somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অতিপ্রাকৃত গল্পঃ ফুড ডেলিভারি সার্ভিস (শেষ পর্ব)

০৪ ঠা জুলাই, ২০২০ রাত ১০:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



প্রথম পর্ব

জেনির সাথে আমার পরিচয়টা রেস্টুরেন্টের মাধ্যমেই । দিন দিন আমার কাজের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছিলো । অর্থ্যাৎ আমাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বেশি সংখ্যক ডেলিভারি করতে হচ্ছিলো । সাইকেল থেকে স্কুটিতে এসেছেও আমি ঠিকমত কুলিয়ে উঠছিলাম না । আমার নিজের কাছেও মনে হচ্ছিলো যে আরেকজনকে যদি কাজে নেওয়া হত, তাহলে হয়তো আমার কাজটা আরও একটু সহজ হত !

প্রায় দেড় মাস কাজ করার পরে একদিন রাতে যথারীতি রেস্টুরেন্টে হাজির হলাম অর্ডার নেওয়ার জন্য । স্কুটিটা পার্ক করতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম সেখানে আরেকটা স্কুটি পার্ক করা রয়েছে । এটা আমার কাছে খানিকটা নতুন মনে হল । আমি গত দেড় মাসে একদিনও দেখি নি রাতের বেলা এখানে কোন গাড়ি পার্ক করা রয়েছে । পুরো গ্যারেজটা ফাঁকা থাকে । অন্তত আমি যত সময় থাকি তত সময় কোন গাড়ি থাকে না ।
তবে এটার ব্যাপারে খুব বেশি কৌতুহল দেখালাম না । আমার এসব ব্যাপারে কৌতুহল দেখানোর কথা না । আমি সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম । আজকে আমার জন্য নতুন কিছু অপেক্ষা করছিলো । রেস্টুরেন্টে ঢুকেই আমি মেয়েটাকে দেখতে পেলাম । এই পরিবেশের সাথে বড্ড বেমানান । আমার কফির কাপ সেখানে রাখা, সেই টেবিলের উল্টো দিকে মেয়েটা বসে কফি খাচ্ছে । আমি কোন দিকে না তাকিয়ে আমার কফির কাপের সামনে গিয়ে বসলাম । কফির কাপের নিচেই আমার নীলখাম রাখা ছিল । সেটা পকেটে ভরে কফির কাপে চুমুক দিলাম ।
মনের ভেতরে একটা ইচ্ছে কাজ করছিলো যে সামনে বসা মেয়েটার সাথে একটু কথা বলি কিন্তু সেটা বললাম না । নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে নিলাম ! তবে দেখলাম মেয়েটি নিজ থেকেই আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল ।

-হ্যালো! আমি জেনি!
একটু ইতস্তর করে আমি হাতটা ধরলাম । তারপর বললাম আমি অপু !
-তুমি কত দিন ধরে কাজ কর এখানে ?
-এই মাস দেড়েক!
-অনেক দিন । আমি গতকালকে জয়েন করেছি । আমি তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারি নি যে প্রতিদিন এরা দুই হাজার টাকা দেবে ! তোমাকে দেয় তো টাকা পয়সা ঠিক মত ?
আমি বললাম, হ্যা ! একদম নিয়মিত । এখনও একদিনও পেমেন্ট মিস হয়নি !
মেয়েটার মুখে একটা হাসি দেখতে পেলাম ! আমার কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে মেয়েটা যেন একটু শান্তি পেল ! তারপর বলল, রেস্টুরেন্ট টা নতুন তাই না ? একদিন ভাবছি বন্ধুদের নিয়ে আসবো ! আচ্ছা কেবল কি আমরাই কাজ করি এখানে ? আর কেউ করে ?
-আমি যতদুর জানি, না । এতো দিন আমি একা ছিলাম । আজকে তুমি যুক্ত হলে !
-আচ্ছা আচ্ছা!

আমি কিছু বলতে গিয়েও বললাম না । মেয়েটার কেমন কৌতুহলী চোখ নিয়ে সব দিকে তাকাচ্ছে । এটাই আমার কাছে ভাল লাগলো না । গতকাল কি জেনিকে ওরা ঠিক মত ব্রিফ করে নি ? মেয়েটা মনে হচ্ছে এই কাজটা ঠিক মত করতে পারবে না ।

কফি শেষ করে আমাদের পার্সেল চলে এল । দুজনে এক সাথেই নিচে নামলাম । জেনিকে দেখলাম নিজ থেকে এগিয়ে এসে আমার কাছ থেকে নাম্বার নিল । বলল যেহেতু আমরা কলিগ, আমাদের মাঝে যোগাযোগ থাকা দরকার !
স্কুটি নিয়ে বের হতে যাবে তখন আমি জেনিকে বললাম, জেনি !
-বল!
-তোমার কাজ কেবল পার্সেল পৌছানো! ঠিক আছে । অন্য কিছু খেয়াল করবে না অন্য কিছু নিয়ে ভাববেও না !
-এই কথা কেন বলছো?
-না মানে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি । কৌতুহল দেখাবে না এবং কোন কিছুতে ভয় পাবে না । তাহলেই সব কিছু ঠিক থাকবে !
জেনি কি বুঝলো কে জানে ! স্কুটি নিয়ে বের হয়ে গেল । আমি নিজেও বের হয়ে গেলাম নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে !


তারপর থেকে আমাদের প্রতিদিনই দেখা হতে লাগলো । আমরা একই সাথে ফুড পার্সেল নিতে রেস্টুরেন্টে যাই । কফি খেতে খেতে কথা বলি । জেনি নানান কথা বলে । বেশির ভাগ সময়ই আমি চুপ করে শুনি ! ঠিক সাত দিনের মাথায় রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখি জেনি আসে নি । প্রতিদিন আমার আগেই চলে আসে ও । সেদিন এল না । তার পরের দিনও না । ওকি কাজ ছেড়ে দিল ? নাকি আমি চলে যাওয়ার পরে আসে ? কে জানে ! তারপর আর আজকে এই মেয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছে এখানে ! কত কথা বলছে !

জেনি বলল, তুমি জানো ঐ বক্সের ভেতরে কি থাকে ?
আমি বললাম, কি থাকে ?
-তুমি বিশ্বাস করবে না কি থাকে !
একবার মনে হল জেনিকে বলি যে কি থাকে না থাকে সেটা আমার জানার দরকার নেই । আমি জানতে চাই না । কিন্তু একটু যে কৌতুহল হচ্ছিলো না সেটা বলবো না !
জেনি বলল, গত পরশু দিন আমার সাথে একটা ভয়ানক ঘটনা ঘটেছে ।
-কি ভয়ানক ঘটনা ?
জেনি একটু সময় চুপ করে তাকিয়ে রইলো টেবিলের উপরে রাখা খাবারের প্লেটের দিকে । তারপর বলল, তুমি তো জানো আমাদের কন্ট্রাক্টের একটা রুলস হচ্ছে ডেলিভারির সময়ে আমাদের কোথাও থামা চলবে না !

হ্যা । এই নিয়ম টা আছে । ডেলিভারির সময় আমাদের রেস্টুরেন্ট থেকে সোজা কাস্টোমারের বাড়ি, সেখান থেকে অন্য বাড়ি । মাঝে কোথাও থামা চলবে না । আমি কেবল মাথা ঝাকালাম !
জেনি বলল, আমার চা খাওয়ার সখ একটু বেশি । সেদিন যাওয়ার পথে দেখি পথের মাঝে একটা চায়ের দোকান । লোভ সামলাতে পারলাম না । স্কুটিটা এক পাশে দাড় করিয়ে চা খেয়ে নিলাম এক কাপ । তারপর আবারও রওয়ানা দিলাম । কিন্তু কিচু দুর যেতেই আমাকে দুইটা পুলিশ থামালো । টহল দিচ্ছিলো । আমাকে বলা হয়েছিলো যে কোন পুলিশি ঝামেলা হবে না । আর হলেও তারা সামলে নিবে ।

আমি জেনির দিকে তাকিয়ে রইলাম । আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি জেনি কি বলে । জেনি বলে চলল, পুলিশ দুজন আমাকে বেশ কিছু সময় ধরে নানা রকম প্রশ্ন করলো । তারপর আমাকে ব্যাগের ভেতরে থাকা পার্সেল বের করতে বলল । সেগুলো তারা খুলে দেখবে । যদিও খুব একটা ভয় করছিল না আমার । প্যাকেটের ভেতরে যদি অবৈধ কিছু না থাকে, কেবল খাবার থাকে তাহলে তো আর আমার চিন্তার কোন কারণ নেই । আমি একটা প্যাকেট বের করে দিলাম । পুলিশ দুজন হাতে নিয়ে কিছু একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগলো । তারপর একজন একটা পেনসিল নাইফ বের করল। মাঝ বরাবর কেটে ফেলল ।

লাইন গুলো বলে জেনি কিছু সময় আবার চুপ করে রইলো । আমি লক্ষ্য করলাম এই এসির ভেতরেও জেনির কপালে একটু একটু ঘাম জমেছে । আমি বললাম, কি দেখলে তুমি?
একটু দম নিয়ে জেনি আবার বলল, প্যাকেট টা খুলতেই চারিদিকে একটা তীব্র কটু গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল । আমার মনে হল আমি জীবনে এতো তীব্র পঁচা গন্ধ কোন দিন পাই নি । আমার নাড়ি ভূড়ি সব উল্টে এল । ল্যাম্প পোস্টের আলোতে দেখতে পেলাম প্যাকেটের কাটা অংশ থেকে মুরগির পঁচা নাড়িভূড়ি বের হয়ে এসেছে । আমার মত পুলিশ দুই জনও তীব্র ভাবেই অবাক হয়েছে । তারা যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না যে কেউ মুরগির পঁচা নাড়ি ভূড়ি এভাবে প্যাকেট করে নিয়ে যেতে পারে । একজন আমার দকে তীব্র রাগের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বলল, এগুলো কি? তুমি না বললে খাবার ! এ ……
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো সে তার আগেই তার ফোন বেজে উঠলো । ফোনের দিকে তাকাতেই সে সোজা হয়ে গেল । তারপর ফোন টা ধরেই বলল, জি স্যার !
দেখতে পেলাম তার মুখের ভাব বদলে গেছে । সে বলার চেষ্টা করলো
জি স্যার ! না মানে ……।। জি স্যার ! জি আচ্ছা স্যার ……

আমি বললাম, এর পর?
জেনি বলল, আমাকে অবাক করে দিয়ে পুলিশ লোকটা বলল, সরি ম্যাডাম, আমরা আসলে বুঝতে পারি নি । প্লিজ কিছু মনে করবেন না ।
তারপর পাশের লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, এই রশিদ গাড়িতে স্কচটেপ আছে । জলদি নিয়ে আসো তো । কুইক !

পুলিশের গাড়িটা আমাদের থেকে একটু দুরেই দাঁড়িয়ে ছিল । লোকটা সেখানে থেকে দ্রুত স্কচটেপ নিয়ে এল । তারপর নিজ দায়িত্বেই ওরা প্যাকের কাটা অংশ টেপ দিয়ে আটকে দিলো এবং সেটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল । আমার কেন জানি সেটা আর নিতে ইচ্ছে করলো না । একটা ঘেন্না করতে লাগলো ।

পুলিশ দুজন নিজেদের গাড়ি নিয়ে যেতেই আমার ফোনে ফোন এসে হাজির । ওপাশ থেকে বলল, আমাদের কাস্টমার ক্ষুদার্থ ! জলদি যাও ……
কন্ঠটা এতো ঠান্ডা ছিল যে আমার পুরো শরীর কেঁপে উঠলো । আমার সেটা অমান্য করার কোন শক্তি ছিল না। আমি আপনা আপনি স্কুটিতে চেঁপে বসলাম ।

আমার মনের ভেতরে কেমন একটা অদ্ভুত মিশ্র প্রতিক্রিয়া হল । অন্য সময় কিংবা অন্য কোন বিষয় হলে হয়তো আমি জেনির সাথে একমত হতাম । তবে এখন কেন জানি আমার কাছে ব্যাপারটা মোটেই খারাপ কিছু মনে হল না । কেবল মনে হল কেউ যদি মুরগির নাড়ি ভুড়ি খায় । খাক ! আমার কি ? আমার কাজ হচ্ছে সেগুলো তার কাছে পৌছে দেওয়া এবং বিনিমনে টাকা নেওয়া । অন্য কিছু আমার ভাবার দরকার নেই ।
জেনির কথা আমি অবিশ্বাস করলাম না । আমার মনে হল জেনি সত্য কথা বলছে । এর পেছনে আরেকটা কারণও আছে । যে বড় ভাই আমাকে এই চাকরিটা জোগার করে দিয়েছে, তার কাওরান বাজারে মুরগির আড়ত আছে । সুতরাং প্যাকেটের ভেতরে এই বস্তু গুলো কোথা থেকে আসে সেটা মেলাতে আমার কষ্ট হল না । কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কোন মানুষ কি এই পঁচা জিনিস গুলো খেতে পারে? আদৌও কি সম্ভব ?
কেন খাবে?

আমি জেনির দিকে তাকিয়ে বললাম, আচ্ছা বুঝলাম । কিন্তু সেটা কি সমস্যা আমি তো বুঝতে পারছি না । হ্যা ঠিক আছে পচা নাড়িভূড়ি নিয়ে যাচ্ছো । কিন্তু এতে আমার তোমার কি সমস্যা ? হতে পারে এটা ওরা কোন প্রাণীকে খাওয়ায়?
জেনি যেন খানিকটা অবাক চোখেই আমার দিকে তােকিয়ে রইলো । তারপর বলল, তোমার কাছে এটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে?
-না । স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না । কিন্তু জগতে কতই না অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে । আর আমরা সে কাজ করছি সেটার পেমেন্ট কি স্বাভাবিক ? বল স্বাভাবিক ? কিছু অস্বাভাবিক কাজের জন্যই আমাদের কে এতো টাকা দেওয়া হচ্ছে । তবে কাজটা অস্বাভাবিক হতে পারে অন্যায় না । অন্যায় কি?

জেনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় । যেন বুঝতে চেষ্টা করছে আমার মনভাব ! তারপর বলল, তুমি যদি ওদের চেহারা দেখতে তাহলে এই কথা বলতে না !
-তুমি দেখেছো ওদের?
-হ্যা । কি বিভৎস ওদের চেহারা সেটা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না । ঐদিনই আমি পার্সেল নিয়ে আবারও রওয়ানা দিলাম । তিনটার ভেতরে দুইটা পার্সেল জায়গা মত স্থানে পৌছে দিলাম । তবে তৃতীয়টা পৌছাতে গিয়ে আমার কেমন যেন ভয় করতে শুরু করলো । আমার একদম প্রথমদিনই আমি এখানে এসেছিলাম পার্সেল দিতে । একটা চার তলা বিল্ডিং ! কাস্টোমার তিন তলায় থাকে । আমি ধীর পায়ে উপরে গেলাম সিড়ি দিয়ে । আমার বুকের ভেতরে একটা দুরু দুরু অনুভূতি হচ্ছিলো ।

জেনির চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারছিলাম ও একটা ভয় অনুভব করছে । যেন সেই দৃশ্যটা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে ও । জেনি টেবিলের উপরে রাখা গ্লাস থেকে ঢকঢক করে পানি খেল । তারপর বলল, আমি কলিং চাপ দিলাম । একবার দুবার তিন বার ! অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিলো । বারবার মনে হচ্ছিলো যেন দৌড় দিয়ে চলে যাই । আরও একবার কলিংবেল চাপ দিলাম । তারপরই আমি প্রতিদিনের মত যা হওয়ার তাই হল । তীব্র একটা বোটকা গন্ধ পেলাম । তারপর ভেতর থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম । আমাকে বলা হল আমি যেন প্যাকেট রেখে চলে যাই । আমিও এটা শোনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম । আমি প্যাকেটটা নিচে রেখে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াই । করিডোর দিয়ে সিড়ি পর্যন্ত যেতেই আমি পেছন থেকে দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম । অন্যান্য দিন সাধারনত এরকম হয় না । রাত নিতব্ধ থাকে । আমি যখন বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে আসে কিংবা সিড়ির দিয়ে কয়েকধাপ নেমে আসি তখনই দরজা খোলার আওয়াজ পাই । কোন দিন সেটাও পাই না । কিন্তু আজকে এতো জলদি কেন দরজা খুলে গেল সেটা আমি বুঝতে পারলাম না । সম্ভবত আজকে আমার পৌছাতে একটু দেরি হয়েছিলো বলেই দরজাটা খুলে গেল।

কথা গুলো একভাবে বলেই জেনি চুপ করলো কিছু সময়ের জন্য । এবার আমি নিজে ওকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলাম । এবার সত্যিই আমি নিজে খানিকটা চিন্তিত হলাম জেনির চেহারা দেখে । মেয়েটা সত্যিই ভয় পেয়েছে সেটা বুঝতে মোটেও কষ্ট হল না আমার । আমি বললাম, তুমি যদি না বলতে চাও তাহলে বলতে হবে না । আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি ।
জেনি বলল, না। আমি তোমাকে বলি । তাহলে হয়তো তুমি ব্যাপারটা বুঝতে পারবে !
আমি ওকে আরও একটু দম নেওয়ার সময় দিলাম । জেনি নিজেও যেন একটু সময় নিল । আমার মনে হল যেন ও মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছে কথা গুলো। জেনি আবারও বলতে শুরু করলো, আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার খুব চেষ্টা করলাম । কিন্তু খুব একটা কাজ হল না । আমি পেছনে তাকিয়ে ফেললাম । ঠিকই দরজাটা পুরোপুরি খুলে গেল । তার সেই জিনিসটা বের হয়ে এল ।

জেনির চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল যে ও এখনও চোখের সামনে তাকে দেখতে পাচ্ছে ।

-ওটাকে আর যাই বলা হোক, মানুষ কোন ভাবেই বলা যাবে না । কোন ভাবেই না । লম্বায় আমার সমানই হবে । মানুষের মতই গড়ত । চোখ মুখ হাত সবই রয়েছে । তবে সেগুলো মানুষের মত নয় । মুখের স্থানে অনেকটা লম্বা ঠোঁট রয়েছে । কাল ঠোঁট । পাখিদের যেমন হয় । আরও ভাল করে বললে কাকের যেমন হয় । সেই ঠোঁটের উপরেই নাকের ফুটো । তার একটু উপরে চোখ । মানুষের মত গলা থেকে বুক আর কোমর । তবে সেগুলো বেশ সরু ! পা আর হাতের নিটে চারটা করে আঙ্গুল । তিনটা একদিকে বাকি একটা অন্য দিকে ।
পুরো শরীরে কোন পোশাক নেই । তবে কালো আবরন রয়েছে । সেটা আমার দিকে কিছু সময় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো । আমি যে ঘুরে দাড়াবো সেটা সম্ভবত আশা করে নি । চোখ দুটো মানুষের মত না । অনেকটা গোল গোল । তার ভেতরে কালো চোখের মনি । আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে স্থির ভাবে ।

আমি চুপচাপ শুনে গেলাম । কি যে বলবো সেটা বুঝতে পারছি না । কি বলা উচিৎ ?
কিছু যে একটা অস্বাভাবিক কাজ আমি করছি সেটা আমি শুরু থেকেই জানতাম । তবে সেটা যে এমন হবে সেটা তো বুঝতে পারি নি ।

জেনি বলল, সেটা তারপর দ্রুত প্যাকেট টা নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল । পুরো পথ আমি কিভাবে এসেছি কেবল আমি জানি । আমার মনে যে কি ভয় ধরে গেছে সটা আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারবোনা ।
আমি বললাম, তুমি কি করতে চাও?
-জানি না কি করবো তবে আর যাচ্ছি না আমি । তোমারও যাওয়া উচিৎ না। তোমার সেফটির জন্যই আমি বললাম। আমি যাবো না ওখানে । বুঝতে পেরেছো কি ! তবে আমি চুপও থাকবো না। এই সব ভয়ংকর প্রাণী আমাদের মাঝে রয়েছে । না জানি ওরা কি করবে ! আমি কালই পুলিশের কাছে যাবো । আমার এক বন্ধুর বাবা পুলিশে আছে। তাকে খুলে বলবো । অন্তত ঐ রেস্টুরেন্টে আর যে কয়টা বাড়ি আমি চিনি সেখানে পুলিশ নিয়ে যাবোই । বেটাদের ধরবো তারপর দেখা যাক কি করা যায় !

আমি জেনির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলাম । মনের ভেতরে অদ্ভুত সব চিন্তা ভাবনা কাজ করছে । কিছুতেই আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না । জেনি যা বলেছে সেটা আমি মোটেই অস্বীকার করছি না । অন্য কেউ ওর কথা এতো সহজে বিশ্বাস করবে না আমি জানি । কিন্তু পুরোপুরি ভাবেই বিশ্বাস করেছি । তাহলে এখন আমার কি করা উচিৎ ?
জেনির কথা মত কাজ কর্ম বাদ দিয়ে দেওয়া উচিৎ ? আমিও জেনির সাথে সুর মিলিয়ে ঐ প্রাণীদের কে ধরিয়ে দিবো ?
নাকি কিছুই হয় নি ভেবে আগের মতই পার্সেল সার্ভিস দিয়ে যাবো ?

একটা ব্যাপার আমি খুব ভাল করেই বুঝতে পারছি যে যদি জেনির সাথে হাত মিলাই তাহলে প্রতিদিন আমার পকেটে যে দুই হাজার টাকা করে আসছে সেটা আর আসবে না । সেটা বন্ধ হয়ে যাবে । দেশের পরিস্থিতি খুব সম্প্রতি ভাল হবে বলে আমার মনে হয় না । আমি তখন কি করবো ?
আর মেনে নিলাম যে তারা মানুষ না । কিন্তু আমার কি কোন ক্ষতি করছে ? এই যে এতোদিন আমি ওদের বাসার সামনে গিয়ে হাজির হলাম যদি আমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছে ওদের থাকতো তাহলে তারা ঠিকই ক্ষতি করে ফেলতো ! তাহলে নিশ্চিত একটা অর্থ প্রাপ্তির পথ আমি কেন বন্ধ করবো ? আর অন্যকেই বা কেন বন্ধ করতে দিবো ?

আমি বাসার নিচে এসে আবারও স্কুটিটা ঘুরিয়ে ফেললাম । সোজা হাজির হলাম রেস্টুরেন্টের সামনে । আমি দিনের বেলা যতদিন এখানে এসেছি ততদিন দরজা বন্ধই পেয়েছি । কিন্তু আজকে আমাকে অবাক করে দিয়েই দরজার একটা পাল্লা মনে হল খোলা । আমি স্কুটি টা সামনে পার্ক করে দরজা দিয়ে ঢুকে গেলাম ভেতরে !

সেদিনের সেই কম বয়সী লোকটা আমার দিকে বেশ কিছু সময় তাকিয়ে রইলো । আমি এতো সময়ে জেনির কাছ থেকে যা শুনেছি সবই বলে দিয়েছি । সে শান্ত মুখে আমার কথা শুনলো । তারপর বলল, তোমার মনে হয় যে জেনি যা বলেছে সব সত্যি?
আমি ইতস্তত করে বললাম, হ্যা সত্যি ।
-তারপরেও তুমি এসেছো ?
-হ্যা ।
-কারণ কি জানতে পারি কি?
-কারণটা খুবই স্বাভাবিক । আমি আগে থেকেই জানতাম যে কাজ আমি করছি তার ভেতরে কিছু তো অস্বাভাবিকতা আছে । আর কাজ টা যেহেতু অবৈধ না, এবং সেই প্রাণী গুলো মানুষ হোক বা না হোক তারা মানুষের ক্ষতি করছে না । করছে কি ? তাহলে কেন আমি তাদের শান্তিভঙ্গ করবো ?

এইবার লোকটার মুখে হাসি ফুটলো । তারপর বলল, তোমার কথা শুনে খুশি হলাম । তুমি এখন আসতে পারো । জেনির ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে !
একটু ভয় হল । জেনিকে আবার না ওরা কিছু করে ফেলে । আমি বললাম, জেনিকে কি করবেন আপনারা?
লোকটা একটু হাসলো। তারপর বলল ভয় পেও না । আমরা খুন খারাবীতে বিশ্বাসী নই । তবে জেনির ব্যাপারে কিছু করতে হবে । যেহতু সে আমাদের ব্যাপারে হুমকি হয়ে দাড়াতে পারে । তুমি চিন্তা কর না । আমরা সামলে নিবো ।


আমার মনে তবুও জেনির জন্য একটু চিন্তা হতে লাগলো । মনে হল যে জেনির যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে সেটার জন্য আমিই দায়ী থাকবো । কিন্তু এখানে আমার আর কি বা করার ছিল । আমি যখন উঠতে যাবো তখন লোকটা আবারও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ইউ আর রাইট ! ওরা ডিফারেন্ট কিন্তু ক্ষতিকর না । আমাদের দেশে ভিন্নতাকে সবাই গ্রহন করতে পারে না, ভয় পায়, ক্ষতি করার চেষ্টা করে । আমরা কেবল ওদের একটু সাহায্য করছি । আর কিছু না ।
আমি হঠাৎ বলল, ওরা কারা?
দেখতে পেলাম লোকটার চোখ কেমন যে জ্বলে উঠলো । তবে সেটা নিভে গেল সাথে সাথেই । আমি বললাম, সরি, আসলে এই কৌতুহল আমি দমাতে পারলাম না ।
লোকটা বলল, ওরা কারা এটা জানার খুব একটা দরকার নেই । কেবল এই টুকু বলে রাখি যে ওরা এই পৃথিবীতে আছে অনেক দিন থেকে । অনেক দুর থেকে এসেছে, এখনও আসছে । আমাদের কাজ কেবল ওদের খাবার সরবারহ করা । বিনিময়ে আমরা এর অর্থ পাই । ঠিক আছে ?
-জি ঠিক আছে !


পরিশিষ্টঃ

রেস্টুরেন্ট থেকে আমাকে একটা বাইক কিনে দেওয়া হয়েছে । সেই সাথে প্রতিদিনের পেমেন্টের পরিমানটাও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে । তবে খাবার ডেলিভারির সময়টা একটু বেড়েছে এখন । আগে তিনটার ভেতরে সব শেষ করতে হত এখন চার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে । সেই সাথে আমাকে আরও একটু সুবিধা দেওয়া হয়েছে । আমাকে একটা আলাদা চাবি দেওয়া হয়েছে । চাবিটা অনেকটা মাস্টার কি এর মত । আমাকে এখন আর কাস্টমারদের বাসায় গিয়ে কলিংবেল চাপতে হয় না । এই চাবি টা দরজাতে প্রবেশ করালেই দরজা খুলে যায় । এই এক চাবি দিয়ে সব দরজা খুলে যায় । আমি দরজার কাছে প্যাকেট টা রেখে আবার দরজা বন্ধ কে চলে আসি । সুতরাং কাস্টোমার পেছনে আমার সময় কম খরচ করতে হয় । বেশি বেশি ডেলিভারি করা যায় !
আমি হিসাব করে দেখেছি, মাসের ভেতরে ঘুরে ফিরে পঞ্চাশটা বাড়িতে আমি খাবার সাপ্লাই করি । যদিও এখনও কারো সাথে আমার সামনা সামনি দেখা হয় নি । তবে একদিন তাদের সামনে থেকে দেখার বেশ ইচ্ছে আমার । আমার কাছে চাবি থাকা স্বত্ত্বেও কাজটা কারতে আমি ঠিক সাহস পাই না । যতই আমাকে বলা হোক যে ওরা আমার কোন ক্ষতি করবে না তারপরেও আমার এই সাহস এখনও হয় না যে ওদের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ি । প্রতিবার দরজা খুলতেই একটা বিদঘুটে গন্ধ এসে নাকে লাগে । যা একেবারেই সহ্য হয় না ! কোন মতে খাবার রেখেই চলে আসি !

জেনির সাথে আমার মাস খানেক পরে আবার দেখা হয়েছিলো । আমি ওকে ডাক দিলাম । আমার ডাক শুনে আমার দিকে ফিরে তাকালো । কিন্তু ওর চোখের দৃষ্টি দেখে আমি অবাক হলাম । আমার কাছে এসে বলল আমি ওকে চিনি কি না ! সে নাকি আমাকে চেনে না ! ঐ লোকটা বলেছিলো যে জেনির ব্যবস্থা ওরা নিবে । সম্ভবত এই ব্যবস্থা নিয়ে ফেলেছে ! জেনি আমাকে চিনতে পারছে না, এর অর্থ হচ্ছে ওর কিছু মনে নেই । মনটা খানিকটা শান্ত হল । জেনির আপাতত ঠিক আছে । যে ভয়টা পাচ্ছিলাম সেটা হয় নি ।


জেনির মত আমিও যদি বেশি কৌতুহল দেখাতে যাই তাহলে আমারও হয়তো এমন কিছু হবে । দরকার নেই এসব চিন্তা করার । আমার কাজ হচ্ছে ফুড ডেলিভারি করা । এর বিনিময়ে আমি টাকা পাই । আমি সেটাই করি বরং । এতো কৌতুহল দেখানোর কি দরকার শুনি !




(সমাপ্ত)

ব্লগার কল্পদ্রুম এর গল্পানুঃ দশচক্রের তিন চক্র এর প্রথম অনু গল্প ক্ষুধা থেকে এই গল্পের সুচনা ।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জুলাই, ২০২০ দুপুর ২:১৪
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

৪৫ বছরের অপ-উন্নয়ন, ইহা ফিক্স করার মতো বাংগালী নেই

লিখেছেন চাঁদগাজী, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ বিকাল ৫:০৫



প্রথমে দেখুন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিগুলো; উইকিপেডিয়াতে দেখলাম, ১০৩ টি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি আছে; ঢাকা ইউনিভার্সিটি যাঁরা যেই উদ্দেশ্যে করেছেন, নর্থ-সাউথ কি একই উদ্দেশ্যে করা হয়েছে? ষ্টেমফোর্ড ইউনিভার্সিটি কি চট্টগ্রাম... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ মাতানো ব্লগাররা সবাই কোথায় হারিয়ে গেল ?

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৩৪

ইদানিং সামু ব্লগ ব্লগার ও পোস্ট শূন্যতায় ভুগছে। ব্লগ মাতানো হেভিওয়েট ব্লগাররা কোথায় যেন হারিয়ে গেছেন।কাজের ব্যস্ততায় নাকি ব্লগিং সম্পর্কে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। আমি কিছু ব্লগারের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ৬৪

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:২৫



সুরভি বাসায় নাই। সে তার বাবার বাড়ি গিয়েছে।
করোনা ভাইরাস তাকে আটকে রাখতে পারেনি। তবে এবার সে অনেকদিন পর গেছে। প্রায় পাঁচ মাস পর। আমি বলেছি, যতদিন ভালো... ...বাকিটুকু পড়ুন

কবিতাঃ অমঙ্গল প্রদীপ (পাঁচশততম পোস্ট)

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১০ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১১:১৪

প্রদীপের কাজ আলো জ্বালিয়ে রাখা।
কিন্তু টেকনাফের একটি ‘অমঙ্গল প্রদীপ’
ঘরে ঘরে গিয়ে আলো নিভিয়ে আসতো,
নারী শিশুর কান্না তাকে রুখতে পারতো না।

মাত্র বাইশ মাসে দুইশ চৌদ্দটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণপ্রজাতন্ত্রী সোমালিয়া দেশে চাকরি সংকট

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১১ ই আগস্ট, ২০২০ রাত ১২:২০



গণপ্রজাতন্ত্রী সোমালিয়া সরকার মন্ত্রী পরিষদে কতোজান বিসিএস অফিসার আছেন? তাছাড়া সততার সাথে সোমালিয়া সরকার চাইলেও সঠিক ও যোগ্য মন্ত্রীপদে কতোজন বিসিএস অফিসার দিতে পারবেন?

(ক) মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় - একজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×