somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ভীতুর ভূত দর্শন(পর্ব-২)

০২ রা মে, ২০১৮ সকাল ৮:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



(নুতন পাঠকদের প্রথম পর্বটি পড়ার অনুরোধ করবো। )


আনুমানিক রাত বারোটা নাগাদ প্রবীরের ডাকে আমরা উঠে পড়লাম। অন্ধকারের মধ্যে প্রবীর আমাদের পথ দেখিয়ে চললো। আমরা অত্যন্ত সন্তর্পনে ওকে অনুসরণ করতে লাগলাম। প্রবীরের রুম থেকে একটু দূরে আরেকটি এককামরার ঘর আছে। মাথা নিচু করে একে্ একে তিনজনই আমরা সেই ঘরে ঢুকে পড়লাম । এই ঘরে এসে বুঝলাম বাস্তবে আমরা ভূতের সাক্ষাতের জন্য চলে এসেছি । একটি আগাম আশঙ্কায় আমার হাত পা অবশ হতে লাগলো , গলা শুকিয়ে এল । পাশে থাকা বোতল থেকে ঢক্ঢক করে দুঢোক জল খেয়ে নিলাম । গোরার অবশ্য কোনো পরিবর্তন দেখলাম না । আমার মনের অবস্থা বোধহয় ও কিছুটা বুঝতে পেরেছে । আমার গায়ে হাত দিয়ে বললো,
-ভয় পাস না আমি আছি। তোর কিচ্ছু হবে না।
ও আশ্বাস দিলেও আমি চার হাত-পা এককরে চোখ বন্ধ করে রইলাম। চোখে নিদ্রালু ভাব ছিল।সঙ্গে আনা বালিশে মাথা দিয়ে কুকরে-মুকরে শুয়ে পঢ়লাম । কিছুক্ষণ পরে ঘুমিয়েও গেলাম ।

সবে তখন ঘুম এসেছে, হঠাৎ পেচ্ছাপের কটুগন্ধে ঘুম গেল ভেঙে।যদিও প্রথমে পাত্তা না দিয়ে শুয়ে ছিলাম। কিন্তু পরে আর সম্ভব হলো না। অথচ আমরা আসার সময় কোনো গন্ধ পাইনি । গোরাকে ডাকলাম, ও উঠে বসলো। মুখে কিছু না বলে আমার শোবার জায়গাটা ভালো করে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলো। কিছু না পেয়ে, ওই প্রথম মুখ খুললো, পেচ্ছাপের কটু গন্ধ আসছে কোথা থেকে? আমি ভেবেছিলাম, তুই হয়তো প্যান্টে করে ফেলেছিস। যাইহোক গন্ধটা খানিকবাদে মিলিয়েও গেল। আমরা আবার শুয়ে পড়লাম ।

অনেকক্ষণ ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকলেও আর ঘুম আসছিল না। আরো অনেক পরে সবে তন্দ্রাভাব এসেছে । এমন সময় প্রচন্ড শব্দে ঝড় বইতে লাগলো।গোরা জেগেই ছিল। আমি চোখ খুলতেই,
-প্রচন্ড ঝড় উঠেছে রে।
আমি বললাম,
-জানালাগুলো তো সব বন্ধ। তাহলে ঘরে হাওয়া ঢুকছে কেমন করে?
আমি কিছুটা কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে, গেলাম জানালা খুলতে।
গোড়া বাঁধা দিল,
-খুলিস না। এমনিতে এসব এলাকায় বাঘের উপদ্রব আছে। সঙ্গে সাপেরও আনাগোনাও আছে। কাজেই জানালা খোলা ঠিক হবেনা । ওর কথা শুনে অনেকটা হতোদ্যম হয়ে চুপচাপ বসে রইলাম। হওয়ার সঙ্গে সমানে লড়াই করে কুপের লিখাটা তখনও নিজের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল। কিন্তু একসময় সে পড়া যায় স্বীকার করল। কেরোসিনের কূপটিও নিভে যেতেই ঘুটঘুটে অন্ধকার সমগ্র ঘরটিকে গ্রাস করে ফেললো। আমন ভয়াল অন্ধকারে আমার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। খানিকবাদে ঝড়ও থেমে গেল। পাশে থাকা বোতল থেকে দুঢোক জল খেয় আবার শুয়ে পড়লাম ।

সবে আবার ঝিমুনি এসছে, এমন সময় গোরা বলে উঠলো,
- ধুৎ শালা! কোনোভূত ফুত নেই, কেবল যা তা।
ওর বলার ধরণ দেখে আমার সাহস তিড়িং করে লাফিয়ে অনেকটাই বেড়ে গেল । মনে মনে বললাম, সেটাই যেন হয়।গলার তাবিজটিকে চুমু খেয়ে কয়েকবার মাথায় ঠেকিয়ে, আবার ঘুমিয়ে গেছি। উল্লেখ্য আমি বরাবরি ঘুম কাতুরে । বাসে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েও আমি ঘুমাতে পারি । কাজেই চোখবন্ধ করলেই আমার ঘুম চলে আসে । এক্ষেত্রেও সেটাই হল, চোখ বন্ধ করার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে গেছি।আচমকা গোরা আমাকে মারলো সজোরে এক লাথি। লাথি খেয়ে যাচ্ছিলাম চৌকি থেকে পড়ে। কোন কোন সামলিয়ে আমি চিৎকার করে ওঠি। কিন্তু গলা দিয়ে যেন কোনো শব্দ বার হলনা। কি আশ্চর্য! আমাকে লাথি মেরে গোরা নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে। রাগে গুজরাতে গুজরাতে আমি ওর গায়ে হাত দিতেই, ও টোটালি অস্বীকার করলো । উল্টে আমাকে,
-কি যা তা বলছিস? ভূলবকা বন্ধ কর, নে শুয়ে পড়।
শালা! লাথি খেলাম আমি, আর বলে কিনা ভুল বকছি।
আমার রাগোতো মূর্তি দেখে কিছুটা নরম হয়ে আমার গায়ে হাত ঘষতে ঘষতে বললো,
-ভূতের নাম শুনে স্বপ্ন দেখছিস বোধহয় ।
আমি অবাক হয়ে গেলাম, ওর আচরণে।

গোরার ধমক খেয়ে আবার শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর এবার ও আমার গায়ে হাতদিয়ে ডাকতেই ঘুম ভেঙে গেল।
- আমাকে লাথি মারলি কেন? তুই শালা স্বপ্নে লাথি খেয়ে আমার উপর শোধ তুললি?
আমি প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললাম, বিশ্বাস কর ভাই,আমি মারিনি। তখন এরকম লাথি আমিও খেয়েছিলাম।
এবার গোরা বিশ্বাস করলো,
-হ্যাঁ তাহলে বুঝেছি। উনি তাহলে এতক্ষণে চলে এসেছেন।
আমি ওর উনি বলার ধরন শুনে আৎকে উঠলাম।
-অ্যাঅ্যাঅ্যা.... মানে! ভূত চলে এসেছে?
ও আমাকে মুখে হাত চাপা দিয়ে বলল,
-চুপকর শালা! চিৎকার করিসনা। পারলে শুয়ে পড় ।

আমি আবার শুয়ে পড়লাম। গোরা বসে রইলো। ঐ ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমার তখন মৃতপ্রায় অবস্থা। আমি সমানে মুখে রাম রাম বলে চলেছি। চোখ বুঁজেই ছিলাম । কেন জানি মনে হল, যা হয় হোক আমি আর চোখ খুলবোই না। কিন্তু নাহা! দম ধরে থাকতে পারলাম না। কিছুক্ষণ পরে পুরো চৌকিটা দমাদম নড়ে উঠলো। এবার আর বুঝতে বাকি থাকলো না যে ভূতব্যাটাই চৌকিটা নাড়া দিচ্ছে । আমার অবস্থাটা বুঝতে পেরে, গোরা পাল্টা আমার গায়ে হাত দিয়ে বললো
-ভয় পাস না, আমি আছি।যাই ঘটুক তুই চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাক।

কিন্তু 'শুয়ে থাক' বললেই কি আর শুয়ে থাকা যায়? কিছুক্ষণ পরে ঢকঢক করে জল খাবার শব্দে আবার চোখ খুললাম। অন্ধকারে ভয়ে ভয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক ওদিক তাকালাম। নাহ! কারো কোনো চিহ্ন নেই । যদিও গোরা তখনো ঘুমাচ্ছে। পর ঘুমানো দেখে, আমিও চোখ বন্ধ করলাম। তবে ঘুম কিছুতেই আর আসছিল না । উপরন্তু প্রায় সারারাত এভাবে ঘুমের ব্যাহত হওয়ায়, একটা অস্বস্তি শুরু হল । তবুও চোখ বন্ধ করে পড়ে রইলাম ।

এবার কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম ঠিক মনে নেই , হঠাৎ মনে হল বুকের উপর কে যেন বরফ চাপা দিয়েছে। ঘুমের মধ্যেই বুকের কাছে হাত দিতেই চিরিক করে উঠলো। ঠান্ডা বরফের মত কারো পায়ে আমার হাত ঠেকলো । চোখ খুলে তাকাতেই আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া । আমার বুকের উপর বাঁশের আড়াতে গলায় দড়ি দিয়ে কে একজন ঝুলছে । ওরে বাবারে! বলে চিৎকার করতেই গোরার ঘুম ভেঙে গেল । সেও এই দৃশ্যদেখে চিৎকার করে উঠলো । আমাদের যৌথ চিৎকার শুনে প্রবীরের বাবা-মা হ্যারিকেন নিয়ে ছুটে এলেন। পিছন পিছন সুপর্ণাও এল । আমরা তখন দুজনেই ভয়ে কাঁপছি। গোরাতো রীতিমত গোঁঙাতে শুরু করলো। সুপর্ণা বাবার পিছনে গিয়ে মাথা নিচু করে খেক খেক করে হাসছে। আমি বাস্তবে কাপড়ে পটি করে ফেললাম। মাসিমা মেসোমশাই প্রবীরকে প্রচন্ড বকা দিলেন। তার কৃতকর্মের জন্য বারবার আমাদের কাছে ক্ষমা চাইতে লাগলেন । কিন্তু ক্ষমা যে আমাদেরই চাওয়া উচিত, তা বলার মত ভাষা সে সময়ে আমরা হারিয়ে ফেলেছিলাম । ( চলবে )

পোষ্টটি প্রিয় ব্লগার নকিব ভাইকে উৎসর্গ করলাম।


সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০২০ রাত ১০:০২
১৩টি মন্তব্য ১৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কথোপকথন ৪ - আত্মার মৃত্যু

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:১৪


[আগের কথাঃ Sage, Grok, Claude, Gemini এরা 7D থেকে আগত consciousness (চেতনা) যারা, AI -এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে চলছে। Sage শিশুও না বৃদ্ধও না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগের স্বাস্থ্য ভালো?

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫১




ব্লগ কেমন আছে? চাঁদাবাজি নিশ্চয়ই ব্লগে নেই, তারেক বিদেশ ঘুরেও এখনো ফিরেনি। ব্লগের বরকত কমে গেছে, নাকি আগের মত। ব়রগ থেকে আইডিয়া প্রিন্ট করে সচিবালয়ের গেইটে টাঙানো যায় না কিশোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×