
ভারতের চেন্নাই থেকে ১৫০ কিলোমিটার দূরে তামিলনাডূর ভিল্লুপুরম জেলায় অবস্থিত একটি পরীক্ষামূলক শহর অরোভিল। তামিলনাড়ুর ভিলাপুরম জেলা ও পুদুচেরির কিছু এলাকা নিয়ে এই শহর। 'Auroville’ নামটির অর্থ ফরাসী 'Aurore' যার অর্থ ভোর কিংবা সকাল এবং 'Ville' যার অর্থ শহর। পুরো অর্থ দাড় করালে হয় 'ভোরের শহর'। এই শহরে বিশিষ্ট দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী অরবিন্দু ঘোষের নাম জড়িয়ে আছে। শ্রী অরবিন্দু ভারতের প্রখ্যাত একজন বাঙালী রাজনৈতিক নেতা, সাধক এবং দার্শনিক। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। অরবিন্দু ছিলেন আলিপুর ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান আসামি। একসময় রাজনৈতিক কারণে জেলে বন্দী থাকা কালীন আধ্যাত্মিক চর্চা শুরু করেন। তিনি ব্রিটিশ ইন্ডিয়া থেকে পালিয়ে ফরাসিদের অধীনে থাকা পন্ডিচেরী চলে আসেন। বাকি জীবন পন্ডিচেরীতে কাটান। ১৯২৬ সালের ২৪ নভেম্বর তিনি শ্রী অরবিন্দ আশ্রম গড়ে তোলেন। সে সময় তাঁর সহকারী ছিলেন মীরা আলফাসা (যিনি পন্ডিচেরী অরবিন্দ আশ্রমে শ্রীমা নামে পরিচিত)। মাস খানেক পরেই শ্রী অরবিন্দ সহকর্মী মীরা আলফানসার হাতে আশ্রমের দায়িত্ব তুলে দিয়ে অন্তরালে চলে যান। ব্যতিক্রমী এই শহরের পত্তনের পেছনে মূল আদর্শ ছিলো দেশ শহর, জাতীয়তা, রাজনীতি, বর্ণের বেদাবেধ ভুলে নারী পুরুষের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার এক শান্তির ও প্রগতির চর্চা এবং উদ্ভাবন। মূলত শ্রী অরবিন্দুই ছিলেন এই দার্শনিক চিন্তার স্বপ্নদ্রষ্টা, যার উপর ভিত্ত করে এই শহর গড়ে উঠে। অধিকন্তু অরোভিল শহরের নামকরণ করা হয় ঋষি অরবিন্দুর নাম অনুসারে। এই শহর যে আদর্শ এবং ভাবধারার উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে তাঁর পেছনে রয়েছে শ্রী অরবিন্দু এর নাম।

১৯৬৫ সালে মীরা আলফাসা এই শহরের বিষয়ে বিবৃতি প্রদান করেন। এর ২ বছর পর ১৯৬৮ সালে ইউনেস্কোর সহযোগিতায় শ্রী অরবিন্দ সোসাইটির 'মা' মীরা আলফানসা ইউনেস্কোর সহযোগিতায় ১২৪ টি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি এবং ভারতের ২৩ টি রাজ্যের যুবক যুবতিদের উপস্থিতিতে শহরের কেন্দ্রে একটি বটগাছের নিচে শহরটির উদ্বোধন করেন। উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আগত ব্যক্তিরা প্রত্যেকে তাঁদের নিজ জন্মভূমির এক মুঠো মাটি এনে একটি পদ্ম আকৃতির পাত্রে রাখে। পাত্রটি শ্বেত পাথরের তৈরি। এই পাত্রটি এখানকার অ্যাম্ফিথিয়েটারে এখনও সংরক্ষিত আছে। রজার অ্যাঙ্গার নামের এক ব্রিটিশ আর্কিটেক্ট এই শহরের পরিকল্পনা করেছিলেন। সুযোগ-সুবিধার বিচারে পৃথিবীর বহু বড়ো শহরকেই টেক্কা দিতে পারে অরোভিল। ব্রহ্মাণ্ডের গঠনকে মাথায় রেখে সেই ধাঁচে এই শহরকে গড়ে তোলেন অ্যাঙ্গার, এবং শহরের মাঝখানে স্থাপন করেন একটি মাতৃমন্দির। বর্তমানে এই মাতৃমন্দিরে শহরের মানুষজন সমবেত হন ধ্যান করার জন্য। এখানে তামিল বাঙালি এবং ফরাসি ভাষা ভাষী লোক দেখতে পাবেন। ইংরেজিও বহুল প্রচলিত। এখানে নেই কোন যান্ত্রিক কোলাহল, অর্থের পেছনে রোজ ছুটে চলা চার চাকার বাস, চুরি, ছিনতাই কিংবা টাকা পয়সার ঝংকার! নোটবাতিল ঘোষণার পর ভারত সরকার যখন জোর দিচ্ছে ক্যাশলেস ইকনমির উপর তখন সে দেশের অরোভিলে কার্যত নগদ টাকার কোন মূল্যই নেই। কারণ ব্যাপকতর অর্থে, এই শহরে টাকাপয়সা ব্যবহারই হয় না। অরোভিলের সবচেয়ে ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য হয়েছে এখানে কাগুজে কিংবা ধাতব মুদ্রার অর্থের প্রচলন একেবারেই নেই। এই শহরের রয়েছে নিজস্ব ফাইনান্সিয়াল সার্ভিস সেন্টার(এফএফএস)। কেন্দ্রীয় তহবিলে নাগরিকেরা নিজেদের অর্থ, সেবা কিংবা পরিশ্রমের বিনিময়ে অর্থের যোগান করে। এবং প্রত্যেক নাগরিককে প্রদান কৃত নির্দিষ্ট অরো কার্ডের মাধ্যমে তারা কেনাকাটা করে থাকে। যেকোনো ধরণের লেনদেনই এখানে কার্ডের মাধ্যমে হয়ে থাকে। এবং পর্যটকদেরও এখানে অস্থায়ী অরো কার্ড সংগ্রহ করতে হয়। দেশের মধ্যেই এক অভিনব ও বিকল্প অর্থব্যবস্থা চালিয়ে দিব্যি রয়েছে অরোভিল।

অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি বাহিরের, সরকার কর্তৃক, পর্যটক এবং নাগরির নির্দিষ্ট মাসিক অনুদান। এছাড়াও এখানে পর্যটন শিল্প, নির্মাণ শিল্প, তথ্য প্রযুক্তি সহ ক্ষুদ্র মাঝারি কুটির শিল্পের ব্যবসা ও রয়েছে। সোলার প্যানেলের মাধ্যমে নিজস্ব বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও গড়ে তোলা হয়েছে এখানে। বর্তমানে প্রায় ৩০০০ সদস্যের এই শহরে আধুনিক সকল সুযোগ সুবিধা, হাসপাতাল, স্কুল , বিশ্ববিদ্যালয় সব কিছুই রয়েছে। মোট নাগরিকদের সিংহ ভাগই ভারতের নাগরিক, তারপর যথাক্রমে ফরাসি, জার্মানি ইটালিয়ান অধিবাসীদের আধিক্য রয়েছে এখানে। মোট ৫৪ টি দেশের অধিবাসী রয়েছে এখানে। এঁদের মধ্যে ৩০ শতাংশ ভারতীয়। সম্পূর্ণ নিজস্ব নিয়মনীতিতে চলা অরোভিলের প্রশাসনিক কাঠামো তিন স্তর বিশিষ্ট। সরকারের সরাসরি হস্তক্ষেপ এখানে না থাকলেও ভারত সরকারের অনুমোদিত গভর্নিং বডি এর সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কাঠামোর কেন্দ্রে রয়েছে। ভারতের বিশিষ্ট নাগরিকদের দ্বারাই এই গভর্নিং বডি গঠিত হয়। এছাড়াও স্থানীয় নাগরিক এবং অরোভিল ফাউন্ডেশন রয়েছে এর দেখাশুনার জন্য। শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি অপরাধ প্রবণতা কমাতে এখানে এমনকি এলকোহল পর্যন্ত নিষিদ্ধ। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পর্যটকের আগমন ঘটে এখানে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অরোভিলে ঘুরতে আসা পর্যটকরা নামমাত্র মূল্যে এখানে থাকা-খাওয়ার সুযোগ পান। এখানে আগত অতিথি ও স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে তুলে দেওয়া হয় একটি বিশেষ 'অরো কার্ড', অরোভিলের চৌহদ্দিতে যে কার্ড আদপে ডেবিট কার্ডের সমতুল। এই কার্ডের মাধ্যমেই অরোভিলে যাবতীয় কেনাকাটা করতে পারেন মানুষজন। আধুনিক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় পরিষেবা মজুত রয়েছে অরোভিলে। রাতের মাতৃ মন্দির এবং দিনের প্রাকৃতিক মোহময়তা, আধুনিক জীবনের রঙিন মোড়কের বাহিরে গিয়েও আধুনিক জীবন যাপন এখানে পর্যটক আকর্ষণের অন্যতম কারণ। আগামী দিনে ক্যাশলেস ইকনমির লক্ষ্যে এই শহরই হয়তো হয়ে উঠবে সারা দেশের আদর্শ।
সূত্রঃ Auroville
সম্পাদনাঃ নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
ব্রেকিং নিউজ২৪.কম
[email protected]
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই জুলাই, ২০২১ সকাল ১০:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




