প্রহলাদ মন্ডল সৈকত, আজ ২৮ মার্চ শনিবার কুড়িগ্রামের রাজারহাটে সিন্দুরমতী দিঘীর পাড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্নানোৎসব শুরু হবে। ভোর ৬টা থেকে আগামী কাল রোববার ভোর ৬টা ৪১মিনিট পর্যন্ত নবমী তিথিতে এ উৎসব পালিত হবে। এ স্নান উৎসবকে কেন্দ্র করে ২দিনব্যাপী জমে উঠে ঐতিহ্যবাহী সিন্দুরমতীর মেলা। মেলাকে ঘিরে প্রতিবছর এক সপ্তাহ ধরে মেলা প্রাঙ্গনে সার্কাসের নামে অশ্লীল নৃত্যের অর্ধশতাধিক সার্কাস প্যান্ডেল তৈরি করা হয়। সেই সাথে কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাট জেলার জুয়াড়ীরা কোটি টাকার জুয়ার আসর বসায়। কিন্তু এ বছর লালমনিরহাট জেলা প্রশাসন সার্কাস ও জুয়া বন্ধের জন্য কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করেছেন নিছিদ্র নিরাপত্তায় র্যাব- পুলিশের সহযোগীতায় এ বছর মেলা হতে যাচ্ছে বলে লালমনিরহাট-কুড়িগ্রাম প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা ও লালমনিরহাট জেলা সদরের সীমান্তবর্তী এলাকায় উত্তরাঞ্চলের সুপরিচিত প্রাচীন তীর্থ এ সিন্দুরমতী দিঘী। কথিত নৈসর্গিক সৌন্দর্যে পূর্ণ, নান্দনিককতায় স্লাত, কিংবদন্তির কল্পলোকে ঘেরা, উল্লেখ্যযোগ্য প্রাচীন তীর্থ এ দিঘী।
পৌরানিক মতে, রাজা রাজনারায়ন রত্নগর্ভা রানী মেনেকা দেবী অনেক সাধনা করে মহামায়াকে সন্তুষ্ট করলে তাদের ঘর আলো করে দু’টি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। দেব অংশ প্রাপ্ত হওয়ায়, সূচনালগ্ন থেকেই এদের রুপ গুন ও বিভিন্ন কর্মকান্ডের মধ্যে অসাধারনত্ব এবং অসামঞ্জস্যতার বিস্তার ঘটে। এক সময় রাজা প্রজাদের জলকষ্ট দুর করার জন্য পুকুর খনন করার সিন্ধান্ত নেন। অজস্র শ্রমিক দিনরাত খেটে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দীর্ঘদিন যাবৎ অক্লান্ত পরিশ্রম করলেও শেষ মুহুর্তে জোয়ার আসেনি, মেলেনি জলের কোন অস্তিত্ব। সবাই চিন্তায় পড়ে গেলেন। এমন বিপদের সময় রাজার স্বপ্ন যোগে দৈব নির্দেশ প্রাপ্ত হন। এর সারসত্বা হলো রাজাকে তার দুই মেয়ে, সিন্দু ও মতীকে দিয়ে খনন করা পুকুরের মাঝখানে গঙ্গাদেবীর পুজো দিতে হবে। প্রজাদের মঙ্গল ও কল্যাণার্থে রাজা বিভিন্ন বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে স্বপ্নাদেশ মেনে নিয়ে মেয়েদের সহ পূজায় অংশ গ্রহন করলেন। অর্চনা শেষের পথে। অঞ্জলী সমাপ্ত। পুরোহিতের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছে দেবীর বিসর্জনের অশ্র“সজল বিদায়ী বেদমন্ত্র। হঠাৎ করে বিকট আওয়াজ। শোঁ শোঁ শব্দ। চার কোণ থেকে পাতাল পুরীর অন্ধকার ভেদ করে একযোগে কাউকে কোন কিছু ভাববার সুযোগ না দিয়ে নিমিষে একযোগে আর্বিভূত হলো বৃহৎ জলরাশি। প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে পড়ি-মরি করে যে যেভাবে পারে সেভাবে কোন রকমে আহত অর্ধমৃত, অচেতন অবস্থায় উপরে অবস্থান নিলেন। অনেক পরে সিন্দুরমতীর জন্য যখন স্বাড়ম্বড়ে খোঁজ খবর করা হলো তখন বিরাট জলধারাটি কানায় কানায় পূর্ণ। হারিয়ে গেল অল্প দিনের জন্য রানী মেনেকার কোল আলো করে আসা সিন্দুর ও মতী। সাত দিন পর মহামায়ার আদেশে রাজা-রানী কন্যাদ্বয়ের কনীষ্ঠাঙ্গুলী দেখতে পান। সেদিন ছিল রাম নবমী তিথি।
মানব কল্যাণার্থে নিবেদিত এ কন্যাদ্বয়ের মহতী ত্যাগের মহিমায় প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েই দু’জনের নামানুসারেই পুকুরটি পরিচিতি লাভ করে। লাখ লাখ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পাপ মোচন করে পূর্ণ সঞ্চয়ের আশায় প্রতিবছর এ দিনে সূর্যদ্বয়ের আগে স্নান করে। কথিতে আছে, চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিেিত ব্রক্ষপুত্রের স্নান শেষে সিন্দুরমতী দিঘির পাড়ে রাত্রি যাপন করে নবমী তিথিতে স্নান করলে তবেই পাপমোচন হয়। আর এ জন্যই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রতিবছর ব্রক্ষপুত্র স্নান শেষে সিন্দুমতী দিঘীতে স্নান করে ঘরে যান। ১১ একর জমিতে এ পুকুরের বিস্তার অংশ। ১৯৭৫-৭৬ সালে এর বেশীর ভাগ সংস্কারের সময় প্রাচীন আমলের স্বর্ণ ও রৌপ্যমূদ্রা, রাম লক্ষনের মূর্তিসহ অনেক মূল্যবান জিনিসপত্র পাওয়া যায় বলে জনশ্র“তি রয়েছে। আশ্চয্যের বিষয় ছিল, বছরের বার মাসেই জলে ভরা থাকে। অলৌকিককত্ববাদীরা মনে করেন, সিন্দুরমতি দীঘি ও ব্রক্ষপুত্র নদের মধ্যে ভূগর্ভস্থ প্রায় চল্লিশ কিলোমিটার একটি সুড়ঙ্গপথ আছে। প্রাকৃতিক লীলা ভূমির অপরুপ দৃষ্টিনন্দন স্থানটি খুব সহজেই অতিথিদের কাছে টানে।#
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মার্চ, ২০১৫ দুপুর ২:০৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






