somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গণজাগরণ মঞ্চ যখন গণকাড়াকাড়ি মঞ্চ

০৯ ই এপ্রিল, ২০১৪ রাত ১১:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

২০১৩ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারি । এই দিনটার কথা খুব সম্ভবত আমার সারাজীবন মনে থাকবে । কসাই কাদের মোল্লার ফাঁসির রায় শোনার অপেক্ষায় যখন প্রমোদ গুনছিলাম , ঠিক তখন টিভিতে কাদের মোল্লার সেই বিখ্যাত "ভি" সাইন দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলাম । কাদের মোল্লার আসলে ফাঁসি হচ্ছে না , বিষয়টা বিশ্বাস করতে আমার বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগল । মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দাবি করে আসা দলের শাসন আমলেও একজন চিহ্নিত রাজাকারের বেঁচে যাওয়া দেখতে পারার দুর্ভাগ্য হবে কখনও ভাবিনি । একজন অতি সাধারণ নগণ্য নাগরিক হিসেবে , এই অবস্থায় আমার আসলে কি করা উচিৎ হবে কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলাম না ।

ফেসবুকে আমার মত অসংখ্য মানুষের হাহাকার আর্তনাদ দেখলাম । তখনও আমার ধারণা ছিল না , আদালতের দেওয়া একটি রায়ের ব্যাপারে সাধারণ মানুষ হিসেবে আসলেই আমাদের কি ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখানো উচিৎ । সেই ফেসবুকেই দেখলাম একটি ইভেন্ট খোলা হয়েছে । শাহবাগে আপনারা যেভাবে পারেন আসুন , এই রায়ের বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ করি ।

একজন সাধারণ নগণ্য প্রতিবাদকারি হিসেবে শাহবাগের সেই ইভেন্টে যোগ দিলাম । শাহবাগের সেই অল্প জনস্রোত একসময় ফেনিল সমুদ্রের মত উত্তাল হয়ে গেল । চারিদিক থেকে মানুষ এসে শাহবাগে জড়ো হতে থাকল । তারপরের ঘটনা সবার জানা ।

শাহবাগ হল প্রজন্ম চত্তর সেই সাথে তৈরি হল গণজাগরণ মঞ্চ । সেই মঞ্চ একজন মুখপাত্রও পেল । প্রজন্ম চত্তর দেখতে পেল নানা সংগঠনের ব্যানারে লোকজন সেখানে জমা হচ্ছে । দিনের পর দিন নিজস্ব কায়দায় অথবা সাংগঠনিক কায়দায় সবাই প্রতিবাদ জানাচ্ছে । কেউ মুহুর্মুহু স্লোগান দিচ্ছে , কেউ বা মোম জ্বালিয়ে , ফুল সাজিয়ে প্রতিবাদ করছে । সবকিছু ঠিকই ছিল , কিন্তু ঝামেলাটা বাঁধল আর একটু পরেই ।

ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগও শাহবাগে এতো মানুষের ভিড় কোনভাবে আশা করেনি । শাহবাগে যেসব মানুষ ছিল বা প্রতিবাদ করছিল তাঁদের সবার দাবি ছিল এক । আওয়ামীলীগও বুঝেছিল , মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের এই স্রোত কখনও তাঁদের বিপক্ষে যাবে না , তাই শাহবাগকে পুলিশি নিরাপত্তা দিতে সরকারের কোন বাঁধা ছিল না । শাহবাগে যেমন সাংস্কৃতিক সংগঠন যুক্ত হয়েছিল ঠিক তেমন রাজনৈতিক সংগঠনও যুক্ত হয়েছিল । ছাত্রলীগ প্রায় প্রথম থেকে শাহবাগে ছিল , কিন্তু একবারে প্রথমে তাঁরা সবাই ব্যাক্তিগত ভাবে শাহবাগে যুক্ত ছিলেন এরপর একসময় তারা সাংগঠনিকভাবেই শাহবাগের সাথে যুক্ত হবার সিদ্ধান্ত নেয় ।

অন্যদিকে বাংলাদেশের চিরবিপ্লবী বামদলগুলোও বসে ছিল না । তারাও শাহবাগের সাথে যুক্ত হয় , এবং এতো বড় বিপ্লব করার সুযোগ দেখে তাঁদের খুব সম্ভবত মাথা খারাপের মত অবস্থা হয়ে যায় । শাহবাগ হয়ে পড়ে নিজেদের চেনানোর মঞ্চ । যে বামদলের নেতাদের কালে ভাদ্রে নিজেদের টিভিতে দেখানোর সুযোগ মিলত সেই দল এবং তাঁদের নেতাদের প্রতিদিন টিভি ক্যামেরায় দেখানোর সুযোগ মিলে যায় এই শাহবাগে এসে ।

অনদিকে ক্ষমতাসীন দলের কাছে শাহবাগকে মনে হতে থাকে , সোনার ডিম পাড়া হাঁস । পদ্মা সেতু , শেয়ার বাজার , আবুল , সাহারা খাতুন সবার পাপ মোচনের গুরু দায়িত্ব শাহবাগের কাঁধে এসে পড়ে । গণজাগরণ মঞ্চের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ সরকারের হাতে চলে যায় । ইমরান এইচ সরকার হয়ে যান পুতুল সরকার ।

শাহবাগের আন্দোলনে মানুষের খরস্রোতা নদীর মত স্বতঃস্ফূর্ততার চারপাশে দেওয়া হতে থাকে রাজনিতিকরনের বাঁধ । বামপন্থীদের ধারণা হতে থাকে এদেশে বিপ্লব হতে হলে তাদের হাত ধরেই হতে হবে । অন্যদিকে আওয়ামিলীগের ধারণা হতে থাকে , শাহবাগই পারবে তাঁদের নির্বাচনী বৈতরণী পার করিয়ে দিতে । তাই একে বাধ্য ঘোড়ার মত নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী চালিয়ে নিতে হবে ।

অন্যদিকে জামাত শিবির , এবং বিএনপি শাহবাগের এই তুমুল জনপ্রিয়তা দেখে শংকিত হয়ে পড়ে । জামাত যেভাবে পেরেছে এই আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তৎপরতা শুরু করে দেয় । এবং বরাবরের মত জামাত তাদের সবচেয়ে ভয়ানক মরনঅস্ত্র ধর্মীও অনুভুতিকে এখানেও কাজে লাগায় । তাদের এই অস্ত্র ভয়ানকভাবে কাজে লেগে যায় । ফটোশপ , গুজব সবকিছু ব্যাবহার করে তারা অনেকাংশে প্রমান করতে সমর্থ হয় , শাহবাগ আসলে ধর্মবিরোধী আন্দোলন । ঠিক যেমনভাবে তারা প্রমান করেছিল মুক্তিযুদ্ধ আসলে ধর্মযুদ্ধ । অবশ্য শাহবাগের অতি বামপন্থী নাস্তিকরা তাদের হাস্যকর অনলাইন কার্যক্রমের মাধ্যমে জামায়াতকে বিশাল সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল , এবং জামাত শিবির এই কুড়িয়ে পাওয়া সুযোগ পুরোপুরিভাবে কাজে লাগায় । জামায়াতের এই ধর্মীয়চেতনার প্রচার থেকেই মুলত শাহবাগের জনসম্পৃক্ততা কমতির দিকে যেতে থাকে ।

অন্যদিকে শাহবাগে একটি পক্ষ ইমরান এইচ সরকারের অদ্ভুত মোম জ্বালানো নেভানো , বেলুনে চিঠি ভরে উড়িয়ে দেওয়া , অট্টহাসি কর্মসূচী দেখে হতাশ হয়ে পড়ে । শাহবাগ আন্দোলনকে যখন গতি দেবার দরকার ছিল কিছুটা আক্রমণাত্মক এবং আপোষহীন ভুমিকা পালন করে , তখন মুখপাত্রের এসব একক সিদ্ধান্তে নেওয়া কর্মসূচী দেখে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল , তিনি সরকারের ইচ্ছাই কেবল বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন । কেননা সরকার কোনভাবেই চাচ্ছিল না , এই উত্তাল জনস্রোত তার বিরুদ্ধে যাক । কোনভাবে এই জনস্রোত কিছুটা স্থিমিত করা গেলে , এবং নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নেওয়া গেলে তাদের পুনরায় ক্ষমতায় আসা সহজ হবে ।

বাস্তবিক পক্ষে শাহবাগের অবস্থা হয়ে পরেছিল শুস্ক মরুতে অনেকটা হঠাৎ আসা নদীর মত । রাজনৈতিক দল , বিভিন্ন সংগঠন , কিংবা মুখপাত্র যে যেভাবে পেরেছে এই স্রোতকে নিজের দিকে টানতে চেয়েছে । এর ফলে শাহবাগ গতি হারিয়েছে । যখন বন্ধ হবার প্রয়োজন ছিল কিংবা কার্যক্রম সংকোচনের দরকার ছিল তখনও এটিকে লেবুর মত কচলিয়ে কচলিয়ে সবাই রস বের করে নিতে চেয়েছে । সবাই সবার চাওয়া শাহবাগকে দিয়েই বার বার পূরণের চেষ্টা করে গেছে । এরফলে সাধারণ মানুষের যে আন্দোলন হবার কথা ছিল এইটা আর তা থাকেনি । ক্রমেই গণজাগরণ মঞ্চ হয়ে পড়ে কাড়াকাড়ির মঞ্চ । শাহবাগকে আস্তে আস্তে সবাই ছেড়ে গেছে । এখনও কেউ একে ধরে রেখছে । কেউ হয়তো ভালবাসা থেকে আবার কেউ হয়তো বা শাহবাগ লেবু থেকে শেষফোঁটা রস শুষে নিতে ।



০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×