
দ্বিতীয়বার বাড়ি এসে দুদিন কাটিয়ে আবার স্কুলে পৌঁছাতে বেশ রাত হয়ে গেছিল । প্রবল ঝড়-বৃষ্টিতে ট্রেনের তার ছিড়ে যাওয়াতে অনেকক্ষণ ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল । সেদিন এক নরক যন্ত্রণার সম্মুখীন হয়েছিলাম। একদিকে ভ্যাপসা গরম, তার উপর চারিদিকে অবরুদ্ধ লোকজনের চিৎকার চেচামেচি। ঘন্টার পর ঘন্টা ঘণ্টা বসে দাঁড়িয়ে না পাচ্ছি এগোতে বা পিছাতে । স্টেশনে পানীয় জলের কোন ব্যবস্থা নেই । তার উপরে হকারদের দৌরাত্ম্য। বার দুয়েক ওদের কাছ থেকে মুড়ি কিনেও খেলাম । তবুও কিছুতেই যেন সময় আর কাটতে চাইছে না । অবশেষে এক সময় লাইন ঠিক হলো এবং ট্রেন চলাচল শুরু হল । কিন্তু ততক্ষণে অনেক রাত হয়ে গেল । কেটে গেলো মাঝে অনেকগুলো ঘন্টা । নতুন আশঙ্কা মনের মধ্যে তৈরি হলো -স্টেশনে নেমে অতো রাতে শেষ বাসটি মিলবে কিনা ।
যদিও বাস পেতে সেদিন সমস্যা হয়নি । প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অত রাতে নেমেও বাসস্ট্যান্ডে বাস পেলাম । প্রায় সারাদিন ঘামে ভিজে যুদ্ধবিধ্বস্ত সৈনিকের মতো কোনোক্রমে শরীরটাকে টানতে টানতে যখন স্কুলে পৌছালাম তখন রাত বারটা বেজে গেছে । আমার যাওয়ার সম্ভাবনা রমেনদাকে বলা ছিল । বোধহয় সেজন্য অতো রাতে কয়েক বার টোকা দিতেই গেট খুলে গেল । গেট খুলতে রমেনদার পরিবর্তে মিলিদিকে দেখে অবাক হলেও বাস্তবে আমি কথা বলার মত অবস্থায় ছিলাম না । ডাইনিং রুমে ঢুকে পায়ের কাছে ব্যাগটি রেখে টেবিলে মাথা গুঁজে বসে পড়লাম । মিলিদি সহ কয়েকজন আমার পাশে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল । আমি তাদের পায়ের শব্দ হাঁটাচলা ও মুখের কথা বুঝতে পারলেও মুখে একটিও কথা বলার সামর্থ্য না থাকায় মাথা নিচু করে বসে রইলাম । আমার কানে আসছিল আমি অসুস্থ কিনা - এসব নিয়ে ওদের ফিসফিসানি । এবার হাত দিয়ে ইঙ্গিত করাতেই ওরা যে যার কাজে চলে গেল । খানিক বাদে মাথা তুললাম। চোখের অন্ধকার ভাবটা কেটে গেছে । হাতে মুখে জল দিয়ে জায়গায় আসতে ততক্ষণ মিলিদির খাবার রেডি। খেতে খেতে রাস্তার দুর্ভোগের কথা পরিচয় করতে লাগলাম । রমেনদার খোঁজ করাতে শুনি ও আজ দেশে গেছে । সম্ভবত আগামীকাল ফিরবে ।আমার কথা রমেনদা মিলিদিকে জানিয়ে গেছিল যে কারণে মিলিদি জেগে ছিল এবং এত রাতেও দুবার ধাক্কা দিতেই গেট খুলে দিল ।
পরে রুমে এসে ড্রেস বদল করে আরো একটু ফ্রেশ হয়ে শুয়ে পড়ি । পরের দিন সকালে অনেক দেরী করে ঘুম ভাঙ্গে । মাথার উপর ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি ততক্ষণে সাড়ে আটটা বেজে গেছে ।একটা নিম্নচাপ সৃষ্টি হওয়ায় সেদিন প্রায় সারাদিন মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়েছিল । সন্ধ্যাবেলা টিফিন করতে ডাইনিং রুমে ঢুকতেই ,
- আরে মাস্টারদা! কেমন আছেন?
-আমি ভালো আছি । তুমি কেমন আছ? কখন ফিরলে?
-এইতো সন্ধের একটু আগে । আমিও আপনাদের আশীর্বাদে ভালো আছি ।
সত্যি কথা খাবার সময় মিলিদি বা রমেনদাকে না দেখলে মনের মধ্যে একটা অপূর্ণতা তৈরি হতো । হয়তো দুজনেই আমার ব্যাপারে এতটা যত্নশীল হয়েছিল বলেই বোধহয় এই আনুগত্য বোধ তৈরি হয়েছিল ।
সেদিন রাতেও প্রচুর ঝড় বৃষ্টি হওয়ায় সবাই আগেভাগে খেয়ে নিয়েছিল । আগেও বলেছি রাতে খাবার খেতে খেতে ডাইনিং রুমে বসে দিদিদের সঙ্গে গল্প করাটা আমার একটা অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল । সবারই বাড়ির টুকটাক খোঁজ খবর নিতাম । শেফালীম্যাডামের জন্য ইতিপূর্বে কয়েকদিন ধরে আগেভাগে খেতে এলেও ওনার দেখা না পাওয়ায় মনের মধ্যে কেমন একটা দুর দুর ভাব চলে এসেছিল । কথা হচ্ছিল মিলিদি নমিতাদি ফজিলাবুবু মমতামাসী রমেনদা সবার সঙ্গে । এমন সময় টিপ টিপ বৃষ্টিতে ছাতা মাথায় দিয়ে ডাইনিং রুমে শেফালীম্যাডামকে আসতে দেখে যেন নিজের চোখকেই বিশ্বাস হচ্ছিল না । সরাসরি একদম আমার সামনে এসে বললেন ,
- কি ব্যাপার!দারুণ জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন দেখছি। ব্যাপক ভাব হয়েছে সবার সঙ্গে তাহলে ।
-হ্যাঁ ম্যাডাম! এক প্রকার বলতেই পারেন যে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছি বা ভাব হয়েছে সবার সঙ্গে । আর তাছাড়া এরা ছাড়া আর কেই বা আমাদের এখানে আপন আছে বলেন?
-ঠিকই বলেছেন । সেদিন আপনার সঙ্গে দেখা হলো আর বাড়িতে গিয়ে সে কি বিপদ । বাবার আগে থেকে একটু হার্টের অসুখ ছিল। তবে সেদিন রাতে বাবার হার্টের সমস্যাটা অনেকটা বেড়ে যায়। আমি বাড়ি থাকায় তড়িঘড়ি করে নিকটবর্তী একটি নার্সিং হোমে নিয়ে গেছিলাম । বাবার অবস্থা দেখে নার্সিংহোম এডমিশন করতে রাজি হয়নি । কিছু টেস্ট করিয়ে অবস্থা খারাপ বুঝে ওরা দ্রুত কলকাতায় রেফার করে । আমরা সেই মত অন্য কোথাও ছোটাছুটি না করে সরাসরি দেবি শেঠির হসপিটালে নিয়ে যাই। ওখানে বাবার ওপেন হার্ট সার্জারি হয় । এখন অবস্থার উন্নতি হওয়াতেই আজ দুপুরে চলে এসেছি ।
- এসব ক্ষেত্রে তো অনেক বিধি নিষেধ থাকে ।
- বিধি নিষেধ তো থাকবেই। তবে বাবা আবার কারো কথা শোনেন না । ডাক্তার তো বলেছেন ভীষণ রেস্ট্রিকশনে থাকতে হবে ।
- আপনারা তো খুব ভালো জায়গায় মেসোমশাইকে চিকিৎসা করাচ্ছেন । দেবী শেঠির হসপিটাল তো পূর্ব ভারতের হার্ট চিকিৎসার সেরা কেন্দ্র বলেই জানি।
-হ্যাঁ , এক হিসাবে সেটা বলতেই পারেন।
কথা বলতে বলতে ম্যাডাম বসে পড়লেন । ফজিলাবুবু ভাত নিয়ে এলো । উনি খাওয়া শুরু করতেই আমিও কথা বলা বন্ধ করলাম । বাবার কথা বলতে বলতে শেষের দিকে ওনার গলা বেশ ধরে এল। সবার মুখে চোখে থমথমে ভাব। আমি আর কিছু না বলার সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু মুহূর্তেই সিদ্ধান্ত বদল করলাম। বরং ততক্ষণে বাকিদের সঙ্গে দু'একটি কথা বলে পরিবেশটিকে একটু স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলাম। বেশ কিছু পরে ওনার খাওয়া শেষ হল । এবার আমি জিজ্ঞাসা করলাম ,
- যদি কিছু মনে না করেন ম্যাডাম ,বাড়িতে বাবা ছাড়া আর কে কে আছেন?
-মা আর দিদি । তবে দিদি আবার সেরিব্রাল পালসের রোগী । আগে তবুও বাবা মা দুজনেই দিদিকে দেখাশোনা করতে পারতেন । কিন্তু এখন বাবা অসুস্থ হওয়ায় মায়ের উপর অসুস্থ দুজন মানুষের দেখাশোনার ভার । যে কারণে বাইরে থেকে প্রতিটি মুহূর্তে দুশ্চিন্তায় আছি । বাবা সদ্য রিটায়ার করেছেন। আর আমিও পেলাম না তেমন কিছু । এক প্রকার বসে না থেকে এখানে চাকরি করতে আসা । মাকে বললাম তুমি একা পারবে না, আমি না হয় চাকরিটা ছেড়ে দিই । মা রাজী হলেন না । বললেন তুই যা আমি সামলে নেব । অথচ আমার যে এক বিন্দু এখানে কাজে মন নেই ।আমি কি যে করি শেষ পর্যন্ত । চাকরিটা আদৌ করতে পারব কিনা সন্দেহ।
-আপনি যদি কিছু মনে না করেন তাহলে আপনার এই অবস্থায় যদি কোনো সাহায্যের দরকার হয় তাহলে আমাকে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন ।
-না না , মনে করবো কেন! তবে এই মুহূর্তে তেমন দরকার নেই । ভবিষ্যতে দরকার হলে বলব । এমনভাবে সাহায্যের হাত বাড়ানোর জন্য ধন্যবাদ আপনাকে । বেশ রাত হল আসি তাহলে ।
- হ্যাঁ আসুন ।
বোর্ডিং স্কুলে ডাইনিং রুম স্টাফদের সাথে কথা বলে বুঝেছি প্রত্যেকেই এখানে কিন্তু স্বেচ্ছায় আসেন নি । অনেকটা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে সংগ্রাম করতে করতে এইখানে এসে পৌঁছেছেন । সেই তালিকায় নবতম সংযোজন হলো শেফালীম্যাডাম । যদিও ওনার ব্যাপারটা একটু আলাদা। তবে সে যাই হোক, ব্যথা যন্ত্রণার অনুভূতি সবার একই। তার হয় না কোন রং বা শ্রেণীভেদ । নমিতামাসির মুখ থেকে ইতিপূর্বে শুনেছি এদের প্রত্যেকেরই পিছনে আছে একেকটি দুঃখের মহাসাগরের কাহিনী । তবে শেষ পর্যন্ত এখানে এসে হোস্টেলে তিন বেলা খাওয়া, বাচ্চাদের সঙ্গে জীবন কটানো ছিল ওদের জীবনে পাওয়া সর্বোৎকৃষ্ট পুরস্কার। সমাজ পরিবার-পরিজন থেকে বিচ্যুত মানুষ গুলোর মধ্যে শেফালীম্যাডামকে এভাবে পেয়ে আমার মনের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়ে গেল ।
ম্যাডাম চলে যেতেই কিছুক্ষণ পরে আমিও রুমে ফিরে আসি । মাথার মধ্যে নতুন একটা চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগলো । এমন সময় বাইরে ঠকঠক শব্দ । দরজা খুলতেই দেখি রমেনদা দাঁড়িয়ে ।
- আরে , তুমি এখন ! এসো এসো ভেতরে এসো ।
বলতেই রমেন দা ঘরে ঢুকলো ।
চলবে ....
বিশেষ দ্রষ্টব্য :- পুজোবকাশ এর পরে একটি চটজলদি পোস্ট । ব্লগে আমার ছোটভাই স্নেহের রাকু কে এই পোস্টটি উপহার দিলাম ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


