somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মিজান-মানিকদের কথা...

১৬ ই মে, ২০০৯ সন্ধ্যা ৭:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমরা সবাই আসলে স্বার্থপর। এমন না যে, সবাই খুব ভালো আছি, একা একা ভোগ করলেই যে ভাগে অনেক কিছু পাবো তাও নয়। তবু আমাদের একাই সবকিছু পাওয়া চাই। অন্যকে নিয়ে ভাবার সময় আমাদের কই?

প্রথম পাতার স্টিকি পোস্টটা পড়ছিলাম। জঙ্গি কিংবা বোমা মিজান বিষয়ক রচনা। গতরাতে শুরু হয়ে আজ প্রায় দুপুর পর্যন্ত সেই লেখার আলোচনা সমালোচনা পর্যালোচনা চলেছে। ভালো লেখা, দূর্দান্ত লেখা। এবং ব্রেন-স্টর্মিংয়ের আদর্শ উপাদান। পর্যালোচনায় অনেক কথা উঠে আসলো, কিছু তার গ্রহণযোগ্য কিছু বিবেচনাযোগ্য কিছু শুনে মাথার চাঁদি গরম হয়ে যায়, কিছু শুনলে গভীরভাবে দুঃখিত হতে হয়। (আমি দুঃখিত, রবি'র লেখাটার লিংক এখানে অ্যাড করতে পারছিনা। এই টেকনিক্যাল বিষয়গুলোতে আমি বেশ কাঁচা) সেই গভীর দুঃখিত হবার কথাগুলো বলতেই এই লেখা।

প্রাইমারীতে পড়ার সময় বন্ধু সহপাঠী বন্ধু দু-একজনের বেশি তেমন ঘনিষ্ঠ হয়না। সেই ঘনিষ্ঠদের একজন, যে কিনা বরাবর ফার্স্ট কিংবা সেকেন্ড হতো (আমার জীবনের প্রথম প্রাইভেট টিউটর!), সেই ছেলেটা ফেল না করেও ক্লাস ফোর-এ উঠলোনা! কেন, সেই কারণটি খুবই বিচিত্র। তার পরিবারের কোনও একটি ফাঁড়া কাটানোর জন্য বাবা-মা মানত করেছিলো, একটি ছেলেকে আল্লাহ্'র রাস্তায় পাঠিয়ে দিবে। মানিক তাই ক্লাস ফোরে না উঠে আল্লাহ'র রাস্তায় চলে গেল!

আমি ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পেয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলাম, মানিক সেই বছর আমাদের মসজিদে খতম তারাবী পড়িয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলো। আমি ক্লাস এইটে যখন আবারও বৃত্তি পেয়ে সবার কাছে অভিনন্দিত হচ্ছি, মানিক তখন কোরআন হাফেজ হয়েও মাঠে ক্রিকেট খেলার অপরাধে (!) নিয়মিত পরিবারে নিগৃহীত হচ্ছে, সমাজে নিন্দিত হচ্ছে। আমি এসএসসিতে যখন স্টার মার্কের সাথে স্কুলের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে প্রথম ছাত্র হিসেবে বাংলায় লেটার পাওয়ার আনন্দে আর অভিনন্দনে আত্মহারা, মানিক তখন দাখিল পরীক্ষায় নকল করতে গিয়ে এক্সপেল্ড হয়ে এলাকাছাড়া! এখন আমি চাকরি করি, মানিব্যাগে খুচরো রেখে নোটগুলো এটিএম কার্ডে জমা করি, মানিক সর্বশেষ প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী মসজিদে আযান দেয় নামাজ পড়ায়, মাদ্রাসায় হেফজো করায়, মসজিদ-মাদ্রাসার নামে চাঁদার বই পকেটে নিয়ে ঘোরে। শেষবার দেখা হতে আমিও চাঁদা দিয়েছি, দৃপ্ত অসংকোচে মানিক বলেছিল- "একটু বেশি করেই দিস দোস্ত, বাজারে অনেক ধার দেনা!" আমি অবাক হয়ে বললাম, "ধারদেনার সাথে চাঁদার সম্পর্ক কী? আমি কি শালা তোকে দিচ্ছি নাকি? দিচ্ছি তো মসজিদে-মাদ্রাসায়!" মানিক এতটুকুও অপ্রস্তুত না হয়ে বললো, "ওই একই তো হলো। মসজিদে দিলে মুয়াজ্জিনের বেতন হিসেবে, মাদ্রাসায় দিলে হজুরের ভাতা হিসেবে... ঘুরে ফিরে তো আমার কাছেই আসবে!"
আমার সহপাঠী জানের দোস্ত, যে আমাকে মুখস্ত করিয়েছিলো মদনমোহন তর্কালঙ্কার-এর প্রভাত বন্দনা: পাখি সব করে রব রাতি পোহাইলো/কাননে কুসুমকলি সকলি ফুটিলো..." আমার জীবনের প্রথম শিক্ষক আমার কাছে হাত পেতে মসজিদের নামে ভিক্ষা নিচ্ছে, যেটা সে আল্লাহ্'র ওয়াস্তে নিজেই উদরস্ত করবে -স্বীকার করতেও লজ্জা পাচ্ছেনা, দেখে আমি নিজেই লজ্জা পেলাম, দুঃখ পেলাম, কষ্ট পেলাম।

আমাদের দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার সাথে সরাসরি পরিচয় আছে এমন যে কেউ জানেন, ওই পড়াশোনাটা আসলে পড়াশোনার অভিনয় ছাড়া আর কিছুই না। "সমমান" শব্দের দোহাই দিয়েও মাদ্রাসা শিক্ষিতদের ভাগ্যাকাশে চাঁদ ওঠানো যাচ্ছেনা, সূর্য তো কল্পনাতীত! কী নির্মম প্রবঞ্চনা যে তাদের সাথে করা হয়, এর কোনও সীমা পরিসীমা নেই। এবং এর একমাত্র কারণ, দারিদ্র। সীমাহীন দারিদ্রের থাবা থেকে কোনও রকমে পাশ কাটাতেই বাবা-মায়েরা ছেলেমেয়েদের মাদ্রাসায় পাঠান, আর কোনও কারণ নেই। আল্লাহ্'র রাস্তায় দেয়া বলতে আসলে ধর্মের রাস্তায় পাঠানো নয়, নিজের রাস্তা নিজেকেই দেখে নিতে বলা। বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনও দেশে পাঁচ বছরের দুধের শিশুকে চব্বিশ ঘন্টার এডুকেশন শেল্টারে রাখা হয় বলে আমার মনে হয়না। এর পেছনে ধর্মীয় চেতনা, আদর্শ মানুষ করে গড়ে তোলা, আল্লাহ্'র কালাম-দ্বীন শিক্ষা এসব কোনও কারণ কাজ করে না, এখানে দারিদ্র ছাড়া আর কোনও কারণ নেই, ক্ষুধা ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই, জান বাঁচানো ছাড়া আর কোনও তাগিদ নেই!

আমাদের ধর্মীয় শিক্ষা ভিক্ষাবৃত্তি ছাড়া আর কিছু শেখায় না। আমাকে একবার আমার মাদ্রাসায় পড়া সেই বন্ধু খু্ব অবাক হয়ে বলেছিল, "আরব দেশের কোন কবির লেখার খুব প্রশংসা দেখলাম খবরের কাগজে। বড়ই তাজ্জব!" কেন তাজ্জব সেটা জিজ্ঞেস করতেই বললো, "ওই দেশে তো কোনও স্কুল কলেজ নাই, সবই মাদ্রাসা। আমাদের মতোন মাদ্রাসায় পইড়া বেটা কবি হইলো কেমনে? আমরা তো জানি কবিতা লেখা-পড়া হারাম। আমি যেইদিন প্রথম মাদ্রাসায় ভর্তি হইছিলাম, সেইদিনই মাইর খাইছি পাখিসব করে রব... পড়তেছিলাম বইলা!"

মানিক খুব ভালো ক্রিকেট খেলতে শিখেছিল। বগুড়া জেলা ক্রিকেট লীগে কোন এক বছর সর্বোচ্চ রানকারী হয়েছিল, জাতীয় দলের এক টপ-অর্ডার ব্যাটসম্যানকে পেছনে ফেলে। বোলিংটাও ভালো করতো। ফুটবল কেমন খেলতে পারতো বলতে পারিনা, কারণ তাকে শেখানো হয়েছিলো, হাফপ্যান্ট পরে খেলা হয় বলে ফুটবল খেলা হারাম। তাহলে সৌদি আরব, ইরাক-ইরান এইসব দেশ বিশ্বকাপ খেলে কেন? -এই প্রশ্ন কিংবা তর্ক করে একবার দেড়দিন না খেয়ে ছিলো বলে আর কখনো ফুটবল নিয়ে মাথা ঘামায়নি। তবে মাথা ঘামানোর খেলা দাবায় তার নাম পুরো বগুড়া জেলায় ছড়িয়ে পড়েছিল। মাদ্রাসার হুজুরদের ফাঁকি দিয়ে (কারণ ইসলমের দৃষ্টিতে দাবা খেলাও নাকি হারাম) টুর্নামেন্ট খেলতে গিয়ে হারিয়ে দিলো হায়ারে আসা গ্রান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ-কে। সেই খবর ছবিসহ সব পত্রিকায় ছাপা হতেই প্রথমবার মানিকের নিরুদ্দেশ যাত্রা। মাসাধিককাল পর উদ্ধার ঢাকা থেকে, বেদম প্রহারসহ মাদ্রাসায় প্রত্যাবর্তন।

রবি খুব সুন্দর একটা টার্ম ব্যবহার করেছেন, মিজানদের মতো জঙ্গিদের তিনি বলেছেন প্রোডাক্ট (যেভাবে প্রোডাক্টের গুনগান গাওয়া মডেলদেরও আমরা প্রোডাক্ট হিসেবেই ধরি, মেয়েদের ক্ষেত্রে আরো এককাঠি আগ-বাড়িয়ে "মাল" বলি)। এই প্রোডাক্টগুলো কারা তৈরি করে, কোথায় তাদের ফ্যাক্টরী, সেই ফ্যাক্টরী উদ্ঘাটন করতে সরকারের ঠিক কোন অংশ দিয়ে কী রঙের সুতা বেরিয়ে যাবে এইগুলো নিয়ে নানান কচকচানি হয়েছে, হতে থাকবে। কিন্তু কেউ জানতেও পারবেনা, মানিকের মতো ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া ছেলেরা মাদ্রাসায় গিয়ে কীভাবে ভিক্ষাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিচ্ছে।

(চলবে)
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×