
কুসংস্কার বা ভ্রান্ত ধারনা এমন কাজ, কথা ও প্রথা মানা যার কোনো বাস্তব ও ধর্মীয় ভিত্তি নেই। মানুষের তৈরি যুক্তিহীন এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস, কথা, কাজ ও প্রথাকে সহজ বাংলায় কুসংস্কার বলা হয়। এসব কুসংস্কারে কারণে অনেকের জীবন হুমকির সম্মুখীন হয়। আবার কোথাও কুসংস্কারের কবলে জীবনহানীর ঘটনাও ঘটে। কিছু কিছু কুসংস্কার তো শিরকের পর্যায়ভূক্ত। আবার কিছু বিষয় সাধারণ বিবেক বিরোধী এবং রীতিমত হাস্যকর। মূলতঃ বাজারে ‘কি করলে কি হয়’ জাতীয় বই এসবের সরবরাহকারী। কিছু মানুষ চরম অন্ধবিশ্বাসে এগুলোকে লালন করে। যেমন কোথাও বেরনোর সময় পিছন ডাকলে বিপদের আশঙ্কা থাকে, বা কালো বেড়াল আপনার সামনে দিয়ে রাস্তা পার হলে একটু দাঁড়িয়ে যেতে হয়। বাড়ির মুরব্বিদের মুখ থেকে এই ধরনের কুসংস্কারের অনেক কথাই তো আমরা শুনেছি। যার কোনো কোনোটির পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। শুধু আমাদের দেশ নয়, এমন হাজার কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে। উন্নত দেশ হোক বা অশিক্ষার অন্ধকারে ডুবে থাকা গরীব জনপ্রান্তর - কুসংস্কারের খোঁজ একটুও মিলবে না, এমন জায়গা খুঁজে পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার আমাদের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সমাজজীবনের রন্ধ্রে প্রতি পরম নির্ভরতা বা তাওয়াক্কুল বহুলাংশে লোপ পায়। একজন মুসলিমের জীবনের সব ধরনের সমস্যার সমাধান ও দিক-নির্দেশনা রন্ধ্রে কুসংস্কার সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়েছে। অথচ এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকি। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা।ইসলামে কুসংস্কারের কোনো স্থান নেই। এই কুসংস্কারের জন্যই আল্লাহর ওপর আস্থা ও ধর্মবিশ্বাস এবং আল্লাহর ইসলাম প্রদান করেছে। অধিকাংশ মুসলিমরা সাধারণত ইসলামরে দিক-নির্দেশনাই মেনে চলেন বা চলার চেষ্ঠা করেন। কিন্তু ইসলামের বিধান মান্য করার পাশাপাশি মুসলিম সমাজে বেশ কিছু কুসংস্কারও প্রচলিত রয়েছে। অনেক মুসলিম কুসংস্কারগুলোকে ভালো মনে করেই পালন করেন। এর মাঝে কিছু কুংস্কার এমন রয়েছে যার মাধ্যমে প্রভুর সাথে শিরকও হয়ে যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। হজরত রাসূলুল্লাহর (সাঃ) এর আগমনপূর্ব সময়কে কোরআনে কারিমে ‘আইয়্যামে জাহিলিয়াত’ বা অজ্ঞতা, ববর্রতা ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন যুগ বলা হয়েছে। কারণ, তৎকালীন আরব সমাজ ছিল নানা কুসংস্কারের ঘোর অন্ধকারে নিমজ্জিত। এ ধরনের কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজকে পরিশুদ্ধ করতে আল্লাহতায়ালা হজরত রাসূলুল্লাহকে (সাঃ) পাঠিয়ে ঘোষণা দেন যে, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি স্বীয় রাসূলকে সঠিক পথ ও সঠিক তথা সত্য ধর্মসহ পাঠিয়েছেন, যাতে আর সব মতবাদের ওপর এ ধর্ম তথা মতবাদ বিজয়ী হতে পারে।’ -সূরা আত তাওবা : ৩৩ বাংলাদেশের গ্রাম-গঞ্জের মানুষগুলো অনেক বেশি সহজ-সলর। তারা নিজের অজানতেই অনেক কিছু-কেই ইসলামের বিধান হিসেবে মনে করে। সমাজের বিভিন্ন কিছুকে তারা কুলক্ষণ-সুলক্ষণ বলে ধারণা করে। আসলে কুলক্ষণ-সুলক্ষণ বলতে ইসলামে কিছু নেই! মুসলিম সমাজে প্রচলিত তেমনই কিছু কুসংস্কার যা ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকিঃ

আমাদের সমাজের মানুষের মাঝে বিভিন্ন প্রকার কুসংস্কার ছড়িয়ে আছে। এই সকল বিষয়কে বিশ্বাস করা হচ্ছে শিরক। সমাজে ছড়িয়ে থাকা ১৩ টি কুসংস্কারের কথা তুলে ধারা হলোঃ
১। গর্ভবতী নারীর সাথে ‘দিয়াশলাই, রসুন, লোহার টুকরা ইত্যাদি’ রাখা: এক জঘন্য কুসংস্কার!
২। “গোলাপে এতো সুগন্ধ হওয়ার কারণ হল, তাতে নবীজির এক ফোটা ঘাম মোবারক পড়েছিল।” এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
৩। ২১ বার বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পড়ে ঘুমালে নাকি প্রতি নিশ্বাসে নেকি লিখা হয়। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার।
৪। মাকড়সা মারা ও তার জাল ভাঙ্গার বিধান এবং এ সংক্রান্ত একটি কুসংস্কার।
৫। যে বাড়িতে অন্তঃসত্ত্বা নারী আছে সে বাড়িতে কুরবানি দেয়া যাবে না। একটি কুসংস্কার।
৬। “ঘরে মাকড়সার জাল থাকলে অভাব অনটন দেখা দেয়।”একটি কুসংস্কার।
৭। ওজু ছাড়া আজান দেয়ার বিধান এবং ওজু ছাড়া আজান দিলে সংসারে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার।
৮। ভাঙ্গা পাত্রে খাবার খেলে আয়ু কমে যায়। সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার
৯। গর্ভবতী মহিলার ঘরে সুন্দর সুন্দর বাচ্চাদের ছবি রাখলে বাচ্চা ছবির মত সুন্দর হবে’ বলে ধারণা করা হয়। এটিও কুসংস্কার।
১০। ওযু শেষে আসমানের দিকে তাকিয়ে তর্জনী অঙ্গুলি দ্বারা ইশারা করে কালিমা শাহাদাত পড়া হাদিস সম্মত নয় বরং সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
১১। ‘ওজু ছাড়া আজান দিলে সংসারে দুর্ভিক্ষ নেমে আসে’ এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার।
১২। মুহররম মাসে বিয়ে-শাদী নিষিদ্ধ এ মর্মে যে সব কথা প্রচলিত রয়েছে সবই ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার।
১৩। ফাতেমা রা. কে মা বলে সম্মোধন করা। কুরআনে আল্লাহ তাআলা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর স্ত্রীদেরকে মুমিনদের ‘মা’ হিসেবে সম্বোধন করেছেন-যাদেরকে বলা হয় ‘উম্মাহাতুল মুমিনীন’। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তাঁর স্ত্রীগণ তাদের (মুমিনদের) মা।” (সূরা আহযাব: ৬) সুতরাং যারা আমাদের মা তাদের কন্যাদেরকেও মা বলা হলে তা হারামের পর্যায়ে যাবে।

ঠিক এভাবে আমাদের সমাজে গ্রাম গঞ্জে অনেক কুসংস্কারে প্রভাব বিস্তার করেছে বেশি করে আমাদের গ্রামের মা-বোনদের মাঝে । আর আমাদের সমাজের মানুষ অনেকটা এইসব বিশ্বাস করে ধর্মের দিক দিয়ে, যেটা ধর্মকে কলুষিত করা ছাড়া আর কিছই নয়। কারন ধর্ম আমরা বিশ্বাস করি মঙ্গল এর কারনে কিন্তু যে বিশ্বাসে শুদু অমঙ্গল নিহিত সেটা ধর্মের অংশ হতে পারে না। আমাদের পবিত্র গ্রন্থ কুরআন কিংবা দয়াল নবীজির কোন বাণী দ্বারা এসব সত্য সাবস্থ্য নয়। মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে সমাজে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য কুসংস্কার থেকে এখানে কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করা হলো। এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস ভীষণপাপ ও ভ্রষ্টতার কারণ। কোরআনে কারিমে এ সম্পর্কে উল্লেখ আছে, ‘পথভ্রষ্ট লোক আল্লাহর রহমত থেকে অনেক দূরে অবস্থান করবে।’ সুন্দর ও মার্জিত বিষয়াদীই ইসলামে অনুমোদিত। অন্যদিকে অসত্য, অসুন্দর ও যাবতীয় কদর্যতা ইসলামে নিষিদ্ধ। মানুষের জীবনকে সুন্দর ও শৃঙ্খলাময় করার জন্য যত রকমের সহজ-সরল দিকনির্দেশনা ও পথ রয়েছে- তার সব ইসলামে বিদ্যমান। এ কারণেই ইসলামকে মধ্যপন্থীদের ধর্ম বলা হয়। মানবতার বিরুদ্ধে যাবতীয় নিষ্ঠুরতা, অসহিষ্ণুতা ও ববর্রতার বিরুদ্ধে ইসলামই একমাত্র রক্ষাকবচ। তাই আমাদের সব ধরপ্রনের কুসংস্কারের ঊর্ধ্বে উঠে জীবন পরিচালনা করতে হবে। আমাদের সমাজ থেকে যাবতীয় কুসংস্কার সম্পর্কে মানুষকে সচেতন ও সজাগ করতে আলেম-উলামা, মসজিদের ইমাম-খতিব, শিক্ষক, সাংবাদিক ও সমাজ উন্নয়ন কর্মীদের এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে ধর্ম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা দিতে হবে। দেশ ও জাতির বৃহৎ স্বার্থে এমন অলিক ও ধরাণাপ্রসূত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের পরিবর্তন অতীব জরুরি।
সূত্রঃ ইসলামী প্রশ্নোত্তর-ক্যাটাগরিঃ প্রচলিত ভুল ও কুসংস্কার
নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২১ সকাল ১১:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


