কবি লেখকদের। আসলে কবির পরামর্শ নিতে আসতেন অনেকেই। সেইসময় কালিদাস রায়ের সাহিত্য বিচারবোধের উপর অনেক প্রখ্যাত সাহিত্যিকের আস্থা ছিল। তাঁর পিতা যোগেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন কাশিমবাজার রাজ এস্টেটের কর্মচারী। তিনি ছিলেন চৈতন্যদেবের জীবনীকার লোচনদাসের বংশধর। বৈষ্ণব কবি লোচনদাস ঠাকুর ছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষ। কালিদাসের শৈশব কেটেছিল মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরে। কালিদাস কাশিমবাজার আশুতোষ চতুষ্পাঠীতে সংস্কৃত শেখেন এবং পরে কাশিমবাজারের খাগড়া লন্ডন মিশন স্কুলে অধ্যয়ন করেন। ১৯১০ সালে তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ পাস করে স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শনশাস্ত্রে এমএ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেন; কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আগেই পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। রংপুরের উলিপুর মহারানী স্বর্ণময়ী হাইস্কুলের সহশিক্ষক (১৯১৩) হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে কিছুদিন (১৯২০-৩১) চবিবশ পরগনার বড়িশা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার পর রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের সহায়তায় তিনি কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের ভবানীপুর শাখায় প্রধান শিক্ষকরূপে যোগদান করেন। দীর্ঘকাল তিনি এখানে শিক্ষকতা করেছিলেন। ১৯৫২ সালে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।

সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ কালিদাস বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ (১৯৫৩) ও ‘সরোজিনী স্বর্ণপদক’, বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ (১৯৬৩) এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি (১৯৭১) লাভ করেন। তবু কবির সঠিক মূল্যায়ন হয়নি বলেই মনে করেন অনুরাগীরা। ১৯৭৫ সালের ২৫ অক্টোবর কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়। কালিদাস রায় স্মৃতি কমিটি নিজ উদ্যোগে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে (১৪১৫ বঙ্গাব্দ) কবির ভিটেয় একটি আবক্ষ মূর্তি বসিয়েছে। স্মৃতি কমিটির পক্ষ থেকে কবিভিটেয় জন্ম দিন পালন করা হয়। আজ কবিশেখর কালিদাস রায়ের ১৩১তম জন্মবার্ষিকী। রবীন্দ্রানুসারী কবি, সমালোচক কালিদাস রায়ের জন্মবার্ষিকীতে ফুলেল শুভেচ্ছা।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
নিউজ চ্যানেল
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুন, ২০২০ দুপুর ২:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


