
শামচুল হক
সেদিন বাবলু কোন এক দরকারে ফুফাতো ভাই ফরিদ আলীর বাড়ি গিয়েছে। বাড়ির ভিতরে ঢুকতে গিয়ে থমকে গেল। উঠানে দাঁড়িয়ে ফুফাতো ভাইয়ের বউ ঝগড়া করছে। স্বামীকে গালি দিয়ে বলছে, বেজন্মার ঘরের বেজন্মা। এমন বেজন্মার সাথে বাপে আমারে বিয়া দিল, না পাইলাম দুই বেলা পেট ভইরা ভাত না পাইলাম সুখ-শান্তি। জীবনডা আমার বেজন্মার হাতে কিল খাইতে খাইতেই গেল।
স্বামী বেচারা ঘরেই ছিল, বউয়ের কথা শুনে গর্জে উঠল, এই কি কইলি রে- - -?
স্বামী গর্জে উঠায় বউ মনে হয় কিছুটা ভয় পেয়েই বলল, কি কমু আবার, কিছু কই নাই।
-- আরে হারামজাদী মাগী, বেজন্মা কয়া গাইল দিলি আবার কস কই নাই।
-- গাইল দিয়া কিছু কইলেই দেহি পট কইরা কানে ঢোকে, ভালো কথা কইলে তো কানে ঢুকতে দেহি না।
-- আরে হারামজাদী-- বেজন্মা কয়া গাইল দিবি আবার কইলে উলটা ঝাড়ি মারোস, তর সাহস তো কম না? তর তো দেহি ত্যাল বাইরা গ্যাছে, খাড়া-- তর ত্যাল আগে খাটো কইরা নেই, বলেই হাতে লাঠি নিয়ে বউ মারার জন্য তেড়ে আসল।
স্বামীকে লাঠি নিয়ে তেড়ে আসতে দেখেই বউ বাড়ির পিছন দিকে দে দৌড়, মহুর্তেই উধাও।
স্বামী স্ত্রীর এই অবস্থা দেখে বাবলু বেকি বেড়ার ভিতরে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালো। মনে মনে ভাবল- এ অবস্থায় বাড়ির ভিতর ঢোকা উচিৎ হবে না, তারচেয় বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ভালো। বাবলূ পুণঃরায় বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়িয়ে রইল।
স্বামী লাঠি হাতে বাড়ির পিছনে গিয়ে অনেক খুঁজেও বউকে পেল না। রাগে গজ গজ করতে করতে বাড়ির সামনে এলো। এসেই দেখে বাবলু দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখেই রাগান্বিত ভাবটি মুহুর্তেই পরিবর্তন করে বলল, আরে বাবলু-- কহন আইছা?
বাবলু স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিল, এই তো-- মাত্র আইলাম।
-- বাড়িতে আইসা বাড়ির সামনে খাড়ায়া রইছস ক্যান? আয় আয় বাড়ির ভিতের আয়।
ফরিদ আলীর আদর মাখা কথায় বাবলু আর দেরি করল না, সাথে সাথেই বাড়ির ভিতরে ঢুকলো। ঘরে নিয়ে বাবলুকে চৌকির উপর বসতে বলে বউকে উচ্চ স্বরে ডাকতে লাগল। এই হাবুলের মাও কই গেলিরে--। এই হাবুলের মাও--- এ--ই হাবুলের মাও-- -
স্বামীর গলা ফাটানো ডাকা ডাকিতেও বউ কোন সারা দিল না। বউয়ের সারা না পেয়ে আবার মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। বাবলুর সামনেই বউকে উদ্দেশ্য করে গালি দিতে লাগল, শালা মেয়া মানুষ মাইনষের জাতই না, শালাগোরে এমনি এমনি থাপরাই।
তার রাগারাগি দেখে বাবলু জেনেও না জানার ভান করে বলল, ভাই-- কার সাথে রাগারাগি করেন?
-- আরে কইস না--। তর ভাবির সাথে রাগারাগি করি।
-- ভাবির সাথে রাগ করেন কি নিয়া?
-- আরে দ্যাহস না-- গলা ফাটায়া চিল্লাইতেছি তারপরেও জবাব দেয় না।
-- এই রকম গালাগালি করলে পাগলেও তো জবাব দিব না।
-- তাইলে কি করমু?
-- ভালো কইরা ডাক দ্যান।
-- ভালো কইরা ক্যামনে ডাক দিমু তুই আমারে শিখায়া দে।
বাবুল ফরিদ আলীর কথা শুনে বিপদে পড়ে গেল। বউকে ভালো করে ক্যামনে ডাকতে হয় এটা সে কিভাবে শিখাবে। সে তো নিজেই বিয়ে করে নাই। ফরিদ আলী একে তো ফুফাতো ভাই তারোপর বয়সেও অনেক বড়। কিভাবে বউ ডাকতে হয় সেটা কি বড় ভাইকে শিখানো যায়?
বাবলু কোন বুদ্ধি না পেয়ে বলল, ভাবিরে ডাকা লাগবো না, আপনি আমার সাথে চলেন।
-- কই যামু?
-- বাবা যাইতে কইছে।
-- মামু যাইতে কইছে-- কি দরকার?
-- তা জানি না, বাবায় কইছে আপনারে সাথে নিয়া যাইতে।
-- তর সাথে গেলে তো গেলাম, কিন্তু ট্যাকা লাগবো তো?
-- ট্যাকা দিয়া কি করবেন?
-- হাটে যাইতে হইবো, ট্যাকার দরকার।
-- নেন, ট্যাকা নেন।
-- ট্যাকা তর ভাবীর কাছে। ট্যাকা ছাড়া যাই কেমনে?
-- তাইলে ভাবীরে ডাক দেন।
-- আমার ডাকে আইবো না, তুই ডাক দে।
-- আমি ডাক দিলে আইবো?
-- আইবো।
বাবলু ভাবী - -- ভাবী--- - বলে ডাকাডাকির পরও সারা পেল না।
বাবলুর ডাকে সারা না পেয়ে ফরিদ আলী রেগে গিয়ে আরো কিছু গালি দিয়ে বলল, বাবলুরে-- তুই একটু পাশের বাড়িতে যা তো ভাই, গিয়া দ্যাখ তর ভাবী কারো ঘরে হয়তো বইসা আছে।
ফরিদ আলীর কথামত বাবলু পাশের বাড়ি গিয়ে দেখে ফরিদ আলীর বউ ঠিকই রান্না ঘরের দাওয়ায় মন মরা হয়ে বসে আছে। বাবলুকে দেখেই তাড়াতাড়ি দাওয়া থেকে নেমে এসে জিজ্ঞেস করল, তুই কখন আইছোস?
-- একটু আগেই আইছি।
-- তর ভাইয়ের সাথে দেখা করছা।
-- করছি। ভাই আপনারে খুঁজতেছে।
-- তর ভাই আমারে খোঁজে কিয়ের লাইগা?
-- হাটে যাইবো-- ট্যাকা নাকি আপনার কাছে?
একথা শুনে ফরিদ আলীর বউ মুখটা কালো করে বলল, তর ভাই যাইতে তো কইছে, কিন্তু তর ভাই তো মানুষ না, একটা অমানুষ।
ভাবীর কথা শুনে বাবলু আশ্চার্য হওয়ার কপট ভাব দেখিয়ে বলল-- কন কি ভাবি! ভাই আবার অমানুষ হইল কবে?
-- আর কইস না রে ভাই, কথায় কথায় আমারে মাইরা ধইরা জানডা শেষ কইরা ফালাইল।
-- আমার সাথে আহেন, আমি থাকলে আর মারতে পারবো না।
-- তুই যদি যাইতে কস তাইলে যামু।
-- ঠিক আছে আহেন, আমি থাকলে হাত তোলার সাহস পাইবো না।
বাবলুর কথায় ফরিদ আলীর বউ চলে এলো। বাবলু ডেকে আনায় ফরিদ আলী বউকে কিছুই বলল না। স্বাভাবিক ভাবেই বলল, হাটে যামু ট্যাকা দে।
কাঠের বাক্স খুলে বউ টাকা বের করে দিলে টাকাগুলো হাতে নিয়ে বলল, ট্যাকা যহন পাইছি তাইলে আর দেরি করার দরকার নাই, চলরে বাবলু।
ফরিদ আলী চলরে বালায় বাবলু তৎক্ষনাৎ ঘরের বাইরে চলে আসে। বাবলু ঘরের বাইরে আসায় ফরিদ আলী বউকে একা পেয়ে দুই গালে চটাচট দু’টি থাপ্পর দিয়ে বের হয়ে আসে। আকস্মিকভাবে থাপ্পর দেয়ায় বউ রেগেমেগে আবার গাল দিয়ে উঠে, বেজন্মার ঘরের বেজন্মা, আল্লায় বিচার করবো, হাত খইসা পড়বো।
হাত খাইসা পড়বো শুনে ফরিদ আলী দাঁত মুখ খিচতে খিচতে আবার মারার জন্য উঠান থেকে ঘরের দিকে ফিরতে উদ্যোত হলে বাবলু দৌড়ে এসে ফরিদ আলীকে জাপটিয়ে ধরে।
জাপটিয়ে ধরায় ফরিদ আলী বাবলুকে বলল, এই ছাইড়া দে, শালার মাগীর মুখটা আগে ঠিক কইরা নেই।
বাবলু জাপটিয়ে ধরে রেখেই বলল, আরে ভাই-- আপনি কি পাগল হইছেন নাকি?
-- তুই আবার কি কস? আমি পাগল হমু ক্যান রে? তর সামনেই তো গাইল দিল, শুনলি না?
-- কথায় কথায় এই রকম মাইরধোর করলে কতক্ষণ সহ্য করবো? সহ্য করবার না পাইরা গাইল দিছে।
-- এই-- তুই বুঝবি না রে-- তোর এখনও বোঝার বয়স হয় নাই, মহিলাদের কিলের উপর না রাখলে মহিলারা ঠিক থাকে না, জানো--স?
-- এইডা কথা কইলা ভাই, যারা বউ কিলায় না তাদের বউ কি ঠিক থাকে না?
-- ঠিক থাকে কিন্তু শান্তি পায় না।
-- বউ কিলাইলে কি সংসারে খুব শান্তি পাওয়া যায়?
-- তুই এসব বুঝবি না।
আপনার কথা এহন আমার বুঝে আসবো না, আপনে চলেন তো। বলেই ফরিদ আলীকে কিছুটা টানতে টানতেই বাড়ির বাইরে নিয়ে আসলে বউ বাড়ির ভিতর থেকে আবার বলে উঠল, বেজন্মার ঘরের বেজন্মা, আমারে বিনা কারণে মাইরধোর করোস, আল্লায় বিচার করবো, রাস্তায় ঠাস কইরা পইড়া মরবি।
বউয়ের গালাগালি শুনে ফরিদ আলী আবার ক্ষেপে উঠে বলল, বাবলুরে হুনছোস-- তর ভাবী আমারে কি কইল?
বাবলু পিছনে এসে ফরিদ আলীর ডান হাতটি খপ করে ধরে টানতে টানতে বলল, যা কইছে কইছেই, আসেন তো।
ডান হাত বাবলু ধরে রাখায় ফরিদ আলী বাম হাত নেড়েই কথা বলতে লাগল, আরে আমি কি আর কম দুঃখে কিলাইরে। অর মুখের চোটে কিলাই। আসলে এইডা মাইনষের জাতই না। হাজার কিলাইলেও মুখ বন্ধ করবো না।
-- কিলাকিলি না কইরা দুইজনে মিলাঝিলা থাকবার পারেন না?
-- আমি কি ইচ্ছা কইরা কিলাইরে, ব্যাসৃষ্টি মুখের চোটে কিলাই।
-- কিলাইলে কি মুখ ভালো হইবো।
-- তাইলে কেমনে মুখ ভালো হইবো?
-- দুইজনে মিলের মধ্যে আইতে হইবো।
-- তুই তো দেহি আরেক পাগল, ও আমারে যা তা কইয়া গাইল দিব, আর আমি মিলাঝিলা থাকমু। এইডা কি কথা কইলি রে - -? এইভাবে মিলঝিল হয়?
-- আপনি চেষ্টা করলেই মিলঝিল হয়।
-- ধূর ব্যাক্কল- - - তর এহনো বুঝই আসে নাই, তর সাথে কথা কওয়াই উচিৎ না, বলেই ফরিদ আলী চুপ হয়ে গেল।
এর পরে দুইজনে কথা না বলেই চুপচাপ হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে একসময় বাবলুদের বাড়ি চলে এলো। বাবলু ফরিদ আলীকে ঘরের বারান্দায় বসিয়ে রেখে অন্য দিকে চলে গেল। ফরিদ আলীও বেশি দেরি করল না। বাবলুর বাবার সাথে প্রয়োজন সেরে তড়িঘড়ি হাটে চলে গেলে। যাওয়ার সময় বাবলুর সাথে আর দেখা হলো না।
বাবলু ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হওয়ায় গ্রামে খুব একটা থাকে না। ইতোমধ্যে দু’বছর কেটে গেছে। গ্রীষ্মের ছুটিতে বাড়ি এসে শহরে বেড়াতে গেছে। মেইন রোড দিয়ে হাঁটার সময় হঠাৎ দেখে ফরিদ আলী তার সামনে দিয়ে খুব দ্রুত হেঁটে যাচ্ছে। তাকে দেখেই বাবলু ডাক দিল, ও ফরিদ ভাই-- হন হন কইরা কই যান?
বাবলুর কণ্ঠ শুনে ফরিদ আলী থেমে যায়। দ্রুত বাবলুর কাছে চলে আসে। চোখে মুখে দুঃশ্চিন্তার ছাপ। বাবলুর কাছে এসেই বলে উঠে, বাবলুরে-- তরে পাইয়া খুব ভালো হইল।
-- ক্যান কি হইছে?
-- আরে বিপদে পড়ছি রে।
-- কি বিপদ?
-- তর ভাবী হাসপাতালে, তুই একটু আমার সাথে আয় তো রে ভাই।
-- ভাবী হাসপাতালে তো ভালই হইছে।
বাবলুর কথা শুনে ফরিদ আলী আশ্চার্য হয়ে যায়-- ভালো হইছে মানে!
-- তুমি তো ভাবীরে দেখতেই পারো না, ভাবী মরলেই তো তোমার ভালো।
বাবলুর কথা শুনে ফরিদ আলী ধমকে উঠে, এই ব্যাক্কল, তুই কস কি?
-- কি কই আবার, যা সত্য তাই কই।
-- আমি তর ভাবীরে দেখবার পারি না তরে ক্যাডা কইছে?
-- ক্যাডা কইবো আবার, আমি নিজ চোখেই তো দেখছি, তুমি কথায় কথায় মাইরধোর করো না?
-- আরে ভাই তুই বুঝবি না। অভাব সংসারে মন মেজাজ ঠিক থাকে না তাই একটু আধটু হাত তুলি। তাই বইলা তর ভাবীরে দেখবার পারি না এইডা তরে কেডায় কইছে?
-- কেউ কয় নাই, তোমার মাইরধোর দেইখা কই, সারা দিন কথায় কথায় কিল খাওয়ার চেয়ে ও ব্যাচারীর মইরা যাওয়াই ভালো।
-- হেই ব্যাক্কল, এইডা তুই কি কস? ও মইরা গেলে আমার তিন পোলা মাইয়ার কি হইবো রে-- ? হেইডা চিন্তা কইরা দেখছোস?
-- তাইলে ভাবীর জন্য না, পোলা মাইয়ার জন্য তারে বাচায়া রাখতে হইবো?
-- আরে রাখ তো তর মাতব্বরী তর্ক। আয় তো আয়, আমার সাথে হাসপাতালে আয়।
-- খালি হাসপাতালে গেলে তো হইবো না, ভালো ডাক্তার দেখাইতে হইলে ট্যাকা লাগবো।
-- আরে ট্যাকা আনছি।
-- কয় ট্যাকা আনছেন?
-- ম্যালা ট্যাক আনছি।
-- ম্যালা কয় ট্যাকা আনছেন?
-- আরে দশ হাজার ট্যাকা আনছি।
-- এত ট্যাকা পাইলেন কই?
-- দুইডা খাসি বেচছি।
ফরিদ আলীর খাসি বেচার কথা শুনে বাবলু আশ্চার্য হয়ে যায়। চোখ কপালে তুলে বলে -- দুইডা খাসি বেচছেন! আমার তো বিশ্বাস হয় না।
-- ট্যাকা দেখলি তো বিশ্বাস করবি?
-- দেখান দেহি ট্যাকা।
বাবলু টাকা দেখতে চাওয়ায় ফরিদ আলী কমরে পেচিয়ে রাখা লুঙ্গির খুট খুলে দ্যাখালো। সত্যিই ফরিদ আলী অনেক টাকা এনেছে।
টাকা দেখে বাবলু বলল, দুই খাসির ট্যাকা যে আপনি ভাবীর পিছনে খরচ করবেন এইডা তো আমার বিশ্বাস হয় না।
বাবলুর অবিশ্বাসী মূলক কথা শুনে ফরিদ আলী বলল, আরে ঘরের মানুষ মইরা যায় আমি খাসি দিয়া কি করমু রে--। ও বাইচা থাকলে এরকম খাসি কত হইবো।
হঠাৎ করে ফরিদ আলীর পরিবর্তন দেখে বাবলু কিছুটা অবাকই হলো। যে বউকে দেখতেই পারে না, কথায় কথায় গালে চড় মারে, লাঠি দিয়ে পিটায়, সেই বউয়ের জন্যে দশ হাজার টাকা খরচ করবে! বিষয়টি যেন তাকে ভাবিয়ে তুলল। আরো আশ্চার্য হলো, ফরিদ আলী যখন বাবলুর দুই হাত জড়িয়ে ধরে বলল, বাবলুরে-- তর দুইডা পায় পড়ি রে ভাই, তুই আমার বউডারে বাঁচারে ভাই, বেশি দেরি করা যাইবো নারে--, দেরি করলে ও মইরা যাইবো রে--।
ফরিদ আলীর কাকুতি মিনতি দেখে বাবলু ভাবতে লাগল, মানুষের ভালোবাসা কখন কার প্রতি কিভাবে প্রকাশ পায় তা বোঝা মুশকিল। বউকে বাঁচানোর জন্য ফরিদ ভাই যে ভাবে কান্না কাটি করছে তাতে তার মধ্যে ভালোবাসার এতটুকু কমতি নাই বলেই মনে হচ্ছে। বড় ভাই হয়ে ছোট ভাইয়ের পায়ে পড়তে চাওয়া কম দুর্বলতা নয়। বউয়ের জন্য এরকম কাকুতি মিনতি খুব কমই চোখে পড়ে। তার কান্না মিশ্রিত অনুরোধে বাবলু আর পাশ কাটাতে পারল না। ফরিদ আলীর সাথে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে গেল। হাসপাতালে গিয়ে দেখে মেয়েলি রোগে রক্ত ক্ষরণ হয়ে বেচারী মরার অবস্থা। চিকিৎসায় বেশি দেরি করলে হয়তো মারাই যাবে।
বাবলু যাথাসাধ্য চেষ্টা করে তাড়াতাড়ি গাইনি ডাক্তার দেখিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যবস্থা করল। ল্যাবে নিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষার পর জড়ায়ুতে ইনফেকশন ধরা পড়ল। প্রায় দশ দিন হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা করতে হলো। মোটামুটি সুস্থ্য হলে ডাক্তার বাড়ি নিয়ে ওষধ পথ্যের পাশাপাশি ভালো ভালো খাবার খাওয়ানোর পরামর্শ দিয়ে রিলিজ দিল।
রুগী রিলিজ হওয়ার সময় বাবলু উপস্থিত ছিল। বিল-বাট্টা প্রশাসনের ঝামেলা মিটিয়ে বেলা বারোটার সময় রুগী বের করার অনুমতি মিলল।
ফরিদ আলীর বউ অভাব সংসারের মানুষ হলেও খাওয়ায় খুব একটা কষ্ট করত না। গ্রামের মানুষ হিসাবে চেহারা বেশ নাদুস নুদুস ছিল। কিন্তু এই কয়দিনে শুকিয়ে কাঠ হয়েছে। চোখ দু’টো কোটরে ঢুকেছে। শরীর খুবই দুর্বল। রুগীর বেড থেকে নেমে হাঁটতে গিয়ে মাথা ঘুরে পড়তে ধরলে ফরিদ আলী তাড়াতাড়ি বউকে জড়িয়ে ধরে বলল, তুই এক হাত আমার ঘারের উপর দে।
ফরিদ আলীর বউ ফরিদ আলীর ঘাড়ের উপরে হাত দিলেও দুর্বলতার কারণে টলকে টলকে পড়ে যাওয়ার অবস্থা। বউয়ের এই অবস্থা দেখে ফরিদ আলী বলল, তর শরীল দুর্বল, তুই নিজের শরীলের উপর ভর দ্যাস ক্যা, আমার শরীলের উপর পুরা ভর দিবার পারোস না?
ফরিদ আলীর বউ স্বামীর কথামত তার শরীরের উপর ভর রেখে হাঁটতে গিয়েও হাঁটতে পারছিল না, অবশেষে ফরিদ আলী দুইহাত দিয়ে বউকে পুরোপুরি পাঁজাকোলা করে হাসপাতালের বাইরে নিয়ে এলো। অপেক্ষমান রিক্সায় বসিয়ে দিয়ে নিজেও পাশে বসল। অসুস্থ্য বউ যাতে চলন্ত রিক্সা থেকে পড়ে না যায় তার জন্য এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে রইল। শরীরের ভার বহন করতে না পারায় নিজের মাথাটা স্বামীর কাঁধের উপর রেখে দিল। রিক্সা আস্তে আস্তে হাসপাতালের গেটের বাইরে চলে গেল।
হাড্ডিসার দেহের বউকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে যেতে দেখে বাবলুর চোখ দু’টা আনন্দে ছলছল করে উঠল। মনে মনে চিন্তা করল, স্বামীর ভালোবাসা নাকি বোঝা যায় স্ত্রীর অসুখের সময়, আজ যেন চোখের সামনে তারই প্রমাণ হলো। অভাব সংসারে এমন ভালোবাসা খুব একটা দেখা যায় না। অভাবের কারণে মন মেজাজ ঠিক থাকে না বলে অনেক সময় বউকে মারধোর করে ঠিকই কিন্তু তাতে তাদের প্রকৃত ভালোবাসা কমে না।
০০০ সমাপ্ত ০০০
ছবিঃ গোগুল
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মে, ২০১৮ দুপুর ১:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



