somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যুদ্ধ শিশু '71 : স্বাধীনতার এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা-1

১২ ই নভেম্বর, ২০০৬ রাত ৩:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(ভূমিকা : প্রসঙ্গ যুদ্ধ শিশু। একাত্তরে আমাদের ধর্ষিতা বোনদের গর্ভের শিশু তারা। তাদের পাপ, তারা পাপের ফসল। ঠিক কী হয়েছিল তাদের নিয়ে এ নিয়ে আমার আগ্রহ অনেকদিনের। হঠাৎই পেয়ে গেলাম বীনা ডি'কস্টার একটি থিসিস। চার বছর আগে দ্য অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে উনি কাজ করেছেন এটা নিয়ে। পড়তে পড়তে যার নাম এল তিনি ডঃ জিওফ্রে ডেভিস। 72 সালে আমাদের অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের শিকার বীরাঙ্গনাদের গর্ভপাতের দায়িত্বে ছিলেন। বীনার থিসিসটা কয়েকভাগে ভাগ করা। উনি যুদ্ধে নারীদের অসহায়ত্ব, বাংলাদেশের নারীদের সামাজিক প্রোপট, যুদ্ধে তাদের লাঞ্ছনা তুলে ধরেছেন। সেই সঙ্গে নিয়েছেন ডেভিস ও এক বীরাঙ্গনার সাক্ষাৎকারও। এরপর পেলাম ডেভিসের নিজেরই লেখা স্মৃতিকথা 'দ্য চেঞ্জিং ফেস অব জেনোসাইড'।

দোটানার শুরুও এখানে। আমি কী কম্পাইল করে একটা স্টোরি দাঁড় করাবো? সেটাতে কী আমার আরোপিত অনেক বাক্য ঢুকে পড়বে না! বায়াসড হয়ে যাবে না লেখাটা? তারচেয়ে কী ভালো নয় বীনা এবং ডেভিসের লেখাগুলো অনুবাদ করেই তুলে ধরি। তারা বিদেশী, তাদের চোখে এবং বিচারে সবকিছুই যে স্বাধীনতার পক্ষে যাবে এমনটি নয়। তারপরও এই পথটিই বেছে নিলাম। লেখাগুলো বেশ বড়। কিছু জায়গা একেবারেই কাব্যিক বিশ্লেষণ বলে উপেক্ষা করা হয়েছে মূল তথ্যের গাথুনিতে আচড় না কেটেই। পাঠকদের ধৈর্য্যের ওপর আস্থা রাখার ঝুঁকি নিচ্ছি। কারণ তারা আমাকে নিরাশ করেননি আগে। ধারাবাহিক হবে তারপরও। আর আমার ইংরেজি তেমন সুবিধার নয় বলে অনুবাদে ভুলটা ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখার জন্য পাঠকদের প্রতি আর্তি রইল)


ওয়ার বেবিজ : দ্য কোয়েশ্চান অব ন্যাশনাল অনার / বীনা ডি'কস্টা

ইতিহাস নিয়ে তার সেই বিখ্যাত মূল্যায়নে নিয়েজশে লিখেছেন, 'আমরা আগের প্রজন্মের উত্তরসূরী বলেই তাদের দোষত্রুটি, ভুলভাল, আবেগ এবং নিঃসন্দেহে অপরাধের দায়ভারেরও ভাগীদার। এই শেকল থেকে পুরোপুরি মুক্তির সম্ভাবনা একেবারেই অসম্ভব।' ইতিহাসকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন ব্যাপারটা হচ্ছে 'ইট ওয়াজ' বচনটাকে বুঝতে পারা। কিন্তু ইতিহাস সচেতনতা একটা জটিল বিষয়। তাই সতর্ক করে বলেছেন, 'ঐতিহাসিক এবং এর বিপরীত ব্যাপারটা একই সঙ্গে একজন ব্যক্তি ও একটি সংস্কৃতির পুরো ছবিটা তুলে ধরে।' এভাবেই নিয়েজশে 'ভুলে যাওয়ার' মূল্যটাও বুঝেছিলেন। এটা তখনই হয় যখন মানুষ তার অতীতের বন্ধন থেকে পালিয়ে নতুন করে সব শুরু করে- কল্পনা ও বিনির্মাণ। বোঝার চেষ্টা করে যা সে আগে কখনও বোঝেনি। নিয়েজশে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন স্মৃতিভ্রষ্টতা নিয়েও বেচে থাকা সম্ভব, আমাদের অনেকেই তা করে। কিন্তু সব কিছু ভুলে গিয়ে বেচে থাকাটা সার্বিকভাবেই অসম্ভব।

স্বাধীন বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জটা এই জটিল পরবাস্তবতার ঘেরাটোপেই বন্দী। একটি দেশ এবং একটি জাতি হিসেবেই তার অতীত ভুলে যাওয়াটা উচিত নয়। একই সঙ্গে তাকে কিছু ব্যাপার ভুলতেই হবে। তাকে মেনে নিতে হবে নিষ্ঠুর সেই নিয়তিকে, কোনো কিছু ভোলার আগে তার কথা স্মরণ করতে হয়।

1971 সালের স্বাধীনতার যুদ্ধ বাঙ্গালীর উপর জঘণ্য এক হিংসাচার। ভিটেছাড়া হওয়া থেকে শুরু করে ব্যাপক আকারে গণহত্যার মতো ব্যাপারগুলো তাদের সইতে হয়েছে। বিজয়ের পর সেই য়তির তালিকাও ব্যাপক। আমাদের আলোচনা সেই ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে বিশেষ একদলকে নিয়ে। প্রশ্ন হচ্ছে যারা ইতিহাসে উপেক্ষার শিকার, তাদের কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যায়? বিপন্না নারী থেকে শুরু করে অধস্তন সৈন্যদের সবার স্মৃতিকথা লিপিবদ্ধ করাতেই কী 1971 সালের পূর্ণাঙ্গ ছবিটা পাওয়া সম্ভব? বাংলাদেশের প েক্ষ কী আসলেই সম্ভব অতীতকে পুরোপুরি ভুলে গিয়ে সেই ক্ষত থেকে সেরে ওঠা? যদি নতুন করে ইতিহাস লেখা হয়, সেখানে কী সেটা কী শেষমেষ সম্মিলিত অতীতভ্রষ্টতায় রূপ নেবে?

যুদ্ধে গণহত্যার পাশাপাশি ধর্ষণের ব্যাপারটাও একটা স্বীকৃত আচার। বাংলাদেশই শুধু নয়, যে কোনো যুদ্ধেই একটি জাতির অস্তিত্ব ও পরিচয়কে বিপন্ন করতেই ধর্ষণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। নারী এবং তার শরীরকে নিয়েই পুরুষরা তাদের জঘণ্যতম প্রতিহিংসাগুলো চরিতার্থ করতে পারে। শুধু ভোগেই নয়, তার মননকে চিরতরে দুঃস্মৃতিময় করে দিয়েও। এই অর্থে বীরাঙ্গনারা (স্বাধীনতা যুদ্ধে ধর্ষিতা) শুধু সেই যুদ্ধের তান্ডবে ক্ষতিগ্রস্থই নন, নির্মমতার স্বাক্ষীও। এই প্রান্তিক নারীদের ক্ষেত্রে ধর্ম-সংস্কৃতি-আত্মপরিচয়-ইতিহাসের অবমাননা ও স্মৃতির এক জটিল সংযুক্তি ভূমিকা রাখে। এই নারীরা দুর্বল। পক্ষ ও বিপক্ষের শক্তির কাছে তারা বরাবরই অসহায়। যদিও জাতীয় ভাবমূর্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে এদের গুরুত্ব ফেলনা নয়, কিন্তু ইতিহাসে ব্রাত্য রাখার প্রয়াসটাও অবিরাম। যুদ্ধ বিধ্বস্ত এক জাতির পুনর্গঠণে অনেক সময় তারা বোঝাও হয়ে যান।

এ প্রসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা, সমাজকর্মী, বীরাঙ্গনা ও সমাজের নানা স্তরের মানুষের সাক্ষাৎকার নিয়েছি। দুটো সাক্ষাৎকার আমি প্রকাশ করছি। তবে সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে বাঙ্গালীদের ঐতিহ্য ও লোকাচার সম্পর্কে কিছুটা আভাস না দিলেই নয়।

পর্দাপ্রথা ও পুরুষদের থেকে পৃথক বিচরণের ঐতিহ্যেই অভ্যস্ত বাঙ্গালী মেয়েরা। তাইবলে পশ্চিম পাকিস্তানের মতো অতোটা ধর্মীয় অনুশাসন কখনোই ছিল না তাদের ওপর, বিশেষ করে পর্দা নিয়ে। বাঙ্গালী মেয়েরা তাদের প্রাচুর্য্যপূর্ণ সংস্কৃতিতেই বেড়ে ওঠে যা তাদের গান, সাহিত্য ও অন্যান্য অনুষঙ্গে সমপৃক্ত রেখেছে বরাবর। তাই পাকিস্তানীদের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ে মিল ছাড়া আর কিছুই ছিল না। সার্বিকভাবে পাঞ্জাবিরা লম্বা-চওড়া ফর্সা, বাঙ্গালীরা বেটে-শ্যামলা। শারীরিক এই পার্থক্যই যুদ্ধ শেষে গর্ভবতী ধর্ষিতা বাঙ্গালীদের মনে বাড়তি এক মনস্তাত্তি্বক চাপ সৃষ্টি করেছিল। কারণ যে শিশু জন্মাবে, তার শারীরিক বৈশিষ্টই তাকে আলাদা করে চিনিয়ে দেবে তার পরিচয়। (চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০০৮ সকাল ১১:৪৭
২৬টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পিটিভির আর্কাইভে ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ দেখা

লিখেছেন অর্ক, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:২৫



‘খুব ভালো জঙ্গ চলছে। একের পর এক নাপাক হিন্দু সেনা হালাক (মৃত্যু) হচ্ছে। রাজাকার আলবদরদের নিয়ে পাকিস্তানের বীর সেনা যুদ্ধ জয়ের দ্বারপ্রান্তে। দুয়েক দিনের মধ্যেই হিন্দুস্থান হাঁটু গেড়ে বসে... ...বাকিটুকু পড়ুন

উপরোধের আগে

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



একটা ক্ষণ,
ক্ষীণ, তবুও অবয়,
আমাকে হাজার বছর বাঁচিয়ে রাখবে সবুজ অটবীর আলেখ্যে,
তুমি এলে,
সেই পুরোনো মায়া হয়ে।

কতকাল পরে সম্মুক্ষে দু জোড়া চোখ?
সে প্রশ্নের প্লাবনে আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা কি আধুনিক যুগের জন্য প্রস্তুত।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ৮:২৩

২০০৯ সাল থেকে সম্ভবত সকল সরকারি কর্মচারীদের ব্যাংকে বেতন হয়। এবং এই বেতন দেওয়ার পক্রিয়া ১০০% কম্পিউটার বেইস। সরকারি কর্মচারীদের বেতন সিজিএ অফিস হ্যান্ডেল করে। আর সম্ভবত আইবিবিএএস+ সার্ভার বেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫৫ বছরে কেন আরেকটা রিফাইনারি হলো না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১১:৪৪


রাশিয়া থেকে তেল আনতে হলে আমেরিকার অনুমতি লাগবে। এই একটা বাক্য পড়লে অনেকে ভাববেন এটা কোনো রাজনৈতিক ভাষণের অংশ, কিংবা অতিরঞ্জন। কিন্তু এটা ২০২৬ সালের বাস্তবতা। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ লেগেছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৮৮

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩



আপনারা কেমন আছেন?
আমি কেমন আছি, বুঝতে পারছি না। মনে হচ্ছে কোনো অলৌকিক কিছু যেন জেনে ফেলেছি। না জানলেই বুঝি ভালো হতো। দুনিয়াতে যে যত কম জানে, সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×