somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

রম্যঃ রসগোল্লা ভক্ষণ

০৭ ই মে, ২০১৮ রাত ৮:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
ছবিঃ গোগুল


শামচুল হক

হুকুম আলীর ছোট থেকেই রসগোল্লা খুব পছন্দ। বড় হওয়ার পরও রসগোল্লা দেখলেই তার জিহ্বাটা লক লক করে। স্ত্রীর দেয়া বাজারের পয়সা বাঁচিয়ে হলেও রসগোল্লা খাবে।

একাত্তর সালে যুদ্ধের সময় হঠাৎ জ্বর হলো। জ্বর তাও এই সেই জ্বর নয়, টাইফয়েড জ্বর। যুদ্ধের কারণে ডাক্তার, কবিরাজ বিহীন ঔষধ পথ্য ছাড়াই জ্বর ভালো হলো। বিনে চিকিৎসায় জ্বর ভালো হলো বটে তবে পেট ব্যথায় বড় যন্ত্রনা ভোগ করতে লাগল। দেশ স্বাধীনের পরে অনেক ডাক্তার কবিরাজ দেখালো কিন্তু পেট ব্যথা ভাল হলো না। এমন পেটের ব্যথা, না খেতে পারে না ঘুমাতে পারে। শরীর শুকিয়ে কাঠ, পিঠের হাড্ডিগুলোও গোনা যায়। দুর্বল শরীরে ঠিকমত হাঁটতেও পারে না, মাথা ঘুরে পড়ে যায়।

শারীরিক এই অবস্থায় তার মনে হলো সে আর বাঁচবে না। মরার আগে ভাল-মন্দ কিছু খেয়ে মরা দরকার। মরে গেলে তো আর ঘুরে এসে খাওয়া যাবে না, যা খাওয়া দরকার তা বেঁচে থাকতেই খেতে হবে। তার নেশা অনুযায়ী রসগোল্লা খাওয়ার খুব শখ হলো। বাড়ির লোকজন তার ইচ্ছা অনুযায়ী রসগোল্লা এনে দিল কিন্তু খেয়ে তৃপ্তি মিটল না। আরো রসগোল্লা দরকার, পেট ভরে খাওয়া দরকার। পেট ভরে না খেলে যেন তার রসগোল্লাই খাওয়া হয় না।

সারা দিন গোল্লা গোল্লা করায় হুকুম আলীর বউ কিছুটা বিরক্ত হয়েই বলল, তোমার যদি এতো গোল্লা খাইবার মন চায় তাইলে ঘরে বইসা রইছ ক্যান, ময়রার দোকানে যাইবার পারো না? ময়রার হাঁড়ির উপর বইসা আত্মা ঠান্ডা কইরা খায়া আইসো।

বউয়ের খোঁচা মারা কথা হুকুম আলীর আঁতে লাগল বটে কিন্তু রাগ হলো না। মনে মনে ভাবল বউয়ের কথায় রাগ না করে বরঞ্চ উল্টো কৌশল অবলম্বন করা দরকার। রাগলে রসগোল্লা নাও খাওয়া হতে পারে। বুঝেও না বোঝার ভান করে তার খোঁচা মারা কথাটাকেই সম্মতি স্বরুপ ধরে নিয়ে আনন্দে বিগলিত হয়ে বলল, বউরে, এতদিনে তুই আমার মনের কথাডাই কইছোস। এই কথাডাই কেউ কয় না।

হুকুম আলীর বউ স্বামীর চালাকি বুঝতে না পেরে কিছুটা অবাকই হলো। তার খোটা দিয়ে বলা কথাটাও সে সত্যি হিসেবে ধরে নিল! যে লোক কথায় কথায় খ্যাক খ্যাক করে উঠে, সেই লোক খুশিতে বিগলিত হয়ে স্ত্রীর কথাকে তার মনের কথা হিসাবে ধরে নিল। এহেন পরিবর্তন দেখে স্বামীর প্রতি তার মায়া হলো। কথার খোটা না মেরে সহজভাবে বলল, তোমার ভাব দেইখাই তো কইলাম, হাজার হইলেও তুমি আমার স্বামী না, তোমার মনের কথা কেউ না বুঝলেও আমি তো বুঝি।

এতক্ষণ সে বউয়ের কাছে এমন কথাই আশা করেছিল। রসগোল্লা খাওয়ার অনুমতি পেয়ে মুখটা খুশিতে উজ্বল হয়ে উঠল। যে মানুষ নড়তে চড়তে পারে না সেই মানুষ নিজেই দশ কেজি পাট ঘাড়ে নিয়ে হাটের দিকে দৌড়াতে লাগল।

খুশিতে দৌড়ালে কি হবে সরাসরি হাটে যাওয়ার কোন রাস্তা নেই, মাঝখানে নদী পার হতে হয়। নদীর পাড়ে গিয়ে তার দৌড়ানো থেমে গেল। হাটবারে খেয়া ঘাটে প্রচন্ড ভির। নৌকা এপারে আসার সাথে সাথেই কার আগে কে নৌকায় উঠবে হুড়াহুড়ি লেগে গেল। হুকুম আলীরও তর সইছে না, অসুস্থ্য শরীর নিয়েই ঠেলে ঠুলে নৌকায় উঠল।

হুড়মুড় করে অতিরিক্ত লোক উঠায় নৌকা তলতল হওয়ার অবস্থা। অন্যান্যদের মত হুকুম আলীও পাট মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভরা নৌকা একটু কাত হলেই উপচে পানি উঠছে। অতি সাবধানে মাঝি নৌকার লগি ঠেলছে। মাঝি সাবধান হলে কি হবে? লোকজন তো সাবধান হয় না। শত লোকের নড়াচড়ার ঠেলায় মাঝ নদীতেই নৌকা তলিয়ে গেল। সবার সাথে হুকুম আলীও মাথার পাটসহ ডুবে গেল। নৌকা ডুবে যাওয়ায় জান বাঁচানোর জন্য সবাই জিনিষপত্র ফেলে সাঁতরাতে লাগল, কিন্তু হুকুম আলী পানির নিচেও পাটের বোঝা জড়িয়ে ধরে রাখল।

তার চিন্তা হলো পাট ছাড়া তো রসগোল্লা খাওয়া যাবে না-- কাজেই পাট নিয়েই তাকে ভেসে উঠতে হবে। কিন্তু যতই পাট নিয়ে উপরে উঠার চেষ্টা করে ততই পাট পানিতে ভিজে ভারি হয়ে নদীর তলার দিকে যায়। দুর্বল শরীরে পানির নিচে আর কতক্ষণ থাকতে পারে? দম বন্ধ হয়ে মরার অবস্থা। কুলাতে না পেরে ইতোমধ্যে কিছু পানিও খেয়ে ফেলেছে। পাটসহ উপরে উঠতে না পেরে মনে মনে ভাবল, রসগোল্লা খেতে এসে বুঝি জানটাই যায়। জান যায় যায় অবস্থায় পাটে লাথি মেরে উপরে ভেসে উঠে।

হুকুম আলী পানির উপরে ভেসে উঠতেই অন্যান্য নৌকাওয়ালারা টেনে হিঁচড়ে নৌকায় তোলে। হুকুম আলী নৌকায় উঠেই অজ্ঞান। অনেক পরে হুশ হলে হাটের লোকজন ধরাধরি করে বাড়ি পৌছে দিয়ে যায়। নদীর তল থেকে মরতে মরতে বেঁচে আসলেও বাড়ি এসে জান নিয়ে টানাটানি। ব্যাঙের মত ফুলে ফেঁপে ঢোল হওয়া পেট নিয়ে নড়তে চড়তে পারে না। কারণ ভগ্যে রসগোল্লা না জুটলেও নদীর তলায় ঘোলা পানির অভাব হয় নাই। রসগোল্লার সাধ সে নদীর ঘোলা পানিতেই মিটিয়েছে।

তবে নদীর ঘোলা পানি খেয়ে তার ক্ষতি হয় নাই বরঞ্চ লাভই হয়েছে। অতিরিক্ত পানি খাওয়ায় ঐযে পেট ব্যাথা সেরেছে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আর ঐ ব্যাথা কখনই ভাসে নাই।
০০০ সমাপ্ত ০০০

(রম্যটি যুদ্ধ পরবর্তী বাস্তব ঘটনা থেকে নেয়া। ঘটনার নায়ক আমার পাশের গ্রামের এক চাচার। চাচা এখনো বেঁচে আছেন। নৌকা ডুবে মরতে মরতে বেঁচে যাওয়া চাচার আসলেই পেটের ব্যথা ভালো হয়েছিল। কাহিনীকে রসালো করার জন্য আমি শুধু চাচার নাম পরিবর্তন করে রংচং লাগিয়েছি।)
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মে, ২০১৮ ভোর ৬:১৩
২৯টি মন্তব্য ২৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"কর্পোরেট_ফ্যাক্টসমুহ"

লিখেছেন মামুন রেজওয়ান, ২৮ শে জুলাই, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৪

"কর্পোরেট_ফ্যাক্ট_২১"



সব সময় ইন্টার্ভিউ দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমরা জানতে পারি অনলাইনে। কিন্তু যারা ইন্টার্ভিউ নেন বিভিন্ন পজিশনের জন্য তাদের অভিজ্ঞতা খুব একটা জানা হয়না আমাদের। তাই আমরাও যারা মোটামুটি এক্সপেরিয়েন্স... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা: (দ্বিতীয় পর্ব)

লিখেছেন মৃত্যুঞ্জয়, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০০

কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

দ্বিতীয় পর্ব: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বিভাজন এবং অসম প্রতিযোগিতা

একটি শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

দেবদাস, কালজয়ী উপন্যাস এবং চিত্রনাট্যের পটভূমি

লিখেছেন মেহবুবা, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ১১:২৮


প্রথম ১৯২৮ সনে নির্বাক "দেবদাস" মুক্তি পায় ফনী বর্মা এবং তারকবালা অভিনীত ছিল সেটি। এরপর প্রমথেশ বড়ুয়া এবং যমুনা বড়ুয়া অভিনীত সবাক দেবদাস মুক্তি পায় ১৯৩৫ সনে। তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৪৩




যে হৃদয় বিলিয়ে দেয়, বিশ্ব চরাচরে
শান্ত গৌরবে, সেই আত্মারা কোথায় বেঁচে রয়।
দয়ার প্রতিটি বীজ সর্ন্তপণে বপন করা হয়,
সপ্তাকাশে উজ্জ্বল ফসল তবে অবধারিত রয়।

সাত আকাশের চরাচরে , ছায়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কেমনের দিনে

লিখেছেন শাওন আহমাদ, ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৫



মাঝেমধ্যেই মনের ক্যানভাসটা কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে যায়। পৃথিবীর সমস্ত রং হারিয়ে যায় অচেনা পথের বাঁকে। কোনো সংকেত ছাড়াই একরাশ এলোমেলো বিষণ্ণতা এসে জেঁকে বসে মনের কার্নিশে। চারপাশের চেনা জগৎটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×