
শিল্পকলায় সৃষ্ট বস্তুই শিল্পকর্ম। মানুষের মনের সৃজনশীল কর্মকান্ডের সামগ্রিক রূপ হচ্ছে শিল্পকলা। যে ব্যক্তি শিল্পকলার চর্চা করে শিল্পকর্ম সৃষ্টি করেন তিনি শিল্পী। শিল্পী তাঁর কল্পনা ও প্রতিভার সাথে দক্ষতা ও রুচির সমন্বয়ে শিল্প সৃষ্টি করেন। শিল্পী তাঁর সৃষ্টির আনন্দ থেকে শিল্প সৃষ্টি করেন বলে কোনো বাঁধাধরা নিয়মের অধীনে শিল্পকে ফেলা যায় না। সৃষ্টির আনন্দে মনের তাগিদ থেকেই তার উৎপত্তি। শিল্পীর কাজ হচ্ছে শিল্পকলার মাধ্যমে আমাদের অন্তর্দৃষ্টিকে সম্প্রসারিত করা, আমাদের কল্পনার পরিধি বাড়িয়ে তোলা। শিল্পকলার উদ্ভব হয়েছে আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে সেই আদিম মানুষের হাত ধরে। মানুষের সৃষ্টি সমস্ত শ্রেষ্ঠ শিল্পই চারুশিল্পের অন্তর্গত। বিখ্যাত শিল্পীদের আঁকা ছবি ও ভাষ্কর্যের জন্য সংগ্রাহকরা বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে থাকেন। আজ তেমনই কয়েকটি শিল্পকর্ম নিয়ে আলোকপাত করা হলোা যা অর্থমূল্যের হিসেবে বিশ্বে এ যাবৎকালে বিক্রি হওয়া শিল্পকর্মের মধ্যে সর্বোচ্চ।

১। সালভাদর মুন্ডিঃ
লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা ২০টি অক্ষত ছবির একটি এটি৷ ধারণা করা হয়, ১৫০০ সালে এ ছবিটি আঁকা হয়৷ ১৯৫৮ সালে ছবিটিকে অনুলিপি ভেবে নিলামে মাত্র ৬০ মার্কিন ডলারে এটি বিক্রি হয়৷ যিশুখ্রিষ্টের এ ছবিটি ২০১৭ সালে ১০ কোটি মার্কিন ডলারে বিক্রি হবে ধারণা করা হলেও অজ্ঞাত এক ক্রেতা ৪৫ কোটি ডলার দিয়ে কেনেন এটি৷ কিংবদন্তি শিল্পী লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা বলে খ্যাত এ চিত্রকর্মটি রেকর্ড ৪৫ কোটি ডলারে বিক্রি হওয়ার পর থেকে কোথায় আছে, তা এমনকী শিল্প সংস্কৃতির জগতেও রহস্যাবৃত ছিল। তবে বিশ্বের সবচেয়ে দামি চিত্রকর্ম ‘সালভাতর মুন্ডি’ সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানের একটি বিলাসবহুল ইয়টে শোভা পাচ্ছে বলে লন্ডনভিত্তিক এক আর্ট ডিলার দাবি করেছেন।

২। ইন্টারচেঞ্জঃ
ডাচ-অ্যামেরিকান শিল্পী উইলেম ডে কুনিং-এর আঁকা ইন্টারচেঞ্জ নামে একটি তৈলচিত্র ২০১৫ সালে ৩০ কোটি ডলারে বিক্রি হয়৷

৩। তাস খেলায় মগ্নঃ
উত্তর অভিব্যাক্তিবাদ ঘরানার ফরাসি শিল্পী পল সেজানের আঁকা এ ছবিটির নাম ‘দ্যা কার্ড প্লেয়ার’৷ ২০১১ সালে ২৫ কোটি ডলারে ছবিটি বিক্রি হয়৷

৪। ‘যখন তুমি বিয়ে করবে’ ‘হোয়েন উইল ইউ মেরি’ শিরোনামের ফ্রান্সের শিল্পী পল গগাঁরএ ছবিটি আঁকা হয়েছিল ১৮৯২ সালে ৷ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পল গঁগ্যাকে চিত্রশিল্পী হিসেবে কেউ সেভাবে মূল্যায়ন করেনি। কিন্তু ১৯০৩ সালে ফরাসি ‘পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট’ এই শিল্পীর মৃত্যুর পরই তাঁর কদর বেড়ে যায়। ১৮৯২ সালে অমর তৈলচিত্র ‘নাফেয়া ফা ইপোইপো’ (হোয়েন উইল ইউ ম্যারি) ছবিটি আঁকেন গঁগ্যা। এ ছবিতে তিনি তাহিতি দ্বীপের দুই নারীর প্রতিমূর্তি অঙ্কন করেন। ১৮৯১ সালে প্রথমবারের মতো তাহিতি দ্বীপে গিয়ে এই ছবির রসদ জোগাড় করেছিলেন গঁগ্যা। ২০১৪ সালে সুইস ব্যবসায়ী রুডলফ স্টায়েচলিনের কাছ থেকে নিলামে ২১ কোটি ২০ লাখ ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৭৫৭ কোটি টাকার বেশি)

৫। ‘নাম্বার ১৭এ’
বিমূর্ত ছবির জগতে অ্যামেরিকান শিল্পী জ্যাকসন পোলক বেশ সমীহ জাগানিয়া নাম। মাত্র ৪৪ বছরে সড়ক দুর্ঘটনায় পৃথিবীর মায়া কাটানো এই চিত্রশিল্পী ১৯৪৮ সালে ‘নাম্বার ১৭এ’ ছবিটি এঁকেছিলেন। কাঠের তন্তুর ওপর আঁকা এই তৈলচিত্রটি ২০১৫ সালে ২০ কোটি ২০ লাখ ডলারে (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৬৭৪ কোটি টাকার বেশি) কিনে নেন বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘সিটাডেল’-এর প্রতিষ্ঠাতা কেনেথ সি গ্রিফিন। পল গঁগ্যার আঁকা তাহিতির নারীরা ইতিহাস গড়ার আগ পর্যন্ত জ্যাকসনের এ ছবিটিই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে দামি চিত্রকর্ম।

৬। ‘বিয়ের ছবি’
নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত মার্টেন ও ওপইয়েন এর ১৬৩৪ সালের অনুষ্ঠিত বিয়ের ছবি এটি৷ চিত্রকর ডাচ শিল্পী রেমব্রান্ট হারমেনসুন ফান রিন৷ ২০১৫ সালে বিক্রি হওয়া এ ছবিটির দাম পড়েছে ১৮ কোটি ডলার৷

৭। আলজিয়ার্সের মহিলারাঃ
লেডি অব আলজিয়ার্স শিরোনামে ছবিটি স্পেনের জগদ্বিখ্যাত চিত্রকর পাবলো পিকাসোর ১৯৫৫ সালে আঁকা৷ নিলামে ছবিটির দাম উঠে ১৭ কোটি ৯৪ লাখ ডলারে৷

৮। ‘ন্যু কুশে’
ইটালির চিত্রকর আমেদেও মোদিগলিয়ানি এই ছবিটি আঁকেন ১৯১৭ সালে, তার মৃত্যুর তিন বছর আগে৷ ২০১৫ সালে ১৭ কোটি চার লাখ ডলারে বিক্রি হয় ছবিটি৷

৯। ‘মাস্টারপিস’
অ্যামেরিকান পপ আর্টিস্ট রয় লিচটেনস্টাইনের ১৯৬২ সালে একেছিলেন বিখ্যাত এ ছবিটি৷ ২০১৭ সালে ১৬ কোটি ৫০ লাখ ডলারে ছবিটি বিক্রি হয়৷

১০। লুসিয়ান ফ্রয়েডের তিনটি প্রতিকৃতিঃ
আইরিশ চিত্রকর ফ্রান্সিস বেকন এই তিন খণ্ডের ছবিটি আঁকেন ১৯৬৯ সালে৷ ছবিতে যার আলেখ্য, তিনি হলেন ব্রিটিশ চিত্রকর লুসিয়ান ফ্রয়েড, পক্ষান্তরে মনস্তত্বের জনক সিগমুন্ড ফ্রয়েডের পৌত্র৷ ২০১৩ সালে ক্রিস্টি’স-এর নিলামে ছবিটির দাম ওঠে ১৪ কোটি ২৪ লাখ মার্কিন ডলার৷ রয়েছে মার্কিন শিল্পকলা সংগ্রাহক এলেইন ওয়াইনের সংগ্রহে৷

১১। অঙ্গুলিনির্দেশঃ
সুইস ভাস্কর আলবের্তো জাকোমেত্তির সৃষ্টি এই মানুষ-সমান ব্রোঞ্জ মূর্তিটি নিউ ইয়র্কে ক্রিস্টি’স-এ নিলাম করা হয় ২০১৫ সালে, কেনেন স্টিভ কোহেন নামের এক হেজফান্ড ম্যানেজার৷ মূর্তিটি আজ বিশ্বের সবচেয়ে দামি ক্রয়যোগ্য ভাস্কর্য বলে গণ্য৷ এটি বিক্রি হয়েছেল ১৪ কোটি ১৩ লাখ মার্কিন ডলারে৷

১২। সোনার আডেলেঃ
অস্ট্রিয়ার চিত্রকর গুস্তাফ ক্লিম্ট আডেলে ব্লখ-বাউয়ারের এই প্রতিকৃতিটি আঁকেন ১৯০৭ সালে৷ ম্যানহ্যাটানের ‘নয়ে গ্যালেরি’ নামের সংগ্রহশালার জন্য ২০০৬ সালে ছবিটি কেনেন মার্কিন ব্যবসায়ী রোনাল্ড লডার৷ ছবিটি ১৩ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলারে কেনার ব্যবস্থা করে ক্রিস্টি’স সংস্থা৷

১৩। চিৎকারঃ
নরওয়েজীয় চিত্রকর এডভার্ড মুঞ্চ ‘চিৎকার’ ছবিটি এঁকেছেন একাধিক বার ৷ দা ভিঞ্চির মোনালিসা ও ফান গখ-এর সূর্যমুখি ফুলের পরেই মুঞ্চের এই ছবিটিকে বিশ্বের খ্যাততম চিত্রকর্ম বলে গণ্য করা হয়৷ ছবিটির প্যাস্টেল রঙে আঁকা এই সংস্করণ নিলাম করা হয় ২০১২ সালে, নিউ ইয়র্কের সথেবি সংস্থায়৷ মার্কিন শিল্পপতি লিয়ন ব্ল্যাক ১১ কোটি ৯৯ লাখ মার্কিন ডলারে কিনেন এটি৷

১৪। নগ্নমূর্তি, সবুজ পাতা, আবক্ষঃ
পাবলো পিকাসো এই তেলরঙের ছবিটি এঁকেছিলেন মাত্র একদিনে – দিনটা ছিল ৮ই মার্চ, ১৯৩২৷ প্রায় অজ্ঞাত ছবিটি নিউ ইয়র্কের নিলামে বিক্রি হয় ১০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যে, কেনেন এক অজ্ঞাত ক্রেতা৷ ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকলেও, ছবিটি লন্ডনের টেট মডার্ন গ্যালারিকে ধার দেওয়া হয়েছে ২০১১ সালে৷

১৫। রুপোলি গাড়ি দুর্ঘটনাঃ
মার্কিন চিত্রকর অ্যান্ডি ওয়ারহল ১৯৬৩ সালে এই সিল্ক স্ক্রিন প্রিন্টটি সৃষ্টি করেন – যার বিষয়বস্তু হল একটি গাড়ি দুর্ঘটনা৷ ২০ বছর ধরে ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকার পর ২০১৩ সালে সথেবি-তে ছবিটি নিলাম করা হয়৷ ক্রেতা অজ্ঞাতই থাকেন; তবে ছবিটি পপ আর্ট শিল্পী ওয়ারহলের সবচেয়ে দামী ছবি বলে গণ্য করা হয়৷
সূত্রঃ আইডিয়েল নিউজ২৪
সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জুন, ২০২১ বিকাল ৩:১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




