১)
বনী ঈসরাইল কিংবা বর্তমানের ইহুদী জাতি একসময় মিশরে ফারাওয়ের অধীনে দাসত্ব ও অত্যাচারে জর্জরিত অবস্থায় বসবাস করতো। মিশরে থাকলেও তাদের কখনও মিশরের নাগরিক হিসাবে বিবেচনা করা হয়নি। দুর্ভোগ বাড়তে বাড়তে এমন এক অবস্থায় গেলো যে এক পর্যায়ে তারা আশা করতে লাগলো তাদের মধ্যে এমন কেউ একজন আবির্ভূত হবে যে তাদের এই দুঃখ দুর্দশা থেকে মুক্ত করে তাদের এক স্বাধীন দেশে অধীষ্ঠ করবে। এবং অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসা নবীকে পাঠানো হলো তাদের হয়ে ফারাওয়ের মোকাবিলা করার জন্য। পরবর্তী ঘটনা আমরা সবাই মোটামুটি জানি। নানারকম আলৌকিক কারিশমা দেখানোর পর অবশেষে মুসা নবী সাগর দু'ভাগ করে তার মধ্য দিয়ে বনী ঈসরাইলদের মিশর থেকে বের করে নিয়ে যায়। কিন্তু ইতিহাস এখানেই শেষ হয়নি। এর পরে সেই জাতির কি হলো সেটাই আমার এখানের আলোচনার মূল বিষয়।
মিশর থেকে বনী ঈসরাইলদের বের করে এনে তাদের এক জায়গায় রেখে মুসা নবী পাহাড়ের গুহায় গেলেন আল্লাহর কাছ থেকে নির্দেশ আনার জন্য। ৪০ দিন পর ফিরে এসে তিনি দেখেন যে সদ্যমুক্ত বনী ঈসরাইল জাতি তখন স্বর্ণালঙ্কার দিয়ে গরুর এক মূর্তি বানিয়ে তার পূজা ও ব্যভিচারে নিমগ্ন। সেখান থেকে তাদের আবার লাইনে ফিরিয়ে আনার পরে নবী যখন বললেন যে আল্লাহর কাছ থেকে তাদের জন্য তিনি নির্দেশ নিয়ে এসেছেন, তখন তারা আবার বেঁকে বসলো। বললো নিজের চোখে আল্লাহকে না দেখা পর্যন্ত তারা এটা কখনোই বিশ্বাস করবে না। অতএব ৪০ জন লোক নিয়ে নবী আবারও গেলেন সেই পাহাড়ের পাদদেশে, এবং আল্লাহর নূরের একাংশ দেখেই তারা সবাই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো। পরে আবার নবীর অনুরোধে তাদের জীবিতও করা হলো। তারা এসে সাক্ষী দেয়ার পর বাকীরা আল্লাহর নির্দেশনা মেনে নিলো। তাদের দেয়া হলো নতুন এক দেশ। বলা হলো এখানে স্বাধীনভাবে থাকো, এবং এই এই ফল খেয়ে ও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করো। নিজেদের স্বাধীন দেশ পাওয়ার পরেও দেখা গেলো তাদের মধ্যে শান্তি নেই। বারো গোত্রে ভাগ হয়ে তাদের মধ্যে পানির দখল নিয়ে মারামারি, কেউ কাউকে খুন করে তা নিয়ে জল ঘোলা করা, এরকম নানারকম ঝামেলা চলতেই লাগলো। মুসা নবীও তাদের লাইনে রাখার চেষ্টা করতে করতেই পেরেশান। একটা সমস্যার সমাধান করতে করতেই আরেকটা এসে হাজির। এক পর্যায়ে তারা নবীকে এসে বলতে লাগলো যে একই রকম খাবার খেতে খেতে তারা বিরক্ত। তারা আর এখানে থাকতে চায় না। এমন কোথাও যেতে চায় যেখানে আমিষ খাবার পাওয়া যাবে। অতএব আবারও স্থানান্তর। এবার তাদের সাগরের পারে এক দেশ দেয়া হলো। বলা হলো সাগর থেকে মাছ ধরে খাও, তবে সপ্তাহের অমুক দিন কোন মাছ ধরবে না। সপ্তাহের ছয়দিন মনের সুখে মাছ ধরে খেতে পারার পরেও দেখা গেলো তাদের মধ্যে কেউ কেউ বাকী একদিন মাছ ধরতে না পারা নিয়ে অখুশি। তাদের কেউ কেউ তাই সপ্তাহের একদিন মাছ না ধরার নির্দেশ সরাসরি অমান্য করলো, আর কেউ ছলচাতুরীর আশ্রয় নিলো এক্ষেত্রে। পরবর্তীতে আল্লাহর অভিশাপে তাদের বানর ও শুয়োরে পরিণত করা হলো।
এভাবেই চলতে লাগলো বনী ঈসরাইলদের স্বাধীন জীবন। কোন কিছুতেই তারা পুরোপুরি তুষ্ট হতে পারে না। এক সময় তাদের মনে হতে লাগলো যে মিশরেই আসলে তারা অনেক ভাল ছিলো। অতএব দল বেঁধে আবার রওয়ানা হলো মিশর অভিমুখে। অবশ্য মিশরে পৌছানোর পরিবর্তে তারা এদিকে সেদিকে চল্লিশ বছর ঘুরে মরেছে পথ ভুলে। এরপর থেকে কোথাও আর তারা স্থায়ীভাবে থিতু হতে পারেনি। যেখানেই যখন গেছে সেখানেই তাদের উপর নেমে এসেছে অত্যাচারের খড়গ। সর্বশেষ ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তাদের উপর নাৎসী বাহিনীর নৃসংশ নির্যাতনের কথা আমরা সবাই জানি। আবার যখনই তারা নিজেদের কোন দেশ পেয়েছে, তখনই তারা নিজেরাই হয়ে উঠেছে অত্যাচারীর প্রতিভূ। যেমন বর্তমানের ঈসরাইল।
২)
এবার আমরা একটু নিজেদের দেশ ও জাতির দিকে তাকাই। আমরা বাংলাদেশীরা একসময় ছিলাম পাকিস্তানের অংশ, যদিও পাকিস্তান কখনোই আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের নাগরিকদের সমান সুযোগ সুবিধা দেয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানের শোষনে অতিষ্ঠ হতে হতে এক পর্যায়ে আমরা নিজেদের স্বাধীন এক দেশের স্বপ্ন দেখা শুরু করলাম। আর এসময়েই আমাদের নের্তৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। তার বলিষ্ঠ কন্ঠ আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে আরও উজ্জীবিত করলো। তাই পাকিস্তানের সামরিক শাসকের নানারকম ছলচাতুরীর এক পর্যায়ে তারা যখন আমাদের আক্রমণ করে বসলো, আমরা কেউ চুপ করে তা মেনে নেইনি। দেশের আপামর জনসাধারণের প্রায় সবাই যে যার মতো ঝাপিয়ে পড়লো মুক্তির সংগ্রামে। কেউ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করলো, আর অন্যেরা সবাই তাদের সবকিছু দিয়ে সহায়তা করলো। অবশ্য হাতে গোণা কিছু চামচিকা রাজাকার, আল-বদর ইত্যাদি নামে পাকিস্তানীদের পা-চাটায় নিমগ্ন ছিলো। যাই হোক, দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে আমরা পেলাম আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু ইতিহাস এখানেই থেমে থাকেনি। যদিও সেই ইতিহাস আমরা সবাইই মোটামুটি জানি, তবুও এখানে স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসেই আরেকবার আলোকপাত করতে চাই।
যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন দেশে তখন নানা রকম অরাজকতা। এদিকে সেদিকে তখনও খুনখারাবী লুটপাট লেগে আছে। পরাজিত শক্তি তখন গর্তে গিয়ে লুকিয়েছে। অর্থাৎ স্বাধীনতা পরবর্তী লুটতরাজে পরাজিত শক্তি না, বিজয়ী শক্তির ভূমিকাই মূখ্য ছিলো। মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই যুদ্ধ শেষে অস্ত্র ফেরত দেয়নি। তাদের অনেকেই দল বেঁধে এদিকে সেদিকে ডাকাতি ও দখলবাজি করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নামে এই অপবাদে আপনারা অনেকেই আমার উপর খেপে যাবেন জানি। কিন্তু আমার পরিচিত ও আত্মীয়ের মধ্যেই এমন অনেক উদাহরণ আছে। তাদের কেউ হয়তো ভারতে পাড়ি জমানো কোন হিন্দু পরিবারের বাড়ি দখল করে বসবাস করছে, কেউবা যে দোকানের কর্মচারী ছিলো সেই দোকান দখল করে নিজের যোগ্যতায় এখন শিল্পপতি, আবার কেউ বা ব্যাংক ডাকাতি করে নিজের অর্থনৈতিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন করে ফেলেছে। আমাদের এলাকার এক কুখ্যাত ডাকাত মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো। আবার যুদ্ধের পরে সে ডাকাতি ও খুনখারাবিতেই ফিরে যায়। যেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন স্বাধীনতার মহান নায়ক, স্বয়ং তিনিই রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ অবস্থানে থেকেও আক্ষেপ করে বলেছেন যে তার চারপাশে সব চোরের দল। বাইরের চোরের দল তো বটেই, ঘরের দলকেও তিনি ঠিকমতো আর সামলে উঠতে পারেননি। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে শুনেছি যে বঙ্গবন্ধুর ছেলেরা বন্ধুসহ মাইক্রোবাস নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো ইউনিভার্সিটি ও কলেজের সামনে। যখন যে মেয়েকে তাদের পছন্দ হয়েছে, তাদের জোর করে তুলে নিয়ে গেছে আমোদ ফুর্তি করার জন্য। কোথাও ব্যাংক ডাকাতির খবর বঙ্গবন্ধুকে জানানো হলে তিনি আগে খোঁজ নিয়ে দেখতেন এটা তার কোন ছেলের কীর্তি কিনা। আবার যেই বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বাংলাদেশ গনতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করলো, তিনি নিজেই বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গনতন্ত্রের টুটি চেপে ধরলেন। অতএব যখন কোন প্রত্যক্ষদর্শী জানায় যে বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করার পর সেই খবর শুনে উদ্বেলিত জনগন এসে বিদ্রোহীদের ট্যাঙ্কে পুস্প অর্পণ করে গেছিলো, তখন খুব অবিশ্বাস করতে পারি না।
মুক্তিযুদ্ধের আরেক বীর জিয়াউর রহমান অগনতান্ত্রিকভাবে এসে ক্ষমতা দখল করেন। অগনতান্ত্রিকভাবে এলেও বঙ্গবন্ধুর বন্ধ করা গনতন্ত্রের পথ আবার এই ব্যক্তিই উন্মুক্ত করেন। পাশাপাশি নিজের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য মুক্তিযুদ্ধের পরাজিত শক্তিকেও এই মুক্তিযোদ্ধা নিজ হাতে ধরে এনে পুনর্বাসিত করেন, এবং নিজের পাশেই স্থান দেন। জিয়াউর রহমান যখন প্রেসিডেন্ট, তখন তার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন একজন রাজাকার। (আবার তার স্ত্রী যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন প্রেসিডেন্ট হলো বিশিষ্ট রাজাকার।) বাংলাদেশের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট বীর মুক্তিযোদ্ধা এই বাঙ্গালী বাংলা লেখতে পারতেন না। তিনি বড় হয়েছিলেন পশ্চিম পাকিস্তানে। কোথাও বাংলায় বক্তব্য দিতে গেলে বাংলা কথাগুলো তিনি কাগজে উর্দুতে আগে লিখে নিতেন। রাষ্ট্রপ্রধান হিসাবে জিয়াউর রহমান ছিলেন সৎ, নির্মোহ ও অত্যন্ত কড়া প্রকৃতির। রাষ্ট্রপ্রধান থাকা অবস্থায় নিজ পরিবারকে কখনও তিনি প্রশ্রয় দেননি এবং তার স্ত্রী বা সন্তানদের রাষ্ট্রপ্রধানের পরিবার হিসাবে কোথাও উপস্থাপন করেননি। একবার কক্সবাজারে তিনি সরকারি ট্যুরে গিয়েছিলেন হেলিকপ্টারে। তার স্ত্রী খালেদা জিয়া তখন তার বোনকে নিয়ে সড়কপথে কক্সবাজার গিয়ে হাজির হয়েছিলেন। আশা ছিলো কক্সবাজার ভ্রমণ হবে, তারপরে স্বামীর সাথে হেলিকপ্টারে করে তিনি আবার ঢাকায় ফিরতে পারবেন। কিন্তু জিয়াউর রহমান তার স্ত্রীকে আবার সড়কপথেই ফেরত পাঠান। কারণ হেলিকপ্টারটি শুধুমাত্র সরকারী কাজে ব্যবহারের জন্য, স্ত্রী নিয়ে প্রমোদের জন্য নয়। (সেসময় আমরা কক্সবাজার থাকতাম।) এই জিয়াউর রহমানের আমলে অসংখ্যবার আর্মির ক্যু হয় তার বিরুদ্ধে, এবং প্রতিবারই নিষ্ঠুরের মতো দোষী-নির্দোষ হাজার হাজার আর্মিকে কোর্ট মার্শালে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়, যার কোন হিসাব নেই। এবং অবশেষে আর্মির ক্যু-তেই প্রাণ হারান তিনি।
পরবর্তী ১১ বছরের এরশাদের শাসনামল স্বৈরশাসকের আমল হিসাবে বর্তমানে পরিচিত। এই ব্যক্তিও জিয়াউর রহমানের মতোই মার্শাল ল' দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তার দীর্ঘ শাসনামলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা থেকে নিয়ে নানারকম ব্যক্তিস্বাধীনতা রহিত থাকে। বিটিভিতে এরশাদের চেহারা যতোটা না দেখানো হয়, তার থেকে বেশি দেখানো হতে থাকে ফার্স্ট লেডি রওশন এরশাদকে। সেই প্রথম জাতি জানতে পারে যে প্রেসিডেন্টের পাশাপাশি ফার্স্ট লেডি নামেও একজন থাকেন যে কিনা প্রায় প্রেসিডেন্টার সমানই গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্রপতি দেশ চালালেও রাষ্ট্রপতিকে পরিচালনা করে থাকেন ফার্স্ট লেডি। গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নামে এরশাদ ভুয়া নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। সেই নির্বাচনে এরশাদের রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টি বিপুল ভোটে জয়ী হয়। কিন্তু ১১ বছরের মাথায় এরশাদের সাম্রাজ্য ভেঙ্গে পড়ে। বিপুল গনজাগরণের সাথে গনতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় আমাদের দেশে।
কিন্তু তারপর থেকেই আমরা জনগন ভোটের মাধ্যমে পিংপং বলের মতো ক্ষমতা একবার বিএনপি এবং একবার আওয়ামীলীগকে দিয়ে যাচ্ছি। আর প্রতিবারই তারা জনগনকে গনতন্ত্রের মূলো দেখিয়ে দেশটাকে যতটুকু পারে আরও ছিবড়ে বানানোর চেষ্টায় লিপ্ত হচ্ছে। স্বৈরাচারী এরশাদের পতনের পর তার স্ত্রী ও মন্ত্রী-আমলাদের বিরুদ্ধে যতো দুর্নীতির খবর প্রকাশ পায়, এর পরের কোন গনতান্ত্রিক দলও ক্ষমতায় গিয়ে তার থেকে কিছু কম করেনি। বিএনপির সর্বশেষ শাসনামলে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সুযোগ্য সন্তান শেখ মুজিবরের সন্তানদের মতো ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে ছাত্রী উঠিয়ে নিয়ে না এলেও গাজীপুরের বাগানবাড়িতে বিভিন্ন মডেলদের নিয়ে কম মৌজমাস্তি করেনি। নির্বাচিত সরকার তখন পরিচালিত হয়েছে হাওয়া ভবনের অনির্বাচিত রাজপুত্রের কলকাঠির ইশারায়। দুর্নীতি ও দালালির মাধ্যমে দেশ দেউলিয়া হয়ে গেলেও অনেকে টাকার পাহাড় বানিয়েছে বিদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে। আর বর্তমান আওয়ামীলীগের সরকারের কথা বলতে গেলেও ভালর চেয়ে খারাপের সংখ্যাই বেশি থাকবে। আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় এলেই প্রতিবার শেয়ার মার্কেটে ধ্বস নামে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে, দেখা যায় তাদেরই আবার সেখানের হর্তাকর্তা বানিয়ে বসিয়ে দেয়া হয়। আর আওয়ামীলীগের বর্তমান আচরণ তো পুরোপুরি গনতন্ত্রপরিপন্থী। বিরোধী দল আন্দোলনের ঘোষণা দিলে সরকার অঘোষিতভাবে হরতাল দিয়ে ঢাকাকে পুরো দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয় নিরাপত্তার নামে। ৭১-এর পাকিস্তানী দানব কিংবা স্বৈরশাসক এরশাদের মতো টুটি চেপে ধরে গণমাধ্যমের। বিরোধীদলের নেত্রীর ভাষণ সরাসরি সম্প্রচারে বাধা দেয় কোন নিরাপত্তার অযুহাত ছাড়াই! এ যেন ঠিক ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষন সম্প্রচার বন্ধ করার মতোই। এদিকে আমাদের দয়ার শরীর রাষ্ট্রপতি একে একে ক্ষমা করে যাচ্ছেন সন্ত্রাসী কুখ্যাত খুনীদের। এক দল আরেকদলের নামে কাঁদা ছুড়াছুড়ি এবং সংসদে নোংরা গালাগালি করাই আজ আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর মূল কাজ হয়ে দাড়িয়েছে। এভাবে চলছে, এবং এভাবেই সব চলবে মনে হচ্ছে, যতোদিন পর্যন্ত না আমরা পুরোপুরি অতলে ডুবে যাই।
৩)
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে আমরা কেউ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেই না। তাই সেই ফারাওয়ের আমল থেকে নিয়ে এখন পর্যন্ত ঘুরেফিরে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে সব জায়গাতেই। বনী ঈসরাইলের দিকে তাকালে বুঝা যায় যে সমস্যাটা তাদের জনগনের মধ্যেই ছিলো। তাই যতোভাবেই চেষ্টা করা হোক না কেন, তাদের ঠিক লাইনে আনা যায়নি। জনগন ঠিক না থাকলে কোন স্বাধীনতা, গনতন্ত্র বা অন্য কোন তন্ত্রই কোন কাজে আসে না। যেমন আসছে না আমাদের কাজে। আমরাই প্রতিবার ভোট দিয়ে হয় চোর নইলে জোচ্চোরদের ক্ষমতায় বসাচ্ছি। আর আশা করছি কেউ এসে গনতন্ত্রের সুফল আমাদের হাতে এনে তুলে দিয়ে যাবে এমনি এমনি। ভোট দেয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলের উর্ধ্বে উঠে যাকে ভোট দিচ্ছি তাকে বিচার করতে পারছি না। নিজের স্বার্থের চিন্তায় নিজেরাই কোন না কোনভাবে জড়িয়ে পড়ছি কোন এক রাজনৈতিক দলের সাথে, তাদের কর্মকান্ডকে সঠিক মনে না হলেও। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে দলের উপরে রেখে ব্যক্তিকে বিচার করতে পারছি না, আর নৈতিকতার ক্ষেত্রে নিজের উপরে রেখে দেশকে বিবেচনা করতে পারছি না। প্রতি ক্ষেত্রেই কোন না কোন একটা কিছু দিয়ে আমরা প্রভাবিত, এবং ব্যালেন্স থেকে বিচ্যুত। যারা ধর্ম নিয়ে বেশি স্পর্শকাতর, তারা রাজাকারকে ধর্মের সাথে গুলিয়ে ফেলছি। যারা নাস্তিক তারা ধার্মিকদের কটাক্ষ করে যাচ্ছি। যারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ, তারা এর বিপরীত কোন গঠনমূলক সমালোচনাও শুনতে নারাজ। কেউ কিছু বলতে গেলেই তার গায়ে রাজাকারের ছাপ মেরে দিচ্ছি। ইন্টারনেটের ব্লগার থেকে নিয়ে সংসদে জনগণের প্রতিনিধি কেউই বিরোধী মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে গালিগালাজ থেকে বিরত থাকতে পারছি না।
যেভাবে সব চলছে, তাতে ভয় পাচ্ছি যে বনী ঈসরাইলদের মতো কোন একসময় আমরাও না আবার বলে বসি যে পাকিস্তান বা বৃটিশ আমলেই আমরা আসলে সুখে ছিলাম। তাই চলো আবার পাকিস্তান বা ভারতের সাথে এক হয়ে যাই। সেক্ষেত্রে বনী ঈসরাইলের মতোই আমাদের এই হতভাগা জাতিকেও যে কতো বছর দুর্ভোগ পোহাতে হবে তা একমাত্র উপরওয়ালাই জানে
(লেখাটি ইতিপূর্বে বকলমে প্রকাশিত হয়েছে)
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে মার্চ, ২০১২ রাত ১:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


