
মিথ্যা বলা মহা পাপ। মিথ্যাকে সব পাপের জননী বলা হয়। একটি মিথ্যা থেকে শতশত পাপের সূত্রপাত হয়। তাই খুব সাধারণ বিষয়েও মিথ্যা কথা বলা ঠিক নয়। এতে করে যে কেউ ধীরে ধীরে মিথ্যা বলায় অভ্যস্ত হয়ে যায়। তখন মিথ্যা কথা বলতে আর দ্বিধাবোধ করে না। যে কোনো বিষয়ে মুখ দিয়ে অকপটে মিথ্যা বের হয়ে আসে। শরিয়তে সত্যকে সর্বত্রই উৎসাহিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সত্য মুক্তি দেয়, মিথ্যা ধ্বংস আনে। তাই নিঃসন্দেহে মিথ্যা বলা হারাম। ইসলামে মানবজাতিকে সর্বাবস্থায় মিথ্যাচারিতা পরিহার করার জন্য বিশেষভাবে জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে। মিথ্যাচার হচ্ছে অসত্য কথা বলা, অসত্য সংবাদ দেওয়া, অবাস্তব বর্ণনা ও অসত্য তথ্য প্রদান। তার পরেও চলার পথে আমরা অনেক সময় ইচ্ছায় হোক বা অনিচ্ছায়, চাপে পড়ে বা জীবন সংশয়ের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হলে মাঝে মধ্যে মিথ্যা বলি। ইসলামী শরীয়ত কিছু ক্ষেত্রে মিথ্যা বলার এজাজত দিয়েছে। সামাজিক আচরণবিধি সম্পর্কিত মাসয়ালা পাওয়া যায় যে, বিবদমান দু’পক্ষের মধ্যে সমঝোতা ও শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং নির্দোষ ব্যক্তির প্রাণ রক্ষার লক্ষ্যে কখনো অপ্রিয় সত্যটি গোপন করা বা অসত্যকে তুলে ধরার অনুমতি রয়েছে। তাছাড়া কোনো বৈধ বিষয়কে প্রতিষ্ঠিত করতে বা অধিকার সুরক্ষার জন্য দ্ব্যর্থবোধক বা অস্পষ্ট কথা বলার অনুমতি শরিয়তে রয়েছে। আবু দাউদ শরীফের হাদীস নং ৪৯২১ এ হাদীসে দেখা যায় নবী করিম ((সঃ) এরশাদ করেন ৩ ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা জায়েজ। যেমনঃ

১। স্বামী তার স্ত্রীকে খুশি করার জন্য মিথ্যা বলা জায়েজঃ
ওলামায়ে কেরাম এর ব্যাখ্যায় লিখেন যে স্ত্রীরা জিদ্দি হয়ে থাকে, এখন আপনি যদি স্ত্রী কোন কিছু আবদার করে আর আপনি তা না করার এরাদা করেন তখন যদি সাথে সাথে বলে দেন যে আপনি বউ এর সে আবদার পুরন করবেন না তখন বউ হতে পারে ঘরে অশান্তি সৃষ্টি করতে পারে, তাই এ ক্ষেত্রে স্ত্রীকে ঠান্ডা রাখার জন্য আপনি বলে দিলেন ঠিক আছে করে দিব ইনশা আল্লাহ। স্ত্রী যদি বলে আমাকে আকাশের চাঁদটা এনে দাও তখনও আপনি বলতে পারেন ইনশাআল্লাহ আমি যত দ্রুত সম্ভব তোমার জন্য চাঁদ এনে দিব। অথচ এটা পসিবল না তবুও আপনি যেহেতু মজবুর, যদি মুখের উপর না বলে দেন তাহলে অনেক বড় ঝগড়ার কারন হতে পারে, তাই এ থেকে বাঁচার জন্য ইসলামী শরীয়ত এ ক্ষেত্রে মিথ্যা বলার এজাজত দিয়েছে।
২। যুদ্ধ ময়দানে মিথ্যা বলা জায়েজঃ
এর ব্যাখ্যায় ওলামায়ে কেরাম বলেন আপনি যুদ্ধের ময়দানে গ্রেফতার হলেন তখন আপনাকে জিজ্ঞাসা করল তোমরা কতজন সৈন্য? তখন আপনি সেখানে যুদ্ধ কৌশল হিসেবে সংখ্যা বেশী বলতে পারেন, যেমন নবী করিম (সঃ) ঘোষনা দিতেন আগামীকাল সকালে ফজরের নামাজ আদায় করে সৈন্যদের নিয়ে পূর্ব দিকে রওয়ানা দিব কিন্তু দেখা যেত তিনি নামাজ শেষে পশ্চিম দিকে রওয়ানা দিতেন। কারন রাতে নামাজে মুনাফিকরা থাকত তারা শত্রুদের সে খবর দিয়ে দিত তাই রসুলুল্লাহ (দঃ) যুদ্ধ কৌশল হিসেবে এমনটি করতেন।
৩। দুই জন লোকের মাঝে সন্ধি করতে ঝগড়া মিটাতে মিথ্যা বলা জায়েজঃ
যেমন আপনার ২ প্রতিবেশী ঝগড়া করে একে অপরের মুখ পযন্ত দেখে না তখন আপনি একজন প্রতিবেশীকে গিয়ে বললেন যে তুমি ওর সাথে কথা বলনা অথচ দেখলাম সে তোমার খুব প্রসংশা করছে, তুমি যে তার অনেক ভাল প্রতিবেশী সেটা সে স্বিকার করেছে, কিন্তু এখন তুমি যে তার সাথে কথা বলছনা তাতে সে খুবই দুঃখিত। তারপর যখন ২য় প্রতিবেশীর সাথে দেখা হবে তাকেও একইভাবে বুঝালে দেখা যাবে একে অপরের সাথে আবার মিলে যাবে। এভাবে ২ জন লোকের মাঝে ঝগড়া মিটাতে মিথ্যা বলা শরীয়তে জায়েজ। কারণ কথাবার্তা উদ্দেশ্য সফল হওয়ার অন্যতম মাধ্যম।

কোন মিথ্যার আশ্রয় ব্যতিরেকে যদি সৎ উদ্দেশ্য সাধন সম্ভবপর হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া বৈধ নয়। পক্ষান্তরে সে সৎ উদ্দেশ্য যদি মিথ্যা বলা ছাড়া সাধন সম্ভব না হয়, তাহলে সে ক্ষেত্রে মিথ্যা বলা বৈধ। পরন্তু যদি বাঞ্ছিত লক্ষ্য বৈধ পর্যায়ের হয়, তাহলে মিথ্যা বলা বৈধ হবে। আর যদি অভীষ্ট লক্ষ্য ওয়াজেবের পর্যায়ভুক্ত হয়, তাহলে তা অর্জনের জন্য মিথ্যা বলাও ওয়াজেব হবে। যেমন কোন মুসলিম এমন অত্যাচারী থেকে আত্মগোপন করেছে, যে তাকে হত্যা করতে চায় অথবা তার মাল-ধন ছিনিয়ে নিতে চায় এবং সে তা লুকিয়ে রেখেছে। এখন যদি কেউ তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হয় (যে তার ঠিকানা জানে), তাহলে সে ক্ষেত্রে তাকে গোপন ও নিরাপদ রাখার জন্য তার পক্ষে মিথ্যা বলা ওয়াজেব। অনুরূপভাবে যদি কারো নিকট অপরের আমানত থাকে, আর কোন জালেম যদি তা বলপূর্বক ছিনিয়ে নিতে চায়, তাহলে তা গোপন করার জন্য মিথ্যা বলা ওয়াজেব। অবশ্য এ সমস্ত বিষয়ে সরাসরি স্পষ্টাক্ষরে মিথ্যা না বলে ‘তাওরিয়াহ’ করার পদ্ধতি অবলম্বন করাই উত্তম। ‘তাওরিয়াহ’ হল এমন বাক্য ব্যবহার করা, যার অর্থ ও উদ্দেশ্য শুদ্ধ তথা তাতে সে মিথ্যাবাদী নয়; যদিও বাহ্যিক শব্দার্থে এবং সম্বোধিত ব্যক্তির বুঝ মতে সে মিথ্যাবাদী হয়। পক্ষান্তরে যদি উক্ত পরিস্থিতিতে ‘তাওরিয়াহ’ পরিহার করে প্রকাশ্যভাবে মিথ্যা বলা হয়, তবুও তা হারাম নয়। উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছেন যে, ‘‘লোকের মধ্যে সন্ধি স্থাপনকারী মিথ্যাবাদী নয়। সে হয় ভাল কথা পৌঁছায়, না হয় ভাল কথা বলে।’’ (বুখারী ও মুসলিম)

তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে মিথ্যা বলাটা সহজ হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে মোবাইল কল বা মেসেজে। ঘরে অবস্থান করে বলে বাইরে। বাইরে কোথাও ঘুরতে গিয়ে বলা হয় অফিসে বা কর্মস্থলে। ধর্ম-কর্মে মিথ্যার মাধ্যমে ধোঁকাবাজি প্রতিনিয়ত চলছেই। মিথ্যা এতটাই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে যে, এটা কিছু লোকের অবিচ্ছেদ্য স্বভাবে পরিণত হয়েছে। আমরা মিথ্যার এত কাছাকাছি বাস করছি, এটা পাপ বা সর্বজনস্বীকৃত ঘৃণ্য কাজ হওয়া সত্ত্বেও তার প্রতি একটুও বিরক্তি সৃষ্টি হচ্ছে না। মিথ্যা একাল-ওকাল দুটোই ধ্বংস করে।
আমার আজকের লেখাটি মিথ্যার স্বপক্ষে নয় বা মিথ্যা প্রতিষ্ঠা করা নয়। কারণ মিথ্যাকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেই কেবল ঘৃণা করা হয় না বরং সব বর্ণের-ধর্মের মানুষ মিথ্যাকে ঘৃণা করে। যারা কোনো ধর্ম মানে না, তারাও মিথ্যাকে ঘৃণা করে। যারা অনর্গল মিথ্যা বলে, তারাও মিথ্যাকে ঘৃণা করে। মিথ্যাবাদীও চায়, অন্যেরা তার সঙ্গে সত্য কথা বলুক। মিথ্যাবাদীকে আল্লাহ প্রচণ্ড ঘৃণা করেন। আল কোরআন ও হাদিসে মিথ্যুক এবং মিথ্যাবাদীর ভয়ানক পরিণতির কথা বলা হয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই তার অনুসরণ কর না।’ (সূরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ৩৬)। রাসূল (সা.) বলেন, ‘মানুষ যখন মিথ্যা কথা বলে, তখন মিথ্যার দুর্গন্ধে ফেরেশতারা মিথ্যাবাদী থেকে এক মাইল দূরে চলে যায়।’ (তিরমিজি : ১৯৭২)

আমার আজকের লেখার শিরোনামে বলা হয়েছে আপনি মিথ্যা বলছেনঃ বাক্যটি অশোভন। হ্যাঁ কাউকে সরাসরি এ কথা বলার মানে তাকে মিথ্যাবাদীতে রূপান্তর করা। যা ইসলাম সমর্থন করেনা। হয়তোবা সে অজ্ঞতা বশতঃ কোন কথা বলেছেন যা সত্য নয়। তাই তাকে সরাসরি অভিযুক্ত করে মিথ্যাবাদী বলা অনুচিত। ইসলামে কাউকে রুঢ় কথা বলে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। হাদীস শরীফে বর্ণিতঃ যার হাত ও মুখ থেকে অন্যরা নিরাপদ সে-ই প্রকৃত মুসলিম। (দরসে হাদীস) আমের (রহঃ) আবদুল্লাহ ইবনু আমর (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলতেন, নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ মুসলমান (প্রকৃত) সেই ব্যাক্তি, যার জবান ও হাত থেকে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে। আর মুহাজির (প্রকৃত) সে, আল্লাহ যা নিষেধ করেছেন তা পরিত্যাগ করে। সুতরাং কাউকে সরাসরি মিথ্যাবাদী না বলে আপনি অসত্য বলা অধিকতর শোভন। হাদিসে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলমান সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে। ’ ( তিরমিজি, হাদিস নং: ২৬২৭; আবু দাউদ, হাদিস নং: ২৪৮১) তাই অপর মুসলমান কষ্ট পেতে পারে এমন কাজ করা কোনো মুসলমানের জন্য শোভা পায় না। কখনো অজান্তে কাউকে কষ্ট দিয়ে ফেললে, বোঝার সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে মাফ চেয়ে নেয়া উত্তম চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। তেমনিভাবে কারো কাছ থেকে কোনো জুলুমের শিকার হলেও তাকে ক্ষমা করে দেয়াই মহৎ চরিত্রের পরিচায়ক। হাদিসে এসেছে, ‘রাসুল (সা.) বলেছেন, যে তোমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, তুমি তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করো, যে তোমাকে বঞ্চিত করে, তুমি তাকে তুষ্ট করো, যে তোমার প্রতি জুলুম করে, তুমি তার সঙ্গে উত্তম ব্যবহার (ক্ষমা) করো। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ১৭৩৩৪) আল্লাহ আমাদের সকল অবস্থায় অশোভন, রুঢ় বাক্যপরিহার করার তাওফিক দিন। আমিন।
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১ রাত ৯:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


