somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাঙালীর চোখে ইটালী

০২ রা মার্চ, ২০০৭ বিকাল ৫:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঘুরে এলাম সাত পাহাড়ের শহর রোম ও স্বপ্নের শহর ভেনিস। ভেবেছিলাম বিসতারিত ভ্রমন বৃত্মান্ত লিখব। কিন্তু সেটি তোলা থাক ভবিষ্যতের জন্যে। খুব লিখতে ইচ্ছে করছে ইটালীর সাথে বাংলাদেশের মিল এবং ইটালিতে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের কথা।

বাংলাদেশের কথা মনে পরে গেল রোম এর একটি ঘেটো দিয়ে ঢুকতেই। বিলডিংগুলো রংজ্বলা, বারান্দায় কাপড় শুকোতে দেয়া, রাস্তার পাশে লোহার ব্যারিকেড, গাড়ীর আইন না মানা, সবকিছুতেই ঢাকার গন্ধ পাচ্ছিলাম। আর হাইওয়ে থেকে নেমে একটি ট্রাফিক সিগন্যালে এসেই দেজাভূ! রাস্তায় দুজন বাংলাদেশী খবরের কাগজ বিলি করছে। এরা ইটালীতে অবস্থানরত 1 লাখ বাংলাদেশীরই অংশবিশেষ। বলা হয় এদের মধ্যে অধিকাংশই এসছে বৃহত্তর ফরিদপুর ও নোয়াখালী থেকে এবং অনেক পথ পায়ে হেটে, পাকিসতান-ইরান-তুরস্ক হয়ে। বিদেশে এসে এখন অনেক লোকের ভীড়ে দেশী ভাইদের আরও ভালভাবে চিনতে পারি।

ইটালীতে 1990 সালের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশীদের সংখ্যা ছিল কয়েক হাজার মাত্র। কিন্তু 1990 সালের মার্ত্তেল্লী আইনের মাধ্যমে ইটালী সরকার অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বৈধ ঘোষনার সুযোগ দিলে ইটালী খুব আকর্ষনীয় যায়গা হয়ে পরে। সাধারনভাবে টুরিষ্ট হিসেবে বাংলাদেশ থেকে ইটালী আসা খুব কঠিন। ঢাকায় ওদের এমব্যাসিতে ফোন করে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়, যেখানে ফোনটি অধিকাংশ সময়েই কেউই ধরেনা। সম্পদের নিক্তিতে মানুষকে মাপা হয় তাই সাধারন গ্রামের লোকের ভিসা পাওয়া খুব কঠিন। বেশীর ভাগই ইটালীতে এসেছে পরিবারের কারো বদৌলতে বা দালাল ধরে অন্য দেশ ঘুরে।

ত্রেভি ফাউন্টেন দেখতে গেলাম রাত দশটার পরে। চিপা গলি দিয়ে হাটতে হাটতে শুনি এক কোনা থেকে বাংলা লোকসঙীত ভেসে আসছে। কাছে গিয়ে দেখি দেয়ালে হেলান দিয়ে দেশী ভাই। রোদে পোড়া চেহারা, হাতে গোলাপফুল, বিক্রির জন্যে। আরেকটু সামনে হঠাৎ হইচই। পুলিশ একদল হকারকে দৌড়াচ্ছে। ওরা দৌড়ে আমাদের দিকে আসল। আমাদের সাথে শাড়ী পরা মেয়ে, ছোট বাচ্চা। জিগ্গাসু চোখে আমাদেরকে পর্যবেক্ষন। অস্বস্তি লাগছিল তাই সরে এলাম। ট্রেভি ফাউন্টেন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের টুরিস্টে গিজগিজ করছে। ভীড়ের মধ্যে যুবক যুবতী জড়িয়ে বসে ঝর্নার শব্দ শুনছে ও নিজস্ব ভুবনে থাকার চেষ্টা করছে। যুবতীদের অনেকের হাতে তাজা গোলাপ। বিক্রি ভাল হওয়ার কথা। হঠাৎ দেখি পুলিশের দল সরে গেল এবং গুটি গুটি পায়ে বাঙালী ভাইদের পুন:প্রবেশ। ফুলসহ হাত পেছনে রাখা। আবার ব্যবসা হবে। চলে আসলাম ওখান থেকে তাড়াতাড়ি।

ভ্যাটিকানের সেন্ট পিটারস স্কোয়ার এবং বিভিন্ন মোড়ে গাড়ী থামিয়ে ছাতা, ব্যাগ ইত্যাদি বিভিন্ন পশরা বিক্রি করতে দেখলাম আরো কিছু দেশী ভাইকে। সারাদিন রোদে মুখে হাসি ঝুলিয়ে রেখে ফেরী করা নিশ্চয়ই খুব কষ্টের। এই লোকেরা হয়ত একেকজন আট দশ লাখ টাকা খরচ করে এসেছে। তাদের অনেক কষ্ট করেই দেনা শোধ করতে হবে, প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। কি কঠিন জীবন। পাশাপাশি এক আলবানিজ বুড়োকে দেখলাম ভিক্ষা করতে। জীবনের কি কন্ট্রাস্ট।

ভেনিসের একটি ছোট গ্রাম মেস্ট্রেতে প্রচুর বাঙালীর দেখা পেলাম। রাস্তায় সারি সারি বাংলাদেশী দোকান, বাংলা হরফে লেখা দোকানের নাম। ইউরোপে বিলেতের পর সবচেয়ে বেশী দেশীদের বসবাস ইটালীতে। ইটালীর পুলিশকে বলা হয় ইউরোপের সবচেয়ে ভদ্র। ওরা ক্রাইম না করলে সাধারনত অবৈধদের ধরার কষ্ট করতে চায়না। তাদের গাছাড়া ভাব অনেক অবৈধ বাঙালীকে থাকার ও কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছে। আর 5-6 বছর কাটাতে পারলে সুযোগ হয়ে যাচ্ছে বৈধ হয়ে যাওয়ার।

ভেনিসে যে আত্মীয়র বাড়ীতে উঠলাম সে রেস্টুরেন্টে কাজ করে শুনে প্রথমে বিস্মিত হয়েছিলাম (আমরা জানতাম অন্য চাকরি করে)। কিন্তু তার কাছেই শুনেছি 15-18 ঘন্টা একাধিক রেস্টুরেন্টে কাজ করে 4000 ইউরো মাসে আয় করে সে যেখানে একজন সরকারী ইনজিনিয়ার 2000 ইউরোর বেশী পায় না। শিক্ষিত সে, 6-7টি ভাষা জানে, দশ বছর ধরে আছে এবং বাড়ী গাড়ী করেছে। তাদের জীবন যাত্রার মানের সাথে সাধারনের চলা মুশকিল।

ইচ্ছে করেই এদের কোন ছবি তুলিনি। এদের কষ্টের কাছে নিজের জীবন খুব অলস মনে হলো। তবে অচিরেই এরা আরও প্রতিষ্ঠিত হবে, তাদের কষ্টের স্বীকৃতি পাবে এবং মাথা তুলে বিশ্বে তাদের অবস্থান জানাবে। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে কষ্টের বিকল্প নেই। তাদেরকে লাল সালাম।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা মার্চ, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:১১
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হিন্দু মুসলমান ভুলে গিয়ে, আমরা সবাই মানুষ হই

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৩ রা মে, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



আমি জন্মগত ভাবে মুসলমান।
অবশ্য ধর্মীয় নিয়ম কানুন কিছুই মানতে পারি না। মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। এখন তো আর এটা ফকির লালনের যুগ না। মানবিক এবং সচেতন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নান্দাইলের ইউনুস ও স্বপ্নভঙ্গের বাংলাদেশ

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ০৩ রা মে, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০


নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে প্রচারিত হুমায়ূন আহমেদের জনপ্রিয় একটি নাটকে একজন ভাড়াটে খুনীর চরিত্র ছিল। খুনীর নাম ইউনুস - নান্দাইলের ইউনুস। গ্রামের চেয়ারম্যান তার প্রতিদ্বন্দ্বী একজন ভালো মানুষ স্কুল শিক্ষককে হত্যার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্বনির্ভর অর্থনীতি থেকে ঋণনির্ভর, আমদানিনির্ভর, পরনির্ভর রাষ্ট্রে পরিনত হতে যাচ্ছি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৩ রা মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৪




মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কাছে নতজানু হয়ে যে রাষ্ট্রগুলো নিজের অর্থনীতি, কৃষি আর ভবিষ্যৎ বিক্রি করে দেয়- তার পরিণতি কী, তার জীবন্ত উদাহরণ পাকিস্তান। কোটি কোটি মানুষকে ভিক্ষুক বানানোর সেই পথেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

এরা খুবই বিপদজনক

লিখেছেন শ্রাবণ আহমেদ, ০৩ রা মে, ২০২৬ রাত ১১:০১

যে তোমার সাফল্য দেখে হিংসে করে,
যে তোমার বিপদ দেখে খুশি হয়,
যে তোমার সামনে এক আর পেছনে আরেক।
তাকে তোমার গোপন কথা কিংবা তোমার কোনো পরিকল্পনার কথা বলতে যেও না।
সবসময় তার... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্পিরিট শোন বাই আমেরিকান এয়ারলাইন্স-এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত!

লিখেছেন ঢাকার লোক, ০৪ ঠা মে, ২০২৬ ভোর ৪:১৫

গতকালের একটা বড় খবর ছিল আমেরিকার একটি অন্যতম জনপ্রিয় বিমান সংস্থা স্পিরিট এয়ারলাইন্স দেউলিয়া হয়ে তাদের সব সেবা তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। বেশ কিছুদিন ধরেই স্পিরিট অর্থনৈতিক সংকটে হাবুডুবু খাচ্ছিলো,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×