তিন বিশিষ্ট রাজনীতিক পরপারে বড়ই মনোকষ্টে আছেন। মর্মপীড়ার মূল কারণ পৃথিবীতে রেখে যাওয়া উত্তরসূরীদের উল্টোপাল্টা চালচলন। কিন্তু কী আর করা, ওপারে বসে হা-হুতাশ করাই সার, এপারে তাদের যোগাযোগের উপায় কী? দুনিয়ায় তাদের উত্তরসূরীরা কথায় কথায় তাদের নাম করে অমুকের স্বপ্ন তমুকের স্বপ্ন বলে গলা ফাটাচ্ছে, অথচ তাঁরা যে সত্যি সত্যি স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাদের সতর্ক করবেন, সেই সুযোগ পাচ্ছেন না। বদমাশগুলো বিছানায় পড়ে কি ঘুমিয়ে যায়, স্বপ্ন দেখার ধার ধারে না! কী মুশকিল!!
এমন পরিস্থিতিতে তাদের কাছে আশার বাণী নিয়ে এলো বিজ্ঞান। তথ্য প্রযুক্তির আশীর্বাদ এমনকি পৃথিবীর সাথে পরপারের টেলিফোন সংযোগ ঘটিয়ে ফেলেছে! আশীর্বাদ যে কেবল স্বর্গ থেকেই আসবে তার তো কোনও মানে নেই, এখন দেখা যাচ্ছে পৃথিবী থেকেও পরপারে তা বইতে পারে!!
তো এই অবস্থায় পৃথিবীর তিন নেতা পরপারে বসে ঠিক করলেন, এপারে একবার ডায়াল করবেন। সবার আগে লাইন চাইলেন আমেরিকার কেনেডি মহোদয়। তাকে জানানো হলো, লাইনটা খুব এক্সপেন্সিভ, প্রতি মিনিটে পাঁচ হাজার ডলার দিতে হবে। কেনেডি একটু দমে গেলেন, কিন্তু না বলার তো উপায় নেই। হাজার হলেও তিনি সাবেক মার্কীন প্রেসিডেন্ট, খরচের ভয়ে না বলেন কী করে!
যাই হোক, এই চড়া রেটে তিনি কোনও রকমে দু'মিনিট ছাপান্ন সেকেন্ড কথা বলেই রেখে দিলেন। তার চেহারা দেখে মনে হলো, ফোনটা না করলেই ভালো হতো। ওবামা তাকে মনে হয় তেমন একটা পাত্তা দেননি।
মার্কিনীরা যা করে, রাশানদেরও তাই করতে হয়। এটাই নিয়ম। সুতরাং স্ট্যালিনও লাইন চাইলেন পুতিনের। তাকে জানানো হলো, এই লাইনটা আরো বেশি এক্সপেন্সিভ, কেননা রাশিয়া পুঁজিবাদে উত্তরণের পর সেখানে যে ভয়ানক মুদ্রাস্ফিতি ঘটেছে, তার থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় আসতে আরো ক'দিন লাগবে। স্ট্যালিনের মুখটা তিক্ততায় ভরে গেল, কিন্তু পরিস্থিতির শিকার হয়ে সব মেনে নেয়া ছাড়া তার তখন উপায়ই বা কী? তিনি ফোন ঘোরালেন পুতিনের নাম্বারে। পিএবিএক্স তাকে কাঙ্খিত নাম্বার ডায়াল করতে বললো, তিনি তাঁর চিরচেনা ক্রেমলিন প্রাসাদের নাম্বার মনে করতে পারলেন না। অপারেটরের সাহায্য চাইতে জিরো ডায়াল করে জানতে পারলেন, পুতিন এখন নাইট ক্লাবে ব্যস্ত আছেন, তাঁকে সকালের আগে পাওয়া যাবে না। স্ট্যালিন হতভম্ব হয়ে গেলেন! গুচ্ছের টাকা খরচ করে তিনি ফোন করেছেন কি সেক্রেটারীর রিনিঝিনি মিস্টি হাসি শোনার জন্যে?
এদিকে এক কোনে চুপচাপ বসে ছিলেন শেখ মুজিব। তিনি নিজেকে স্ট্যালিনের অনুসারী বলতে পছন্দ করেন, আবার কেনেডিকেও বিশেষ পছন্দ করেন। সুতরাং তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ না করে তাঁর উপায় কী? এদিকে পকেটের অবস্থা ততৈবচ। রাতের অন্ধকারে আচমকা ঘুম ভেঙে এক কাপড়ে চলে এসেছেন, টাকা পয়সা পাবেন কোথায়? এখানে পার্টটাইম অড-জব করে যা জমিয়েছেন সবই বুঝি যায়... তাই বলে তিনি মেয়ের সাথে কথা বলার এমন সুযোগ হেলায় হারাবেন? পুরো একটা জাতির নেতা তিনি, পিতা তিনি... এই সব ভাবতে ভাবতে তিনিও লাইন চেয়ে বসলেন!
লাইন পাওয়ার পর হাসিনা আর কিছুতেই বাবাকে ছাড়েন না। ইশ কতদিন পর কথা! এই কথা সেই কথা ব্যাঙের মাথা... বাবা জানো আমাদের একটা ময়না পাখি আছে না... কথা চলছেই! শেখ সাহেব ক্রমশ ঘামছেন, কিন্তু কিছু করার নেই। মেয়ে তাকে দুনিয়াতে ডোবাচ্ছে, পরপারেও ডোবাচ্ছে! কী বিপদ!!
যাই হোক, পাঁচ মিনিট পূর্ণ হবার ঠিক আগ মুহূর্তে তিনি প্রায় অভদ্রের মতো ফোন রেখে দিলেন। এছাড়া তাঁর আর উপায়ই বা কী? কাজের কাজ তো কিছু হলই না, এই পাঁচ মিনিটের জন্যেই কত গচ্চা যায় কে জানে! তিনি ভয়ে ভয়ে বিলের জন্য হাত বাড়ালেন।
বিল দেখে তাঁর চোখ ছানাবড়া! তার হতভম্ব ভাব দেখে কেনেডি খুব মজা পেলেন, নিজের দুরবস্থা ভুলতে মুজিবের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া চেহারা টনিকের কাজ দিলো। তিনি হাত বাড়িয়ে মুজিবের হাত থেকে বিলটা নিয়ে তাতে চোখ রাখতেই তার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো! স্ট্যালিনের হাসি তখন দেখে কে! বিশ্বের সবচেয়ে বড় পুঁজিপতিরই বিল দেখে এই অবস্থা... মুজিব ব্যাটা গেছে! দে এখন ক্যামনে বিল দিবি দে!! তিনি লাইন না পাবার অপমান ভুলে বিলটা হাতে নিলেন। কিন্তু এ কী! ততক্ষণে কেনেডি চিৎকার শুরু করে দিয়েছেন। আমেরিকা-রাশিয়া, পুঁজিবাদ-সমাজবাদ, সিআইএ-কেজিবি, ঠান্ডা লড়াই-স্নায়ুযুদ্ধ... সব রকমের বিরুদ্ধবাদ ভুলে এই প্রথম স্ট্যালিন কেনেডির সাথে একমত হলেন, কণ্ঠ মেলালেন-
"এটা অন্যায়, দূর্নীতি.. এ মানা যায় না। বাঙালীরা সবখানে দূর্নীতি করে, এমনকি পরপারেও... হতেই পারে না। পাঁচ মিনিট কথা বলার বিল মাত্র পাঁচটাকা! মামা বাড়ির আবদার? এই জালিয়াতি চলবে না। এটা কি অবৈধ ভিওআইপি নাকি? মানি না, মানবো না..."
ততক্ষণে ফেরেস্তারা ছুটে এসেছেন। টেলি যোগাযোগ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেস্তা জিব্রাঈল খুব বিনীতভাবে বললেন,
"সম্মানিত সাবেক নেতৃবৃন্দ, আমরা বার বার চেক করে দেখেছি। কোথাও কোনও দূর্নীতি হয়নি। এটা একটা ফুলপ্রুফ লাইন, জালিয়াতির কোনও সুযোগই নেই। কিন্তু ওনার বিল আসলেই এর বেশি আসে না।"
কেনেডি ফুঁসে উঠলেন, "বললেই হলো আসে না!"
স্ট্যালিন গর্জে উঠলেন, "কেন আসবে না? আমরা তাহলে এত বিল দিলাম কেন?"
জিব্রাঈল শান্ত স্বরে বললেন, "আসলে আপনাদের কলগুলো ছিল ই-আইএসডি আর এসটিডি। কিন্তু ওনারটা তো লোকাল কল..."
কেনেডি, স্ট্যালিন এমনকি শেখ মুজিবও বিষ্ময়ে চিৎকার করে উঠলেন,
"লোকাল কল মানে?!"
জিব্রাঈল বললেন, "জ্বি ঠিকই শুনেছেন, লোকাল কল। নরক থেকে নরকে তো লোকাল কলই ধরা হবে, তাই না?"
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুন, ২০০৯ সকাল ১১:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


