somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দলি, শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল.........

১৯ শে মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পুকুরের টলটলে জলে যখন বড় বড় লাল শাপলা ফুটে থাকে, তখন সেটি দেখতে এতোটাই সুন্দর লাগেযে তাতে মন উদাস হয়ে যায়। মন চায় জলে নেমে তুলে নিয়ে আসি কয়েকটি। কিন্তু হায়!! আমি সাঁতার জানি না, মন উদাস হওয়ার সেটাই বড় কারণ।

দেখতে গিয়েছিলাম জমিদার বাড়ি, সাটুরিয়াতে। সেখানে জমিদারদের ঘাটলা পুকুরে দেখতে পেলাম বড় বড় লাল শাপলা ফুটে আছে। সেই পুকুরের ঘাটে বসে ছিলাম বেশ কিছুটা সময়। লাল শাপলার ছবিও তুলেছি কিছু।


ঝিলের জলে কে ভাসালো নীল শালুকের ভেলা
মেঘলা সকাল বেলা।
বেণু বনে কে খেলে রে পাতা ঝরার খেলা।
মেঘলা সকাল বেলা।।
কাজল বরণ পল্লী মেয়ে
বৃষ্টি ধারায় বেড়ায় নেয়ে,
ব'সে দিঘীর ধারে মেঘের পানে রয় চেয়ে একেলা।।
দুলিয়ে কেয়া ফুলের বেনী শাপলা মালা প'রে
খেলতে এলো মেঘ পরীরা ঘুমতী নদীর চরে।
বিজলিতে কে দূর বিমানে, সোনার চুড়ির ঝিলিক হানে,
বনে বনে কে বসালো যুঁই-চামেলির মেলা।।

----- কাজী নজরুল ইসলাম -----




লাল শাপলা
অন্যান্য ও আঞ্চলিক নাম : রক্ত কমল, লাল কমল, আলগন্ধা, অলিপ্রিয়া, আলোহিতা, নিলুফার।
Common Name : Red Water Lily
Scientific Name : Nymphaea Rubra


লাল শাপলা বা রক্ত কমল নাতিশীতোষ্ণ ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এলাকার স্বল্প গভীর জলের হ্রদ ও পুকুরে জন্মে। সাধারণত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, চীনের ইউনান প্রদেশ, তাইওয়ান, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া, লাওস, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া প্রভৃতি দেশে শাপলা ফুটতে দেখা যায়।



সারা বাংলাদেশের সমস্ত বদ্ধ জলাশয়েই জলজ ফুল শাপলাকে ফুটে থাকতে দেখা যায়। গ্রামবাংলার চিরায়ত এক দৃশ্য "বিলের জলে কিশোর ছেলে ছোট্ট নৌকোয় তুলছে শাপলা"। আমাদের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি চোখে পরে সাদা শাপলা, এবং তারপরেই আছে লাল শাপলার অবস্থান। এই লাল শাপলার বৈজ্ঞানিক নাম Nymphaea Rubra। প্রচীন যুগে গ্রীকরা এই জাতীয় ফুলকে Nymph (জলপরীদের) উৎসর্গ করতো, সেখান থেকেই এই Nymphaea শব্দটি এসেছে।

Hylas and the Nymphs by John William Waterhouse (উইকি)

বাংলাদেশে কয়েক প্রজাতির শাপলা দেখতে পাওয়া যায়। এদের মধ্যে শুধু মাত্র সাদা শাপলাই আমাদের জাতীয় ফুলের মর্যাদা পেয়েছে, অন্য কোনো রঙের শাপলা তা পায়নি। অন্যদিকে শ্রীলংকা আর ইরানের জাতীয় ফুলও কিন্তু শাপলা, তবে তাদের রং ভিন্ন ভিন্ন।
বাংলাদেশের জাতীয় প্রতীকে এবং টাকায় শাপলর ছবি আছে। ইন্দোনেশিয়ার কাগুজে নোটেও লাল শাপলার ছবি আছে। তাছাড়া বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ডাকটিকিটেও লাল শাপলার উপস্থিতি রয়েছে।








যতদূর জানি সারা পৃথিবীতে মোটামুটি ৩৫ প্রজাতির মত শাপলা দেখতে পাওয়া যায়। তবে বাংলাদেশের শাপলাদের রং সাধারণত সাদা, লাল, লালচে গোলাপি, নীল, আর নীলচে সাদা, বেগুনী হতেই বেশি দেখা যায়। শাপলা সারা বছর ধরেই একটু-আকটু ফুটতে দেখা যায় তবে বর্ষায় ও শরৎ কালে এদের ফুটার সিজন বলা যায়। তখন এরা ফুটে প্রচুর পরিমানে।


এ কি অপরূপ রূপে মা তোমায় হেরিনু পল্লী-জননী।
ফুলে ও ফসলে কাদা মাটি জলে ঝলমল করে লাবনি॥
রৌদ্রতপ্ত বৈশাখে তুমি চাতকের সাথে চাহ জল,
আম কাঁঠালের মধুর গন্ধে জ্যৈষ্ঠে মাতাও তরুতল।
ঝঞ্ঝার সাথে প্রান্তরে মাঠে কভু খেল ল’য়ে অশনি॥
কেতকী-কদম-যূথিকা কুসুমে বর্ষায় গাঁথ মালিকা,
পথে অবিরল ছিটাইয়া জল খেল চঞ্চলা বালিকা।
তড়াগে পুকুরে থই থই করে শ্যামল শোভার নবনী॥
শাপলা শালুক সাজাইয়া সাজি শরতে শিশির নাহিয়া,
শিউলি-ছোপানো শাড়ি পরে ফের আগামনী-গীত গাহিয়া।
অঘ্রাণে মা গো আমন ধানের সুঘ্রাণে ভরে অবনি॥
শীতের শূন্য মাঠে তুমি ফের উদাসী বাউল সাথে মা,
ভাটিয়ালি গাও মাঝিদের সাথে গো, কীর্তন শোনো রাতে মা।
ফাল্গুনে রাঙা ফুলের আবিরে রাঙাও নিখিল ধরণী॥

----- কাজী নজরুল ইসলাম -----



জলের উপর ভেসে থাকে শাপলা ফুল আর তার বড় সবুজ পাতা। সাধারণত শাপলা ফুল পানির উপরে ছড়ানো অবস্থায় থাকে। কদাচিৎ পানির অল্প নীচে থাকতে পারে, কোথাও কোথাও এই অল্প ডুবে থাকা শাপলাকে “ডুবুরি শাপলা” বলে

শাপলার পাতা আর ফুলের কান্ড বা ডাটি বা পুস্পদন্ড পানির নিচে মূলের সঙ্গে যুক্ত থাকে আর এই মূল যুক্ত থাকে মাটির সঙ্গে। এই মূল থেকই আবার নতুন শাপলা জন্ম নেয়। শাপলার কান্ড বা ডাটা বা পুস্পদন্ড সবজী হিসেবেও খাওয়া হয়। আজকাল এই শাপলা ফুলের কান্ড বা ডাটা বা পুস্পদন্ড বাজারে বিক্রি হচ্ছে হরহামেসাই। তবে লাল শাপলা অনেকেই খেতে চায় না।

এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে।
এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ-রথে।।
দলি, শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল
নীল লাবনি ঝরায়ে চলচল এসো অরণ্য পর্বতে।।
এসো ভাদরের ভরা নদীতে ভাসায়েকেতকী পাতার তরণী
এসো বলাকার রঙ পালক কুড়ায়ে বাহি’ ছায়াপথ-সরণি।
শ্যাম শস্যে কুসুমে হাসিয়া এসো হিমেল হাওয়ায় ভাসিয়া
এসো ধরনীরে ভালোবাসিয়া দুর নন্দন-তীর হতে।।

----- কাজী নজরুল ইসলাম -----



পূর্ণবিকশিত শাপলা ফুলের গর্ভাশয়ে গুড়ি গুড়ি বীজ থাকে। আঠালো এই বীজ গ্রামের ছোটো ছোটো বাচ্চাদের খেতে দেখা যায়। তাছাড়া এই বীজ ভেজে এধরনের খাবার তৈরী করা হয় যার নাম “ঢ্যাপের খৈ”। খেতে খুবই চমৎকার। কিন্তু উপযুক্ত সময়ে গর্ভাশয়ের এই বীজ সংগ্রহ না করা হলে শেষ পর্যায়ে তা শুষ্ক হয়ে যায়।



এলো ঐ পূর্ণ শশী ফুল-জাগানো
বহে বায় বকুল-বনে ঘুম-ভাঙানো।।
লাগিল জাফরানি-রঙ শিউলি-ফুলে
ফুটিল প্রেমের কুঁড়ি পাপড়ি খুলে,
খুশির আজ আমেজ জাগে মন-রাঙানো।।
চাঁদিনী ঝিলমিলায় ঝিলের জলে,
আবেশে শাপলা ফুলের মৃণাল টলে,
জাগে ঢেউ দীঘির বুকে দোল-লাগানো।।

----- কাজী নজরুল ইসলাম -----



তথ্য সূত্র : বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, অন্তর্জাল।
ছবি ও বর্ণনা : মরুভূমির জলদস্যু।
ছবি তোলার স্থান : বালিয়াটি জমিদার বাড়ি পুকুর, সাটুরিয়া, মানিকগঞ্জ, বাংলাদেশ।
ছবি তোলার তারিখ : ২৫শে নভেম্বর, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দ।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৮
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মগজ ধোলাইয়ের মেশিন এবং ইংল্যান্ডের আদালতে দণ্ডিত ইমাম

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৮ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৩


"হীরক রাজার দেশে" সিনেমায় অত্যাচারী রাজা প্রজাদের ওপর অনেক অত্যাচারের পরেও যখন দেখেন প্রজারা পুরোপুরি বশ মানছে না, তখন সভা-বিজ্ঞানীকে দিয়ে একটা "যন্তর-মন্তর" ঘর তৈরি করেন। সেখানে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইউনুস শুধুমাত্র বাই বর্ন বাংলাদেশী!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১০


আমেরিকার সাথে চুক্তির কথাটি আসলেই ইউনুসের উপদেষ্টাসহ তার লোকজন বলে বিএনপি ও জামাতের সাথে আলোচনা করেই চুক্তিটি হয়েছে!
বিএনপি ও জামায়েতের সাথে আলোচনা করলেই কি এই চুক্তি সঠিক হয়ে যায়?

আপনাদের বিএনপি-... ...বাকিটুকু পড়ুন

মহাজাগতিক মাস্টারপ্ল্যান ও ভূ-রাজনীতির গোলকধাঁধা: আমরা কি কোনো অদৃশ্য নকশার অংশ?

লিখেছেন গেঁয়ো ভূত, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩২



মানুষের ইতিহাস আসলে দুটি সমান্তরাল রেখায় চলে। একটি হলো সেই ইতিহাস যা আমাদের পাঠ্যবইয়ে পড়ানো হয় বা নিউজ চ্যানেলে দেখানো হয়। আর অন্যটি হলো সেই গোপন... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিজেকে জানুন, নিজেকে গড়ুন

লিখেছেন মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ১৮ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৩৭

"নিজেকে জানুন, নিজেকে গড়ুন — নীরবতা হোক আপনার শক্তির সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।"
সব সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব আপনার একার না। আপনি যদি বারবার বোঝান, কিন্তু কেউ বুঝতে না চায় — তাহলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

দলি, শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল.........

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ১৯ শে মে, ২০২৬ দুপুর ২:২৫


পুকুরের টলটলে জলে যখন বড় বড় লাল শাপলা ফুটে থাকে, তখন সেটি দেখতে এতোটাই সুন্দর লাগেযে তাতে মন উদাস হয়ে যায়। মন চায় জলে নেমে তুলে নিয়ে আসি কয়েকটি। কিন্তু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×