
শি জিনফিংয়ের নেতৃত্বে চীন ২০২০ সালের শেষ নাগাদ তাদের দেশ থেকে চরম দারিদ্র্য সম্পূর্ণ নির্মূল করার ঐতিহাসিক লক্ষ্য অর্জন করে, যা বিশ্ব রাজনীতির ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। এই মহাপরিকল্পনার আওতায় চীনের প্রায় ১০ কোটি গ্রামীণ মানুষকে পদ্ধতিগত এবং সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমার ওপরে নিয়ে আসা হয়। এই বিশাল লক্ষ্য অর্জনে শি জিনফিং মূলত "টার্গেটেড পভার্টি অ্যালিভিয়েশন" বা সুনির্দিষ্ট দারিদ্র্য বিমোচন নীতি গ্রহণ করেছিলেন। নিচে পাঁচটি ধাপে এই নীতি কীভাবে সফল হলো, তা বর্ণনা করা হয়েছে -
প্রথমত, সঠিক ডেটা এবং সুনির্দিষ্ট পরিবার চিহ্নিতকরণ
এই অভিযানের প্রথম পদক্ষেপ ছিল প্রতিটি দরিদ্র পরিবারকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা। অতীতে ঢালাওভাবে পুরো অঞ্চলের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার নীতি পরিবর্তন করে শি জিনপিংয়ের প্রশাসন প্রতিটি গ্রামে কর্মী পাঠায়। এই কর্মীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রতিটি পরিবারের আয়ের উৎস, শারীরিক সক্ষমতা এবং দারিদ্র্যের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করেন। এরপর একটি জাতীয় ডেটাবেস তৈরি করা হয়, যার ফলে সরকার জানতে পারে ঠিক কোন পরিবারটির কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সম্পদের ভিত্তিতে শিল্পায়ন ও ই-কমার্স
দারিদ্র্য দূরীকরণে কেবল অনুদান না দিয়ে সরকার গ্রামীণ মানুষকে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেয়। প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করে সেখানে নির্দিষ্ট কৃষিপণ্য উৎপাদন এবং কুটির শিল্পের বিকাশ ঘটানো হয়। পাশাপাশি, গ্রামীণ এলাকাগুলোতে দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও লজিস্টিকস সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়। এর ফলে কৃষকেরা "তাওবাও ভিলেজ" বা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সরাসরি শহরের ক্রেতাদের কাছে ভালো দামে পণ্য বিক্রির সুযোগ পান।
তৃতীয়ত, পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ আবাসন পুনর্বাসন
চীনের অনেক দরিদ্র মানুষ অত্যন্ত দুর্গম পাহাড়, মরুভূমি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় বসবাস করতেন, যেখানে রাস্তাঘাট বা বিদ্যুৎ পৌঁছানো অসম্ভব ছিল। শি জিনপিং সরকার এমন প্রায় ১ কোটি মানুষকে সম্পূর্ণ সরকারি খরচে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত নতুন পরিকল্পিত শহর বা গ্রামে পুনর্বাসিত করে। নতুন এসব আবাসস্থলে বিশুদ্ধ পানি, বিদ্যুৎ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করার মাধ্যমে তাদের জীবনযাত্রার মান রাতারাতি বদলে দেওয়া হয়।
চতুর্থত, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা
দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র ভাঙতে শি জিনপিংয়ের প্রশাসন শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। গ্রামীণ অঞ্চলের দরিদ্র পরিবারের শিশুদের জন্য বিনামূল্যে শিক্ষা, দুপুরের খাবার এবং বৃত্তির ব্যবস্থা করা হয়, যাতে তারা দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। একই সাথে, চিকিৎসার খরচের কারণে যেন কোনো পরিবার আবার দরিদ্র হয়ে না পড়ে, সেজন্য গ্রামীণ চিকিৎসাসেবা উন্নত করা হয় এবং দরিদ্রদের জন্য প্রায় শতভাগ চিকিৎসা বীমা নিশ্চিত করা হয়।
পঞ্চমত, কঠোর পর্যবেক্ষণ ও কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা
এই পুরো প্রক্রিয়াটি সফল করার পেছনে ছিল কমিউনিস্ট পার্টির লাখ লাখ ক্যাডার ও সরকারি কর্মকর্তার অক্লান্ত পরিশ্রম। প্রায় ৩০ লাখ সরকারি কর্মীকে সরাসরি দুর্গম গ্রামগুলোতে পাঠিয়ে দরিদ্র পরিবারের সাথে থেকে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও মূল্যায়ন নির্ভর করত তারা কতজন মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে পেরেছেন তার ওপর। এই কঠোর তদারকি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কারণেই মাত্র আট বছরে ১০ কোটি মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।
বাংলাদেশ কি এ থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের দেশে তা প্রয়োগ করতে যাচ্ছে? আপনি কি মনে করেন না যে, বাংলাদেশে এরকম ত্যাগী নেতা ও কর্মীদল আছেন? আমি আশাবাদী।
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



