somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আষাঢ়স্য প্রথম কদম ফুল করিনু দান

১৫ ই জুন, ২০২২ বিকাল ৪:১১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জ্যৈষ্ঠ শেষ আষাঢ়ের প্রথম দিন আজ। বৃষ্টি হোক বা না হোক আজ বর্ষা। গ্রীষ্মের রুদ্র দহন ছিন্ন করে আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো প্রিয় ঋতু বর্ষার। আজ বুধবার থেকে শুরু হযেছে আষাঢ় মাস ১৪২৯ বঙ্গাব্দ। কাগজে কলমে বর্ষা ঋতুর চলে আসার দিন। তবে অলিখিতভাবে আরো কয়েক দিন আগে থেকেই বর্ষা কালবৈশাখীকে সঙ্গী করে তার স্বভাবসুলভ তেজের ছটা দেখিয়ে গেছে। প্রকৃতিতে গ্রীষ্মের রুদ্র দহন ছিন্ন করে আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো প্রিয় ঋতু বর্ষার। তৃষিত হৃদয়ে, পুষ্পে-বৃক্ষে, পত্র-পল্লবে নতুন প্রাণের নতুন গানের সুর নিয়ে বর্ষা সমাগত। বর্ষা কবিদের ঋতু। বর্ষা নিয়ে কবিরা লিখেছেন অসংখ্য কবিতা-গল্প-গান। ‘বাদল-দিনের প্রথম কদম ফুল করেছ দান/ আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান” বর্ষা নিয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সেই আবেগময়, প্রেমসিক্ত গান যেন সে কথাই বলে। শুধু রবীন্দ্রনাথই নন, বাংলা সাহিত্যের খ্যাত-অখ্যাত বহু কবিই বর্ষার রূপ-ঐশ্বর্যে মোহিত ও মুগ্ধ, বর্ষার আবাহনে উচ্ছ্বসিত ও মুখর। প্রকৃতির কবি জীবনানন্দ দাশ আষাঢ়কে বলেছেন, 'ধ্যানমগ্ন বাউল-সুখের বাঁশি'। প্রকৃতি পরিবেশের পাশাপাশি মানুষের হৃদয়েও নানাভাবে ক্রিয়া করে বর্ষা। মন মেঘের সঙ্গী হতে চায়। কবিগুরুর ভাষায়: মন মোর মেঘের সঙ্গী,/উড়ে চলে দিগ্দিগন্তের পানে/নিঃসীম শূন্যে শ্রাবণবর্ষণ সঙ্গীতে/রিমিঝিম রিমিঝিম রিমিঝিম...। বর্ষায় মন কখনো ‘ময়ূরের মতো নাচে রে।’ আবার কখনো বেদনায় বেদনায় ডুবায়। তুমি যদি না দেখা দাও, কর আমায় হেলা,/কেমন করে কাটে আমার এমন বাদল-বেলা...। প্রিয়জন ছাড়া যেন কাটতে চায় না দিন। কারও কারও বুকে বাজে হারানোর ব্যথা। বর্ষায় সে যন্ত্রণার কথা কথা জানিয়ে কবি লিখেন: চেনা দিনের কথা ভেজা সুবাসে,/অতীত স্মৃতি হয়ে ফিরে ফিরে আসে।/এমনি ছলছল ভরা সে-বাদরে/তোমারে পাওয়া মোর হয়েছিল সারা...। আরও বহুকাল আগে রিক্ত বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতি লিখেছিলেন: এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর।/এ ভরা ভাদর/মাহ ভাদর/শূন্য৬ মন্দির মোর...। এখানেই শেষ নয়, মহাকবি কালিদাস দেশান্তরিত যক্ষকে বর্ষাকালেই বিরহে ফেলেছিলেন। এসব বিবেচনায় বিরহের ঋতু বটে বর্ষা। বাদল দিনে বিরহকাতর হয়ে ওঠা বাঙালী মনের ব্যবচ্ছেদ করতে গিয়ে সমকালীন কবি নির্মলেন্দু গুণ বলেছেন, বর্ষাই একমাত্র নারী। একমাত্র রমণী। তিনি আমাদের প্রিয় দ্রৌপদী।

বাকি পাঁচ ঋতু হচ্ছে মহাভারতের পঞ্চপা-ব! হয়তো এ কারণেই বর্ষায় বিরহ বেড়ে যায়। মহাকবি কালিদাস তার ‘মেঘদূত’ কাব্যে আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে বিরহ কাতর যক্ষ মেঘকে দূত করে কৈলাশে পাঠিয়েছিলেন তার প্রিয়ার কাছে। বৃষ্টির শব্দে যক্ষের মতোই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের হৃদয় যেন এক অজানা বিরহে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। তাই রবীন্দ্রনাথ কালিদাসের উদ্দেশে লিখেছিলেনঃ ‘কবিবর, কবে কোন্ বিস্মৃত বরষে/ কোন পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে/ লিখেছিলে মেঘদূত। মেঘমন্দ্র শ্লোক বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক/রাখিয়াছ আপন আঁধার স্তরে স্তরে/ সঘন সংগীত মাঝে পূঞ্জীভূত ক’রে।’ বর্ষার সৌন্দর্যে বিমোহিত মধ্যযুগের কবি জয়দেবের কণ্ঠে তাই ধ্বনিত হয়েছে- ‘মেঘৈর্মে দুরম্বরং, বণভুব শ্যামাস্ত মালদ্রুমৈ।’ সে যা হোক বর্ষা ঋতুর প্রথম দিন পহেলা আষাঢ়। যদিও তার আগেই দেশে প্রবেশ করেছে বর্ষা। তবু ঋতুচক্রের নিয়মে আষাঢ় মাসের শুরু মানেই বর্ষার শুরু। আষাঢ়, শ্রাবণ দুই মাস বর্ষাকাল। মেঘলা আকাশ। বৃষ্টিতেই কাটবে জীবন। বাংলার চিরায়ত বর্ষার রূপ-রস এবং সৌন্দর্য্য ও প্রকৃতির বিচারে বলা যায়, তাপবিদগ্ধ তৃষিত ধরা নববর্ষার বারিধারায় সিক্ত হওয়ার দিন। বাঙালীর অতি প্রিয় এই ঋতুর আগমনে প্রকৃতি তার রূপ ও বর্ণ বদলে ফেলে। কেতকীর মনমাতানো সুগন্ধ, কদমফুলের চোখ জুড়ানো শোভা ও পেখম খোলা ময়ূরের উচ্ছ্বল নৃত্যের আবাহন থাকে এই আষাঢ়েই। গাছপালা, তরুলতা, সবকিছুই যেন গ্রীষ্মের দহন থেকে মুক্তি পেয়ে বারিধারায় স্নান করে সজীব হয়ে ওঠে। প্রকৃতি ও উদ্ভিদরাজিও যেন ফিরে পেতে চলেছে শান্তি স্বস্তি ও জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। বৃষ্টির শব্দে যক্ষের মতোই বাঙালির হূদয় এক অজানা বিরহে ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে। কেতকীর মনমাতানো সুগন্ধ আর কদম ফুলের চোখ জুড়ানো শোভা অনুসঙ্গ হয়ে আছে আষাঢ়ের। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, ‘হূদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মত নাচেরে, আকুল পরান আকাশে চাহিয়া উল্লাসে কারে যাচে রে..।


আষাঢ়ে প্রকৃতি রূপ-রঙে হয়ে ওঠে ঢল ঢল। তাপদাহে চৌচির মাঠ-ঘাট খাল-বিল বনবিথিকায় জেগে ওঠে নবীন প্রাণের ছন্দ। চারিধারে অথৈ থৈ থৈ পানিতে আবহমান বাংলার রূপ হয় অপরূপ রূপবতী সলিল দুহিতা। আষাঢ় মানেই সময়-অসময়ে ঝমাঝম বৃষ্টি, কর্দমাক্ত পথঘাট, খাল-বিলে থৈ থৈ পানি, নদীতে বয়ে চলা ছবির মতো পাল তোলা নৌকার সারি। বর্ষার নতুন জলে স্নান সেরে প্রকৃতির মনও যেন নেচে ওঠে। ফুলে ফুলে শোভিত হয় প্রকৃতি। তাল তমাল শাল পিয়াল আর মরাল কপোতের বন বীথিকায় চোখে পড়ে বকুল, কদম, জারুল, পারুল, কৃষ্ণচূড়া ও রাধাচূড়াসহ অসংখ্য ফুল। অবশ্য বর্ষার সবই উপভোগ্য উপকারের- এমনটি বলা যাবে না। ভারি বর্ষণে, পাহাড়ী ঢলে গ্রামের পর গ্রাম যে ভাসিয়ে নেয় সে-ও বর্ষা! অপেক্ষাকৃত নিচু এলাকার মানুষ এ সময় বন্যার আশঙ্কায় থাকে। কখনও কখনও কৃষকের ফসল পানিতে তলিয়ে যায়।

"বাংলাদেশের আবহাওয়া নিয়ে গবেষণা করেন, এমন একাধিক বিজ্ঞানী বলেছেন, এবার মৌসুমি বায়ু হতে পারে বেশ শক্তিশালী। এর সঙ্গে আসা বিশাল মেঘমালার কারণে বৃষ্টি বেশি হবে। ফলে এবার বন্যা স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি মাত্রায় হতে পারে। স্বাভাবিক বন্যায় দেশের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। আর মাঝারি মাত্রার বন্যায় তা ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ হয়ে থাকে"। (সূত্রঃ প্রথম আলো) শাহ আবদুল করিমের ভাষায় : আসে যখন বর্ষার পানি ঢেউ করে হানাহানি/ গরিবের যায় দিন রজনী দুর্ভাবনায়/ ঘরে বসে ভাবাগুনা নৌকা বিনা চলা যায় না/বর্ষায় মজুরি পায় না গরিব নিরুপায়...। একইভাবে ঝড়ে খেই হারানো জেলের নৌকোটি ঘাটে সব সময় ফিরতে পারে না! আর কর্দমাক্ত পথে পা পিছলে পড়ার গল্প তো প্রতিদিনের। বর্ষার কাছে কবিগুরুর তাই প্রার্থনা করে বলেন, এমন দিনে সকলের সবুজ সুধার ধারায় প্রাণ এনে দাও তপ্ত ধারায়,/বামে রাখ ভয়ঙ্করী বন্যা মরণ-ঢালা...। বর্ষাবিহীন বাংলাদেশ ভাবাই যায় না। কবির কবিতায়, শিল্পীর সুরে-গানে, চারুশিল্পীর তুলির আঁচড়ে নকশীকাঁথার ফোঁড়ে ফোঁড়ে বর্ষার অপরূপ রূপ বর্ণনা, স্থিতি ও ব্যাপ্তি মূর্ত ও চিরকালীন হয়ে আছে। প্রতি বছর নানা আয়োজনে বর্ষাকে বরণ করে নেয় বাঙালী। ঢাকায় ছায়ানট, উদীচী, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্ঠীসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রিয় ঋতুর বন্দনা করে। চারুকলার বকুলতলায় এবং বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজন থাকবে বর্ষাবরণের। ‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ দিয়ে প্রণয় নিবেদন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবি নজরুল ইসলামের কাছে বর্ষাকে মনে হয়েছে ‘বাদলের পরী’। তিনি লিখেছেনঃ ‘রিমঝিম রিমঝিম ঘন দেয়া বরষে/কাজরি নাচিয়া চল, পুর-নারী হরষে।’ বর্ষার আবাহনে চলমান তাপিত গ্রীষ্মের অবসান হবে সেই প্রত্যাশায় আষাঢ়স্য প্রথম কদম ফুল করিনু দান। আসুন এ বর্ষা ঋতুতে আমরা অধিক পরিমানে গাছ লাগাই।আষাঢ়ের প্রথম দিনে সামুর শ্রদ্ধেয় মডারেটর, সম্পাদক, সূধী লেখক, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের সকলের জন্য বরষার শুভেচ্ছা ও শুভকামনা।

সম্পাদনায়ঃ নূর মোহাম্মদ নূরু
গণমাধ্যমকর্মী
[email protected]
দ্রষ্টব্যঃ একটি কপি পেষ্ট পরিবেশনা।
গত বছর এই দিনে এটি প্রকাশ করা হয়। তবএবার
কিছুটা পরিবত'ন করতে হয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুন, ২০২২ বিকাল ৪:৩৪
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনফিং - দরিদ্রদের একজন ত্রানকর্তা

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ১০:২৭

.



শি জিনফিংয়ের নেতৃত্বে চীন ২০২০ সালের শেষ নাগাদ তাদের দেশ থেকে চরম দারিদ্র্য সম্পূর্ণ নির্মূল করার ঐতিহাসিক লক্ষ্য অর্জন করে, যা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এই মহাপরিকল্পনার আওতায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলা ব্লগিং-এ দুই দশক - ধন্যবাদ সামহোয়্যার ইন ব্লগ

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫৮


দেখতে দেখতে শেষ পর্যন্ত সামুতে ২০ বছর পেরিয়ে গেল, ব্যক্তিগত একটি মাইলস্টোনও পার করা হলো। এই অনুভূতি মূলত মিশ্র। একদিকে আমি যেমন সামহোয়্যার ইন কর্তৃপক্ষের নিকট কৃতজ্ঞ যে দু'দশক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুসা নবী এবং ফেরাউন

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮



মুসার নবীর নির্দেশ অমান্য করে এবং আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কারণে-
লোহিত সাগরে ডুবে ফেরাউনের করুণ মৃত্যু হয়। হজরত মুসা আলাইহিস সালাম এমন এক ফেরাউনের আমলে জন্মগ্রহণ করেছিলেন- যিনি রামেসিস... ...বাকিটুকু পড়ুন

৭২০১৪

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ৩০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৫৮

"ভাই, এইখানেই নামবেন?"

হেল্পার ছেলেটা দরজার হাতল ধরে আমার দিকে ঠিক এমনভাবে তাকালো, যেন আমি জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করতে যাচ্ছি। বাসের ভেতরের হলদে আলোয় ওর মুখটা কেমন বিবর্ণ দেখাচ্ছিল। চোখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯২

লিখেছেন রাজীব নুর, ৩০ শে জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১৯



বিএনপি সরকার দেশে ক্ষমতায় আসতে না আসতেই দেশে প্রতারকের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
প্রতারক সব আমলেই ছিলো। কিন্তু বিএনপির আমলে যেন প্রতারকের উৎসব শুরু হচ্ছে। দেশে বেড়ে গেছে মারামারি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×