পরকালে কেমন আছেন আমাদের রাজনীতিকরা?
আমেরিকায় না গিয়েও আমেরিকার খবর পাওয়া যায়। আমেরিকা তো কোন ছার, মঙ্গলেই বা আমরা ক'জন গেছি? তারপরও তো মোটামুটি সবাই এখন মঙ্গল সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি। অতএব পরকালে না গিয়েও পরকাল সম্পর্কে অনেক খবরই জানা সম্ভব। অন্তত অনুমান করতে তো আপত্তি নেই। এটাও তেমনি একটা কল্পগল্প বৈ বেশি কিছু নয়। গল্প হলেও এটা সায়েন্স ফিকশনও নয়, নয় এমনকি ঈশপের গল্পের মতো মরাল লুকিয়ে রাখা কোনও কাহিনী। নির্দোষ বিনোদনের বাইরে এই গল্পের কোনও উদ্দেশ্য দয়া করে কেউ না খুঁজলেই খুশি হবো।
যাই হোক, যা বলছিলাম। পরকালের রাজনীতিবিদদের কথা টানলে সবার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নামটাই আসবার কথা। কেমন আছেন তিনি? খোঁজ নিয়ে জানা গেল, তিনি মোটামুটি আরামেই দিন গুজরান করছেন। এই ব্যক্তি পরপারে গিয়েও তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর সুযোগ একবিন্দু হাতছাড়া করেন নি, বরং তার বিনিময়ে পুরোপুরি ফায়দা হাসিল করেছেন। কীভাবে? সে এক বিরাট ইতিহাস!
স্বপরিবারে ওপারে পৌঁছুনোর পরপরই তিনি হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, "আমার থাকার ব্যবস্থা কী? খোলা আকাশের নিচে দুধের শিশু আর বৌ-বেটিদের নিয়ে আমি কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো? কেউ আমার কথা শুনছে না কেন...? আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাইনা, আমার বাসস্থানের অধিকার চাই..." ইত্যাদি ইত্যাদি। ফেরেস্তারা তাঁকে বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করার সমুদয় চেষ্টা করে ব্যর্থ হলেন। তিনি কোনও কথা শুনবেন না। কবে পৃথিবী ধ্বংস হবে, সবাই পূনরুত্থিত হবে, ততদিন তিনি এভাবে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকবেন? এটা তো আইয়ুবের সামরিক স্বেচ্ছাচারিতার চেয়েও বড় স্বৈরাচার! তিনি চব্বিশ ঘন্টার আলটিমেটাম দিলেন, এর মধ্যে তাঁর হিসাব নিকাশ ক্লিয়ার করা না হলে তিনি আন্দোলনের ডাক দিবেন, অসহযোগ আন্দোলন!
বাধ্য হয়ে বিশেষ ট্রাইবুনাল বসানো হলো। জিব্রাঈলকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করে গঠিত বিশেষ বেঞ্চ ততদিনে বাংলাদেশী বিচারপতিদের মতো বিব্রত হওয়া শিখে গেছে! তা হবে নাই বা কেন? হিসাবের খাতা যে বড়ই জটিল। এই লোক পুরো একটা জাতিকে পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্ত করেছেন, এটা নিঃসন্দেহে মহামানবের কাজ। দাও তাকে বেহেস্তে। কিন্তু এই লোকেরই দলীয় অনুসারীরা এমনকি পরিবারেরও কোনও কোনও সদস্য সদ্য স্বাধীন দেশটাকে নরক বানানোর মহোৎসবে লিপ্ত ছিলো, তিনি অপরাধ প্রমাণ হওয়া সত্বেও তাদের শাস্তি দেননি, বরং প্রশ্রয় দিয়েছেন। তাহলে তো তার নিয়তে খোঁট পাওয়া যাচ্ছে। কী মুশকিল! কোনদিকে যাই? তাছাড়া উপযুক্ত সাক্ষীরাও সবাই উপস্থিত নেই। এই অবস্থায় অপরাধ বা কৃতীত্ব কোনওটাই প্রমাণ করা সহজ নয়। সুতরাং ট্রাইবুনাল শেষ পর্যন্ত সুপারিশ করলো, আপাতত তাকে ভিআইপি কোটায় একটা বাড়ি দেয়া হোক, ভাড়ায় কিংবা সম্ভব হলে লিজ-এ; আর ভেতরে ভেতরে তদন্ত চলতে থাকুক। পূর্ণাঙ্গ রায় শোনানোর সময় আসেনি।
সেই থেকে শেখ মুজিব নিজের মতো থাকেন, সঙ্গী-সাথীহীন বিরক্তিকর অবসর জীবন। আর মনে মনে খোঁজেন শুধু একজনকে, যার কারণে তাঁকে এই রিটায়ারমেন্টের আগেই অবসর জীবন কাটাতে হচ্ছে। আশ্চর্য তাঁর কপাল, এমনকি এরা তাঁকে এলপিআর-এর সুখটাও অনুভব করতে দিলো না! জীবদ্দশায় অবসর বলতে তো জেলখানার দিনগুলো। পরকালে এসে... এও তো একরকম জেলখানাই! তিনি নিস্ফল আক্রোশে ভেতরে ভেতরে গুমরে ওঠেন- খাকি টুপির নিচের ক্রুকাট মাথাটা যদি একবার হাতের নাগালে পেতাম! রে-ব্যান'টা হ্যাঁচকা টানে খুলে নিয়ে সবার আগে চোখদুটোই উপড়ে নিতাম বেঈমানটার!!!
আমাদের মতোন সাধারণ মানুষেরই কত অসাধারণ ইচ্ছে পূরণ হয়ে যায়, তিনি তো একজন অসাধারণ মানুষ, তাঁর এই সাধারণ ইচ্ছেটি কি অপূর্ণ থাকতে পারে? বছর পাঁচেকের মাথায় হঠাৎ মর্নিংওয়াকে বেরিয়ে তিনি তার মুখোমুখি পড়ে গেলেন। দেখে তাঁর রাগের বদলে একটু মায়াই হলো। তিনি নিজের ওপরই বিরক্ত হলেন। এত ভয়ঙ্কর পরিনতি যে তাঁর গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে, তার প্রতি তাঁর দয়া কিসের!
কিন্তু দয়া না করেই বা উপায় কী? একে যে চেনাই যায় না! এই কি সেই দোর্দন্ড প্রতাপশালী বীর সেনা, যে কিনা তাঁর সামনে দাঁড়িয়েও রে-ব্যানে চোখ ঢেকে রাখার ধৃষ্টতা দেখাতে পরোয়া করতো না! এই কি সেই মেজর যে কিনা তাঁর স্নেহের সুযোগ নিয়ে তাঁরই নিয়োগকৃত সেনাপ্রধানকে অস্বীকার করবার ঔদ্ধত্ব দেখিয়েছিলো! এ কী চেহারা হয়েছে তার! বুকের ছাতিতে বুলেটের ঘা তাঁর চেয়েও বেশি! চেহারা বিকৃত, চেনা যায় না। চিনতে তিনি পারতেনও না, যদি না লোকটা হঠাৎ এসে সটান তার পা জড়িয়ে ধরতো। কী সাঙ্ঘাতিক, মেজর জিয়া তাঁর পা জড়িয়ে ধরছে! শেখ মুজিবের পায়ে পড়েছে মেজর জিয়া! দুনিয়ার মানুষ কি এই দৃশ্য চোখে দেখেও বিশ্বাস করতে পারবে?
পা না ধরে জিয়ার যে উপায়ও নেই! পরপারে এসে তিনিও যখন অনাহারে অর্ধাহারে গাছতলাতে দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন আল্লাহর কাছে দাবী জানিয়েছিলেন যাহোক একটা কিছু ব্যবস্থা করার। আল্লাহ তাকে সাফ জানিয়ে দিলেন, ওসব নাকি কান্না এখানে চলবে না। এরশাদ যে তোমার পরিবারকে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দু'দুটো বাড়ি দিলো, এটা নিয়েই দ্যাখো না ক'দিন পর কী হয়! আমি কি আর সেই ভুল করতে পারি? তাছাড়া তোমার বিরুদ্ধে শেখ মুজিবের সুস্পষ্ট অভিযোগ আছে, তুমি নাকি তার হত্যা-পরিকল্পনায় সরাসরি জড়িত। আমার তদন্ত কমিটিতে কিন্তু কোনও মানুষ নাই যে তাকে তুমি হাত করবে। অতএব সাড়ে সাবধান!
অবস্থা বেগতিক দেখে মেজর সাহেব তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ সরাসরি স্বীকার করে নেবার সিদ্ধান্ত নিলেন, তাতে যদি আপাতত জান বাঁচে! তিনি অনুতপ্ত, তাকে ক্ষমা করা হোক।
কিন্তু চাইলেই কি ক্ষমা মিলে? ক্ষমা চাইতে হবে তার কাছে, অপরাধ করেছো যার কাছে।
সবকিছু শুনে শেখ সাহেব যার পর নাই বিস্মীত! এও কি সম্ভব? স্বপরিবারে নির্বিচারে হত্যা করে এখন ক্ষমা চাইছে! এ তো এরশাদের চেয়েও বড় বেহায়া! আসলেই সামরিক বাহিনীতে যারা থাকে তাদের মানবিক বৈশিষ্ট্যগুলো নষ্ট হয়ে যায়।
কিন্তু জিয়ারও স্পষ্ট গ্রাউন্ড আছে ক্ষমা পাবার। আর সব বাদ দিলেও, তিনি শেখ সাহেবকে পরপারে পাঠিয়েছেন স্বপরিবারে। ঝামেলামুক্ত, টেনশনমুক্ত। দুধের শিশুটিও তাঁর হাতের নাগালে, বড় বড় জোয়ান ছেলেরা আছে, সঙ্গে ছেলের বৌরাও। নিজেও বৌয়ের হাতের রান্না ছাড়া তিনি খেতে পারেন না, ব্যক্তিগত দেহরক্ষীটাকে স্নেহ করেন সন্তানের মতো... কেউ বাদ নেই, সবাই আছে তাঁর পাশে। আহারে মেয়েদুটোও যদি... ছি ছি! এ কী ভাবছেন তিনি, বাবা হয়ে মেয়েদের অকাল... তিনি আর ভাবতে পারেন না। কৃতজ্ঞতায় জিয়ার প্রতি তাঁর মন ভরে যায়। সেই সাথে একটু করুণাও হয় তার পরিণতি দেখে। আহা বেচারা! বিদেশ বিভূঁইয়ে একা একা... ওপারে যে বউ ছেলেদের রেখে এসেছে তারাও শুনতে পাচ্ছেন বাপের নাম ভালই রওশন করছে! হায় হায়, এরা তো তার ছেলেদেরও হার মানিয়েছে!! নাহ্, আর রাগ করে থাকা ঠিক না। বরং তাকে মাফ করেই দেয়া যাক। তাছাড়া তিনি যদি বাঙালী জাতির পিতা হয়ে থাকেন, তো জিয়াও বাঙালীর বাইরে নয়। সন্তানকে ক্ষমা করার মধ্য দিয়েই তো পিতৃপ্রাণের মহত্বের পরিচয়!
কিন্তু কেবল ক্ষমা করলেই তো চলবে না। আল্লাহ বলে দিয়েছেন, জিয়াকে কেবল ক্ষমা আদায় করলেই হবে না, বরং শেখ সাহেবের কাছ থেকেই একটা অস্থায়ী বন্দোবস্ত আদায় করে নিতে হবে। একজন দেশের নেতা আর একজন পুরো জাতির নেতা। দুটোই আবার শহীদ! যাই হোক, তোমরা তোমাদের "ইন্টারনাল" ব্যাপার নিজেরাই বুঝে নাও। তাছাড়া বার বার নিয়ম ভেঙে আগাম আদালত বসানো যাবে না। এটা কি বাংলাদেশ পেয়েছো, যাহাই চাইবে তাহাই পাইবে!
এদিকে মুজিব পড়েছেন মহা ফ্যাকড়ায়। এই ব্যাটা বলে কী! তার বাড়িতে গিয়ে উঠতে চায়!! একে একবার বিশ্বাস করে ঠকেছেন। আবার সুযোগ দেয়াটা কি ঠিক হবে? তিনি নানানভাবে কাটানোর চেষ্টা করেন। তাঁর বাড়িটা ছোট, নতুন করে কারো জায়গা হবে না।
জিয়া এতক্ষণে নিজেকে ফিরে পেয়েছেন। মিলিটারী ব্যক্তিত্ব ফুটিয়ে বললেন,
" বিনে পয়সায় তো থাকবোনা স্যার, কাজ করে খাবো।"
" বটে! তা কী কাজটা করবে তুমি? কাজের লোকের আমার কি অভাব পড়েছে?"
" আমি বাজার হাট করে দিবো..."
" অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সেই কাজের টেন্ডার হাসিল করার জন্য আমার দুই ছেলে রাতদিন মারামারি করছে!"
" তাহলে আমি বাড়ি পাহারা দিবো... ইউ নো, আই'ম আ রিটায়ার্ড জেনারেল..."
" ওরে, সে পোস্টটাও তোর পাঠানো রিক্রুট দিয়েই পূর্ণ আছে। আমার বডিগার্ডকেও যে মেরেছিলি, ভুলে গেলি?"
" তাহলে আপনার ছোট ছেলেকে পড়ানোর বিনিময়ে লজিং থাকবো..."
" এ্যাঁহ্! মিলিটারী বিদ্যা দিয়ে তুই আর কী পড়াবি? আমার ছেলের বৌ'রাই ওকে যা পড়ানোর পড়াচ্ছে। তাছাড়া ওর বাপের জীবনটাই তো একই সাথে ইতিহাস ও রাস্ট্রবিজ্ঞান। তুই আর কী পড়াবি?"
এবার জিয়া সত্যিই হাল ছেড়ে দিলেন। ভেঙে পড়া গলায় বললেন,
" একটা কোনও ব্যবস্থা করেন। আমার দল, বউ ছেলেরা কেউ মানুক আর না মানুক, আমি মানি, আপনি আমার জাতির পিতা, আমারও পিতা। দোহাই ছেলের প্রতি বাবার কর্তব্য করুন। আর তো সহ্য হয় না স্যার! এ যে কমান্ডো ট্রেনিংয়ের চেয়েও ভয়াবহ কষ্ট!"
এই আর্তনাদে পাষাণ-হৃদয় সীমারের বুকও ফেটে যেত, বঙ্গবন্ধু তো আবেগাপ্লুত হবার জন্যেই যেন জন্মেছেন। তিনি আর থাকতে পারলেন না, বললেন,
"বাছা আমার চল, তোর থাকার জায়গা দেখিয়ে দিয়ে আসি। ওখানে তোর সঙ্গী-সাথী, চেনা লোক সবই পাবি। তারা একটু অভিমান করবে, পুরানো কথা তুলে একটু সিন-ক্রিয়েটও করতে পারে, বড় ভাইয়ের শাসন মনে করে গায়ে না মাখলেই হলো। পারবি না?"
জিয়া একটু সঙ্কুচিত হয়ে বললেন,
" তা পারবো না আবার? খুউব পারবো। কিন্তু আমরা যাচ্ছি কোথায়?"
শেখ সাহেব একটু অনমনস্ক গলায় উত্তর দিলেন,
" তাজউদ্দীনরা কাছেই মেস করে থাকে। আপাতত ওখানেই..."
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০০৯ সকাল ৯:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


