somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

পদ্ম পুকুর
লেখালেখি একটা নেশার মত। বিভিন্ন ঘাট পেরিয়ে কর্পোরেট জগতে থিতু হওয়ার পরও তাই লিখে যাই যা মনে আসে তাই। পদ্মার ওপাড়ের মানুষ হওয়ায় জন্মগতভাবেই স্মৃতিকাতর। এ আমার দুর্বলতা নয়, অহংকার

ক্রিয়েটিভ মনস্তত্ব

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ বিকাল ৩:৪৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


হুমায়ুন একবার বলেছিলেন ‘আমি দুই তিনজন মানুষ থাকলে খুব ভালো কথা বলতে পারি, দশ বারোজন হলে একটু একটু বলতে পারি কিন্তু এর চেয়ে বেশি হলে কিছুই বলতে পারি না’। হুমায়ুনের আশেপাশে থাকা মানুষেরা জানেন, তিনি অত্যন্ত আড্ডাপ্রিয় এবং বন্ধুবৎসল ছিলেন। তাই নিজের সম্পর্কে বলা হুমায়ুনের এই কথাগুলো আতিশয্য হলেও ক্রিয়েটিভ মানুষের ক্ষেত্রে এই স্টেটমেন্টটা মোটের উপর সত্যি বলেই ধরে নেওয়া হয়।

কোনো এক অদ্ভুত কারণে ক্রিয়েটিভ মানুষেরা সবার সাথে মিশতে পারে না। যারা বিখ্যাত হয়ে গেছেন তাদের কথা আলাদা, কিন্তু বেশিরভাগ ক্রিয়েটিভ মানুষের সম্পর্কে বলা হয়, ‘ও তো অমিশুক’ ‘গোঁয়ার’ ‘ইনট্রোভার্ট’ ‘অসামাজিক’ ‘ম্যানারলেস’ কখনও সখনও ‘ও একটা পাগল’। অবশ্য পাগল শব্দটা ভালোবেসে বা আদর করেও বলা হয়।

আমার মনে হয়, ক্রিয়েটিভ মানুষের চিন্তার ধারা বা লেভেলটা আমাদের মত সাধারণ মানুষের সাথে মেলেনা। যেকোনো বিষয়কে বোঝার জন্য কম বুদ্ধির কারণে আমরা যখন নানাভাবে চেষ্টা করতে করতে গলদঘর্ম হই, তখন ক্রিয়েটিভ মানুষটি তার ভিন্ন ধারার চিন্তা পদ্ধতির কারণে, ভিন্নভাবে দেখার ক্ষমতার কারণে হয়তো ঘটনা ঘটার আগেই প্রেডিক্ট করে ফেলে। এর ফলে একটা ছোট বাচ্চার নতুন আবিষ্কার যেমন বড়দের কাছে অগুরুত্বপূর্ণ মনে হয়, ঠিক তেমনি ক্রিয়েটিভ মানুষের কাছেও আমরা ছোট বাচ্চার পর্যায়ের বিবেচিত হই। আর ঠিক এ কারণে অতি সাধারণ যে সব বিষয় নিয়ে আমরা আনন্দিত হই, আড্ডা দিই, পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াই, সে বিষয়গুলো একজন ক্রিয়েটিভ মানুষের কাছে ঠুনকো মনে হয়, নিম্নস্তরের মনে হয়। সে হয়তো করুণার দৃষ্টিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে, ‘কি সব ফালতু বিষয়ে আলোচনা করে এরা!...’

এই অবস্থায় সে যেহেতু তার সমসাময়িক অন্যদের কাছে মনের খোরাক পায় না, বুদ্ধিবৃত্তিক সঙ্গী পায় না, সে ক্রমেই নিঃসঙ্গ হতে থাকে। বাস্তবে আমি এ রকম অনেককেই দেখেছি। এই নিঃসঙ্গতা ক্রিয়েটিভ মানুষকে প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রে খুবই পিছিয়ে দেয়। দেখা যায়, এক্সট্রোভার্ট সহকর্মীর যোগাযোগক্ষমতার বিপরীতে উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাভাবনা বা যোগ্যতা থাকা সত্বেও ক্রিয়েটিভ মানুষগুলো ডমিনেন্ট হতে থাকে এবং এই ডমিনেন্সিকে মেনে নিতে না পেরে তৈরী হওয়া অভিমান থেকে এক সময় সে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে দেয়। এ কারণেই হয়তো বেশিরভাগ ক্রিয়েটিভ মানুষ শেষ পর্যন্ত একা একা কাজ করেন।

একই ধরনের অভিমান সে বোধ করে তার বন্ধুদের প্রতিও।

ব্লগাররা হয়তো তেড়ে উঠতে পারেন যে, আরে ভাই, আমি তো ব্লগিং করি, আমি তো ক্রিয়েটিভ, কিন্তু আমিতো ইনট্রোভার্ট না। অথবা বিদ্রোহী কবি নজরুল কি ইনট্রোভার্ট ছিলেন? উনি তো তার আড্ডাবাজির জন্য বিখ্যাত ছিলেন, ইত্যাদি ইত্যাদি......। ভাইয়েরা, রাগ করবেন না। এগুলো আমার কথা না। পণ্ডিতদের কথা। অ্যাপল এর সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ ওজনিয়াক যেমনটা বলেছেন ‘Most inventors and engineers I’ve met are like me. They’re shy and they live in their heads. The very best of them are artists. And artists work best alone…”
আবার দ্য গিফটেড ডিভেলপমেন্ট সেন্টারের পরিচালক ড. লিন্ডা সিলভারম্যান বলছেন- ‘Introverts are wired differently from extroverts and they have different needs…..Introverts get their energy from within themselves; too much interaction drains their energy and they need to retreat from the world to recharge their batteries.’

পশাপাশি হু ইজ মোর ক্রিয়েটিভ: ইনট্রোভার্টস অর এক্সট্রোভার্টস আর্টিকেলটা পড়তে গিয়ে খুব মজা পেলাম। ওখানে বলা হচ্ছে‘Introverts have the most energy and ideas when they are alone. It’s really difficult for them to think out loud and verbalize their ideas on the spot, so when it comes to meetings or group brainstorming, it seems like they have nothing to say. In fact, all introverts need is some alone time to ponder and reflect before they share something valuable.’

এইটুকুর জন্যই অবশ্য বলে দেওয়া যায়না যে ক্রিয়েটিভ মানুষ মাত্রই ইনট্রোভার্ট, যেখানে ক্রিয়েটিভিটি ও মানব মন নিয়ে গবেষণাকারী দার্শনিক মিহাই চিকসজেনমিহাইলি বলছেন “Creative people tend to be both extroverted and introverted. We’re usually one or the other, either preferring to be in the thick of crowds or sitting on the sidelines and observing the passing show.”

আবার ক্রিয়েটিভ লোকদের সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা “তারা অগোছালো” হলেও বাস্তবে গবেষণা বলছে ক্রিয়েটিভ মানুষগুলো গোছালো এবং শৃংখলাবদ্ধ। মজার ব্যাপার! তবে একটা বিষষে সবাই একমত যে এ ধরণের লোকেরা খুবই স্পর্শকাতর এবং নিজেদের অর্ন্তনিহিত বোধ এর কারণে গর্বিত থাকেন।

আমার অত্যন্ত প্রিয় একজন মানুষ আছেন, খুবই ক্রিয়েটিভ। অনেক পুরোনো পরিচিত। যখন থেকে পরিচয়, তখন থেকেই দেখেছি, ক্রিয়েটিভ আর্টের যে শাখাতে তিনি গিয়েছেন সেখানেই তিনি ভালো করেছেন। আউট অব দ্য বক্স থেকেছেন। শেষ পর্যন্ত আর্কিটেকচারের সাথে ঘর বাঁধাতে সফল আর্কিটেক্টই হয়েছেন এবং একজন সহযোগী আর্কিটেক্ট এর সাথে মিলে ফার্ম দিয়ে খুব সুন্দর কাজ করছেন। একদিন কথায় কথায় নিজেদের তৈরী প্রতিষ্ঠানে তাঁর ভূমিকা নিয়ে কিছুটা হতাশা প্রকাশ করলেন, অথচ ওই প্রতিষ্ঠানের গুডউইলটাই তৈরী হয়েছে তার অসাধারণ ডিজাইন সেন্স এর কারণে। আমি একটু অবাকই হলাম।

তা ছাড়া এই ব্লগের একজনকে আমি বাস্তবে চিনি, যার লেখা আমি খুবই পছন্দ করি, ওর মত লিখতে চেষ্টা করি। তাকেও আমি দেখেছি ক্রমেই নিজের মধ্যে গুটিয়ে যেতে। এখন তো দেশ ছেড়েই চলে গিয়েছে। মূলত এই দুজনকে দেখেই আমার মনে হতে থাকে যে তবে কি ক্রিয়েটিভ লোকেরা অসামাজিক? ইনট্রোভার্ট?

যদিও গবেষণা মানব মনকে সব সময় সঠিক বিশ্লেষণ করতে পারে না, তবুও আমার মনে হচ্ছে হয়তো এটাই ঠিক। ওরা ইনট্রোভার্ট। এজন্যই হয়তো আমাদের শিল্পীদের ইন্টারভিউতে বলতে দেখি ‘আমি অভিনয় করলেও আমি আসলে মানুষের সাথে মিশতে পারি না’।

আমার পোড়াকপাল, সারাজীবন অন্তর্মুখী অপবাদ ঠিকই শুনলাম কিন্তু ক্রিয়েটিভ হতে পারলাম না!
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে ডিসেম্বর, ২০১৯ সকাল ১০:০২
১৯টি মন্তব্য ১৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাঁকা চাঁদ[শিশুতোষ ছড়া]

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৭ শে মার্চ, ২০২০ বিকাল ৪:৪০


ও বাঁকা চাঁদ ও বাঁকা চাঁদ,
আয়না খোকার বাড়ি।
তুই না এলে খোকন সোনা,
নেবে ঠিক আড়ি।

তোকে দেখে খোকন হাসে,
আদরে ডাকে মামা।
তুই কেন পরিসনি বলতো
একটা কোন জামা।

ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

বান্দার সীমাহীন পাপের শাস্তি আল্লাহর গজব (২য় পর্ব)

লিখেছেন নূর মোহাম্মদ নূরু, ২৭ শে মার্চ, ২০২০ রাত ৯:২৭


বান্দার সীমাহীন পাপের শাস্তি আল্লাহর গজব (১ম পর্ব))
RECAP "হে ইমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো, নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা বাকারা আয়াত নং... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহামারীতে জুমার নামায এবং জামাতে নামায হাদীসে কি বলে?

লিখেছেন শের শায়রী, ২৭ শে মার্চ, ২০২০ রাত ১০:৪৪



বেশ ভালোভাবেই লক ডাউন শুরু হয়েছে, যে যার বাড়ীতে গিয়েছে। এগুলো পুরানো প্যাচাল। নতুন প্যাচাল হল, এই যে লক ডাউন চলছে, যে লক ডাউনের কারনে যেখানে নিম্নবিত্ত বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

চাঁদগাজী সাহেবের কোয়ারেন্টাইন : নিজস্ব অভিমত

লিখেছেন সোনালী ঈগল২৭৪, ২৮ শে মার্চ, ২০২০ দুপুর ১২:৪৫


চাঁদগাজী সাহেব সামু ব্লগের একজন এটি পুরোনো ব্লগার , সম্ভবত বেশ অনেক বছর যাবৎ তিনি ব্লগিং করে যাচ্ছেন , ব্লগে তার লেখা এবং আনুসাঙ্গিক আরো বিষয় দেখে মনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ অ্যাডমিন প্যানেল হয়ত আপনেরা কিছু করুন নয়ত আমরা লেখালেখি বাদ দিয়ে দেই

লিখেছেন :):):)(:(:(:হাসু মামা, ২৮ শে মার্চ, ২০২০ দুপুর ২:১১


তারা আসলে কোনো মানুষ না জীবিত পশু ? যারা বিশ্বের এমন ভয়ংকর পরস্থিতিতেও একজন লেখকের পোস্টে এসে
ভালো কছিু লেখার পরর্বিতে খারাপ ছবি পোস্ট করছে । না আমি এর জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×