
- স্যার, দরজাটা লক করে দেই ?
- কেন, দরজা লক করতে হবে কেন !
- স্যার, আমাদের বাসায় আজ এক্কেবারে হিজিবিজি অবস্থা। প্রতিটি রুমে যেন একটা মাছের বাজার বসছে।
- বুঝলাম তােমাদের বাসায় আজ হিজিবিজি অবস্থা, তবে দরজা লক করতে হবে কেন ? দরজা লক করে আবদ্ধ ঘরে কি পড়াশুনা করা যায় ? আচ্ছা, এবার বাসার মাছ বাজারের বিষয়টা খোলাসা করে বলো তো ।
- আপনি জানেন না স্যার ! পূজার আর মাত্র তিন দিন বাকি। বাসার সবার মধ্যে শপিং করার প্রতিযোগীতা শুরু হয়েছে। ওর এইটা চাই তাে ওর ঐটা। ছােট ভাই মন্টু কি চায় জানেন স্যার ? সে এবার ব্যতিক্রম এক বায়না ধরেছে। পাশের বাসার প্রীতি আন্টির ছােট মেয়ে রিয়া’র সাথে সে এবার ডুয়েট ড্যান্স করবে।
- ভালো তাে। তাতে সমস্যা কি ?
- সমস্যা আছে স্যার। রিয়া তাে ভাইয়ের সাথে নাচতে চাচ্ছে না। রিয়া বলে কি, মন্টু নাকি অনেক মটকু। এজন্য স্যার মন্টুর মনটা অনেক খারাপ। আমার মা বলে, হ্যাঁ রে মন্টু, এ পাড়ায় তাে আরো অনেক মেয়েই আছে, তুই তাদের সাথে নাচবি। কিন্তু না, মন্টুর একটাই দাবি, সে রিয়া’র সাথেই নাচবে।
একটানে কথাগুলো শেষ করে মৃণাল। তাকে এক বছর যাবৎ বাসায় এসে পড়াচ্ছে সজীব। মৃনাল এবার ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে ভর্তি হলো আর সজীব ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। বয়সের ফারাক চুল পরিমান হওয়ায় তাদের সম্পর্কটাও মধুর। সজীব নিজেকে মাঝেমধ্যে একটু গম্ভীর রাখতে চাইলেও মৃণালের মিষ্টি কথার কাছে তাঁর হার মানতে হয়। গম্ভীরতা তখন দুষ্টুমিতে আছড় খায়।
- স্যার, একটা কথা বলি ?
- হুম
- স্যার, আপনি কি শপিং করেছেন ?
- হুম করেছি।
- কি কি কিনেছেন স্যার ?
- অনেক কিছুই কিনেছি। সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী, শার্ট, সানগ্লাস আর মায়ের জন্য একটা শাড়ি।
- তাই নাকি স্যার !
- হুম, তাই।
আসলে সজীব কিছুই কিনেনি। কিভাবে কিনবে সে। টিউশন করে যে’কটা টাকা পকেটে ঢুকে তা থেকে কিছু বাড়িতে পাঠিয়ে বাকিটা দিয়ে কােন রকম মাস কাটে তাঁর। মায়ের মলিন চেহারা যখন তাঁর মনের মধ্যে ভেঁসে উঠে তখন নিজের কথা আর ভাবতে ভাল লাগে না। বড়ই নিঃস্ব লাগে তখন। মায়ের কথা মনে পড়তেই চােখ দুটা ছলছল করছে সজীবের। কত দিন হলো মায়ের সাথে দেখা নেই। এবারের পুজাতেও বাড়ি যেতে পারে কিনা সন্দেহ।
সজীবের কাছে পূজা মানেই দুঃসহ স্মৃতি, বেদনায় ভরপুর। সে তখন প্রাইমারী স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করেছে মাত্র। ঐ বছর গ্রামে খুব ঘটা করে পূজার আয়োজন করা হয়েছে। পুরো গ্রাম জুড়ে সাঁজসাঁজ রব। ঢাক-ঢােলের শব্দে সবার মনে চরম উত্তেজনা। বিজয়া দশমীর দিন দুর্গাদেবীর বিসর্জনের আয়োজন চলছে। বড় নৌকায় উঠানো হলো মূর্তি। সজীবের বাবাও উঠলেন সেই নৌকায়। দুর্গা দেবীকে পানিতে বিসর্জন দেয়ার সাথে সাথে সবাই হইহুল্লোর করে ঝাঁপ দেয়। নদীর দু’পাড় জুড়ে অগনিত মানুষের ভীড়। উলুল ধ্বনি, শঙ্খ-ঘন্টা, ঢাক-ঢােলের তীব্র আওয়াজ। মূর্তি বিসর্জন দিয়ে ঘরে ফিরে সবাই। শুধু ফিরেনা সজীবের বাবা। সবাই বলাবলি করে, মা দূর্গা নাকি সজীবের বাবাকে চুলের গােছা ধরে তার সঙ্গী করেছেন। গ্রামের সবচেয়ে বয়স্ক মহিলা বললেন- এমন মরন নাকি সবার কপালে জােটে না!
- মৃনাল, আজ আমি যাই তাহলে।
- কি বলেন স্যার ! কিছু একটা খেয়ে যান। মা তাে আপনার জন্য নাড়ু তৈরী করেছে। খেয়ে যান স্যার।
- না মৃনাল। অন্যদিন খাবো।
চেয়ার থেকে উঠে পড়ে সজীব। বিদ্যুৎ গতিতে রুম থেকে বের হয় সে। মৃণাল তাঁর স্যারের বের হওয়ার দৃশ্যটা ভালভাবে খেয়াল করছে। একটু অন্যরকম লাগছে স্যারকে। ভরা নদী হঠাৎ শুকালে যেমন দেখায় তেমনই। মৃণাল জানে তাঁর স্যার এই পূজাতে কিছুই কিনেননি। কারণ গত এক বছর ধরেই স্যার তিনটা শার্ট পড়েই তাকে পড়াতে আসেন। শার্টগুলো কতটা বিবর্ণ হয়েছে তা মৃণালের চােখ এড়ায়নি। তবে কেন স্যারের এই সুক্ষ অভিনয় ?
পরের দিন যখন সজীব মৃনালের বাসায় যায় তখন সন্ধা ছ’টা। মৃণাল চুপচাপ চেয়ারে বসে আছে। ধীর,স্থির। চেহারাটা মলিন।
- কি হলো মৃনাল ? চুপচাপ বসে আছ কেন ?
- কিছু না স্যার। আজ আমার কিছুই ভাল লাগছে না। আচ্ছা স্যার, বলেন তাে মানুষ কেন এত অভিনয় করে ?
- বাঁচার জন্য। একটু ভালভাবে বাঁচার জন্য।
- বুঝলাম না স্যার।
- এই ধর তুমি কাউকে খুব পছন্দ করো। তা যেমন তুমিও জানো, সেও জানে। কিন্তু তােমরা দু’জন ভালবাসা প্রকাশ করার জন্য বিভিন্ন ধরনের অভিনয় করে যাচ্ছ। আবার মনে কর, আমাদের প্রিয় একজন মানুষ মারা গেলেন। এই শােক প্রকাশের জন্য আমরা একেক জন একেক ধরনের অভিনয় করেই যাচ্ছি।
স্যারের কথা শুনে মৃণালের মনে তৃষার চেহারাটা ভেঁসে উঠল। তৃষা কি আসলেই তাকে ভালবাসে ? নাকি অভিনয় ! দক্ষ অভিনেত্রীর সুক্ষ অভিনয়!
- কি রে মৃণাল, কি ভাবছো তুমি ?
- না স্যার, কিচ্ছু না।
মৃণাল আবার তাঁর স্যারের মুখের দিকে তাঁকিয়ে বলে-
- স্যার, একটা কথা বলবো ?
- হুম, বলো।
- আপনি কি কাউকে পছন্দ করেন, মানে ভালবাসেন ?
- না না, পাগল হইছো তুমি। আমার কি এখন ভালবাসার সময় আছে ? সময় এখন তােমাদের।
মৃণালের প্রশ্নটা শুনে সজীবের বুকে ধুরুম করে আঘাত লাগলো। এত বড় মিথ্যাটাকে সে কত দ্রুতই অভিনয় করে ঢেকে দিয়েছে। মৃণালদের বাসায় ঢুকতে গিয়ে গলির প্রথম বাসাটায় যে মেয়েটার সাথে তার গত একবছর ধরে চােখাচোখি হয় তাতেও তাে প্রেম আছে। ভালাবাসা আছে। পড়ার টেবিলে বসলে অজান্তেই মেয়েটার চেহারা মনের কােনে উঁকি দেয়। তাকে দেখলেই মনেহয় সব কিছুতেই তার উপর নির্ভর করা যায়। হাতটা ধরে পাড়ি দেয়া যায় সীমাহীন পথ। অনন্তকাল কাটানো যায় অজানা নগরের চাল-চুলোহীন কােন কুটিরে। সম্পুর্ণ অজানা একটা মেয়ে, অথচ তাঁর জন্য হৃদয়টা পুড়ছে। এটা কি ভালবাসা নয় ?
- মৃণাল, তােমার তাে ইদানিং পড়াশুনা মােটেই হচ্ছে না। পূজার পর আবার ভালভাবে শুরু করতে হবে কিন্তুু।
- হ্যাঁ স্যার, অবশ্যই শুরু করবো।
- আজ তাহলে যাই ।
- প্লীজ, একটু ওয়েট করেন স্যার।
একটু পর হাতে একটা রঙ্গিন পেকেট নিয়ে মৃণাল ফিরে এলো। সজীবের কাছে এসেই তাঁর দিকে পেকেটটি বাড়িয়ে দিল সে। সজীব কিছু বুঝে উঠার আগেই মৃণাল বলল- স্যার, মা আপনার জন্য এক সেট সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী কিনেছেন। পূজাতে অবশ্যই পড়বেন।
সজীব এমন একটা আকস্মিক ঘটনার জন্য মােটেই প্রস্তুত ছিল না। সে হাত বাড়িয়ে কিছুটা লাজুক ভঙ্গিতে পেকেটটা নিয়ে নেয়।
সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে মৃণাল তাঁর স্যারকে বলল-
- স্যার, এই ক’দিন তাে আর আপনার সাথে দেখা হবে না। তাই নবমী পূজায় আপনি আমাদের পাড়ার পূজামান্ডবে অবশ্যই আসবেন। আপনার সাথে একজনকে পরিচয় করিয়ে দিব।
- কে সেই একজন ?
- দেখা হলেই বলবো স্যার।
- ঠিক আছে মৃণাল, আমি আসবো।
(২)
আজ নবমী পূজা। পূজামান্ডব মানুষে গিজগিজ করছে। সজীব মৃণালদের দেয়া সাদা পাজামা-পাঞ্জবী খুব যত্ন নিয়ে পড়ল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে চিন্তে একটু অসুবিধাই হচ্ছে। এরকম শ্বেত-শুভ্র পােশাক আগে কখনো পড়া হয়নি। ছােট বেলায় প্রতি পূজাতে মা একটি শার্ট কিনে দিতেন। পাঞ্জাবীর কথা বললেই বলতেন- পরের পূজাতে কিনে দিবো বাবা। মায়ের এমন অপারগতার জন্য খুবই খারাপ লাগতো তাঁর। সেও হাসি মুখে বলতো- ঠিক আছে মা, পরের পূজাতেই কিনে দিও।
সজীব মান্ডবের গেইটে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে দাঁড়িয়ে থাকাটা খুবই বিশ্রী লাগে। সবাই কেমন জানি তাঁর দিকে হা করে তাঁকিয়ে আছে। এক অশ্বস্তিকর ব্যাপার। সেই গলির প্রথম বাসার ঐ মেয়েটি আজ আসবে কিনা কে জানে। কয়েকদিন তার সাথে হাই-হ্যালো হয়েছে ঠিকই তবে এখানে দেখা হওয়ার আশাটা বােকামি। আর দেখা হলেই কি? মেয়েটা কি তাঁর সাথে যেঁচে এসে কথা বলবে ? আর কথা বললেই সমস্যা কােথায় ? একটা স্বাধীন দেশে এক জােড়া স্বল্প পরিচিত কপোত-কপোতির কথা বলার স্বাধীনতা অবশ্যই আছে। ধুত্তরি, এসব কী ভাবছি আমি। লজ্জায় লাল হয়ে আসে সজীবের মুখ।
না, আর ভাল লাগছে না। কখন আসবে মৃণাল ? ছেলেটা ইদানিং ভারি পাঁজি হয়েছে। আমি নিশ্চিত আজ তাঁর প্রেমিকার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিবে। মানুষ শুনলে বলবেটা কি ! শিক্ষকের সাথে ছাত্রের প্রেমিকার পরিচয় পর্ব ! এসব ভেবে একটু লজ্জ্বাই পাচ্ছে সজীব। যাক, মানুষের কথা ভেবে লাভ নাই। মৃণালের আনন্দের জন্য একটু লজ্জা না হয় গায়ে মাখবে সে।
শরতের প্রথম প্রহরের লাল সূর্য যখন শহরের লাল দেয়াল বেয়ে উঁকি দিয়ে আস্তে আস্তে তীব্রতর হচ্ছে তখনই তার দিকে এগিয়ে আসা একটা মেয়েকে দেখে চমকে উঠে সজীব। গিজগিজ করা শতশত মানুষের মাঝে তাঁর মুখটা যেন একগুচ্ছ সােনালি আলোর ফুলকি। আরেকটু কাছে আসতেই মেয়েটাকে চিনতে আর অসুবিধা হয়নি। এ তো গলির মুখের সেই মেয়ে! যাকে দূর থেকে দেখেই স্বপ্নের জাল বুনেছে একের পর এক। তার ভাবনার প্রতিফলন এত সহজেই ধরা দিবে তা কল্পনাও করেনি সে।
সজীব খেয়াল করলো বিপরীত দিক থেকে মেয়েটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মৃণাল। যেন দুটি শান্ত নদী উত্তাল সাগরে এসে মিলিত হচ্ছে। মৃণালের গায়ে লাল টুকটুকে পাঞ্জাবী। পুরোদস্তর আভিজাত্যিক এক বাঙ্গালী ছেলে।
ওরা দু’জন মিলে সজীবের দিকে এগুচ্ছে। তাদের বাঁকা ঠোটের মিষ্টি আর পরিতৃপ্তির হাসি সজীবকে অন্য জগতে নিয়ে গেল। তাহলে কি এই মেয়ের সাথেই মৃণাল প্রেম করছে- নিজেকে প্রশ্ন করে সজীব। সে কী করবে এখন? দাঁড়িয়ে থাকবে নাকি পালিয়ে যাবে দূরে, বহুদুরে। পালিয়ে যাওয়া আর না যাওয়ার সময়টা বড় অস্বস্তিকর। বড়ই বেদনার, কষ্টের।
কোন একজন মহাজ্ঞানী বলেছেন- ছাত্রের কাছে শিক্ষকের অথবা পুত্রের কাছে পিতার হার নাকি বড়ই আনন্দের। কথাটির মর্মার্থ বুকে ধারণ করে পিছু হাঁটলো সজীব। যত দ্রুত সম্ভব এখান থেকে পালাতে হবে। কষ্টে বুকের পাজরটা চিনচিন করছে।
মৃণাল বিষয়টা টের পেয়ে অন্য একটা গলি দিয়ে তড়িৎ বেগে মেয়েটাকে সাথে নিয়ে সজীবের সামনে এসে দাঁড়ায়। সজীবকে কানেকানে বলে-
- স্যার, ওর নাম জ্যােতি, আমার ক্লাসমেট। খুবই ভাল মেয়ে। আপনাকে অনেক দিন ধরেই ফলো করে। খুব পছন্দও করে আপনাকে। সে আমাকে সবকিছুই বলেছে। এবার আপনার কিছু বলার থাকলে জটপট বলে ফেলেন স্যার!
এই মুহুর্তে সজীবের ঠোঁট জোড়া থেকে এক চিলতে লাজুক-মুচকি হাসি ব্যতিত আর একটা টু শব্দও বের হয়নি। সে দুর্গা দেবীর চরণ ধরে প্রণাম করবে নাকি জ্যােতির হাত ধরে এগিয়ে যাবে, তা তাৎক্ষণিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। শুধু দােলাচলে দুলতে থাকে তাঁর টানটান সরু-চিকন পা জোড়া।
** সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা **
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে অক্টোবর, ২০১৫ দুপুর ২:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




