somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

পদাতিক চৌধুরি
আমি আমার নিরক্ষর কিন্তু বুদ্ধিমতী মায়ের কাছ থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছিলাম,যথাযথ কর্তব্য পালন করেই উপযুক্ত অধিকার আদায় করা সম্ভব। - মহাত্মা গান্ধী

ভীতুর ভূত দর্শন( শেষ পর্ব )

০৩ রা মে, ২০১৮ সকাল ৮:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শেষবার কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম ঠিক মনে নেই। হঠাৎ মনে হল বুকের উপর কে যেন বরফ চাপা দিয়েছে। ঘুমের মধ্যে বুকে হাত দিতেই কারো পায়ে আমার হাত ঠেকলো। চোখ খুলেইতো আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া। আমার বুকের উপর বাঁশের আঁড়াতে গলায় দড়ি দিয়ে কে একজন ঝুলছে।ওরে বাবারে! বলে চিৎকার করাতে গোরারও ঘুম ভেঙে গেল। সেও এই দৃশ্য দেখে চিৎকার করে উঠলো। আমাদের সমবেত চিৎকারে প্রবীরের বাবা-মা হ্যারিকেন নিয়ে ছুটে এলেন। পিছন পিছনে সুপর্ণাও চলে এলো। আমরা দুজনেই তখন ভয়ে কাঁপছি।মাসিমা মেসোমশাই প্রবীর সকলেই আমাদের সেবা শুশ্রূষা করতে ব্যস্ত। আর তারই মধ্যে বাবার পিছনে দাঁড়িয়ে কিছুটা মাথা নিচু করে সুপর্ণা খিক খিক করে হাসছে। গোরাতো রীতিমতো গোঁঙানি শুরু করে দিলো। আমার অবস্থা হয়েছিল ওর চাইতেও সঙ্গীন। আমি কথা বলার মত শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম। পিছন থেকে মনে হল ট্রাউজার্সটা চিটটিট করছে। বুঝলাম কাপড়ে পটি হয়ে গেছে। উপস্থিত সকলেই নাক চাপা দিলো। মাসিমা-মেসোমশায় প্রবীরকে প্রচন্ড বকা দিলেন,আর বারবার আমাদের কাছে ক্ষমা চাইতে লাগলেন।

ঐ রাতে আবার ভালো করে স্নান করে আমরা প্রবীরের ঘরে শুয়ে পড়ি। সুপর্ণা ঘুমানোর আগ পর্যন্ত বার কয়েক ঢুঁ মেরে গেল। তবে আমার আর ওসবের প্রতি মন ছিলোনা। আতঙ্ক তখন এতটাই গ্রাস করেছে যে এই ঘরেও ভূত আসতে পারে ভেবে হ্যারিকেনের নভটা অনেকটা বাড়িয়ে দিলাম। কিছুক্ষণ বাদে মোরগের ডাক কানে এলো। আরও কিছুক্ষণ বাদে পূর্বাকাশে রক্তিম আভা দেখা দিল।

পরেরদিন সকালে মাসিমা-মেশোমশাই দুজনেই আবার আমাদের কাছে ক্ষমা চাইলেন। এবার গোরা মুখ খুললো,
-ভূল তো আমাদেরই হয়েছে মাসিমা। আমরা ভূত দেখবো বলেই এখানে এসেছিলাম। আর এজন্যই মাঝরাতে আপনাদের না জানিয়ে ঘর বদল করি। তাই ক্ষমা যদি চাইতেই হয় তাহলে আমাদেরই চাওয়া উচিত।
এবার মেসোমশাই যা বললেন,
-দুই ছেলে-মেয়ে মা ও তোমার মাসিমাকে নিয়ে সংসার চলানো তখন খুব সমস্যার হয়ে দাঁড়িয়েছিল । সামান্য এক ফসলি জমির উপর নির্ভর না করে, আরো একটু ভালো কাজের আশায়,আমি গুজরাতে স্বর্ণ শিল্পের কাজে গেছিলাম । কিছুদিন পরে শুনি মা অসুস্থ। ওখানে যার অধীনে কাজ করতাম, মায়ের অসুস্থতার কথা জানিয়েও না দিল বকেয়া টাকা বা না দিল ছুটি। তবে আমার ধারনা ছিল, তোমার মাসিমা যে করেই হোক সংসারটা সামলে নেবে। এরইমধ্যে আচমকা একদিন মায়ের মৃত্যুর খবর পেলাম। বাড়িতে এসে শুনলাম মা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। প্রথমে পুরোহিত মহাশয় রাজি না হলেও পরে শাস্ত্রমতে মায়ের সৎকারের ব্যবস্থা করি। সেদিন রাতে বাড়িতে লোকজন বেশি হওয়ায় কয়েকজনকে মায়ের ঘরে থাকার ব্যবস্থাও করেছিলাম । উল্লেখ্য ঐ ঘরটি আমাদের পুরানো বাড়ি। পরে আমি এই নুতন বাড়িটি করলেও মা ঐ বাড়ি ছেড়ে কোনোদিন এখানে আসেননি।যাইহোক রাত তখন দুইটা/আড়াইটা নাগাদ হঠাৎ সকলে চিৎকার করে উঠে আমি তখনও জেগেই ছিলাম। ছুটে গিয়ে শুনলাম, ওরা মাকে ঝুলতে দেখেছে । ভাবলাম, মায়ের ঘর ছিল বলেই, একটি ফোবিয়া থেকেই হয়তো এমন আশঙ্কা করছে।

এদিকে এখবর চাউর হতেই স্থানীয় যুক্তিবাদী মঞ্চের কয়েকজন, একদিন আমাদের বাড়িতে আসে।কুসংস্কার বা বুজরুকি বলে তারা এলাকায় প্রচার করে। তাদের দলের জনাছয়েক সভ্য ঐ ঘরে একদিন রাত কাটিয়ে কিছু পায়নি। কয়েকদিন পর আবার ওই ঘরে একই সমস্যা দেখা দেয়। সেবারও কিছু আত্মীয় কুটুম্ব ছিল। যুক্তিবাদী মঞ্চের কাছে আবার খবরটি যায়। তখন তারা দুটি দলে ভাগ হয়ে পালা করে ওখানে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। কী আশ্চর্য! প্রথম দল যে অভিজ্ঞতায় পড়েছিল, পরের দলটিও সেই একই অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয় । তার পর থেকে এই ঘরে আর কেউ থাকেনি। উপর ওয়ালার রক্ষে যে তোমাদের কারো কিছু হয়নি ।

মায়ের মৃত্যুর কারন হিসাবে আমি তোমার মাসিমাকে সত্য ঘটনাটা জানতে চেয়েছিলাম। মিনতি তার অপরাধ স্বীকার করে যে ঘটনাটা বলেছিল,
মাকে মিনতি নিয়মিত খেতে দিতনা । দিনেরপরদিন মা এক হিসাবে না খেয়ে থাকতো । জলের পাত্রগুলি সব লুকিয়ে রাখতো। ঘরে সন্ধ্যাবাতি দিতনা। মায়ের ঘর মা পরিষ্কার করতে না পারায় চূড়ান্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ও অবহেলায় থাকতে মা একপ্রকার বাধ্য হয়েছিল। এদিকে আমি টাকা না পাওয়াই সময়মত টাকা পাঠাতে পারিনি। ফলে সংসার চালাতে মিনতির খুব অসুবিধা হচ্ছিল। ফলে চূড়ান্ত অবহেলায়, দীর্ঘদিন অনাহারে ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সহ্য করতে না পেরে মা গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে ।

এই ঘটনার পরে আমার বন্ধু গোরা অসম্ভব রকম ভূত বিশ্বাসী হয়ে পড়লো । আর আমি তো রাতের বেলা বাইরে বের হওয়া বন্ধই করে দিলাম ।
ফেরার সময় প্রবীরের সঙ্গে গল্প করতে করতে তখন বেশ কিছুটা দূরে চলে এসেছি। এমন সময় সুপর্ণার চিৎকারে পিছন ফিরে দাঁড়ালাম। দূরে বাড়ির সামনে আমারই একটি পেন উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একবার ভাবলাম পেনটি থাক। কিন্তু প্রবীর বাঁধা দিল। ও বোনের কাছে পেন আনতে উদ্ধত হলে আমি বরং ওকে বাঁধা দিয়ে নিজেই এগিয়ে চললাম। এক ছুটে গেলাম পেনটি নিতে। পেনটি নেওয়ার সময় সুপর্ণার নরম হাতের স্পর্শ পেলাম। মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে জানালো,
-ভাগ্যিস দাদা আসেনি। দাদা যেন না জানে। পেনটি আড়ালে খুলবে হিরণদা।
আমি গতকালের সমস্ত ঘটনা ভুলে গিয়ে একটা মিষ্টি হাসি উপহার দিয়ে আবার ছুটে চলে এলাম। বোট ঘাট থেকে প্রবীর বিদায় নিতেই জল বিয়োগের নামে কিছু দুরে গিয়ে পেনটির মুখ খুলতেই দেখি ভিতরে কোন রিফিল নাই। একটা সাদা চিরকুট সুন্দর করে সাজানো। লেখা আছে,
-পারবেনা হিরণদা ভুতের অভিজ্ঞতাকে দূরে সরিয়ে রেখে আমাকে হৃদয়ে ধারণ করতে? যদি পারো, তাহলে তোমার আগমনের অপেক্ষায় রইলাম।
এত বিষাদের মধ্যেও সুপর্ণার মায়াবী চাহনি আমার হৃদয়ে যে দুন্দুভি বাজিয়েছিল তাকে অস্বীকার করি কেমনে।



সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে আগস্ট, ২০২০ রাত ১১:২০
১৫টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"কর্পোরেট_ফ্যাক্টসমুহ"

লিখেছেন মামুন রেজওয়ান, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"কর্পোরেট_ফ্যাক্ট_২১"



সব সময় ইন্টার্ভিউ দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমরা জানতে পারি অনলাইনে। কিন্তু যারা ইন্টার্ভিউ নেন বিভিন্ন পজিশনের জন্য তাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা জানা হয়না আমাদের। তাই আমরাও যারা মোটামুটি এক্সপেরিয়েন্স... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা: (দ্বিতীয় পর্ব)

লিখেছেন মৃত্যুঞ্জয়, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০০

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

দ্বিতীয় পর্ব: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বিভাজন এবং অসম প্রতিযোগিতা

একটি শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবদাস, কালজয়ী উপন্যাস এবং চিত্রনাট্যের পটভূমি

লিখেছেন মেহবুবা, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৮


প্রথম ১৯২৮ সনে নির্বাক "দেবদাস" মুক্তি পায় ফনী বর্মা এবং তারকবালা অভিনীত ছিল সেটি। এরপর প্রমথেশ বড়ুয়া এবং যমুনা বড়ুয়া অভিনীত সবাক দেবদাস মুক্তি পায় ১৯৩৫ সনে। তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩




যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে
শান্ত গৌরবে, সেই আত্মারা কোথায় বেঁচে রয়।
দয়ার প্রতিটি বীজ সর্ন্তপণে বপন করা হয়,
সপ্তাকাশে উজ্জ্বল ফসল তবে অবধারিত রয়।

সাত আকাশের চরাচরে , ছায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কেমনের দিনে

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫



মাঝেমধ্যেই মনের ক্যানভাসটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত রং হারিয়ে যায় অচেনা পথের বাঁকে। কোনো সংকেত ছাড়াই একরাশ এলোমেলো বিষণ্ণতা এসে জেঁকে বসে মনের কার্নিশে। চারপাশের চেনা জগৎটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×