somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ ফেরা এবং ঐতিহাসিক সেই ভুল

১০ ই জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ৮:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ঐতিহাসিক মুহূর্তের কিছু দুর্লভ ছবি আছে, যা থেকে পরে বেরিয়ে আসে অসংখ্য বার্তা।স্বাধীনতার স্থপতির স্বাধীন স্বদেশে পা রাখার ঐতিহাসিক দিনের এমনই একটি ছবি আজ আলাদা বিশ্লেষণ দাবি রাখে।

পাকিস্তানের বন্দীদশা থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বেলা ১টা ৪১ মিনিটে জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে প্রত্যাবর্তন করেন। তিনি পাকিস্তান থেকে লন্ডন যান। তারপর দিল্লী হয়ে ঢাকা ফেরেন। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ ভূমিতে ফিরে আসার ঘটনাটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উৎপত্তি ইতিহাসের একটি রঙিন অধ্যায়। এতে আমাদের বিজয় পেয়েছিল পূর্ণতা।

সদ্য স্বাধীন ভূখণ্ডে প্রাণের নেতা বঙ্গবন্ধুকে স্বাগত জানাতে সেদিন ঢাকার তেজগাঁও পুরনো বিমানবন্দরে নেমেছিল জনতার ঢল। লাখো রক্তে কেনা স্বাধীন ভূ-খণ্ডে পা রেখে আবেগে কেঁদে ফেলেন শেখ মুজিবর রহমান। স্বাধীনতার স্থপতিকে সেদিন বিমানবন্দরে স্বাগত জানাতে হাজির হয়ে ছিলেন একাত্তরে গঠিত অস্থায়ী সরকারের সদস্যরা। যারা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের ঘণিষ্ঠ সহচর, যারা তার অবর্তমানে মুক্তিযুদ্ধকে সাংগঠনিকভাবে নেতৃত্ব দিয়ে কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছে দেয়।

এবার পাঠকের কাছে আহবান, বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে সময় তোলা উপরের ছবিটির দিকে অনুগ্রহ করে তাকান। ভালো করে দেখেন, বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে কাছে কাকে দেখা যায়? চিনতে পারছেন! বিশ শতকের মীরজাফর খন্দকার মোশতাককে ভুলে যাওয়ার কথা নয় কারও। যিনি সাংগঠনিকভাবে মুক্তিযুদ্ধকে পরিচালনায় প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদকে খুঁজে পেয়েছেন? ছবিটি মনোযোগ দিয়ে দেখলে নিশ্চয়ই চোখে পড়বে. পেছনের সারিতে ঠাঁই পেতেও তাঁকে বেগ পেতে হচ্ছে। আসলে ব-দ্বীপের পলিতে গড়ে ওঠা এই ভূখণ্ডে যুগে যুগে এমনটাই হয়ে আসছে। ইতিহাসে বার বার হয়েছে এই নাটকের মঞ্চায়ন। মোশতাকদের ভিড়ে এভাবেই তাজউদ্দিনরা হারিয়ে যান, প্রাপ্য মর্যাদাটুকুও তারা পান না।

স্বাধীনতার স্থপতি শেখ মুজিবর রহমানের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল প্রকৃত মিত্র ও প্রকৃত শত্রুকে চিনতে না পারা। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার একদিন পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠক। ওই দিনই মন্ত্রিসভা পূনর্গঠিত হয় । সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনে বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন আর যুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদকে করা হয় অর্থমন্ত্রী। শেখ মুজিবের সঙ্গে পরবর্তীতে আরো দূরত্ব তৈরি হয় বঙ্গতাজের। দীর্ঘ ৩০ বছরের বিশ্বস্ত রাজনৈতিক সহকর্মীকে ভুল বুঝেন বঙ্গবন্ধু। চক্রান্তবাজরা তার অনুগত সহচরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরেন। ১৯৭৪ সালের ২৬ অক্টোবর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই তাজউদ্দীন আহমেদ মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন।

মূদ্রার অন্যপিঠে ওইসময়ই রচিত হয় ভ্রস্ট মানুষের অগ্রযাত্রা। বিশ্বাসহন্তা খন্দকার মোশতাক আহমেদকে অর্থমন্ত্রীর পদ দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রবর্তন লক্ষে বঙ্গবন্ধুর গঠিত বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগে (বাকশাল) ৪ নম্বর সদস্য হন ওই বেইমান। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কলঙ্কজনক ঘটনার ১২ ঘণ্টার ব্যবধানে তারই সহচর বহুরূপী খন্দকার মোশতাক রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।

শোকাহত জাতি জানতে পারে জাতির জনকের বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পেছনে ছিলেন বঙ্গবন্ধুরই স্নেহধন্য তারই নিজ হাতেগড়া নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ। রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার পরই ওই বিশ্বাসঘাতক তারই দীর্ঘদিনের চার সহকর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধের চার সংগঠক তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান এবং ক্যাপ্টেন মনসুর আলীকে বন্দী করে জেলে পাঠান। শুধু জেলে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হননি খন্দকার মোশতাক। তার নির্দেশেই ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকে। জাতির মুখে আরও চুনকালি মাখা হয়।

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিব যদি তার প্রতি শতভাগ নিবেদিত ও বিশ্বস্ত তাজউদ্দীন আহমদকে দূরে সরিয়ে না দিয়ে পাশে রাখতেন, বঙ্গবন্ধু যদি তার প্রকৃত বন্ধু আর শত্রুকে চিনতে পারতেন; হয়তোবা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতাকে হত্যার লজ্জাজনক কালোপর্দা আমাদের ইতিহাসে সংযোজন নাও হতে পারতো।


লিখেছেন: বিপুল হাসান, লেখক ও সাংবাদিক



বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ ফেরা এবং ঐতিহাসিক সেই ভুল
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ৮:১৩
৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

ছাত্রদলকে সামলাতে না পারলে ক্যাম্পাসগুলো সহিংসতায় পূর্ণ হবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮


রাতে রংপুর, সকালে জগন্নাথ। আজকে জগন্নাথে ছাত্রদলের হামলার শিকার একযোগে সব বিরোধী দল। এসব কি ছাত্রদলের কাজ? নাকি ছাত্রদলের ভেতর ছাত্রলীগ প্রবেশ করেছে? জকসু জিএসের জীবন আশংকাজনক। দেশে যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার প্রিয় ২৬টি পোস্ট; যেগুলো আপনারও ভালো লাগতে পারে

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৪:১৭

গ্যাস নিয়ে গ্যাসলাইটিং: কোনটা আসল সংকট, কোনটা কৃত্রিম?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:২১


বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা কী, এই প্রশ্ন করলে সবাই একবাক্যে বলবেন গ্যাস সংকটের কথা। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে গেছে, ফলে লোডশেডিং বেড়েছে বহুগুণ। কলকারখানা হোক বা বাসাবাড়ি, মানুষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

Humans are (not) from Earth- তবে কি আমরা মহাবিশ্বের ভৃত্য?

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৫৫

Humans are not from Earth: A Scientific Evaluation of the Evidence বইটির লেখক ডক্টর এলিস সিলভার (Dr. Ellis Silver)-এর ব্যক্তিগত ও একাডেমিক জীবন নিয়ে মূলধারার তথ্যমাধ্যমে এক ধরনের রহস্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৫ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:০৩



আমরা ইতিহাসের ছিন্নপত্র...

২০১০, এক-এগারোর পর থেকে ৩৬ জুলাই পর্যন্ত- যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে রাজপথে দাঁড়িয়েছিল, যারা গুম, নির্যাতন, কারাবাস, মামলা, চাকরি হারানো, পরিবার ভেঙে যাওয়া- সবকিছুর মূল্য দিয়েছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×