somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

পদাতিক চৌধুরি
আমি আমার নিরক্ষর কিন্তু বুদ্ধিমতী মায়ের কাছ থেকে এই শিক্ষাই পেয়েছিলাম,যথাযথ কর্তব্য পালন করেই উপযুক্ত অধিকার আদায় করা সম্ভব। - মহাত্মা গান্ধী

একদিন ঝড়ের রাতে

১২ ই মে, ২০১৮ সন্ধ্যা ৬:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমি তখন পটাশপুরে মেসে থাকি । দশজনের মেস । সবসময় একটা হৈ হট্টগোল লেগে থাকে । কখনও রাজনীতি কখনও খেলা তা সে ক্রিকেট, ফুটবল যাইহোক । বাস্তেন কেন পেনাল্টি মিস করলো সেটা ওদের দলের কোচ বা বাস্তেনের নিজের থেকে আমাদেরই দুশ্চিন্তা বেশি । বলটাকে ডানদিকে অতটা না চেপে ইষৎ বামদিক চেপে মারলে যে নিশ্চিত গোল হত , এই সাধারন ব্যাপারটা আমরা বুঝলেও বাস্তেনের মত খেলোয়ার না বোঝায় আমরা অবাক হতাম । সেই সঙ্গে চলতো আমাদের এক আড্ডাসভা । সকাল সাড়ে ছটা থেকে পৌনে সাতটার মধ্যে মেসে নেওয়া একমাত্র বাংলা দৈনিক আনন্দ বাজার পত্রিকার দখল নেওয়ার জন্য আমাদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যেত ।

ফাস্ট সকালে পেপারটি কে আগে হস্তগত করবে তা নিয়ে প্রতিযোগিতার অবশ্য একটি কারন ছিল । পেপার যে পাবে সাধারনত সে সেদিন দুর্বল চৌকির উপর বসে সভা পরিচালনা করতো পার্লামেন্টের স্পিকারের মত একের পর এক পাতা উল্টাবে আর বাকিরা সেটা শুনে মতামত প্রকাশ করতো । কোনও পেজ পছন্দ না হলে পরের পেজে চলে যাওয়ার নিয়ম ছিল । মেসের ছেলেরা সাধারনত বেশি রাতজেগে পড়া করায় একটু গভীর রাতে নিদ্রায় যায়, তুলনায় আমার মত দুএকজন যারা বেশি রাত জাগতে পারিনা, তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ি ওদিকে সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়ি । সেদিন রাতে বেশ বৃষ্টি হওয়াই সকালে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় পেপার না পেয়ে দু একজনকে জিজ্ঞাসা করেও পেপারের কোনও সন্ধান না পাওয়াই মনের মধ্যে একটি অস্থিরতা তৈরী হল ।

উপরে দেওয়াল ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি সাঁতটা বেজেগেছে । অগত্য মেসে অনুজ মানসকে সঙ্গে নিয়ে রাস্তার মোড়ে অবাকজলপান মিষ্টির দোকানের কাছে যেতেই দেখি প্রচুর মানুষের জটলা । আমরা পরিচিত মুখ খুঁজতে লাগলাম । আশপাশে কাউকে খুঁজে পেলামনা । ভিড়ের মধ্যে মিশে গিয়ে মনে হল আরে এটাতো অভিদের বাড়িরই সমস্যা । অভিজিৎ দত্ত, সুরেন্দ্র নাথ কলেজে পড়ে ইংরেজি নিয়ে । আমাদের সঙ্গে পাড়ায় মাঝে মাঝে ক্রিকেট খেলতে আসে । তবে কী ওদের বাড়ির কারও কিছু হয়েছে? মনে একরাশ প্রশ্ন নিয়ে ভীড় ঠেলে সোজা ঢুকে গেলাম ওদের বাড়ির ভিতরে ।

অভি বয়সে আমার চেয়ে অনেকটা ছোট । সাধারনত এপাড়ায় কেউ আমাদের মত মেসের ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা করেনা । আমাদের মেসবাড়ির সামনে রেলের একচিঁলতে জমিতে বিকালে আমরা একটু শর্টহ্যান্ড ক্রিকেট খেলি । পাড়ার কয়েকজন খেলতে আসে তারা সবাই এলাকার শ্রমিক বা পরিচারিকাদের সন্তান । একমাত্র ভদ্রবাড়ির সন্তান ছিল অভি যে আমাদের সঙ্গে খেলতে আসতো। তবে ওর আসাটা বোধহয় সম্ভব হয়েছিল যেহেতু ওর বাবামা কেউ বাড়িতে না থাকার কারনে । বড় দোতলা বাড়িতে ঠাকমাই ছিল ওর একমাত্র আপনজন । অভির কথানুযায়ী ওর বাবা নেভির অফিসার। সারাবছর বাইরে থাকে । বছরে দুচারদিনের জন্য বাড়িতে আসে । ঐসময় বাড়িতে খুব ধুমধাম হয়। সত্যিকথা বাবা যেকদিন বাড়িতে থাকে মনে হয় যেন বাড়িতে উৎসব চলছে । পাশাপাশি মাকে নিয়ে অভি একদিনের জন্যও একটি কথা খরচ করেনি । একবার মায়ের কথা জিজ্ঞাস করতেই ওর চোখে জল দেখে আমরা উল্টে দুঃখ প্রকাশ করে ওকে শান্ত করি । কাজেই এহেন ছোটভায়ের বাড়িতে লোকসমাগম দেখে খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে একটি ঘরে প্রচুর লোকের মধ্যে ওকে পেয়ে গেলাম ।

আমাকে দেখে নিতান্ত একটু শুকনো হাসি দিয়ে , পোকাদা তুমি এসেছ? আমি জিজ্ঞেস করলাম কী হয়েছে অভি? উল্লেখ্য আমার পোকা নামের পিছনে একটা কারন আছে । আমি বরাবরি ভুজঙ্গাসনের মত শুয়ে পড়তাম । বাড়িতে আমার বাবার কাছে এনিয়ে প্রচুর বকা খেয়েছি । মেসেও আমি নিস্তার পাইনি । সিনিয়র বিকাশদা একদিন আমাকে বকা দিয়ে সেই যে পোকার সঙ্গে তুলনা করলে, তারপর থেকে আমার পিতৃপ্রদত্ত নামটিকে বাদ দিয়ে ওরা পোকা নাম চালু করলো । অভির কথানুযায়ী,

সেকেন্ড সেমিস্টারের পড়ার চাপ ছিল । রাতজেগে পড়ছিলাম । সন্ধ্যে থেকেই মুহুর্মুহু মেঘগর্জন হচ্ছিল । একটু রাত বাড়তেই এবার ঝড়ের সঙ্গে বৃষ্টির তীব্রতা বেড়ে গেল । আমি তখনও পড়ছিলাম। ঠাকমা পাশে তখন ঘুমিয়ে কাঁদা । রাত একটা দেড়টা নাগাদ হঠাৎ মনে হল কারা যেন পাশের ঘরে হাঁটাচলা করছে । বই বন্ধ করে কান খাঁড়া করে চুপচাপ মিনিট দশেক বসে থাকলাম । অনুমান করার চেষ্টা করছিলাম শব্দটার উৎস কোথায়? বারবার দরজার দিকে চোখ যাচ্ছিল । যদিও দোতলার যে ঘরে আমরা ছিলাম দরজায় ছিটকিনি দেওয়া ছিল । দশমিনিট তখনও হয়নি এমন সময় বাইরে থেকে, মাসিমা দরজা খুলুন । আপনার ছেলে অসুস্থ ।আমি হঠাৎ বাবার কথা ভেবে সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে ছিটকিনি খুলে দিই ।

ছিটকিনি খুলতেই পরপর সাতজন লোক হুরমুড়িয়ে ভিতরে ঢুকে পড়লো । প্রথম একজন আমার মুখে সপাটে মারলো এক চড়, শালা আলমারির চাবি কোথায়? আমাকে ওভাবে মারতে দেখে ওদের একজন ধমক দিয়ে আমার গায়ে হাত দিতে নিষেধ করলো । আমি মুহূর্তের মধ্যে বুঝে গেলাম আসলে কী ঘটতে চলেছে । আমাকে মারতে বারণ করাই আমি পাল্টা ধন্যবাদ জানালাম । এবার লোকটি ক্রমশ দুএকপা হেটে আমার পাশে চলে এল, লক্ষীবাবাটি আমার আলমারির চাবিটা ঔ বদ লোকটিকে দিয়ে দাও তো । ওদিকে খাটের উপর দুজন ততক্ষণে ঠাকমাকে বাঁধার চেষ্টা করছে । ঠাকমাও সমানে হাতপা ছুড়ছে । আমি চিৎকার করে ছুটে যেতেই খপ করে আমার হাত ধরে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে বললো,আমি দেখছি । এবারও দেখলাম কাকু ঔদুজনকে বেশ ধমক দিল । এরপর আমি কাকুর নির্দেশ মত চাবি দিয়ে ওদের কান্ডকারখানা দেখতে লাগলাম । বুঝলাম এই ডাকাতদলের সর্দার কাকু বেশ ভদ্র । আমার পাশে আর একটি টুল টেনে টেবিলের উপরে সাজানো একেরপর এক বই ওল্টাতে লাগলো ।
আমি বললাম, আঙ্কেল বই এর মধ্যে কিছু নেই ।
-না, আমি তোমার বইগুলি দেখছি। তুমি কী সব বই পড় ।
-তুমি লেখাপড়া জানো?
-একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে! হ্যাঁ জানতাম, তবে কোনও কাজে এলনা ।
পাশ থেকে শেক্সপিয়ারের মার্চেন্ট অফ ভেনিস গ্রন্থটি তুলে ওল্টাতে ওল্টাতে, জানো তোমার মত বয়সে এই বইটি আমার প্রিয়বই ছিল । তখন আমিও নিজেকে অ্যান্টেনিও বা বাসেনিওর খুব আপনজন বলে ভাবতাম । আর এখন আমি সাইলক হয়ে গেছি ।

আঙ্কেলের সঙ্গে গল্প করতে করতে দেখলাম বেশ কয়েকবার পেটে হাত ঘষতে । আমি জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কী খিদে পেয়েছে নাকি?
- হ্যাঁ, বাবু বড্ড খিদে পেয়েছে । আছে নাকি বাড়িতে কোনও খাবার দাবার? আমি ইশারা করে ফ্রিজের দিকে দেখাতেই, খুব খুশি হল ।
ফ্রিজ থেকে একেরপর এক খাবার বার করতে লাগলো । আমাদের বাড়িতে ঠাকমার বয়স হওয়ায় সাধারনত একসঙ্গে একটু বেশি রান্না করে ফ্রিজে রেখে খাওয়ার চল আছে । এবার কৈ মাছের ঝালটা বার করতেই আমি বললাম ,
-কাকু, কৈ মাছ আমার খুব প্রিয় মাছে । সঙ্গে সঙ্গে মাছের ঝালটি ফ্রিজে ঢুকিয়ে দিল । আমি বললাম,
-আমিতো তোমাকে এমনি আমার ভালো লাগাটা জানালাম । তোমরা ওটা খেতে পারো ।
- না,মাসিমা তোমার জন্য রান্না করেছেন, আমরা বরং এইতো মুগডাল ও কিছু সব্জি দিয়ে খেয়ে নেবো।

ওদের সকলের খাওয়ার পরে ঠাকমার একটি কাপড়ে পুটুলি বেঁধে চলে যাওয়ার সময় আমাকে আশীর্বাদ করে বললো,
-বড় হও, মানুষের মত মানুষ হও।
-আঙ্কেল, সবতো নিয় যাচ্ছো । কিন্তু আমরা আগামীকাল খাবোকী? সঙ্গে সঙ্গে জিহ্বা কেটে সরি বলে পকেট থেকে পাঁচশ টাকা বার করে আমার হাতে দিয়ে ঠাকমাকে প্রনাম করলো ।
- এমন কুসন্তানকে পারলে যেন ক্ষমা করে দেন। মুখে বিড়বিড় করে বললো,সারে চার বছরের মেয়ের লিউকোমিয়ার চিকিৎসার খরচ আনুমানিক কুড়ি লক্ষ টাকা । অথচ আমাদের যে অন্য কোনও উপায় নেই।

আমি অচেনা অতিথীর পশ্চাদগমন লক্ষ্য করতে লাগলাম।

বিঃদ্র- একটু ব্যস্ত থাকায় মন্তব্যের উত্তর দিতে একটু দেরি হওয়ার আগাম ক্ষমা প্রার্থী ।

সর্বস্বত্ত সংরক্ষিত।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১৮ দুপুর ১:৫০
২১টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ডায়েরী- ২০০

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:০১



বাঙ্গালীদের খাদ্যাভাস বদলে গেছে।
অদ্ভুত সব খাবার মানুষ এখন খায়। আগ্রহ নিয়েই খায়। ইউটিউব দেখে মানুষের চিন্তা চেতনা এবং ব্যবহার বদলে গেছে। বাংলাদেশে খাবারের ব্যবসায় লস নাই। মানুষজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

শুভ জন্মদিন আফীক

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৩


তোর সাত বছর
কোন দিক দিয়ে গেলো
মনেই পড়ছে না;
জানিস কি অদ্ভুত সময়?
সময়ের উষ্ণভাজে
বেঁচে থাকাটাই ১ বিস্ময়!
শুভ জন্মদিনের
শুভেচ্ছাটা আরও খুশি
যেনো রঙিন ক্ষণ;
শত কষ্টের মাঝে মানুষ
হওয়াটা আনন্দাশ্রু;
মানুষের মত মানুষ হও
শুভ জন্মদিন- শুভ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগের স্বাস্থ্য ভালো?

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫১




ব্লগ কেমন আছে? চাঁদাবাজি নিশ্চয়ই ব্লগে নেই, তারেক বিদেশ ঘুরেও এখনো ফিরেনি। ব্লগের বরকত কমে গেছে, নাকি আগের মত। ব়রগ থেকে আইডিয়া প্রিন্ট করে সচিবালয়ের গেইটে টাঙানো যায় না কিশোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×