কথায় বলে ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভাঙে, যদিও সেটার সত্যতা যাচাই করার কোন উপায় নেই। তবে আমার ব্যক্তিগত বাস্তবতার নিরিখে আমি বলি বাঙালী পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাক না কেন চুরি তারা করবেই, মিথ্যে তারা বলবেই। বলতে পারেন এটা আমাদের জাতীগতভাবে রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুঁকে গেছে। এমন নয় যে, এ বিষেয় আমার অনুধাবন সাম্প্রতিক সময়ের।
মোটামুটিভাবে জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই এই জাতীয় চুরির স্বভাব আমার নজরে এসেছে। বিষয়টা প্রথম অনুধাবন করতে পারি খুব সম্ভবত ১৯৯৮ সালের দিকে। সে সময়ে বাবার কথামতো টেলিফোন অফিসে গিয়ে ল্যান্ড ফোনের জন্য আবেদন করতে গিয়ে বুঝতে পারি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা আমাকে কিছু "মালপানি" ছাড়ার জন্য ঈঙ্গিত দিচ্ছেন। ব্যাপারটা আমি বুঝতে না পেরে, বাসায় এসে বাবার সাথে পুরো বিষয়টা শেয়ার করলে বাবা হেসে দিয়েছিলেন। কারণ টেলিফোন অফিসের ঐ ব্যক্তি যেভাবে "মালপানির" কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন, সেটা ঐ বয়সে তখনো রপ্ত করে উঠিনি।
বলছিলাম বাঙালী চুরি আর বাটপারির কথা। আজ প্রথম আলো পত্রিকার "নিউ ইয়র্ক" সেকশনে বাঙালীর প্রতারণার আরো একটি চিত্র সবার সামনে তুলে ধরা হয়েছে। নিউ ইয়র্কে বাঙালী মালিকানাধীন বেশ কিছু গ্রোসারী দোকান, বহু বছর ধরে ক্রেতাদের বার্মিজ বা থাইল্যান্ডের মাছ কে কম দামে আমদানী করে তা বাংলাদেশী ইলিশ লিখা প্যাকেটে বাজারজাত করে দেশীর ক্রেতাদের সাথে প্রতারণা করছেন। তবে মাছগুলো দেখতে বাংলাদেশী ইলিশ মাছের মতো হওয়াতে অনেকে অনুধাবন করতে পারেন না। রান্না করার পর সেটা বোঝা যায়। বাঙালী মাছ খেতে পছন্দ করে, সমস্যা সেখানে নয়। তবে প্রবাসে নিজের বাড়িতে না থাকলে প্রতিদিন মাছ রান্না করলে সেটা একটা সমস্যার কারণ হতে পারে। রান্না করার সময় মারাত্মক রকম র্দুগন্ধ্যের কারণে পাশের এ্যাপার্টমেন্ট থেকে কমপ্লেইন যাওয়া অসম্ভব নয়, বিশেষ করে নিয়মিতভাবে যদি কেউ মাছ রান্না করেন। তবে, বাঙালী মালিকানাধীন বাড়ি বা যারা প্রজেক্টে থাকেন তাদের হিসেব ভিন্ন হতেও পারে। সে ব্যাপারে আমার ধারনা কম।
এত বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে চড়া দামে বাঙালী দোকান থেকে তথাকথিক বার্মিজ বা থাই ইলিশ কিনে প্রতারিত হতে কারোই ভালো লাগবে না। আমারও লাগেনি। এমনিতেই মাছা রান্না করা হয় খুব কম। আমি রুটি বেশী পছন্দ করি, ছোটবেলা থেকেই রুটি খেয়ে বড় হয়েছি। তিনবেলা রুটি খেলেও আমার সমস্যা হয় না। বিভিন্ন রকম সবজি, মাংশ, স্যালাদ দিয়েই রুটি আমার ভালো লাগে। মাছ রান্না করাও ঝামেলার কাজ আার স্বাদ না হলে তখন সারাদিন অফিস থেকে ফিরে দুমুঠো মাছ-ভাত মুখে দেয়ার সাথে সাথে মেজাজ বিগড়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তবে যারা দু'বেলা বা তিনবেলা মাছ-ভাত খাচ্ছেন, এই ধরনের বাঙালী প্রতারণা তাদের জন্য বেশ বেদনাদায়ক সেটা বুঝতে পারি।
প্রবাসে আসার পরে একটা ব্যাপার বেশ পরিষ্কার হয়েছে আমার কাছে। বিদেশীরা বাঙালীদের তুলনায় অনেক বেশী পারফিউম ব্যবহার করেন। দু' একজন ছাড়া আমি খুব বেশী বাঙালীকে দামী ব্র্যান্ডের পারফিউম ব্যবহার করতে দেখিনি। বেশীরভাগ লোকজনের সাথে মেলামেশা করলে তাদের ব্যবহৃত বেশীরভাগ জামা-কাপড় থেকে মূলত তরকারি বা মশলার ঘ্রাণ বেশী পাওয়া যায়। কালেভদ্রে কমদামী পারফিউমের কিছু ঘ্রাণ পেতেও পারেন। বাঙালী লোকজনদের ট্যাক্সিতে চড়লেও যদি ঐ ধরনের কোন ঘ্রাণ পাওয়া যায় তাতেও আমি অবাক হইনা কারন আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারি। বাসায় যদি দু'বেলা মাছ-মাংশ রান্না হয় তাতে কাপড়ে কিছু মশলার ঘ্রাণ পাওয়া অবাক ব্যাপার নয়, তবে সেটাও যদি প্রকৃত ইলিশ খেয়ে হতো, তবে অন্তত তৃপ্তির একটা ঢেকুড় তোলা যেত। কিন্তু দিন শেষে আমরা বাঙালী তো.. তাই ঢেঁকিও ধান ভেঙ্গেই যাচ্ছে।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০২০ রাত ১১:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




