
ইংরেজিতে ইউটোপিয়া নামে একটি শব্দ রয়েছে, সোজা বাংলায় যার অর্থ হতে পারে স্বপ্নপুরী। বুঝ হবার পর থেকে ভেবে আসছি আমাদের এই দেশ কোন একদিন স্বপ্নপুরী বা ইউটোপিয়া হবে। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে ততই দেখতে পাচ্ছি দেশটা ভালো হতে পারছে না। পোকার মত এই দেশে মানুষ কেবল কিলবিল করছে। এখানে ভালো হতে কেউ পারে না, উল্টো কেউ ভালো কিছু করতে চাইলে তাকে বিপদের মুখে পড়ে যেতে হয়।
আমাদের ঘরে ঘরে কঠোর মা বাবারা আছেন, তাঁরা রাস্তার ঘটে যাওয়া মারামারির মত অপ্রয়োজনীয় খবর আমাদের শুনতে দেন না। আমাদের এক কঠোর সরকার আছে, সে সরকার এসব খবর ছড়ানো বন্ধ রাখতে ইন্টারনেট অফ করে দেয়। এতো বাঁধার ভেতরে আমরা যেটুকু খবর পাই তাও সহ্য করে রাখার মত হয় না। এই দেশটার নাম কত সুন্দর, পিপলস রিপাবলিক অব বাংলাদেশ। কিন্তু দিনদিন দেশটা যেন পিপলস ডিসটোপিয়া অব বাংলাদেশ হয়ে যাচ্ছে। (ইউটোপিয়ার বিপরীত শব্দ ডিসটোপিয়া)

২.
এবারের ছাত্র আন্দোলনে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে ছাত্রদের হাতে ধরে রাখা ব্যানার এবং প্লেকার্ড। সবাই বলাবলি করছে তাদের প্লেকার্ডের ভাষা ছিল খুব অশ্লীল। এব্যপারে আমি একটা কথাও বলবো না। শালীনতা নিয়ে অত ব্যস্ত হবার কিছু নেই। ভদ্র মানুষেরা নিজেরা কত শালীন তা তো আমরা চলতে ফিরতে দেখতে পাচ্ছি। তবুও আমি ছাত্রদের হাতের প্লেকার্ড দেখে লজ্জা পেয়েছি। কারণ তাদের বেশিরভাগ প্লেকার্ডে বানান ভুল ছিল। গালি দিয়ে যেসব প্লেকার্ড তারা লিখেছিল তাতেও বানান ভুল। একজনের হাতে ধরা প্লেকার্ডে Porn Hub লিখতে গিয়ে Pron hub লিখে ফেলেছে। এতো মনোযোগ দিয়ে যে সাইট দেখো তার বানানটাও লিখতে পারে না, বোকা কোথাকার! একারনেই তো এরা প্রশ্নফাঁস জেনারেশনের অপবাদ পাচ্ছে।
কিন্তু এই ছেলেগুলো যখন রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে রাজপথে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশকে পথ দেখাতে চেয়েছে, তখন তাদের ভুলগুলোকে আমার কাছে কোন ভুল বলেই মনে হয়নি।
৩.
ট্র্যাজিক মুভি সিনেমা দেখে চোখের পানি ফেলতে আমার কোন জুড়ি নেই। আমি এমনই বোকা, ব্রেভ এবং টয়স্টোরি এর মত এনিমেশন ছবি দেখেও চোখের জলে অনেকবার মুখ ভিজিয়েছি। জানি এগুলো নিছক বানানো গল্প, ছবির সব চরিত্র সাজানো, তবুও আমি আবেগ ধরে রাখতে পারি না। সেই আমি যখন রাস্তায় পড়ে থাকা তাজা রক্ত দেখেছি, স্কুলের সাদা ইউনিফর্মকে লাল হয়ে যেতে দেখেছি, তখন আমার কাছে কেমন লেগেছিল তা আমি কাকে বোঝাতে পারবো? আমি দুই দিন মনে প্রাণে প্রার্থনা করছিলাম সবাই যেন নিজের ঘরে ফিরে যায়। আমি মনে মনে সব ছেলেকে ডেকে বলছিলাম, তোমরা মার খেয়ে কষ্ট পাচ্ছো। আর আমার মত তোমাদের কোটি কোটি বোন ঘরে বসে কষ্ট পাচ্ছে। কি দরকার এতো যন্ত্রণার, ঢের হয়েছে বাপু, এবার ঘরে ফেরো।
৪.
আমাদের বাসায় পত্রিকা পড়ার মত কেউ নেই। সারাদিন বাবা থাকেন অফিসে, সেখানে হয়তো তাঁর পত্রিকা পড়া হয়ে যায়, মাও হয়তো তাঁর কর্মস্থলে পত্রিকা পড়েন, বাসায় আমি কখনো মাকে আগ্রহভরে পত্রিকা পড়তে দেখিনি। তবুও হকার আমাদের বাসায় প্রতি সকালে দুটো পত্রিকা রেখে যায়। একটা ইংরেজি, আরেকটা বাংলা পত্রিকা। সকালে রেখে যাওয়া পত্রিকা সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় টাটকা থেকে যায়, কেউ ধরে না। আমি মাঝে মাঝে সময় পেলে পত্রিকাতে চোখ বুলিয়ে নিই। আমার খুব আশ্চর্য লাগে, আজ পর্যন্ত এই দুই পত্রিকার কোনটিতে আমি ছাত্রলীগের কোন ভালো খবর পেলাম না। খুন ধর্ষন চাঁদাবাজির খবরেই কেবল ছাত্রলীগের নাম দেখতে পাই! বুঝলাম না, এই দুই পত্রিকা কি ছাত্রলীগের শত্রু? তারা ছাত্রলীগকে নিয়ে কোন ভালো খবর ছাপায় না কেন? ছাত্রলীগ দলটি কি শুধুই খারাপির সাথে জড়িত থাকে? নাকি আমার চোখে সমস্যা? আমিই ছাত্রলীগের কোন ভালো খবর দেখি না!
আগের সব খবর বাদ। এই সপ্তাহে আমি ছাত্রলীগের উপর বেশ মুগ্ধ! আগে শুধু রাজনীতি নামক জিনিসটাকে ঘৃণা করতাম। এখন থেকে শুধু রাজনীতিকে ঘৃণা করলে হবে না, মনে হচ্ছে ছাত্রলীগ শব্দটিকে আলাদাভাবে ঘৃণা করতে হবে। এই দুই দিন আমি ব্লগে অফলাইন থেকে নজর রাখছিলাম, কোন কোন বীরপুঙ্গব ব্লগার ভাষার মারপ্যাঁচে ছাত্রলীগের বর্বরতাকে বৈধতা দেবার চেষ্টা করেছেন। বেশ ভালো করেছেন আপনারা! আপনাদের চিনে রাখলাম। যদি কখনো আমার পোস্টে আপনারা কমেন্ট করেন তাহলে আমি হয়ত সবসময়ের মত হিহিহি.... লিখে প্রতিউত্তর দেব। তবে এইকথা ভুলবনা- আপনি ছাত্রলীগের দোসর, আপনিও ছাত্রলীগ করেন।
৫.
যখন প্রথম খবর পেলাম ছাত্রলীগের হাতে আন্দোলনরত ছাত্র ছাত্রীরা খুন ধর্ষনের স্বীকার হয়েছে তখন শিউরে উঠেছিলাম। কেউ বলে এগুলো সত্য, কেউ বলে গুজব! আমি মনে প্রাণে চাইছিলাম এগুলো যেন গুজব হয়। সত্য খবর শোনার মত আমার মন এতো শক্তিশালী নয়, যদি গুজব হয় আমি খুশি হব। সরকার সব নাগরিকের কাছে মেসেজ পাঠিয়েছে- এগুলো সব গুজব! কেউ বিশ্বাস করবেন না। মেসেজটা আমার মোবাইলে এসেছে, আমার মায়ের মোবাইলেও এসেছে।

এই মেসেজের উত্তর দেবার সুযোগ থাকলে আমি উত্তর লিখে পাঠাতাম- একদম ঠিক। ছাত্রলীগের হাতে মার খাওয়ার ঘটনা একদম গুজব। এমনকি বাংলাদেশ নামে যে একটা দেশ আছে, এই দেশে যে ভালো মানুষ আছে বলে মাঝে মাঝে শোনা যায় এটাও গুজব!
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা অক্টোবর, ২০১৮ রাত ১১:২০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


