somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

যশোর রোডে বাংলাদেশী রোগীদের অন্তহীন মিছিল

১৩ ই নভেম্বর, ২০১৬ সন্ধ্যা ৬:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে কলকাতামূখী বাংলাদেশী শরণার্থীর ভীড়ে ব্যথিত এ্যালেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’। কবির মত কবিতাটাও বিখ্যাত হয়েছিল। বিশ্ববাসী পরিচিত হয়েছিল বেনাপোল থেকে কলকাতামূখী এই সড়কের সাথে। সাম্প্রতিককালে সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড-এ সুরারোপের পর কন্ঠ দিয়ে বিখ্যাত হয়েছেন মৌসুমী ভৌমিক।
মুক্তিযুদ্ধ শেষ। আমরা এখন স্বাধীন। তবুও যশোর রোডে বাংলাদেশীদের ভীড় রয়েছে আগের মতই। পরিবর্তন শুধু পরিচয়ে, এরা শরণার্থী নয়, রোগী।

কলকাতা এপোলোতে প্রসিডিউর রুমের সামনে অপেক্ষা করছি, আমার রোগীর এন্ডোস্কপি করা হবে। আমার মত আরো অসংখ্য স্বজনেরা নিজ নিজ রোগীর প্রসিডিউর শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। অধিকাংশই বাংলাদেশী। বেশভূষা এবং কথাবার্তায় খুব সহজেই তাদের আলাদা করে ফেলা যাচ্ছে। এক ভারতীয় ভদ্রলোক বাংলাদেশীদের জটলায় এগিয়ে আসলেন। লেখক এবং সাংবাদিক মানুষ। জানতে চাইলেন, কেন বাংলাদেশীরা চিকিৎসার জন্য এত অধিক সংখ্যায় ভারতমূখী হচ্ছে। গোপালগঞ্জের মামুন, যাত্রাবাড়ির শফিক সাহেব, বরিশালের সুজন ভাই, ঝিনাইদহ ডিসি অফিসের ওই কর্মী, সবাই মিলে যা বলার, সেটাই বলতে থাকলেন।

আমি আস্তে করে পেছনে সরে আসলাম। নিজের দেশের অতিমাত্রায় লোভী, চুড়ান্তভাবে দায়িত্বহীন, আন্তরিকতাহীন, অতি বুঝদার এইসব ডাক্তার আর রোগীর প্রতি ডাক্তারদের অবহেলা এবং ব্যর্থ চিকিৎসাব্যবস্থা সম্পর্কে কিভাবে বলব অন্য দেশের এক সাংবাদিককে? বাংলাদেশীদের সম্মিলিত প্রতিত্তুরে ভারতীয় ভদ্রলোক ঠিক কি বুঝলেন, তা উনিই ভালো বলতে পারবেন, তবে উপসংহার যা দাড়ালো, সেটা হল আমাদের চিকিৎসকদের পড়াশুনা কম!!

আমরা বাংলাদেশীরা জানি, ঘটনা এমন নয়, আমাদের দেশে প্রচুর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিকিৎসক আছেন। তবুও তার এই ভুল ভাঙানোর কোন প্রবৃত্তি হলো না। আরো যে কদিন আমি কলকাতায় ছিলাম, হাসপাতালে দৌড়াদৌড়ি করেছি, বিভিন্ন সময় সাধারণ ভারতীয়দের সাথে কথাবার্তায় একটা বিষয় জানলাম, সেটা হল কলকাতার গড়পড়তা মানুষের ধারণা বাংলাদেশে মেডিকেল শিক্ষার ভালো ব্যবস্থা নেই বলেই বাংলাদেশীরা ভারতে চিকিৎসার জন্য যায়।

সাধারণভাবে, মারাত্মক হ্যাপা পার করে পাসপোর্ট করা, তারপর ভারতীয় হাই কমিশনের রুঢ় ব্যবহার সয়ে ভিসা নিয়ে অন্য একটা দেশে গিয়ে চিকিৎসা করা খুব সহজ কাজ নয়। আর্থিক সংগতি থাকলে একটা কথা। তবুও দেখা যায়, এ দেশের দরিদ্র মানুষটিও চুড়ান্ত পর্যায়ে নিজের সর্বস্ব বিক্রি করে হলেও চিকিৎসার জন্য ন্যূনতম কলকাতা যায় এবং যে একবার যায়, পরবর্তীতে সে সামান্য অসুস্থতায়ও ভারতে চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হয়। উপরন্তু, বিনামূল্যে ভারতীয় চিকিৎসাব্যবস্থার বিজ্ঞাপন করতে থাকে।

যারা বিভিন্ন কাজে কলকাতায় গিয়েছেন, তারা সবাই স্বীকার করবেন যে কলকতাবাসীর মত অভব্য মানুষ সারা বিশ্বে বিরল। কথাবার্তায় তাঁরা রুক্ষ, আচরণে অসহিঞ্চু, আতিথ্যে কৃপণ, সহযোগিতায় অনিচ্ছুক। এমন একটা যায়গায় আমাদের মত উদার ও তরল মনের মানুষ কেন বার বার যায় সেটা আমরা যারা যাই, তারা খুব ভালো করে জানি। দুঃখের বিষয় হলো, যাদের জানার কথা সেই ডাক্তার সম্প্রদায় আমাদের এই মনোভাবকে থোড়াই কেয়ার করে।

আমাদের ছোট্ট এই ভূখন্ডে জনসংখ্যাধিক্য, খাদ্যে ভেজাল, বাতাসে ধূলা-ময়লাসহ বিভিন্ন কারণে রোগীর সংখ্যাও বেশি। আমাদের দেশে ডাক্তার ও রোগীর ক্ষেত্রে তাই অর্থনীতির ডিমান্ড-সাপ্লাই থিওরি কার্যকর হয় না। এই পেশাজীবিরাও তাই পেশাদার হয়ে ওঠে না, চেষ্টাও করে না। পরিকাঠামোর যে সীমাবদ্ধতাটুকু আছে, সেটা তাঁরা অতিক্রম করতে পারতেন আন্তরিকতা দিয়ে, পেশাদারিত্ব দিয়ে। কিন্তু এই চাওয়াটুকু এই বাংলাদেশে অসম্ভব।

আমি যে রোগীকে নিয়ে গিয়েছিলাম, তার সমস্যা নিতান্তই সামান্য। কিন্তু আমার দেশের তাবড় তাবড় ডাক্তারগণ সেই সামান্য সমস্যাটাই সনাক্ত করতে তো পারলেন নাই, বরং গত দুই বছর ধরে ভূল চিকিৎসা করে সমস্যা জটিল করে দিয়েছেন। ব্যক্তিগত অহংবোধ আমাদের ডাক্তারদের এতটাই বেশি যে তারা কোন রোগীকেই অন্য ডিসিপ্লিনের কোন বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করাকে রীতিমত অপরাধ গণ্য করে থাকেন।

আমাদের ভারতবন্ধু সরকার দরকারী অদরকারী বিভিন্ন কাজে ভারতীয়দের ইনভলব করছেন। সরকার যদি আরেকটু এগিয়ে আমাদের দেশের মেডিকেল শিক্ষায় ‘এটিকেট এন্ড ম্যানার’ শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে ভারতীয় ডাক্তারদের এই কোর্সে নিয়োগ করে তো জাতী উপকৃত হত। বিভিন্ন চেতনা ও রঙে রাঙানো ডাক্তারি সংগঠনগুলোও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নিতে পারে, আখেরে আপনাদেরই লাভ। আমরা তো খরচ বেশি হলেও ভারত যাব, আরো বেশি টাকা থাকলে থাইল্যান্ড, সিংগাপুর, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে।

আমাদের অতি শিক্ষিত ডাক্তারদের অর্বাচীন আচরণের জন্যই প্রতিবছর কী পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ভারতে চলে যাচ্ছে, তা জানতে বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই, যশোর রোড দিয়ে একদিন কলকাতা গেলেই বোঝা যায়। চেন্নাই, ভেলোর, দিল্লীতো বাদ থাকলোই। চেন্নাই-দিল্লীতে আজ এশিয়া ছাড়াও ইউরোপ-আফ্রিকা-দক্ষিণ আমেরিকা থেকে রোগী আসছে। চিকিৎসা নিয়ে সানন্দচিত্তে দেশে ফিরে যাচ্ছে। অথচ আমাদের ডাক্তারদের সুযোগ ছিল এই বাজারটা ধরার। যদি তাঁরা একটু নিবেদিত হতেন।

ঠাঁট বাড়ানো, প্রদর্শনপ্রিয় সংস্কৃতির কারণে আমাদের সরকার বড় বড় স্থাপনা তৈরীকেই উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। ফলে, শিক্ষা, খাদ্য, চিকিৎসার মত মৌলিক বিষয়গুলো, যেখানে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন ছিল, সেগুলো আজ অবহেলিত, মৃত। আজ তাই বাংলাদেশ ব্যাংকে রিজার্ভের পরিমাণ রেকর্ড ছাড়িয়ে গেলেও সরকার দেনার দায়ে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকে, জিপিএ ফাইভ এর বিস্ফোরণেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরিক্ষায় পাশের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নেমে আসে, খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও ফরমালিন আর ভেজালের কারণে মৃত্যুহার বাড়তে থাকে আর বিদেশে ঔষধ রফতানি শুরু করলেও দেশের রোগীরা সব কষ্টার্জিত টাকা ঢেলে আসে বিদেশে।

যশোর রোডে বাংলাদেশী রোগীদের এই যাত্রা সহসাই কমবে, এরকম কোন লক্ষণ পূর্বাকাশে দেখা যাচ্ছে না বরং আরো বাড়বে, সে সম্ভাবনাই প্রবল। আমাদের মহামহিম ডাক্তারবৃন্দ এই সত্যকে মোকাবেলা করতে না পারলে খুব শীঘ্রই গুলশান বনানীর ফ্ল্যাট আর ব্যক্তিগত বিলাসবহুল বাহনের স্বপ্ন বিসর্জন দিতে হবে।
আপনারা প্রস্তুত আছেন তো?
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০১৬ বিকাল ৩:১৩
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩২


একুশটি বার মৃত্যুর মুখোমুখি: এক অবিনশ্বর সংগ্রামের নাম শেখ হাসিনা
শুধু ২১ আগস্টের সেই ভয়াল গ্রেনেড হামলাই নয- বঙ্গবন্ধুকন্যা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা হয়েছে ১৯৮৮ সাল থেকে আজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা - প্রমাণ

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:১২



ব্লগার সাহেব আমেরিকা থেকে লিখেছেন, “অমুক আসলে মুক্তিযোদ্ধা নন।”

আমি বন্ধুকে ফোন করলাম।
বললাম, “তুমি নাকি ভূয়া মুক্তিযোদ্ধা?”

সে বলল, “বুঝতে পারছি না।”

“কেন?” আমি প্রশ্ন করলাম।

“১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন লা-মাযহাবিকে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়ার কারণ কী ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৩২


আজকে নতুন চারটি মুখ মন্ত্রিসভায় যুক্ত হলো। এর মধ্যে একজনকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে । বলছি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শামীম কায়সার লিংকনের কথা। তিনি একজন লা মাযহাবি বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুর্ভিক্ষের আওয়াজ কি আমরা বাংলাদেশিরা শুনতে পাচ্ছি?

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৪৩

মুচলেকা দিয়ে, গোপন সমঝোতা করে মীর জাফর কিংবা মীর কাসিমের মতো “কথিত ক্ষমতার” সিংহাসনে বসা যায় ঠিকই কিন্তু বসে বসে জনগণের সর্বনাশ দেখা ছাড়া তাদের বিশেষ কিছু করার থাকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×